Logo
Logo
×
   

Advertisement

দ্বিতীয় সংস্করণ

‘আমাকে মারবা ঠিক আছে, শুধু দুই বাচ্চারে ঘুম পাড়িয়ে আসি’

মিলল গৃহবধূর লাশ

Advertisement

Icon

যুগান্তর প্রতিবেদন

প্রকাশ: ০৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

Advertisement

রাজধানীর খিলক্ষেত এলাকার বাসিন্দা মুক্তা ইসলাম। এ গৃহবধূকে নির্যাতনের একটি ভিডিও গত মঙ্গলবার তার ভাই তানভীর রহমানের মুঠোফোনে পাঠিয়েছিলেন স্বামী সোহেল শিকদার। মেসেজে লিখেছিলেন, ‘তোমার বোনকে নিয়ে যাও।’ ভিডিওতে দেখা যায়, মুক্তার পায়ে শিকল বাঁধা। তাকে খাটের সঙ্গে বেঁধে বেল্ট দিয়ে পেটানো হচ্ছে। মুক্তার স্বজনরা পরে খিলক্ষেতের বাসায় গিয়ে তাকে আর জীবিত পাননি। বৃহস্পতিবার বাসার সিলিং ফ্যানের সঙ্গে মুক্তার ঝুলন্ত লাশ উদ্ধার করা হয়। মুক্তার পরিবারের অভিযোগ, তাকে নির্যাতনের পর হত্যা করে লাশ ঝুলিয়ে দেওয়া হয়েছে।

রাজধানীর খিলক্ষেতের ৫ নম্বর সড়কের ৩৯ নম্বর বাড়ির তৃতীয় তলার ফ্ল্যাটে এ ঘটনায় মুক্তার ভাই তানভীর রহমান বাদী হয়ে খিলক্ষেত থানায় মামলা করেছেন। মামলায় মুক্তার স্বামীসহ চারজনকে আসামি করা হয়েছে। এ ঘটনায় মামলার প্রধান আসামি মুক্তার স্বামী সোহেল শিকদারকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. সোহরাব আল হোসাইন যুগান্তরকে বলেন, নিহতের স্বামীসহ চারজনকে আসামি করে মামলা করা হয়েছে।

মুক্তাকে নির্যাতনের প্রায় তিন মিনিটের একটি ভিডিও পেয়েছে পুলিশ। ভিডিওতে দেখা যায়, মুক্তার পায়ে শিকল দিয়ে খাটের সঙ্গে বেঁধে রাখা হয়েছে। সোহেল চামড়ার বেল্ট দিয়ে তাকে একের পর এক আঘাত করছেন। তাকে বলতে শোনা যায়, ‘কথা ক, কথা ক, তোরে আজ পিটাইয়া মাইরা ফালামু।’ মুক্তা তখন তাকে বলছিলেন, ‘আমি কিছু করিনি। আমি তোমাকে অনেক ভালোবাসি।’ ভিডিওতে মুক্তার শরীরে আঘাতের দাগ দেখা যায়। নির্যাতনের সময় পাশের কক্ষে ছিল তার দুই সন্তান। তাদের কান্না শুনে মুক্তা স্বামীকে বলেন, ‘আমাকে মারবা ঠিক আছে, শুধু দুই বাচ্চারে ঘুম পাড়িয়ে আসি।’

ওসি সোহরাব আল হোসাইন বলেন, প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে সোহেল মুক্তাকে মারধরের কথা স্বীকার করলেও যেদিন ফাঁস নিয়েছে সেদিন মারধর করেনি বলে দাবি করেছে। ফাঁস দেওয়ার দুই দিন আগে স্ত্রীকে মেরেছিলেন সোহেল। পুলিশ জানিয়েছে, মুক্তাকে মারধর করার একটি ভিডিও গত ১ সেপ্টেম্বর মুক্তার ভাই তানভীরকে পাঠিয়েছিল সোহেল। ভিডিও পাঠিয়ে তার বোনকে (মুক্তা) নিয়ে যেতে বলা হয়েছিল। দুই দিন পরে তারা মুক্তার মৃত্যুর খবর পান। গ্রেফতারের পর সোহেলের জব্দ করা মুঠোফোনেও ভিডিওটি পাওয়া গেছে।

পুলিশ জানিয়েছে, কয়েক মাস আগে মুক্তার ভাইয়ের কাছে তিন লাখ টাকা চেয়েছিলেন সোহেল। টাকা দিতে দেরি হওয়ায় মারধর করা হতো-এমন অভিযোগ করছেন পরিবার। শুধু তাই নয়, বিয়ের পর থেকেই স্বামীর সঙ্গে তার কলহ চলছিল। বিবাহবহির্ভূত সম্পর্কের সন্দেহ ও যৌতুকের জন্য সোহেল তাকে নির্যাতন করতেন-এমন তথ্য তারা পেয়েছেন। তবে মুক্তা নির্যাতনের কথা পরিবারকে তেমন কিছুই বলতেন না।

মুক্তার গ্রামের বাড়ি বরিশালের বাকেরগঞ্জে। একই এলাকার সোহেল শিকদারের সঙ্গে পারিবারিকভাবে তার বিয়ে হয়। বিয়ের পর তারা খিলক্ষেতে থাকতেন। সোহেল প্রথমে মুদি দোকান করতেন। পরে এমব্রয়ডারি ব্যবসায় যুক্ত হন। ব্যবসায় ভালো করতে না পারার পর স্ত্রীর সঙ্গে তার মনোমালিন্য বাড়তে থাকে বলে পরিবারের সদস্যরা জানান।

বাকেরগঞ্জ (বরিশাল) প্রতিনিধি জানান, মঙ্গলবার দুপুরে উপজেলার দুধাল ইউনিয়নের শরশী গ্রামের মুক্তার বাবা নিজাম হাওলাদারের বাড়ি গিয়ে দেখা যায়, পাঁচ বছরের সাফওয়ান ও চার বছরের তাসফিয়াকে দাঁড়াতে হয়েছে মায়ের শেষ ঠিকানার সামনে। স্বজনদের আহাজারির মধ্যে ছোট্ট দুটি শিশুও কাঁদছে। তারা হয়তো এখনো বুঝতে পারছে না, মাটির নিচে শুয়ে থাকা মানুষটিই তাদের মা, যিনি আর কোনোদিন তাদের ডাকে সাড়া দেবেন না। মা কোথায়, কেন ফিরছে না-এসব প্রশ্নের উত্তর হয়তো তারা এখনো খুঁজছে পরিচিত মুখগুলোর কাছে। কিন্তু তাদের প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার মতো ভাষা নেই কারও। বাকেরগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মিল্টন চন্দ্র পাল জানান, এ ঘটনায় উপজেলা প্রশাসনের কর্মকর্তারা ঘটনাস্থলে গিয়ে শিশুদের নগদ টাকা ও খাদ্যসামগ্রী দিয়েছেন। উপজেলা প্রশাসন সব সময় ওই পরিবারের প্রয়োজনে পাশে রয়েছে।

এদিকে মুক্তার স্বামী সোহেল শিকদারের ফাঁসির দাবিতে মানববন্ধন করেছেন এলাকাবাসী। তারা মুক্তার মৃত্যুর ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত এবং জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন।

Advertisement

Advertisement

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম