বিটিআরসি’র ‘মিটিং মিনিটস’ জালিয়াতি
বকেয়া রেখেই এস আলমের প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম শুরু!
আদালতের আদেশ ও সংশ্লিষ্টদের আপত্তি উপেক্ষা
Advertisement
বিশেষ প্রতিনিধি
প্রকাশ: ৩১ মার্চ ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
এস আলম গ্রুপের বিতর্কিত প্রতিষ্ঠান ‘ফার্স্ট কমিউনিকেশন’র বকেয়া রয়েছে ৭ কোটি টাকার বেশি। আছে টেলিযোগাযোগ নীতিমালা ভঙ্গের গুরুতর অভিযোগও। অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে এর কার্যক্রম বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু পুরো বকেয়া আদায় না করে এবং আদালতের আদেশ ও সংশ্লিষ্টদের আপত্তি উপেক্ষা করেই সম্প্রতি সেই নিষেধাজ্ঞা তুলে নিয়েছে বিটিআরসি। অন্য অপারেটররাও এই প্রতিষ্ঠানের কাছে টাকা পাবে। কিন্তু সেই পাওনা আদায়ের কোনো সুরাহা হয়নি। উলটো বিটিআরসির বিরুদ্ধেই ‘মিটিং মিনিটস’ জালিয়াতির অভিযোগ উঠেছে। খোদ অভিভাবক সংস্থাই তাদের এমন সুবিধা দেওয়ায় ক্ষুব্ধ সংশ্লিষ্টরা। তাদের আশঙ্কা, এমন সিদ্ধান্তে টেলিকম খাতে ফের বড় ধরনের বিশৃঙ্খলা দেখা দেবে।
অভিযোগ আছে, একটি বিশেষ মহলকে আশ্রয়-প্রশ্রয় দিতে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন-বিটিআরসি ওই অনুমোদন দিয়েছে। এ ব্যাপারে মন্তব্য নিতে বারবার ফোন করেও বিটিআরসির চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল (অব.) এমদাদুল বারীকে পাওয়া যায়নি।
টেলিযোগাযোগ সচিব আব্দুন নাসের খানের কাছে এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, আইজিডব্লিউগুলোর কার্যক্রম বিটিআরসি সরাসরি দেখে। সুতরাং বিষয়টি সরকারের জানা নেই। তবে কোনো অন্যায় হলে মন্ত্রণালয় এ ব্যাপারে ব্যবস্থা নেবে।
জানা গেছে, ২০২৪’র ৫ আগস্ট পটপরিবর্তনের পর ওই বছরের ৩ ডিসেম্বর বকেয়া প্রায় ৭ কোটি টাকা এবং নানা অভিযোগে ফাস্ট কমের বাণিজ্যিক কার্যক্রম বন্ধ করে দেয় বিটিআরসি। ওই সময়ে আইজিডব্লিউ অপারেটরসদের প্রায় ৩ কোটি টাকা (২ লাখ ২২ হাজার ৫৭১ ডলার) এবং বিটিআরসির রাজস্ব ভাগাভাগি ও লাইসেন্স ফি বাবদ আরও ৪ কোটি টাকা বকেয়া ছিল। কিন্তু পুরো বকেয়া পরিশোধ না করে ওই কোম্পানিকে বাণিজ্যিক কার্যক্রম করার সুযোগ দেওয়া হয়েছে। ফার্স্ট কম কেবল বিটিআরসির ৪ কোটি টাকার মধ্যে মাত্র ২ কোটি টাকা পরিশোধ করেছে। ওই ২ কোটি টাকা পেয়ে বিটিআরসি গত ১৬ মার্চ ফাস্ট কমের বাণিজ্যিক কার্যক্রমের ওপর বিধিনিষেধ তুলে দেয়। অথচ ২০২৫ সালের ২৫ মে বিটিআরসির এক নির্দেশনায় বলা হয়েছে, ৩১ জুলাই ২০২৫ সালের মধ্যে সব বকেয়া পরিশোধ না করলে নতুন টপোলজি বা কল লেনদেনে অংশ নিতে পারবে না। ফাস্ট কমের ক্ষেত্রে বিটিআরসি নিজেই নিজের নিদের্শনা লঙ্ঘন করেছে।
চলতি বছরের জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারিতে বকেয়া নিষ্পত্তি নিয়ে একাধিক বৈঠক হয়। প্রথমে প্রতিষ্ঠানটি ২৫ শতাংশ অর্থ পরিশোধ করে বাকি অর্থ ১২ কিস্তিতে দেওয়ার প্রস্তাব দেয়। পরে তারা তিন কিস্তিতে পরিশোধের নতুন প্রস্তাব দেয়, যেখানে কার্যক্রম শুরুর পর কিস্তি পরিশোধের কথা বলা হয়। তবে সংশ্লিষ্ট আইওএফ অপারেটরদের পক্ষ থেকে এসব প্রস্তাবে অসম্মতি প্রকাশ করা হয়। এ ক্ষেত্রে তাদের বক্তব্য, যেখানে নিয়ম মেনে চলা প্রতিষ্ঠানগুলো বর্তমানে ব্যবসায় টিকে থাকতে হিমশিম খাচ্ছে, সেখানে কোম্পানিটি ব্যবসা করে দায় শোধ করবে-এটার সামান্যতম কোনো বাস্তবতা নাই। অপারেটরদের আশঙ্কা হচ্ছে, এই কোম্পানি আগেও দায় রেখে সরে গেছে, আবারও একই ঘটনা ঘটতে পারে।
অভিযোগ আছে বিটিআরসির একটি গ্রুপ মিটিং মিনিটস জালিয়াতি করে ফাস্ট কমকে বাণিজ্যিক কার্যক্রম চালানোর অনুমোদন দিয়েছে। গত ১৫ মার্চ প্রকাশিত বিটিআরসির মিটিং মিনিটসে উল্লেখ করা হয়, সব পক্ষ ৩ কিস্তির প্রস্তাবে সম্মত! কিন্তু সংশ্লিষ্ট অপারেটরদের দাবি তারা এমন কোনো সম্মতি দেয়নি। এ ঘটনায় অপারেটরদের সংগঠন বিটিআরসির কাছে আনুষ্ঠানিক প্রতিবাদ জানিয়েছে।
আইওএফের চিফ অপারেটিং অফিসার মুশফিক মঞ্জুর সোমবার যুগান্তরকে বলেন, বিটিআরসি টেলিকম খাতের অভিভাবক। বিটিআরসির নির্দেশনায় পরিষ্কারভাবে বলা হয়েছে, সব দেনা পাওনা পরিশোধ করার পর নতুন টপোলজি অনুযায়ী ব্যবসা পরিচালনা করার। ফাস্ট কমের কাছ থেকে আইজিডব্লিউর পাওনা টাকা আদায়ের কোনো সুরাহা না হওয়ার ব্যাপারে বিটিআরসিকে বারবার অবহিত করা হয়েছে। অথচ বিটিআরসি শুধু নিজের পাওনা টাকার অর্ধেক আদায় করেই ফাস্টকমকে চালু করার জন্য আগ্রহী।
আদালতের আদেশে কি আছে : যুগান্তরের হাতে আসা তথ্য উপাত্তে দেখা গেছে, ফাস্ট কমে বিতর্কিত গ্রুপ এবং ব্যাংক লুটের সাথে জড়িত এস আলমের বেনামে ৭৭ শতাংশের বেশি শেয়ার রয়েছে। বাকি শেয়ারের মালিকানা সাবেক মন্ত্রী জিয়া উদ্দিন আহমেদ বাবলুর এবং তার পরিবারের। দুর্নীতি দমন কমিশন-দুদকের এক আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ২০২৫ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি ঢাকা মহানগর স্পেশাল জজ আদালত এস আলম এবং তার পরিবার সংশ্লিষ্ট ৪২টি কোম্পানির অস্থাবর সম্পত্তি জব্দ করার নিদের্শ দেন। সেই ৪২টি কোম্পানির মধ্যে ৫ নম্বরে আছে জেনেসিস টেক্সটাইল এবং ৩৯ নম্বরে আছে লায়ন সিকিউরিটিজ কোম্পানি লিমিটেড। এই দুটি কোম্পানি ফার্স্ট কম কোম্পানির সবচেয়ে বড় শেয়ারের মালিক। আদালতের ওই জব্দের আদেশ দেওয়ার পরও কিভাবে বাণিজ্যিক কার্যক্রম করার সুযোগ পায় তা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
