ব্রয়লার পাঙাশ ডিমও নাগালের বাইরে
গরিবের পাতেও আগুন
২০০ টাকার নিচে মিলছে না মাছ ডিমের ডজন ১৫০ * আটা-চিনিতে নতুন ধাক্কা, কেজিতে বাড়ল ১০ টাকা * মাছ-মাংস আমাদের ভাগ্যে নেই-দিনমজুরের নীরব কান্না * সিন্ডিকেটের কাছে জিম্মি বাজার
ইয়াসিন রহমান
প্রকাশ: ২২ আগস্ট ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
নিত্যপণ্যের বাজারে স্বস্তি মিলছে না কোথাও। গরিবের আমিষ খ্যাত পাঙাশ, ব্রয়লার আর ডিমও এখন নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে। ২০০ টাকার নিচে পাওয়া যাচ্ছে না এক কেজি মাছ, ডিমের ডজন ঠেকেছে ১৫০ টাকায়, গরু-খাসির মাংসের দিকে তাকানোই ছেড়ে দিয়েছেন নিম্ন ও মধ্যআয়ের মানুষ। এর ওপর নতুন করে কেজিতে ১০ টাকা বেড়েছে আটা ও চিনির দাম। চড়া সবজি, পেঁয়াজ ও আদা-রসুনও। আয় না বাড়লেও খাবারের খরচ বাড়ছে লাফিয়ে। লাগামহীন এই দামে দিশেহারা সাধারণ মানুষ বলছেন, গরিবের পাতেও যেন আগুন লেগেছে।
শুক্রবার রাজধানীর কাওরান বাজার, মালিবাগ বাজার, নয়াবাজার ও শান্তিনগরসহ বেশ কয়েকটি বাজার ঘুরে এমন চিত্র দেখা গেছে। লাগামহীন দামের অবস্থা তুলে ধরতে গিয়ে যুগান্তরের কাছে ক্ষোভ জানিয়েছেন ক্রেতাদের অনেকে। তারা বলেন, ভাই মিডিয়ায় লিখে কোনো লাভ হবে না। যারা ব্যবস্থা নেওয়ার তারা নেবে না। সিন্ডিকেট নিয়ে অনেক কথা শুনেছি। কিন্তু ওরা এতই প্রভাবশালী যে, তাদের বিরুদ্ধে কেউ কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নিতে পারে না।
কনজুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) কেন্দ্রীয় কমিটির ভাইস প্রেসিডেন্ট এসএম নাজের হোসাইন যুগান্তরকে বলেন, সার্বিক মূল্যস্ফীতির কারণে এমনিতেই নিম্নআয়ের মানুষ কষ্টে আছে। জ্বালানি তেলের দাম বাড়ায় নিত্যপণ্যের বাজারে প্রভাব পড়েছে। এর মধ্যে সিন্ডিকেটের কারসাজিতে একাধিক পণ্যের দাম হুহু করে বাড়ছে। এতে উচ্চশ্রেণির মানুষের ভোগান্তি না হলেও মধ্যবিত্ত পরিবারগুলো কষ্টে দিন কাটাচ্ছে। সবচেয়ে বেশি কষ্টে আছে নিম্ন আয়ের মানুষ। যারা তাদের আয়ের সঙ্গে ব্যয় সামলাতে হিমশিম খাচ্ছে। অনেকে পরিমাণে কম কিনতে বাধ্য হচ্ছেন। সংশ্লিষ্টদের উচিত, বাজারে তদারকি জোরদার করে অসাধুদের আইনের আওতায় আনা। পাশাপাশি টিসিবি ও ওএমএসের মাধ্যমে বেশি করে ভর্তুকি মূল্যে পণ্য বিক্রি করা। এতে একটু হলেও কষ্ট দূর হবে।
খুচরা বাজারে প্রতিকেজি মোটা চালের মধ্যে স্বর্ণা জাতের চাল বিক্রি হচ্ছে ৫৫-৬০ টাকা। পাইজাম বিক্রি হচ্ছে ৬৫ টাকা। আর সরু চালের মধ্যে মিনিকেট বিক্রি হচ্ছে ৮৫ টাকা। প্রতিকেজি নাজিরশাইল কিনতে ক্রেতার ৯০ টাকা খরচ করতে হচ্ছে। পাশাপাশি খুচরা পর্যায়ে প্রতি ডজন ফার্মের ডিমে ১০ টাকা কমলেও এখনো ১৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। যা মাসখানেক আগে ১২০-১৩০ টাকা ছিল। এছাড়া বাজার ভেদে প্রতিকেজি ব্রয়লার মুরগি বিক্রি হচ্ছে ১৯০-২০০ টাকা। প্রতিকেজি সোনালি মুরগি ৩২০ ও দেশি মুরগি ৬৫০-৭০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। পাঙাশ মাছও বিক্রি হচ্ছে কেজিপ্রতি ২৩০-২৫০ টাকা।
শুক্রবার ছুটির দিন রাজধানীর কাওরান বাজারে কথা হয় দিনমজুর মানিক মিয়ার সঙ্গে। তিনি আক্ষেপ করে যুগান্তরকে বলেন, আমি সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত মালামাল বহন করে ৪৫০-৫০০ টাকা আয় করেছি। এই টাকা নিয়ে বাজারে এসেছি। কিন্তু সবকিছুর দাম অনেক বেশি। তাই কী দিয়ে কী কিনব বুঝতেই পারছি না। আগের চেয়ে ডাল, ডিম, মাছসহ সব কিছুর দাম অনেক বেশি। অথচ এগুলো দিয়ে আগে দুইবেলা পার করতাম। তিনি বলেন, আমাদের এই বোবা কান্না কেউ শোনে না। এখন বাধ্য হয়ে এই টাকার মধ্যে অল্প করেই চাল, ডাল ও ডিম কিনব। মাছ-মাংস আমাদের ভাগ্যে নেই।
রাজধানীর খুচরা বাজারে প্রতিকেজি তেলাপিয়া বিক্রি হচ্ছে ২৫০-২৬০, পাঙাশ ২৩০-২৫০, কাতলা ৩৮০-৪২০ এবং চিংড়ি প্রতিকেজি ১০০০-১৩০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। এছাড়া প্রতিকেজি পাবদা ৩৫০-৪০০ টাকা, বড় আকারের রুই কেজিপ্রতি ৪৫০-৫০০ টাকা ও ট্যাংরা ৭০০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। পাশাপাশি প্রতিকেজি ভেটকি ৪০০-৫৫০ টাকা, মৃগেল ২৫০-৩০০ টাকা, বাইন ৬০০-৮০০ টাকা, দেশি কই ৭০০-৮০০ টাকা, চাষের কই ৩০০ টাকা, পোয়া ২৬০ টাকা এবং শোল ৭০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। আকারভেদে চাষের শিং মাছ বিক্রি হচ্ছে ৩০০-৪৫০ টাকা কেজি দরে। মাঝারি আকারের রুই প্রতিকেজি বিক্রি হচ্ছে ৩০০-৩৫০ টাকা দরে। এছাড়া ৯০০ গ্রাম থেকে ১ কেজি ওজনের ইলিশ ২ হাজার ৫০০, আর ১ কেজি ৩০০ গ্রাম ওজনের ইলিশ ৩ হাজার টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
খুচরা বাজারে প্রতিকেজি টমেটো বিক্রি হচ্ছে ১৩০ টাকায়, কাঁচামরিচ ১২০ টাকা, পটল ৬০ টাকা, শশা প্রতিকেজি ৬০ টাকা, করলা ৮০ টাকা, বরবটি ১০০ টাকা ও ঝিঙা-চিচিঙ্গা প্রতিকেজি বিক্রি হচ্ছে ৮০ টাকায়। এছাড়া কাঁকরোল প্রতিকেজি বিক্রি হচ্ছে ৮০ টাকা, ঢেঁড়স ৬০ টাকা, শিম ২০০ টাকা, পেঁপে ৪০ টাকা, গাজর ১৪০ টাকা, ধন্দুল ৬০ টাকা, মুলা প্রতিকেজি ৮০ টাকা এবং বেগুন ১২০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। অন্যদিকে মুদি দোকানে প্রতিকেজি প্যাকেটজাত আটা ৬৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। যা দুই সপ্তাহ আগেও ৫৫ টাকা ছিল। সেক্ষেত্রে দুই সপ্তাহের ব্যবধানে কেজিতে ১০ টাকা বেড়েছে। একইভাবে কেজিতে ১০ টাকা বেড়ে খোলা ময়দা ৭০ টাকা এবং প্যাকেটজাত ময়দা কোম্পানিভেদে ৭০ থেকে ৭৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। চিনির বাজারেও অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। খুচরা বাজারে প্রতিকেজি চিনি ১২০-১২৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। এক সপ্তাহের ব্যবধানে দাম বেড়েছে প্রায় ১০ টাকা।
নয়াবাজারে কথা হয় রিকশাচালক মো. লোকমানের সঙ্গে। তিনি যুগান্তরকে বলেন, বাজারে সব ধরনের পণ্যের দাম বেশি। গরুর মাংস কবে কিনেছি তা মনে নেই। মাসে একবার মুরগির মাংস খেতে পারলেও এখন দাম নাগালের বাইরে। ডাল-ভাত খেতেও বাড়তি টাকা গুনতে হচ্ছে। ডিমের দামও নাগালের বাইরে চলে গেছে। সব মিলে আমাদের মতো মানুষের অনেক কষ্টে দিন পার করতে হচ্ছে।
