Logo
Logo
×
   

Advertisement

দ্বিতীয় সংস্করণ

গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকট মোকাবিলা

কী জাদু আছে বিরোধী দলের হাতে

ওপেন এক্সেস পদ্ধতি, জরুরি সেল গঠন, কয়লা বিদ্যুতের সর্বোচ্চ ব্যবহার, অগ্রাধিকার ভিত্তিতে বিল পরিশোধ

Advertisement

শহীদুল ইসলাম

শহীদুল ইসলাম

প্রকাশ: ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

কী জাদু আছে বিরোধী দলের হাতে

Advertisement

দেশে চলমান বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকট সমাধানসহ ছয় দফা দাবিতে ঢাকা থেকে চট্টগ্রামে লংমার্চ করেছে বিরোধী দল। কিন্তু বিএনপি সরকারের মেয়াদের মাত্র ছয় মাসের মধ্যে এই লংমার্চ কর্মসূচি পালনের যৌক্তিকতা নিয়ে পক্ষে-বিপক্ষে আলোচনা আছে। কারও কারও মতে, লংমার্চের মতো বড় কর্মসূচি পালনের ক্ষেত্রে সরকারকে আরও কিছুটা সময় দেওয়া উচিত ছিল। তাছাড়া বিএনপির জায়গায় বর্তমান বিরোধী দল ক্ষমতায় থাকলে জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় তারা কী পদক্ষেপ নিত, এ নিয়েও কৌতূহল তৈরি হয়েছে।

এমন পরিস্থিতিতে দলটির নেতাদের সঙ্গে কথা বলে চার ধরনের প্রস্তাব বা পরিকল্পনার কথা জানা গেছে। প্রস্তাবগুলো ইতোমধ্যে তারা সংসদেও উত্থাপন করেছেন। প্রস্তাবগুলো হলো : প্রথমত, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় শিল্পকারখানাগুলোকে উৎপাদনকারীদের কাছ থেকে সরাসরি বিদ্যুৎ কেনার সুযোগ দেওয়া। দ্বিতীয়ত, সরকার ও বিরোধী দলের সমন্বয়ে টাস্কফোর্স সেল গঠন করা। তৃতীয়ত, সিস্টেম লসের নামে চুরি আর দুর্নীতি বন্ধ করা এবং চতুর্থত, সঠিক পরিকল্পনা গ্রহণ, চাঁদা ও কমিশনের মানসিকতা পরিহার করা।

বিরোধী দল মনে করে, এ চারটি পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা গেলেই চলমান বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকট মোকাবিলা সম্ভব। জামায়াত নেতারা যুগান্তরকে জানিয়েছেন, তাদের পক্ষ থেকে চার ধরনের এই প্রস্তাব ইতোমধ্যে সংসদে উত্থাপন করা হয়েছে। জামায়াতে ইসলামীর দায়িত্বশীল সূত্রগুলো এসব তথ্য দিয়ে স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন। তারা বলেছেন, দেশীয় সম্পদ কাজে লাগিয়ে সমস্যা সমাধানের উদ্যোগ নিতে হবে। এর বাইরে কোনো জাদু তাদের হাতে নেই।

সংসদে উত্থাপিত প্রস্তাবের কথা উল্লেখ করে জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার মঙ্গলবার যুগান্তরকে বলেন, জামায়াত আমির এবং সংসদ-সদস্য ব্যারিস্টার নাজিবুর রহমান মোমেন জাতীয় সংসদে গ্যাস-বিদ্যুতের সংকট ও সমাধানের বিষয়ে সবিস্তারে যা বর্ণনা করেছেন, ওটাই আমাদের দলের পূর্ণাঙ্গ বক্তব্য।

তিনি বলেন, চুরি আর দুর্নীতি হলো প্রধান সমস্যা। এ দুটি আগে বন্ধ করতে হবে। কিন্তু সরকার তা করবে না। কারণ, এসব অপকর্মের সঙ্গে সরকারি দলের লোক জড়িত। বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার আগে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়েও তো আমরা গ্যাস-বিদ্যুতের এত সংকট দেখিনি। বিএনপি ক্ষমতা নেওয়ার পর দেশে এমন কী ঘটল যে মহাসংকট তৈরি হয়ে গেল। বাংলাদেশের ইতিহাসে এখন সবচেয়ে ভয়াবহ সংকট বিরাজ করছে এবং এর কারণ সঠিক পরিকল্পনার অভাব। পরিকল্পনার সময় যদি আগে বিবেচনা করা হয় যে আমার পকেটে কত আসবে, সেটা কখনো দেশের কল্যাণে সঠিক পরিকল্পনা হতে পারে না। তিনি আরও বলেন, আমরা সংসদে এবং সংসদীয় কমিটিতে পূর্ণাঙ্গ প্রস্তাব দিয়েছি। তাছাড়াও সংবাদ সম্মেলনে আমরা বিস্তারিত পরিকল্পনা তুলে ধরেছি। আমরা সরকারকে সহযোগিতা করার প্রস্তাব দিয়েছি। একসঙ্গে কাজ করার কথা বলেছি। কারণ, দেশটা আমাদের সবার। কিন্তু সরকার সে পথে যায় না। কারণ, গেলে তারা দুর্নীতি করতে পারবে না।

জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল আবদুল হালিম যুগান্তরকে বলেন, সরকার গঠনের পরপরই জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় আমরা সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব দিয়েছিলাম। সরকার সেগুলো আমলে না নিয়ে সংকট আরও বৃদ্ধি করেছে। তিনি বলেন, আমাদের প্রস্তাব মেনে নেওয়া হলে লংমার্চের কর্মসূচিতে এই দাবিটি থাকত না।

যা বলেছেন বিরোধীদলীয় নেতা : বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকট সমাধানে সংসদে দেওয়া সরকারের প্রতিশ্রুতি ও বাস্তবের মিল না থাকার অভিযোগ করে বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান বলেন, আমরা সরকারের পদক্ষেপে আশাবাদী। তবে বিভ্রান্তি তৈরি হয় যখন দেখি সংসদে দেওয়া খোলামেলা আশ্বাস বাস্তবায়ন হচ্ছে না। যেমন : বলা হয়েছিল মিটার চার্জ, ডিমান্ড চার্জ আর নেওয়া হবে না। কিন্তু ঠিকই নেওয়া হচ্ছে। ভূতুড়ে বিলের সমাধানের কথাও বলা হয়েছিল, কিন্তু তা কন্টিনিউ করছে। জবাবদিহি ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে না পারলে আমাদের প্ল্যান যত সুন্দরই হোক, সব ব্যর্থ হবে।

তিনি আরও বলেন, বিদ্যুৎ খাতে ক্যাপাসিটি চার্জের টাকা দিয়ে মূলত জনগণের টাকা ডাকাতি হয়ে যাচ্ছে। আমরা কাউকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে চাই না, কিন্তু এর সমাধান হওয়া উচিত। এ দুষ্টচক্র থেকে জাতি বের হতে না পারলে কোনো নিস্তার নেই। জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সংকট সমাধানে সরকারকে সহযোগিতার প্রস্তাব দিয়ে শফিকুর রহমান বলেন, সরকার যদি সহযোগিতা চায়, তাহলে আমরা আমাদের টেকনিক্যাল এক্সপার্ট টিমকে সরকারের সঙ্গে যুক্ত করে দিতে পারি। একটি দেশ যখন পাওয়ার ক্রাইসিসে ভোগে, তখন দেশটা পাওয়ারলেস হয়ে যায়। আমরা চাই না আমাদের জাতি পাওয়ারলেস হোক, আমরা চাই জাতি পাওয়ারফুল হোক।

জ্বালানি সংকট উত্তরণে নাজিবুর রহমান মোমেনের ৪ প্রস্তাব : শুধু সমালোচনা নয়, সংকট উত্তরণে স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি বেশকিছু প্রস্তাবনা সংসদে তুলে ধরেন জামায়াতের সংসদ-সদস্য ব্যারিস্টার নাজিবুর রহমান মোমেন। সোমবার সংসদে তুলে ধরা প্রস্তাবের মধ্যে প্রথমেই রয়েছে ওপেন এক্সেস পদ্ধতি। এতে বলা হয়, বকেয়া বিলের কারণে উৎপাদকরা বিদ্যুৎ দিতে পারছেন না, অন্যদিকে শিল্প বন্ধ হচ্ছে। এর সমাধানে ‘ওপেন এক্সেস’ পদ্ধতি চালু করে শিল্পকারখানাগুলোকে সরাসরি বিদ্যুৎ উৎপাদকদের কাছ থেকে বিদ্যুৎ কেনার সুযোগ দেওয়ার প্রস্তাব দেন নাজিব মোমেন। এছাড়া জরুরি সেল গঠন করে সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায়ের তত্ত্বাবধানে কার্যকর একটি ‘জ্বালানি জরুরি সেল’ গঠনের প্রস্তাব দিয়ে তিনি বলেন, এই সেলে পেট্রোবাংলা, পিডিবি, পিজিসিবি ও বিপিসি একটি সমন্বিত সিদ্ধান্ত কাঠামোর মধ্যে আসবে।

তৃতীয়ত, কয়লা বিদ্যুতের সর্বোচ্চ ব্যবহারের ওপর গুরুত্ব দিয়ে তিনি বলেন, দেশে প্রায় ৬ হাজার ৯০০ মেগাওয়াট কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা রয়েছে। জ্বালানি ও এলসি নিশ্চিত করে এখান থেকে দ্রুত সাড়ে ৪ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত করার কথা বলেন তিনি। এছাড়া অগ্রাধিকার ভিত্তিতে বিল পরিশোধের প্রস্তাব দিয়ে তিনি বলেন, বিদ্যুৎ উৎপাদন যেন ব্যাঘাত না ঘটে, সেজন্য সবার আগে জ্বালানি কেনার বকেয়া বিল পরিশোধের উদ্যোগ নিতে হবে। তিনি বলেন, বাংলাদেশের জ্বালানি সংকট শুধু সম্পদের ঘাটতি নয়, সবচেয়ে বড় ঘাটতি হলো সিদ্ধান্তের গতিতে। বিদ্যমান সম্পদ ও নির্মিত অবকাঠামোর সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করতে পারলেই এই সংকট মোকাবিলা সম্ভব।

Advertisement

Advertisement

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম