Logo
Logo
×
   

Advertisement

দ্বিতীয় সংস্করণ

বিমান দুর্ঘটনা নিয়ে বিভ্রান্তি ও বাস্তবতা

Advertisement

Icon

এয়ার ভাইস মার্শাল (অব.) এম সানাউল হক

প্রকাশ: ২২ জুলাই ২০২৫, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

Advertisement

২১ জুলাই ২০২৫, সোমবার রৌদ্রোজ্জ্বল এ দিনটি হঠাৎ করেই বাংলাদেশের ইতিহাসে এক কালো শোকদিবস হিসাবে চিহ্নিত হয়ে গেল বিমানবাহিনীর এক জঙ্গিবিমানের মর্মান্তিক ক্র্যাশ বা দুর্ঘটনায়। ইন্টারনেট ও সোশ্যাল মিডিয়ার বদৌলতে অল্প কিছুক্ষণের মধ্যেই এ খবর ছড়িয়ে পড়ে সর্বত্র।

আমি সব বিদেহী আত্মার মাগফিরাত কামনা করছি, হতাহতদের শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি আমার সহমর্মিতা প্রকাশ করছি।

বাংলাদেশ বিমানবাহিনীতে বিমান দুর্ঘটনা আগেও ঘটেছে, অনেক বৈমানিকও শহীদ হয়েছেন। কিন্তু আল্লাহর অশেষ রহমতে এবং আমাদের চৌকশ বৈমানিকদের বীরত্বপূর্ণ দক্ষতায় এখন পর্যন্ত কোনো দুর্ঘটনাকবলিত বিমানের কারণে মাটিতে কেউ নিহত হবার ঘটনা ঘটেনি। কারণ এ বিষয়টিকে শুরু থেকেই আমাদের বৈমানিকদের বিশেষ গুরুত্বের সঙ্গে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। বিশ্বের অন্যতম জনবহুল বাংলাদেশে এটি আমাদের বৈমানিকদের দক্ষতা এবং আত্মত্যাগের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে পাইলটের নিয়ন্ত্রণের বাইরে অনেক ক্রিটিক্যাল মুহূর্তে এ কাজটি অসম্ভবও হতে পারে। একজন ফাইটার পাইলট হিসাবে আমি নিজে এ বিষয়টি খুব ভালো করেই জানি।

আলোচ্য বিমান দুর্ঘটনাটি সম্ভবত এমনই পরিস্থিতিতে হয়েছে, যার সঠিক উত্তর আমরা কেবল পূর্ণাঙ্গ তদন্তের পরই শুধু জানতে পারব।

বিভান্তি নয়, সচেতনতা প্রয়োজন

যেকোনো বিমান দুর্ঘটনাই মর্মান্তিক এবং সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করে। সবাই এ বিষয়ে জানতে চায়। কিন্তু একদিকে এটি যেমন বিশেষ টেকনিক্যাল বিষয়, আরেক দিকে যদি দুর্ঘটনায় পাইলট ও যাত্রী সবাই নিহত হয়ে যান, তাহলে বিস্তারিত তদন্ত ছাড়া ঠিক কী ঘটেছিল সেটা জানা দুষ্কর হয়ে দাঁড়ায়।

কিন্তু সাধারণ জনগণ অধীর উৎসাহে বিভিন্ন ধরনের তথ্য, ছবি, ভিডিও, এমনকি বিশ্লেষণি মতামত বিভিন্ন সামাজিকমাধ্যমে পোস্ট করতে থাকে। এমনকি বিভিন্ন ইলেকট্রনিক ও প্রিন্ট মিডিয়ায়ও বিভিন্ন বিশেষজ্ঞ মতামত প্রকাশ করতে দেখা যায়। এটা খুবই স্বাভাবিক। কিন্তু এসবের মধ্যে এমন অনেক তথ্য বা খবর প্রায়ই দেখা যায়, যা জনমনে উলটো বিভ্রান্তি সৃষ্টি করে, গুজব ছড়ায়। এমনকি বিমানবাহিনীর মতো বিশেষ বাহিনীর ইমেজ ও তথ্যের সংবেদনশীলতা তথা বাংলাদেশের জাতীয় নিরাপত্তার জন্য ক্ষতিকর প্রভাব সৃষ্টি করার ঝুঁকি তৈরি করে। একজন সচেতন নাগরিক হিসাবে আমাদের দায়িত্ব সঠিক ও নির্ভরযোগ্য সূত্রের তথ্য ব্যতীত অন্য সবকিছুতে কান না দেওয়া।

প্রশিক্ষণ বিমান নয়, জঙ্গিবিমান

২১ জুলাইয়ের দুর্ঘটনাটি ঘটে এফটি-৭ নয়, এফটি-৭বিজিওয়ান (F-7BG1) মডেলে একটি জঙ্গিবিমানের প্রশিক্ষণের জন্য বিশেষভাবে নির্মিত মডেলে।

বিমানটি কি খুব পুরাতন ছিল

যেকোনো বিমানের লাইফ স্প্যান বা জীবনকাল সাধারণত ৩০-৪০ বছর। চাইনিজ এফ-৭ সিরিজের প্রথম মডেল এফ-৭এমবি বাংলাদেশ বিমানবাহিনী প্রথম ক্রয় করে ১৯৮৯ সালে। তারপর এটির উন্নততর মডেল এফ-৭বিজি আমরা ক্রয় করি ২০০৬ সালে। এই সিরিজের সর্বাধুনিক মডেল এফ-৭ বিজিওয়ান মডেল ২০১২ সালে বাংলাদেশ বিমানবাহিনীতে সংযোজন করা হয়। উল্লেখ্য, সাধারণত সবাই মনে করে মিগ-২৯ বিমানই বুঝি আমাদের সর্বাধুনিক বিমান, যা বস্তুত ২০০০ সালে আমরা ক্রয় করি। বাস্তবিকে এফ-৭বিজিওয়ানই বাংলাদেশ বিমানবাহিনীতে সংযোজিত সর্বাধুনিক ও সর্বশেষ জঙ্গিবিমান। কাজেই মাত্র ১২ বছর পরেই এ বিমানকে খুব পুরাতন ভাবার কোনো কারণ নেই।

বিমানের প্রশিক্ষণ জনবসতিপূর্ণ এলাকাতে কেন? অন্য কোথাও করার সুযোগ ছিল কিনা?

আমেরিকা ইউরোপের বড় বড় ধনী দেশসহ পৃথিবীর প্রায় সব দেশেই প্রধান প্রধান আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরগুলো বড় বড় জনবহুল শহরে অবস্থিত। সিভিল এয়ার লাইন্সসমূহের পাশাপাশি মিলিটারি ফ্লাইং ও এসব বিমানবন্দরে নিয়মিত পরিচালিত হচ্ছে। খুব কম দেশই শুধুমাত্র মিলিটারি উড্ডয়নের জন্য অন্যত্র আলাদা বিমানবন্দর তৈরি করে। কারণ, একটি বিমানবন্দরের নির্মাণ খরচ বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার। বাংলাদেশের মতো নিম্ন বা মধ্যম আয়ের দেশের জন্য এটা আকাশকুসুম কল্পনা মাত্র।

উপরন্তু, মিলিটারি ফ্লাইং ট্রেনিংয়ের জন্য বাংলাদেশসহ সব দেশেই কম জনবহুল স্থানজুড়ে সুনির্দিষ্ট প্রশিক্ষণ এলাকা রয়েছে। সব প্রশিক্ষণ সেখানেই করা হয়। কিন্তু টেক অফ এবং ল্যান্ডিং মূল বিমানবন্দর থেকেই করা হয়।

স্বাধীনতার পর আমাদের দেশে ঢাকা এলাকায় তেজগাঁও আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকেই বিমানবাহিনীর জঙ্গিবিমানসমূহের সব প্রশিক্ষণ পরিচালনা করা হতো। ১৯৮৬ সালে কুর্মিটোলা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে প্রয়োজনীয় স্থাপনা নির্মাণের পর ঢাকা এলাকায় জঙ্গিবিমানের উড্ডয়ন মূলত কুর্মিটোলা থেকে পরিচালিত হয়। গতকালের দুর্ঘটনাকবলিত বিমানটি কুর্মিটোলা ঘাঁটি থেকেই উড্ডয়ন করে। কিন্তু বিমানটি বেলা ১২টা ৬ মিনিটে উড্ডউনের মাত্র কয়েক মিনিট পরেই দুর্ঘটনা ঘটে। যেহেতু পাইলট তার প্রথম সোলো মিশান করছিল, তার মিশান প্রোফাইলই ছিল উড্ডয়নের পর বিমানবন্দরের উপরেই কিছুক্ষণ উড্ডয়নের পর সে ল্যান্ড করে যাবে। কাজেই তার ট্রেনিং এরিয়াতে যাওয়ারই প্রয়োজন ছিল না।

এ ধরনের দুর্ঘটনার কারণ কী?

টেক অফ ও ল্যান্ডিং যে কোনো উড্ডয়নের সবচেয়ে ক্রিটিক্যাল মুহূর্ত। এ সময় যেকোনো ধরনের সিরিয়াস জরুরি অবস্থায় পাইলট খুব কম সময় পায়। মাত্র কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে তাকে বিমান তথা নিজের এবং যাত্রীদের জীবন রক্ষার জন্য অতি দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হয়। এসব চেকলিস্ট বা কার্যক্রম প্রতিটি পাইলটের প্রথম উড্ডয়নের আগে কিন্তু এমন কিছু অতি ক্রিটিক্যাল ইমার্জেন্সি অবস্থা ঘটতে পারে, যেখানে পাইলট সে যত অভিজ্ঞই হোক করার কিছুই থাকে না। সম্প্রতি ইন্ডিয়ান এয়ারলাইন্সের বিমান দুর্ঘটনায় আমরা সবাই এটি দেখেছি।

বিমানবাহিনী এ দুর্ঘটনার কারণ নির্ণয়ের জন্য উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠন করেছে। তারা সঙ্গে সঙ্গেই কাজ শুরু করেছে। তাদের তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত আমরা সঠিক কারণ জানতে পারব না। কাজেই তদন্তাধীন এমন একটি বিশেষ জনগুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে আন্দাজের ওপর ভিত্তি করে কারণ বিশ্লেষণ করা দায়িত্বশীলতার পরিচয় হবে না।

তবে উল্লেখ্য যে, বিমানবাহিনীর প্রাথমিক তদন্তে বলা হয়েছে যান্ত্রিক গোলযোগের কারণে এ দুর্ঘটনা ঘটেছে। পাইলট পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে জেনে ক্র্যাশ করার আগে বিমানটি জনবহুল এলাকা থেকে যথাসম্ভব দূরে কোথাও ক্র্যাশ করার চেষ্টা করেও তেমন কোনো ফাঁকা জায়গা পায়নি। ফলে এ মর্মান্তিক দুর্ঘটনা।

আমি বরং এক্ষেত্রে একটি উদাহরণ উল্লেখ করতে চাই, যদিও এমনটি ঘটেছে কিনা আমরা এখনো জানি না।

সুপারিশ

যেহেতু এখনো তদন্তই শেষ হয়নি এবং আমরা সঠিক কারণ জানি না, কাজেই এ ধরনের দুর্ঘটনা রোধের জন্য করণীয় সুপারিশ করাও এখন অন্ধকারে ঢিল ছোড়ার মতো হবে। তবে বিদ্যমান অন্যান্য প্রাসঙ্গিক বিষয় বিবেচনা করে সামরিক ও সিভিল এভিয়েশনের অভিজ্ঞতার আলোকে এ মুহূর্তে প্রাথমিকভাবে সুপারিশ করা যেতে পারে যে-

১। আজ হোক কাল হোক, কুর্মিটোলা বিমানবন্দর বাদ দিয়ে বাংলাদেশকে আরেকটি নতুন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর নির্মাণ করতেই হবে। সাধারণত ১০.১২ বছর লেগে যায়। ২০৩৫ সাল নাগাদ বর্তমান বিমানবন্দরটি তার সক্ষমতার পূর্ণমাত্রায় পৌঁছে যাওয়ার কথা। সে হিসাবে আমরা বরং পিছিয়ে আছি। কাজেই অনতিবিলম্বে সরকারকে এ কাজে হাত দিতে হবে।

২। আগেই বলেছি, যে হারে প্রযুক্তির উন্নয়ন ঘটছে, ২০০০ বা ২০১২ সালের জঙ্গিবিমানের সাথে নতুন পঞ্চম প্রজন্মের জঙ্গিবিমান ক্রয় বিমানবাহিনীর সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং জাতীয় নিরাপত্তা জোরদার করার জন্য অত্যাবশ্যক।

৩, মিডিয়া এবং সচেতন নাগরিক সমাজকে এ ধরনের স্থানীয় বিপর্যয়ের মুহূর্তে গুজব বা অপতথ্যের প্রচারের বিরুদ্ধে সচেতন থেকে জনগণকে সঠিক তথ্য প্রদান এবং দেশের ভাবমূর্তি রক্ষায় সহায়তার আহ্বান জানাচ্ছি।

লেখক : বিমানবাহিনীর সাবেক সহকারী প্রধান এবং সাবেক চেয়ারম্যান, সিভিল এভিয়েশন।

Advertisement

Advertisement

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম