রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতাসহ ২০ কারণ
৩০ হাজার কোটি টাকা কমিয়ে সংশোধিত এডিপি অনুমোদন
এনইসি বৈঠক: সংশোধিত বরাদ্দ ২ লাখ কোটি টাকা * সর্বোচ্চ বরাদ্দ পরিবহণ ও যোগাযোগ খাতে * বৈদেশিক ঋণনির্ভরতা থেকে বেরিয়ে আসার চেষ্টা -ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ
Advertisement
যুগান্তর প্রতিবেদন
প্রকাশ: ১৩ জানুয়ারি ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
দেশে বিরাজমান রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা, প্রকল্প বাছাইয়ে কড়াকড়ি, ক্রয় প্রক্রিয়ায় পরিবর্তন, প্রকল্প পরিচালকদের অদক্ষতা, ভূমি অধিগ্রহণে জটিলতা, ঠিকাদারদের পালিয়ে যাওয়াসহ প্রায় ২০ কারণে চলতি অর্থবছরে এডিপির বাস্তবায়ন কমেছে। ফলে মোট বরাদ্দ থেকে ৩০ হাজার কোটি টাকা বাদ দিয়ে সংশোধিত এডিপি (আরএডিপি) অনুমোদন দিয়েছে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদ (এনইসি)। সোমবার রাজধানীর শেরেবাংলা নগরের এনইসি সম্মেলন কক্ষে অনুষ্ঠিত বৈঠকে এই অনুমোদন দেওয়া হয়। এতে সভাপতিত্ব করেন প্রধান উপদেষ্টা ও এনইসি চেয়ারপারসন ড. মুহাম্মদ ইউনূস।
চলতি অর্থবছরে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে (এডিপি) ২ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ ছিল। এখন আরএডিডিপতে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে ২ লাখ কোটি টাকা। বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের ব্রিফ করেন পরিকল্পনা উপদেষ্টা ড. ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ। তিনি জানান, প্রকল্প সংক্রান্ত তিনটি বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায়ের ফোরাম-এনইসি।
চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের আরএডিপিতে যে বরাদ্দ ধরা হয়েছে, এর মধ্যে সরকারি তহবিলের ১ লাখ ২৮ হাজার কোটি এবং বৈদেশিক ঋণের ৭২ হাজার কোটি টাকা। ফলে মূল এডিপির তুলনায় সরকারি তহবিলের ১৬ হাজার কোটি এবং বৈদেশিক ঋণ থেকে কমেছে ১৪ হাজার কোটি টাকা।
ব্রিফিংয়ে জানানো হয়, সংশোধিত এডিপিতে মোট প্রকল্প দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৩০০টি। এর মধ্যে ১ হাজার ১০৮টি বিনিয়োগ, সম্ভাব্যতা সমীক্ষার ৩৫টি এবং কারিগরি সহায়তা প্রকল্প রয়েছে ১২১টি। এছাড়া স্বায়ত্তশাসিত সংস্থার প্রকল্প রয়েছে ৬৬টি। সংশোধিত এডিপিতে খাতভিত্তিক বরাদ্দের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে পরিবহণ ও যোগাযোগ খাতে ৩৮ হাজার ৫০৯ কোটি, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে ২৬ হাজার ১৮৬ কোটি, গৃহায়ন ও কমিটি সুবিধাবলিতে ২২ হাজার ৭২৯ কোটি, শিক্ষায় ১৮ হাজার ৫৪৯ কোটি এবং স্থানীয় সরকার ও পল্লী উন্নয়ন খাতে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে ১৫ হাজার ১৪২ কোটি টাকা। এদিকে মন্ত্রণালয় ও বিভাগভিত্তিক বরাদ্দের মধ্যে সর্বোচ্চ স্থানীয় সরকার বিভাগে ৩৭ হাজার ৫৩৪ কোটি টাকা, সড়ক পরিবহণ ও মহাসড়ক বিভাগে ১৯ হাজার ৯৪৯ কোটি এবং বিদ্যুৎ বিভাগে দেওয়া হয়েছে ১৪ হাজার ৮৯৫ কোটি টাকা।
ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ জানান, এনইসিতে যে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে তা হলো-প্রথমত, বর্তমানে প্রশাসন ক্যাডারে একীভূত হওয়া অর্থনৈতিক ক্যাডার কর্মকর্তাদের একটি নিদিষ্টি চিহ্ন দিয়ে রাখা হবে। এতে পরবর্তী সময়ে তাদের উন্নয়ন প্রকল্প সংক্রান্ত উইং অথবা কারিগরি কার্যক্রম আছে, এমন স্থানে পদায়ন করা সহজ হবে। দ্বিতীয়ত, দক্ষ প্রকল্প পরিচালক পেতে একটি পিডি পুল গঠন করা হবে। এখান থেকে যোগ্যতা অনুযায়ী যে কোনো প্রকল্পে পরিচালক সরবরাহ করা হবে। তৃতীয়ত, রাজউক ও বিপিসির মতো স্বায়ত্তশাসিত সংস্থাগুলো এখন থেকে তাদের নিজস্ব অর্থায়নে ৫০ কোটি টাকার বেশি ব্যয়ের প্রকল্প হলে অবশ্যই একনেক থেকে অনুমোদন নিতে হবে। বর্তমানে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় নিজস্ব অর্থায়নের প্রকল্প অনুমোদন দিতে পরে। এতে অনেক জটিলতা সৃষ্টি হয়। অর্থ ও সময়ের অপচয় হয়।
এডিপি থেকে ৩০ হাজার কোটি টাকা কাটছাঁটের কারণ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা রয়েছে। এছাড়া রাজনৈতিক সরকারের সময় প্রকল্পের ভিড় ছিল। কিন্তু আমাদের ভালো প্রকল্প খুঁজে তারপর অনুমোদন দিতে হচ্ছে। পাশাপাশি যে কোনো প্রকল্প অনুমোদনের সময় শর্ত দেওয়া হচ্ছে। এতে ৬ মাস পরপর প্রকল্পের অগ্রগতি জানাতে হবে পিডিকে। এক্ষেত্রে তৃতীয় পক্ষের মাধ্যমে বাস্তবায়ন কার্যক্রম মূল্যায়ন করাতে হবে। শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে আগে সেক্টর প্ল্যান ছিল। এখন সেগুলো বাতিল করা হয়েছে। স্বাস্থ্যের ৪ হাজার কোটি টাকার বেশি খরচের প্রকল্প বাধ্য হয়েই ভূতাপেক্ষ অনুমোদন দিতে হয়েছে। তিনি জানান, বৈদেশিক ঋণ নিয়ে কোনো দেশ উন্নত হতে পারেনি। তাই আমরা বৈদেশিক ঋণনির্ভরতা থেকে বেরিয়ে আসার চেষ্টা করছি। এখন থেকে ভালো প্রকল্প নেওয়ার ক্ষেত্রে বৈদেশিক ঋণ খোঁজার আগেই পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপের (পিপিপি) মাধ্যমেও অর্থায়ন খুঁজতে হবে। বৈদেশিক ঋণ দিলেই যে নিতে হবে-এমন কোনো বিষয় থাকবে না। তিনি আরও জানান, পায়রা সমুদ্রবন্দর এবং ঢাকায় মেট্রোরেল কতটা হবে, সেসব বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবে আগামী সরকার। এছাড়া মূল্যস্ফীতি কমাতে বাংলাদেশ ব্যাংক সুদের হার বাড়িয়েছিল। সেটি কমাতে পারলে ভালো হবে। তিনি জানান, চলমান অনেক প্রকল্পে ৩০০-৪০০ শতাংশ ব্যয় বেড়েছে।
এদিকে মেগা প্রকল্পগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি কমছে মেট্রোরেল লাইন-১ (এমআরটি লাইন-১) প্রকল্পের বরাদ্দ। চলমান এডিপিতে এ প্রকল্পের আওতায় বরাদ্দ ছিল ৮ হাজার ৬৩১ কোটি ৪৩ লাখ টাকা। কিন্তু সংশোধিত এডিপিতে বরাদ্দ ধরা হয়েছে ৮০১ কোটি টাকা। ফলে বাদ গেছে ৭ হাজার ৮৩০ কোটি ৪৩ লাখ টাকা, বা ৯১ শতাংশ বরাদ্দ কমছে। এছাড়া বরাদ্দ কমার দিক থেকে দ্বিতীয় অবস্থানে মাতারবাড়ী বন্দর উন্নয়ন প্রকল্প। এটিতে ৪ হাজার ৬৮ কোটি টাকা বরাদ্দ থেকে ২ হাজার ৯৮৩ কোটি টাকা কাটছাঁট করে এখন ধরা হচ্ছে ১ হাজার ৮৫ কোটি টাকা, যা মোট বরাদ্দের ৭৩ শতাংশ। তৃতীয় অবস্থানে থাকা হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর সম্প্রসারণ প্রকল্পে কমছে ৭৩২ কোটি ৯১ লাখ টাকা। এটিতে বরাদ্দ আছে ১ হাজার ৩৯ কোটি ৩৫ লাখ টাকা। এখন সংশোধিত বরাদ্দ ধরা হয়েছে ৩০৬ কোটি ৪৪ লাখ টাকা, ফলে বরাদ্দ কমছে ৭১ শতাংশ। বাস র্যাপিড ট্রানজিট (বিআরটি) প্রকল্পে ৪২৫ কোটি থেকে ২৫৬ কোটি ৪ লাখ টাকা কমিয়ে সংশোধিত বরাদ্দ ধরা হচ্ছে ১৬৮ কোটি ৬ লাখ টাকা। এক্ষেত্রে বরাদ্দ কমছে ৬০ শতাংশ। এছাড়া মেট্রোরেল লাইন-৫ (এমআরটি লাইন-৫) প্রকল্পে ১ হাজার ৪৯০ কোটি ৬৫ লাখ থেকে ৮৯৭ কোটি ৮৫ লাখ কমিয়ে সংশোধিত বরাদ্দ ধরা হচ্ছে ৫৯২ কোটি ৮ লাখ টাকা। এক্ষেত্রে বরাদ্দ কমছে ৬০ শতাংশ। আরএডিপিতে বরাদ্দহীনভাবে অনুমোদিত নতুন প্রকল্প রয়েছে ৮৫৬টি। বৈদেশিক সাহায্য প্রাপ্তির সুবিধার্থে বরাদ্দহীনভাবে অননুমোদিত প্রকল্প রয়েছে ১৫৭টি, সংস্থার নিজস্ব অর্থায়নে বরাদ্দহীনভাবে অননুমোদিত নতুন প্রকল্প ৩৫টি এবং পিপিপি প্রকল্প ৮১টি। এছাড়া ২০২৬ সালের ৩০ জুনের মধ্যে সমাপ্ত করার জন্য নির্ধারিত প্রকল্প রয়েছে ২৮৬টি।
