নজরুল বর্ষের আয়োজন
আলোচনা ছাড়াই আনুষ্ঠানিকতার ঘোষণা সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের
নজরুল গবেষক ও অনুরাগীদের ক্ষোভ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
রাষ্ট্রীয়ভাবে ঘোষিত ‘নজরুল বর্ষ’ শুরুর আনুষ্ঠানিকতা শুরু হচ্ছে বৃহস্পতিবার। ৬৪ জেলা ও ৭৪টি প্রত্যন্ত এবং বিশেষায়িত উপজেলায় তিন দিনব্যাপী উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের ঘোষণা দিয়েছে সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়। এখন পর্যন্ত নজরুল গবেষক, নজরুল সংগীতশিল্পী তথা সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে আলোচনা করেনি সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়। এমনকি নজরুল বর্ষ উদযাপন কমিটিও গঠন করা হয়নি। এমন বাস্তবতায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ঘোষিত নজরুল বর্ষ ঘোষণার তিন সপ্তাহ পর রোববার সংবাদ সম্মেলন অনুষ্ঠানের ঘোষণা দেওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন নজরুল গবেষক ও নজরুল অনুরাগীরা। তাদের ভাষ্য, মন্ত্রণালয়ের এমন সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে আলোচনার প্রয়োজন ছিল। সবার আগে দরকার ছিল জাতীয় নজরুল বর্ষ উদযাপন কমিটি গঠন করা। যদিও মন্ত্রণালয় থেকে যুগান্তরকে বলা হয়েছে, এটি খসড়া মাত্র। বাকি আয়োজন উদযাপন কমিটি করবে।
এর আগে ২৩ মে ময়মনসিংহের ত্রিশালে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের ১২৭তম জন্মবার্ষিকীর অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ২৫ মে ২০২৬ থেকে ২৫ মে ২০২৭ পর্যন্ত সময়কে ‘নজরুল বর্ষ’ হিসাবে ঘোষণা করেন। এর পর থেকেই নজরুল গবেষক, শিল্পী ও সংস্কৃতিকর্মীদের মধ্যে প্রত্যাশা তৈরি হয় বছরব্যাপী একটি সুপরিকল্পিত রাষ্ট্রীয় আয়োজনের। কিন্তু এ নিয়ে বসা হবে বলেও বসা হয়নি। সংবাদ সম্মেলনের সময়ও গেল সপ্তাহে তিনবার পরিবর্তন করা হয়।
প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণার তিন সপ্তাহ পরও জাতীয় নজরুল বর্ষ উদযাপন কমিটি ঘোষণা করতে পারেনি। রোববার জানিয়ে দেওয়া হয়েছে তারা নজরুল বর্ষ উদযাপনের অংশ হিসাবে যেসব উদ্যোগ নিয়েছেন তার মধ্যে উদযাপন কমিটি গঠন একটি।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের গুরুত্ব বুঝেই প্রধানমন্ত্রী নজরুল বর্ষ ঘোষণা করেছেন। কিন্তু সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে নিয়েছেন কিনা সে বিষয়ে সন্দেহের অবকাশ আছে। কারণ, বরেণ্য এ কবিকে নিয়ে বছরব্যাপী অনুষ্ঠানের পরিকল্পিত প্রস্তুতি নেওয়ার দরকার ছিল। তা না করে হুটহাট সিদ্ধান্ত নেওয়া আপত্তিকর।
এ বিষয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে কবি ও নজরুল গবেষক মাহবুব হাসান যুগান্তরকে বলেন, নজরুল বর্ষ উদযাপনের জন্য আগে একটি প্রতিনিধিত্বশীল জাতীয় কমিটি গঠন করা উচিত ছিল। কমিটি গঠনের পর তাদের মাধ্যমেই কর্মসূচি ঘোষণা হওয়া যৌক্তিক। এখন যেভাবে আগে কর্মসূচি ঘোষণা করে পরে কমিটি গঠনের কথা বলা হচ্ছে, সেটি সঠিক প্রক্রিয়া নয়।’ তিনি বলেন, ‘জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামকে তৃণমূল পর্যায়ে ছড়িয়ে দিতে হলে তার সাহিত্য, কবিতা, গান ও দর্শনের সঙ্গে নতুন প্রজন্মকে সম্পৃক্ত করতে হবে। এজন্য প্রাথমিক, মাধ্যমিক, উচ্চমাধ্যমিক ও বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের পাঠক্রমে নজরুলচর্চাকে আরও গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।’
মাহবুব হাসানের অভিযোগ নজরুল বর্ষের পরিকল্পনা প্রণয়নের ক্ষেত্রে নজরুল গবেষক ও দীর্ঘদিন ধরে নজরুলচর্চার সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের সঙ্গে পর্যাপ্ত আলোচনা করা হয়নি। এত বড় একটি রাষ্ট্রীয় আয়োজনের আগে সংশ্লিষ্ট গবেষক, লেখক ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বদের মতামত নেওয়া উচিত ছিল। নজরুল গবেষক ও নজরুলসংগীত শিল্পী তথা সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের আওতাভুক্ত প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিদের নিয়ে আজ মন্ত্রণালয়ে বৈঠক হবে।
সংগীতশিল্পী সুজিত মোস্তফা যুগান্তরকে বলেন, আজ সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ে নজরুল বর্ষ নিয়ে বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে। তিনি বলেন, এ আয়োজনটি অত্যন্ত সুশৃঙ্খলভাবে করা উচিৎ। কোনো রকম বৈষম্য না করে যারা নজরুল চর্চার সঙ্গে যুক্ত তাদের সম্পৃক্ত করা উচিত।
ফেরদৌস আরা এ বিষয়ে প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করতে চাননি। তবে তিনিও জানালেন আজ মন্ত্রণালয়ে নজরুল বর্ষ নিয়ে বৈঠক রয়েছে, যা গত বৃহস্পতিবার হওয়ার কথা ছিল।
এর আগে রোববার দুপুরে সংস্কৃতিবিষয়কমন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে জানান, ১৮ জুন থেকে সারা দেশের ৬৪টি জেলা এবং ৭৪টি প্রত্যন্ত ও বিশেষায়িত উপজেলায় একযোগে তিন দিনব্যাপী বর্ণাঢ্য অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হতে যাচ্ছে ‘নজরুল বর্ষ’র উদ্বোধনী কার্যক্রম। সংবাদ সম্মেলনে মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী আলি নেওয়াজ মাহমুদ খৈয়ম ও সচিব কানিজ মওলাসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
সংবাদ সম্মেলনে সংস্কৃতিমন্ত্রী জানান, প্রধানমন্ত্রীর ঐতিহাসিক ঘোষণাকে সফল ও সার্থক করতে সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয় প্রস্তুতি গ্রহণ করেছে। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানসমূহ সুচারুভাবে আয়োজনের জন্য চলতি অর্থবছরের বাজেট থেকে দেশের প্রতিটি জেলা ও নির্দিষ্ট উপজেলায় ইতোমধ্যে প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।
মন্ত্রী জানান, ‘নজরুল বর্ষ’ উদ্যাপনকে শুধু আনুষ্ঠানিকতা বা সাংস্কৃতিক আয়োজনের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা হবে না। জাতীয় কবির সাহিত্যকর্ম, দর্শন, সাংবাদিকতা ও সংগীত নিয়ে উচ্চতর গবেষণার সুযোগ সৃষ্টি করা হবে। একই সঙ্গে বিভিন্ন শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানে নজরুলচর্চা সম্প্রসারণে বিশেষ কর্মসূচি হাতে নেওয়া হবে।
সংবাদ সম্মেলনে ‘নজরুল বর্ষ’ উদযাপনে জাতীয় কমিটি গঠন, লোগো ও পোস্টার প্রকাশ, বিশেষ ক্যালেন্ডার ও ডাকটিকিট প্রকাশ, গবেষণা ও প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগ, আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সম্প্রসারণ প্রভৃতি উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
উদ্যাপন কমিটি গঠন না করে, কারও সঙ্গে আলোচনা না করে নজরুল বর্ষের আনুষ্ঠানিকতা ঘোষণা দৃষ্টিকটু হলো কিনা যুগান্তরের এমন প্রশ্নের উত্তর দেন সংস্কৃতিবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী আলি নেওয়াজ মাহমুদ খৈয়ম। তিনি রোববার রাতে মোবাইল ফোনে যুগান্তরকে বলেন, মন্ত্রণালয় প্রাথমিকভাবে নজরুল বর্ষের একটি লে-আউট বা খসড়া কর্মপরিকল্পনা তৈরি করেছে। উদ্যাপন কমিটি গঠনের পর সেটি আরও সংযোজন, পরিমার্জন ও পরিবর্ধনের মাধ্যমে চূড়ান্ত করা হবে। মূল আয়োজন, দিকনির্দেশনা ও বাস্তবায়নের দায়িত্ব উদযাপন কমিটিই পালন করবে।
তিনি জানান, এটি একটি প্রাথমিক কাঠামো। কমিটির সভায় আলোচনা করে এটিকে আরও কার্যকর কর্মসূচিতে পরিণত করা হবে। জেলা পর্যায়েও কমিটি গঠন করা হবে।

