Logo
Logo
×
   

Advertisement

দ্বিতীয় সংস্করণ

অন্তর্বর্তী সরকারের কাজের তথ্য প্রকাশ

১৩০টি আইন, ৬ শতাধিক নির্বাহী আদেশ জারি

Advertisement

Icon

বিশেষ প্রতিনিধি

প্রকাশ: ০৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

Advertisement

দায়িত্ব গ্রহণের পর গত ১৮ মাসে রাষ্ট্র সংস্কারে প্রায় ১৩০টি আইন (নতুন আইন এবং সংশোধিত আইন) প্রণয়ন করেছে অন্তর্বর্তী সরকার। এছাড়াও ৬০০টিরও বেশি নির্বাহী আদেশ জারি করা হয়। এসব পদক্ষেপের প্রায় ৮৪ শতাংশ ইতোমধ্যে প্রয়োগ করা হয়েছে। এতে বাস্তবেই সংস্কার দৃশ্যমান হয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকারের পক্ষ থেকে রোববার প্রকাশিত সংস্কার তালিকায় (রিফর্মস বুক) এসব তথ্য তুলে ধরা হয়। ওই রিপোর্টে অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পর বিভিন্ন খাতে কাঠামোগত সংস্কারের রূপরেখা ও বাস্তবায়নের অগ্রগতি তুলে ধরা হয়। এসব খাতের মধ্যে রয়েছে-প্রশাসন, অর্থনীতি, জ্বালানি, পরিবহণ, খাদ্য, শ্রম, শিল্প, স্বাস্থ্য, শিক্ষা এবং সামাজিক ও সাংস্কৃতিক উন্নয়ন।

রিপোর্টে বলা হয়, অন্তর্বর্তী সরকার দেশে সংস্কারের ক্ষেত্রে ৫টি বিষয়কে গুরুত্ব দিয়েছে। এগুলো হলো-দুর্নীতি কমানো, ডিজিটালাইজেশন, আইনের শাসন, টেকসই উন্নয়ন এবং নাগরিক সেবা সহজ করা। এসব ক্ষেত্রে শুধু তাৎক্ষণিক সমস্যা সমাধান নয়, লক্ষ্য ছিল দীর্ঘমেয়াদে একটি স্বচ্ছ, দক্ষ ও জনগণকেন্দ্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ে তোলা। এছাড়াও রাষ্ট্র পরিচালনার গুরুত্বপূর্ণ খাতে স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা, দক্ষতা ও নাগরিকসেবামুখী শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা।

প্রেস উইং থেকে জানায়, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট দেশের সর্বস্তরের মানুষ রাস্তায় নেমে আসে। তাদের মূল বার্তা ছিল শেখ হাসিনার ষোল বছরের ফ্যাসিবাদী শাসনকে বলা-‘যথেষ্ট হয়েছে’। পরে প্রফেসর মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে একটি অন্তর্বর্তী সরকার গঠন হয়।

এতে বলা হয়, অন্তর্বর্তী সরকার উত্তরাধিকার সূত্রে গভীর অর্থনৈতিক, প্রাতিষ্ঠানিক ও গণতান্ত্রিক ভাঙন পেয়েছিল। বছরের পর বছর ধরে চলা দুর্নীতি ও দুঃশাসন এই রাষ্ট্রকে ফাঁপা করে দেয়। সরকারি প্রতিষ্ঠান থেকে শত শত বিলিয়ন ডলার পাচার করা হয়। ব্যাংকিং খাত পঙ্গু হয়ে যায়। কেন্দ্রীয় ব্যাংকসহ মূল নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলো ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিক স্বার্থের অধীনস্থ হয়। আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোকে রাজনৈতিক দমন-পীড়নের জন্য ব্যবহার করা হয়। বিচার বিভাগ দুর্নীতি এবং রাজনৈতিক কারসাজিতে পূর্ণ হয়ে যায়। এসব কারণে জনগণ স্বাধীনতা হারায়। ভোটারবিহীন নির্বাচন জাতির ভাগ্যে পরিণত হয়। গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ও নাগরিক সমাজের প্রাণবন্ত জীবন অদৃশ্য হয়। এই ধ্বংসাবশেষ থেকে অন্তর্বর্তী সরকার বিভিন্ন সেক্টরে লাখ লাখ নাগরিকের পাশাপাশি কাজ করে রূপান্তরের প্রক্রিয়া শুরু করে। দায়িত্ব গ্রহণের পরপরই সংশ্লিষ্ট ক্ষেত্রের বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে সংস্কার কমিশন গঠন করা হয় এবং ক্ষেত্র-ভিত্তিক সংস্কারের জন্য সুপারিশ চাওয়া হয়। এই কমিশনগুলোর দেওয়া রিপোর্টের ভিত্তিতে এবং নিজস্ব উদ্যোগে অন্তর্বর্তী সরকার ব্যাপক আইনি এবং প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার চালু করে।

এতে আরও বলা হয়, অর্থনীতি ও বৈদেশিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে বড় অগ্রগতি অর্জিত হয়েছে। নতুন বাণিজ্য চুক্তিগুলো অংশীদারত্বকে বৈচিত্র্যময় করেছে এবং একক বাজারের ওপর অত্যধিক নির্ভরতা হ্রাস করেছে। এরমধ্যে জাপানের সঙ্গে একটি অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি রয়েছে। এতে প্রায় ৭ হাজার ৪০০ বাংলাদেশি পণ্যে শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার দিয়েছে। চীনের সঙ্গে কৌশলগত সহযোগিতা ঋণের পরিপক্বতা বাড়িয়েছে। প্রধান স্বাস্থ্যসেবা অবকাঠামোকে সমর্থন করেছে এবং তথ্য ভাগ করা হাইড্রোলজিকাল ডেটার মাধ্যমে বন্যার পূর্বাভাস উন্নত করেছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনার ফলে পারস্পরিক শুল্ক ৩৭ শতাংশ থেকে ২০ শতাংশ হ্রাস করা হয়েছে। এ সময়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশীদারদের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্কের উন্নতি হয়েছে। ভারতের সঙ্গে সম্পর্ককে আরও ভারসাম্যপূর্ণ ও সম্মানজনক ভিত্তিতে পুনর্বিন্যাস করা হয়েছে। জবাবদিহি শুরু হয়েছে। বিগত সময়ের দুর্নীতিবাজ রাজনীতিবিদ ও কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির মামলা হয়েছে। শত শত ডলারের সম্পদ জব্দ বা বাজেয়াপ্ত করা হয়। ৪২টি মন্ত্রণালয়জুড়ে ক্রয় স্বচ্ছতা প্রসারিত করা হয়েছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোকে অর্থনৈতিক তথ্য রিপোর্ট করার জন্য সম্পূর্ণ স্বায়ত্তশাসন দেওয়া হয়।

আইন প্রয়োগকারী সংস্কারগুলো সিস্টেমে শৃঙ্খলা যথেষ্ট পরিমাণে পুনরুদ্ধার করা হয়েছে জানিয়ে রিপোর্টে বলা হয়, এ সময়ে ১ হাজার ২০০-এরও বেশি কর্মকর্তাকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। হাজার হাজার কর্মীর জন্য মানবাধিকারকেন্দ্রিক প্রশিক্ষণ চালু করা হয়েছে। গঠিত কমিশনে হাজার হাজার ভুক্তভোগী এবং পরিবারের সদস্যরা সাক্ষ্য দিয়েছেন। র‍্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নকে পুনর্গঠন করা হয়েছে। এর নামকরণ করা হয়েছে ‘স্পেশাল ইন্টারভেনশন ফোর্স’। কাঠামোগত সংস্কারের মাধ্যমে পুনরুদ্ধার করা হয়েছে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা। সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মামলা প্রত্যাহার করা হয়েছে। রাজনৈতিক বিবেচনায় পূর্বে নিষিদ্ধ করা গণমাধ্যমগুলোকে পুনরায় কার্যক্রম শুরুর অনুমতি দেওয়া হয়। সাংবিধানিক সংস্কারের জন্য রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে উম্মুক্ত সংলাপের মাধ্যমে জুলাই সনদ তৈরি করা হয়।

অর্থনীতি ও রাজস্ব ব্যবস্থাপনা : রিপোর্টে বলা হয়েছে, রাজস্ব বাড়ানো ও কর ব্যবস্থাকে আধুনিক করতে মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি কর্মসূচি নেওয়া হয়েছে। এর লক্ষ্য কর-জিডিপি অনুপাত বাড়ানো, অটোমেশন, কর ফাঁকি কমানো এবং আইন সবার জন্য সমানভাবে প্রয়োগ। আমদানি-রপ্তানিতে হয়রানি কমাতে ‘বাংলাদেশ সিঙ্গেল উইন্ডো’ চালু করা হয়েছে। এক্ষেত্রে অনলাইনে লাইসেন্স ও সার্টিফিকেট মিলছে। কাস্টমস বন্ড ব্যবস্থাপনা স্বয়ংক্রিয় করতে কাস্টমস অ্যান্ড বন্ড ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম চালু হয়েছে। অডিট ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা আনতে চালু করা হয়েছে নতুন গাইডলাইন। আর্থিক খাতে ব্যাংক রেগুলেশন অধ্যাদেশ, বাংলাদেশ ব্যাংক অধ্যাদেশ সংশোধন এবং গ্রামীণ ব্যাংকের কাঠামোগত পরিবর্তনের মাধ্যমে স্থিতিশীলতা ও জবাবদিহি বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

জ্বালানি ও অবকাঠামো : বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে বিশেষ আইন বাতিল করে স্বচ্ছতা ফেরানো হয়েছে। নবায়নযোগ্য জ্বালানি নীতির মাধ্যমে ২০৩০ সালে ২০ শতাংশ এবং ২০৪০ সালে ৩০ শতাংশ বিদ্যুৎ নবায়নযোগ্য উৎস থেকে উৎপাদনের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। সরকারি ভবনের ছাদে সৌরবিদ্যুৎ বসিয়ে হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি মার্চেন্ট পাওয়ার পলিসি এবং নেট মিটারিং গাইড লাইন প্রণয়ন করে বেসরকারি বিনিয়োগ ও গ্রাহকদের নিজস্ব বিদ্যুৎ উৎপাদনকে উৎসাহিত করা হয়েছে। জ্বালানি নিয়ন্ত্রক সংস্থাকে স্বাধীন করে ট্যারিফ নির্ধারণে জনশুনানি ফিরিয়ে আনা হয়েছে।

পরিবহণ ও যোগাযোগ : জাতীয় লজিস্টিকস নীতির মাধ্যমে বন্দর ও পরিবহণ খাতে দেরি ও দুর্নীতি কমানোর লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে। পদ্মা সেতুতে ইলেকট্রনিক টোল কালেকশন চালু করে ক্যাশলেস ব্যবস্থা পরীক্ষামূলকভাবে শুরু হয়েছে। রেলওয়েতে নতুন কমিউটার ট্রেন, নারীদের জন্য আলাদা কোচ, ছাদে সৌরবিদ্যুৎ বসানো এবং রেলওয়ে হাসপাতাল সাধারণ মানুষের জন্য উন্মুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

খাদ্য নিরাপত্তা, কৃষি ও মৎস্য : খাদ্য খাতে ওপেন মার্কেট সেল পলিসি এবং খাদ্যবান্ধব প্রোগ্রাম নীতি চালু করে দরিদ্র মানুষের জন্য সাশ্রয়ী খাদ্য নিশ্চিত করার কথা বলা হয়েছে। গুদাম ও পরিবহণ ব্যবস্থায় ঘাটতি ও দুর্নীতি কমাতে অ্যাকশন প্ল্যান নেওয়া হয়েছে। কৃষকদের জন্য ফার্মার অ্যাপস আপডেট করে কৃষকের কাছ থেকে সরাসরি ধান কেনা ও মধ্যস্বত্বভোগী কমানোর চেষ্টা চলছে। মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ খাতে দাদন প্রথা বন্ধে আইন করা এবং মাছ সংরক্ষণ আইনের সংশোধনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

শিল্প, বাণিজ্য ও কর্মসংস্থান : এসএমই খাতকে শক্তিশালী করা, দক্ষতা উন্নয়ন, সহজ ঋণপ্রাপ্তি ও প্রযুক্তি ব্যবহার বাড়ানোর ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। পরিবেশবান্ধব যানবাহন খাত গড়ে তুলতে ইলেক্ট্রিক ভেহিকল ইন্ডাস্ট্রি ডেভেলপমেন্ট পলিসির প্রস্তাব করা হয়েছে। টেক্সটাইল ও পাট খাতে কাঁচামালের ন্যায্য সরবরাহ, সেবা ডিজিটাল করা, সম্পদ ব্যবস্থাপনা সফটওয়্যার চালু ও রেশম চাষিদের পাওনা দ্রুত পরিশোধের মতো সংস্কার অন্তর্ভুক্ত।

শ্রম অধিকার : বাংলাদেশ শ্রম আইন সংশোধন করে ট্রেড ইউনিয়ন গঠন সহজ করা, শিশুশ্রমের শাস্তি বাড়ানো, প্রভিডেন্ট ফান্ড বাধ্যতামূলক করা ও বিপজ্জনক কাজে জোর না করার বিধান আনা হয়েছে। ট্রিপার্টাইট কাউন্সিল পুনর্গঠন, নতুন আইএলও কনভেনশন অনুমোদনের উদ্যোগ, জাতীয় মজুরি নীতি প্রণয়ন এবং শ্রম আদালত সম্প্রসারণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

স্বাস্থ্য ও শিক্ষা : চিকিৎসা শিক্ষায় মান নিশ্চিত করতে বাংলাদেশ মেডিকেল এডুকেশন অ্যাক্রেডিটেশন কাউন্সিল পুনর্গঠন, ইন্টিগ্রেটেড মডিউলার কারিকুলাম চালু, পোস্ট গ্র্যাজুয়েট প্রশিক্ষণে প্রণোদনা বাড়ানো এবং মেডিকেল-ডেন্টাল ভর্তি পরীক্ষায় কোটা বাতিল ও একক পরীক্ষা চালুর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এর লক্ষ্য হলো দক্ষ ও মানবিক ডাক্তার তৈরি করা।

পরিবেশ, দুর্যোগ ও যুব অংশগ্রহণ : দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় তরুণদের স্বেচ্ছাসেবক হিসাবে যুক্ত করা, জাতিসংঘের ‘আর্লি ওয়ারর্নিং ফর অল’ কর্মসূচিতে অংশগ্রহণ এবং খাদ্য নিরাপত্তা ও পরিবেশ রক্ষার নানা উদ্যোগ তুলে ধরা হয়েছে।

সামাজিক-সাংস্কৃতিক ও উন্নয়ন : হজ ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা, যাকাত অ্যাপস চালু, কোরআন হিফজ ও সিরাত প্রতিযোগিতা, ইমাম প্রশিক্ষণের মাধ্যমে জীববৈচিত্র্য রক্ষা ও জীবনমান উন্নয়ন, বাংলা একাডেমি সংস্কার কমিটি, জুলাই গণ-অভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘর আইন এবং নতুন সাংস্কৃতিক নীতির উদ্যোগ রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়।

Advertisement

Advertisement

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম