Logo
Logo
×
   

Advertisement

দ্বিতীয় সংস্করণ

বাংলাদেশ নিয়ে ইউনিসেফ’র প্রতিবেদন

শিক্ষা ব্যয়ের ৭১ শতাংশই বহন করে পরিবার

Advertisement

Icon

যুগান্তর প্রতিবেদন

প্রকাশ: ০৪ জানুয়ারি ২০২৩, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

Advertisement

বাংলাদেশে শিক্ষা ব্যয়ের ৭১ শতাংশ পরিবার বহন করে। বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা (এনজিও) পরিচালিত স্কুলে ফি সরকারি প্রতিষ্ঠানের তুলনায় তিনগুণ বেশি এবং বেসরকারি কিন্ডারগার্টেনের ক্ষেত্রে এই ব্যয় নয়গুণ বেশি। মঙ্গলবার রাজধানীর এক হোটেলে ‘ইউনেস্কোর গ্লোবাল এডুকেশন মনিটরিং রিপোর্ট-২০২২’ শীর্ষক প্রতিবেদনে এ চিত্র উঠে এসেছে। এ প্রতিবেদন তৈরিতে সহযোগিতা করেছে ব্র্যাকসহ ছয়টি সংস্থা। এতে ভারত, পাকিস্তানসহ দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশ সম্পর্কেও তথ্য প্রকাশ করা হয়।

প্রতিবেদনে বলা হয়, বাংলাদেশে শিক্ষা খাতে বেসরকারি উদ্যোগ বৃদ্ধির সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বেড়েছে পরিবারপিছু শিক্ষা ব্যয়। প্রাক-প্রাথমিক স্তরে বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর আধিক্য পরিবারগুলোর শিক্ষা ব্যয়ের বোঝা বাড়িয়েছে। শিক্ষা খাতে অপর্যাপ্ত বরাদ্দ রাষ্ট্রীয় মালিকানায় পরিচালিত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর মানসম্পন্ন শিক্ষা নিশ্চিতের পথে প্রধান অন্তরায়। গত দশকে বাংলাদেশ সরকার মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) আড়াই শতাংশের কম খরচ করেছে শিক্ষা খাতে, যা জাতিসংঘের সুপারিশ করা ৪ শতাংশ সীমার অনেক নিচে।

অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনি। বক্তৃতা করেন গণসাক্ষরতা অভিযানের নির্বাহী পরিচালক রাশেদা কে চৌধুরী, ব্র্যাকের চেয়ারপারসন অর্থনীতিবিদ ড. হোসেন জিল্লুর রহমান, মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক নেহাল আহমেদ, ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের এমিরেটাস অধ্যাপক ড. মনজুর আহমেদ, বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের সদস্য অধ্যাপক ড. বিশ্বজিৎ চন্দ্র, ব্র্যাকের এডুকেশন, স্কিলস ডেভেলপমেন্ট, অ্যান্ড মাইগ্রেশন প্রোগ্রামের পরিচালক সাফি রহমান খান। রিপোর্টের বিভিন্ন দিক তুলে ধরে ধরেন ইউনেস্কোর পরিচালক ম্যানোস আন্তোনিনিস।

প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, দেশের ৫৫ শতাংশ শিশু প্রাক-প্রাথমিক স্তরে বিভিন্ন ধরনের বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে ভর্তি হয়। প্রাথমিক স্তরে মোট বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের হার ২২ শতাংশ, সংখ্যায় ২৯ হাজার। মাধ্যমিক পর্যায়ে এই হার ৯৪ শতাংশ, যা বিশ্বে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ। কারিগরি ও ভোকেশনাল পর্যায়ে বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের আধিক্য সর্বোচ্চ। ২০১২ থেকে ২০১৯ সালের মধ্যে এ খাতের বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বেড়েছে দ্বিগুণ। ছয় হাজার বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বিপরীতে সরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান রয়েছে মাত্র ৯০০টি।

প্রতিবেদনে বলা হয়, দেশে প্রাক-প্রাথমিক স্তরে অধ্যয়নরত ২০ শতাংশ শিশুর গৃহশিক্ষক রয়েছে। গ্রামাঞ্চলে গৃহশিক্ষক বাবদ খরচ ২০০০ সালের ২৮ শতাংশ থেকে বেড়ে ২০১০ সালে ৫৪ শতাংশ হয়েছে। শহরাঞ্চলে এই খরচ ৪৮ শতাংশ থেকে বেড়ে ৬৭ শতাংশে দাঁড়িয়েছে।

অবশ্য ইউনেস্কোর প্রতিবেদন বলছে, মানের দিক থেকে সরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর তুলনায় অনেকটাই পিছিয়ে রয়েছে বেসরকারি খাতের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো। সরকারি প্রতিষ্ঠানের শিক্ষা কার্যক্রমে অংশ নেওয়া শিক্ষার্থীদের ৯৪ শতাংশ মাধ্যমিক স্কুল সার্টিফিকেট পরীক্ষায় সর্বোচ্চ গ্রেড অর্জন করে থাকে। বিপরীতে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের মাত্র ৩৬ শতাংশ একই উচ্চতায় পৌঁছতে পারে।

প্রতিবেদনে বলা হয়, বাংলাদেশের শিক্ষা খাতে সিভিল সোসাইটি ইনস্টিটিউশন বা বেসরকারি সংস্থাগুলোর অবদানের সুবিধা স্বীকার করা হলেও এসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান দেশের শিক্ষাব্যবস্থায় বৈষম্য দূর করতে পারেনি। এনজিও পরিচালিত স্কুলগুলোর ফি সরকারি স্কুলের তুলনায় তিনগুণ বেশি, যার কারণে এসব স্কুলের সুফল দরিদ্রতম প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কাছে পৌঁছে না।

গবেষণায় বলা হয়, বাংলাদেশে শিক্ষকরাও মূলত বেসরকারি ব্যবস্থাপনায়ই প্রশিক্ষিত, শিক্ষক প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউটগুলোর ৬০ শতাংশই বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় পরিচালিত। সরকারি ব্যবস্থাপনায় পর্যাপ্ত ও মানসম্মত প্রশিক্ষণের ঘাটতির ফলেই বেসরকারি শিক্ষক প্রশিক্ষণ কলেজমুখী হচ্ছেন শিক্ষকরা। মাধ্যমিক পর্যায়ের ৪০ শতাংশের বেশি শিক্ষক তাদের বিএড ডিগ্রি নিয়েছেন বেসরকারি শিক্ষক প্রশিক্ষণ কলেজ থেকে। দেশের বেসরকারি খাতের শিক্ষকদের সরকার কর্তৃক প্রদত্ত মাসিক পে-অর্ডার (এমপিও) ব্যবস্থায় অপর্যাপ্ততা এবং অসম বণ্টনের বিষয়টি তুলে ধরা হয়েছে প্রতিবেদনে।

ইউনেস্কোর প্রতিবেদন বলছে, বাংলাদেশে মহামারিকালে সরকারি শিক্ষকরা বেতন পেলেও বেসরকারি শিক্ষকরা পেয়েছেন তাদের বেতনের ৬০ থেকে ৮০ শতাংশ। শিক্ষার মান বাড়ানোর ওপর সরকার জোর দিলেও বাংলাদেশে শিক্ষকদের বেতন কাঠামো মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিতের জন্য যথেষ্ট নয়।

এতে আরও বলা হয়েছে, পাকিস্তানে শিক্ষা ব্যয়ের ৫৭ শতাংশ বহন করে পরিবার। নেপালে প্রাক প্রাথমিক শিক্ষার পরিবারের ব্যয় ৬৩ শতাংশ এবং কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা ও প্রশিক্ষণে তারা ৭৫ শতাংশ যেখানে সরকারি কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা ও প্রশিক্ষণে এই কর হার ৮ শতাংশ। দুটি প্রধান শহরে শীর্ষ চতুর্থাংশ পরিবারের ধারা মাসিক ফি প্রদানের হার নিম্ন চতুর্থাংশ পরিবারের তুলনায় চার থেকে আট গুণ বেশি।

প্রতিবেদনে দেখা গেছে, দক্ষিণ এশিয়ায় প্রায় ১২ শতাংশ পরিবার সঞ্চয় করে এবং ৬ শতাংশ পরিবার স্কুলের ফি মেটাতে ঋণ করে থাকে। বাংলাদেশে প্রায় এক-তৃতীয়াংশ পরিবার ক্ষণ করে বেসরকারি পলিটেকনিকে পড়াশোনার খরচ মেটায়। ভুটান, পাকিস্তান এবং শ্রীলংকায় অন্যান্য রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে শিক্ষা গ্রহণকারীদেরকে স্বল্প সুদে ঋণ প্রদানের জন্য সরকারি শিক্ষার্থী ঋণ কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছে। বাংলাদেশে শিক্ষার্থীরা সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ফি বৃদ্ধি এবং বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিয়ের ওপর কর আরোপের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করেছিল। ফলস্বরূপ, কিছু সিদ্ধান্তের পরিবর্তন হয়েছিল।

অনুষ্ঠানে শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনি বলেন, স্কুল ভর্তির ক্ষেত্রে হয়রানি ও যুদ্ধ বন্ধ করতে আমরা লটারি পদ্ধতি চালু করেছি। এমপিওভুক্তিতে অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ সম্পর্কে মন্ত্রী বলেন, বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্তির আওতায় এসে সেগুলোকে নিয়মিত মনিটরিং করা হচ্ছে। কেউ পিছিয়ে গেলে তাকে সহযোগিতা করে এগিয়ে আনা হচ্ছে। বারবার চেষ্টার পরও যদি কেউ পিছিয়ে পড়ে তবে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।

অনুষ্ঠানে রাশেদা কে চৌধুরী বলেন, ভারতে শিক্ষা বিকেন্দ্রীকরণ হওয়ায় দিল্লিতে ৯০ শতাংশ সরকারি আর ১০ শতাংশ বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান রয়েছে। দিল্লির সেখানে বর্তমানে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থী সংকট তৈরি হয়েছে। এটা সম্ভব হয়েছে সরকারি প্রতিষ্ঠান শক্তিশালী করায়। বাংলাদেশের সরকারকে সে পথে হাঁটার আহ্বান জানান তিনি।

বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের সদস্য অধ্যাপক ড. বিশ্বজিৎ চন্দ্র বলেন, প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকদের জবাবদিহিতা থাকলেও পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় স্বায়ত্তশাসিত হওয়ায় সেখানে এর গুরুত্ব নেই। সব বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের জবাবদিহিতা থাকা প্রয়োজন। এমপিওভুক্তির মতো বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে সরকারি অনুদান দেওয়া যায় কি না তা ভেবে দেখার আহ্বান জানান।

Advertisement

Advertisement

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম