ওসমান হাদির মৃত্যুর খবরে বিক্ষোভ ভাঙচুর আগুন
স্বরাষ্ট্র ও আইন উপদেষ্টার পদত্যাগ দাবি
Advertisement
যুগান্তর প্রতিবেদন
প্রকাশ: ১৯ ডিসেম্বর ২০২৫, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক শরিফ ওসমান হাদির মৃত্যুর খবর পাওয়ার পরপরই উত্তাল হয়ে ওঠে শাহবাগ। বৃহস্পতিবার রাতে সিঙ্গাপুর থেকে হাদির মৃত্যুর খবর পৌঁছানোর পর হত্যাকারীদের বিচারের দাবিতে রাজধানীর শাহবাগে অবস্থান নেন ইনকিলাব মঞ্চের কর্মী-সমর্থকরা। সেই সঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসসহ রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে বিক্ষোভ করেন বিভিন্ন সংগঠনের নেতাকর্মীরা। বিক্ষোভ চলাকালে রাত ১২টার দিকে দৈনিক প্রথম আলো, ডেইলি স্টার ও উত্তরায় সাবেক এক এমপির বাড়িতে হামলা ও অগ্নিসংযোগ করে দুর্বৃত্তরা।
হাদির মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়লে রাত ১০টা থেকে শাহবাগ মোড়ে জড়ো হতে থাকেন ইনকিলাব মঞ্চের কর্মীরা। এরপর বিভিন্ন সংগঠন ও শ্রেণি-পেশার মানুষও শাহবাগ মোড়ে জড়ো হতে থাকেন। তাদের কেউ প্রতিবাদী স্লোগান দেন, কেউ কান্নায় ভেঙে পড়েন। তারা হাদি হত্যার ঘটনায় বিচার দাবি করেন। সেই সঙ্গে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মো. জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী ও আইন, বিচার, সংসদবিষয়ক উপদেষ্টা ড. আসিফ নজরুলের পদত্যাগ দাবি করেন।
রাত সাড়ে দশটা থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন হল থেকে শিক্ষার্থীরা খণ্ড খণ্ড মিলিল নিয়ে বিক্ষোভে যোগ দেন। এরপর শাহবাগ থেকে একটি দল বিক্ষোভ মিছিল নিয়ে প্রধান উপদেষ্টার বাসভবনের পথে যাত্রা করেন। তবে তাদের পরিবাগ মোড়ে আটকে দেয় পুলিশ। রাত ১টায় এই প্রতিবেদন লেখার সময় হাজার হাজার মানুষ মিলিত হতে থাকেন শাহবাগ মোড়ে। তারা সেখানে টায়ারে আগুন জ্বালিয়ে বিক্ষোভ করেন। বিক্ষোভে একে একে যোগ দেন অন্তর্র্বতী সরকারের উপদেষ্টার পদ থেকে পদত্যাগ করা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া ও জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম, মাহফুজ আলম ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) সহসভাপতি (ভিপি) আবু সাদিক কায়েমসহ অন্যরা। বিক্ষোভকারীরা ‘নারায়ে তাকবির, আল্লাহু আকবার’, ‘গুলি করে বিপ্লব, রুখে দেওয়া যাবে না’, ‘শহীদ করে বিপ্লব, রুখে দেওয়া যাবে না’ ‘আমরা সবাই হাদি হব, যুগে যুগে লড়ে যাব, বিচার বিচার বিচার চাই, হাদি হত্যার বিচার চাই, আর নয় প্রতিরোধ, এবার হবে প্রতিশোধ, দিল্লি যাদের মামাবাড়ি, বাংলা ছাড়ো তাড়াতাড়ি, পেতে চাইলে মুক্তি ছাড়ো ভারতভক্তি, সুশীলতার দিন শেষ, বিচার চাই বাংলাদেশ’ ‘ইনকিলাব ইনকিলাব-জিন্দাবাদ জিন্দাবাদ’, ‘তুমি কে আমি কে-হাদি হাদি’, ‘শহীদ হাদির রক্ত বৃথা যেতে দেব না’সহ নানা প্রতিবাদী স্লোগান দিতে থাকেন। ঢাবি শিক্ষার্থী সাদিক মুনিম বলেন, আমাদের অযোগ্য অথর্ব রাষ্ট্রব্যবস্থা এই খুনিদের পালিয়ে যেতে বাধ্য করেছে। যে রাষ্ট্রের রন্ধ্রে রন্ধ্রে দালালি, চাঁদাবাজি, দুর্নীতি-সেই রাষ্ট্রের মুক্তির উপায় নেই। মুক্তির উপায় একটা, সেটি হলো বিপ্লব বিপ্লব বিপ্লব। একই সময়ে রাজধানীর বিমানবন্দর সড়ক ও রামপুরা এলাকা অবরোধ করে বিক্ষোভের খবর পাওয়া যায়।
এদিকে শাহবাগে বিক্ষোভ চলাকালেই রাত ১২টার দিকে কাওরান বাজারে দৈনিক প্রথম আলোর কার্যালয়ে হামলা চালায় একদল দুর্বৃত্ত। প্রথম আলোর একটি ভবনের ভেতরে ভাঙচুর করা হয়। সেখানকার কাগজপত্র, কম্পিউটার নিচে ফেলে দিয়ে আগুন দেওয়া হয়। প্রথম আলোর একজন সহসম্পাদক যুগান্তরকে জানান, বাইরে লোকজন জড়ো হয়ে হামলা চালানোর আগেই ওই ভবন থেকে লোকজন বাইরে বের হয়ে আসেন। এছাড়া পাশেই প্রথম আলোর আরেকটি ভবনেও হামলা চালানোর চেষ্টা করা হয়। এরপর তাদের একটি দল ফার্মগেটের কাছে অবস্থিত ডেইলি স্টারের প্রধান কার্যালয়ে হামলা চালায়। একপর্যায়ে তারা ভবনে অগ্নিসংযোগ করেন। এতে ডেইলি স্টারের বেশ কয়েকজন কর্মী ছাদে আটকে পড়েন। রাত ১টায় এই প্রতিবেদন লেখার সময় প্রথম আলো ও ডেইলি স্টার কার্যালয়ে ফায়ার সার্ভিসের দুটি ইউনিটের কার্যক্রম চলছিল। এছাড়া রাজধানীর উত্তরায় সাবেক এমপি হাবিব হাসানের বাড়িতে হামলা ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছে। এছাড়া রাতে তিন শতাধিক বিক্ষুব্ধ জনতা উত্তরা পূর্ব থানাধীন আজমপুর মহাসড়কে অবস্থান নেয়। রাত ১২টায় দনিয়া কলেজের সামনে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে অবস্থান নেয় প্রায় ১৫০ জন বিক্ষুব্ধ জনতা। এছাড়া রাত সাড়ে ১২টার দিকে ভারতীয় হাইকমিশনের সামনে অন্তত দেড়শ বিক্ষুব্ধ জনতার অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ প্রদর্শন করেন।
চট্টগ্রামে ভারতীয় সহকারী হাইকমিশনারের বাসভবনে হামলা : চট্টগ্রাম ব্যুরো জানায়, ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শরিফ ওসমান হাদির মৃত্যুর খবরে এনসিপি নেতাকর্মী ও ছাত্র-জনতা খুলশীতে ভারতের সহকারী হাইকমিশন অফিসের সামনে অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ করেছে। বৃহস্পতিবার রাত সাড়ে দশটার দিকে নগরীর ষোলশহর দুই নম্বর গেট এলাকায়ও সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করতে থাকেন বিক্ষুব্ধ ছাত্র-জনতা। সেখান থেকে তারা মিছিল নিয়ে ষোলশহর চশমা হিলে সাবেক শিক্ষামন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেলের বাসভবনে গিয়ে হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করে। রাত সাড়ে ১১টার দিকে ভারতীয় হাইকমিশনের নিরাপত্তায় বিপুলসংখ্যক পুলিশ মোতায়েন করা হয়। তবে রাত সোয়া একটার দিকে হঠাৎ হাইকমিশনারের বাসভবন লক্ষ্য করে ইটপাটকেল নিক্ষেপ ও হামলা চালাতে শুরু করে বিক্ষুব্ধরা। এ সময় পুলিশ তাদের ধাওয়া দিলে পুলিশের ওপরও ইটপাটকেল নিক্ষেপ করা হয়। এক পর্যায়ে পুলিশ টিয়ারশেল নিক্ষেপ করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। এ সময় পুলিশের কয়েকজন সদস্য আহত হন। ভারতীয় সহকারী হাইকমিশনার অফিসের বাউন্ডারির ভেতরেই হাইকমিশনারের বাসভবন। সেখানেই বসবাস করেন সহকারী হাইকমিশনার ড. রাজিব রঞ্জন চক্রবর্ত্তী। তবে ঘটনার সময় তিনি বাসায় ছিলেন কিনা সে বিষয়ে নিশ্চিত করে কিছু জানাতে পারেনি খুলশী থানা পুলিশ।
একই সময়ে ষোলশহর দুই নম্বর গেট এলাকায় সড়কে অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ করেন বিক্ষুব্ধ ছাত্র-জনতা। এখান থেকে প্রতিবাদী ছাত্র-জনতা মিছিল নিয়ে চশমা হিলে সাবেক সিটি মেয়র প্রয়াত এবিএম মহিউদ্দিন চৌধুরী ও সাবেক শিক্ষামন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেলের বাড়িতে গিয়ে হামলা, ভাঙচুর ও বাড়ির সামনে অগ্নিসংযোগ করে।
