Logo
Logo
×
   

Advertisement

দ্বিতীয় সংস্করণ

গুলশানে সমন্বয়ক পরিচয়ে চাঁদাবাজি

পুলিশের সামনেই সাবেক এমপির বাসায় লুটের চেষ্টা

Advertisement

Icon

ইমন রহমান

প্রকাশ: ২৯ জুলাই ২০২৫, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

Advertisement

সাবেক এমপি শাম্মী আহমেদের রাজধানীর গুলশানের বাসায় প্রথম পর্যায়ে সমন্বয়ক পরিচয়ে মব সৃষ্টি করে লুটপাট করতে যায় ১৫-২০ জনের একদল যুবক। ১৬ জুলাই দিবাগত রাত চারটার দিকে গুলশানের ৮৩ নম্বর রোডের ১৩ নম্বর বাসার সামনে ভিড় করা ওই যুবকদের নেতৃত্বে ছিলেন গণতান্ত্রিক ছাত্র সংসদের কেন্দ্রীয় যুগ্ম আহ্বায়ক জানে আলম অপু ও সদস্য আব্দুর রাজ্জাক বিন সুলাইমান ওরফে রিয়াদ। তারা পুলিশকে ফোন দিয়ে বলে এখানে বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের মামলার আসামি আছে, তাকে ধরে নিয়ে যেতে বলে। গুলশান থানা পুলিশের একটি টহল টিম দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে। পুলিশের সঙ্গে অপু ও রিয়াদ তাদের আরও চার-পাঁচজন সহযোগীকে নিয়ে ফ্ল্যাটে ঢোকে। কিন্তু সাবেক এমপি শাম্মীকে তারা খুঁজে পায়নি। ফ্ল্যাটে ছিলেন তার ৭৪ বছর বয়সি স্বামী সিদ্দিক আবু জাফর।

ওই অভিযানে থাকা এক পুলিশ সদস্য যুগান্তরকে জানান, বাসায় ঢুকেই অপু ও রিয়াদের নেতৃত্বে সবকিছু ওলটপালট করা শুরু করে মব সৃষ্টি করা যুবকরা। তারা একপর্যায়ে আলমারি খোলার চেষ্টা করে। তখন বাধা দেয় পুলিশ। সেখানে এক ভীতিকর পরিস্থিতি তৈরি করে তারা। এ সময় পুলিশকে তারা বলেন, আলমারিতে স্বর্ণ ও টাকা আছে। উপস্থিত পুলিশ সদস্যরা বলেন, এগুলো আমাদের দেখার বিষয় নয়। তখন পুলিশের বাধার মুখে লুট করতে পারেনি চাঁদাবাজ ওই চক্র। দুই ঘণ্টা পর ভোর ছয়টার দিকে পুলিশ অপু ও রিয়াদসহ অন্যদের নিয়ে বাসা থেকে বের হয়। ওই সময় পুলিশের সঙ্গে খারাপ আচরণও করে রিয়াদ ও অপু। অভিযানের ওই ঘটনায় একটি জিডিও করে গুলশান থানা পুলিশ। এরপর ১৭ জুলাই সকাল ১০টার দিকে ফের গুলশানের ওই বাসায় গিয়ে শাম্মী আহমেদের স্বামীর কাছে ৫০ লাখ টাকা দাবি করে অপু ও রিয়াদ। ভয়ভীতি দেখিয়ে তাৎক্ষণিক ১০ লাখ টাকা নিয়ে আসে তারা। ওই চাঁদা নেওয়ার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়।

পরে গত শনিবার সন্ধ্যায় ফের গুলশানের ওই বাসায় চাঁদার টাকা আনতে গিয়ে গ্রেফতার হয় ৫ জন। তারা হলো-বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সম্মিলিত বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত আহ্বায়ক ও বাংলাদেশ গণতান্ত্রিক ছাত্র সংসদের কেন্দ্রীয় সদস্য আব্দুর রাজ্জাক বিন সুলাইমান ওরফে রিয়াদ, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন ঢাকা মহানগর শাখার আহ্বায়ক ইব্রাহীম হোসেন মুন্না, ঢাকা মহানগর শাখার সদস্য মো. সাকাদাউন সিয়াম ও সাদমান সাদাব এবং বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের কর্মী মো. আমিনুল ইসলাম। তাদের সংগঠন থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে।

গ্রেফতারের পর রিয়াদ, সাকাদাউন সিয়াম, সাদমান সাদাব, ইব্রাহিম হোসেনকে ৭ দিনের রিমান্ডে নেওয়া হয়েছে। তাদের রাজধানীর মিন্টু রোডে ডিবি কার্যালয়ে রেখে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে।

সোমবার রিমান্ডের প্রথম দিনে পুলিশকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করেছে মূল হোতা রিয়াদ। তদন্তসংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, জিজ্ঞাসাবাদে রিয়াদ দাবি করেছে চাঁদাবাজির যে ভিডিও ভাইরাল হয়েছে সেখানে যে প্যাকেট দেখা যাচ্ছে তাতে মূলত বিরিয়ানি ছিল। এছাড়া রিয়াদের বাবা স্কুলশিক্ষক ও তাদের আর্থিক অবস্থা ভালো বলেও দাবি করেন। জিজ্ঞাসাবাদে তার বিরুদ্ধে থাকা অন্যান্য চাঁদাবাজির অভিযোগ অস্বীকার করেছে। রিয়াদের চোখে-মুখে কোনো অনুতপ্তের ছাপ ছিল না। চাঁদাবাজির প্রমাণ উপস্থাপন করলেও তিনি সব অস্বীকার করেন।

জানতে চাইলে গুলশান থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. হাফিজুর রহমান যুগান্তরকে বলেন, ‘গুলশানের ওই বাসার চাঁদাবাজির প্রমাণ আমাদের হাতে রয়েছে। টাকা নেওয়ার কথোপকথনের অডিও রেকর্ডও আছে। এ বিষয়ে তদন্ত শেষে বিস্তারিত জানানো হবে।’

তিনি আরও বলেন, এই চক্রটি কোথাও মব সৃষ্টি করে সেখানে পুলিশকে খবর দেয়। ভুক্তভোগীকে একটি ভীতিকর পরিস্থিতিতে ফেলে পুলিশে দেওয়ার ভয় দেখিয়ে চাঁদা আদায় করে।’

এদিকে এই চাঁদাবাজচক্রের বিরুদ্ধে ওঠা বিভিন্ন অভিযোগের তদন্তে নেমেছে ডিবি পুলিশের একাধিক টিম। নাম প্রকাশ না করে ডিবির এক কর্মকর্তা যুগান্তরকে বলেন, ‘চাঁদাবাজ এই চক্র নিয়ে ডিবির একাধিক টিম কাজ করছে। প্রযুক্তির মাধ্যমে এই চক্রে আর কারা আছে, চাঁদার টাকার ভাগ কারা কারা পেয়েছে তার তালিকা তৈরির কাজ চলছে।’

অধরা জানে আলম অপু : সাবেক এমপি শাম্মী আহমেদের বাসায় চাঁদাবাজির অন্যতম হোতা জানে আলম অপু। তাকে ইতোমধ্যে গণতান্ত্রিক ছাত্র সংসদের কেন্দ্রীয় যুগ্ম আহ্বায়কের পদ থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে। কিন্তু পুলিশ এখনো তাকে গ্রেফতার করতে পারেনি। এ ঘটনার পর পলাতক থেকে ফেসবুকে এক পোস্টে অপু নিজেকে নির্দোষ দাবি করেছেন।

পুলিশের একটি সূত্র বলছে, জানে আলম অপুর প্রকৃত নাম কাজী গৌরব অপু। সে চাঁদার পাঁচ লাখ টাকা নেয়। ওই টাকা দিয়ে নতুন মোটরসাইকেলও কেনেন। গুলশান থানায় হওয়া মামলার দুই নম্বর আসামি সে।

অপুকে গ্রেফতারের বিষয়ে জানতে চাইলে গুলশান থানার ওসি মো. হাফিজুর রহমান বলেন, ‘অপুসহ আরও কয়েকজনে গ্রেফতারে আমাদের একাধিক টিম কাজ করছে।’

দুদক মহাপরিচালক : বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতা আব্দুর রাজ্জাক রিয়াদসহ সংগঠনটির সদস্যদের বিরুদ্ধে অবৈধ সম্পদ অর্জনের সুনির্দিষ্ট অভিযোগ থাকলে তা অনুসন্ধানে কোনো বাধা নেই বলে জানিয়েছেন দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) মহাপরিচালক মো. আক্তার হোসেন।

মঙ্গলবার দুপুরে সেগুনবাগিচায় দুদক কার্যালয়ে সাংবাদিকদের আরও বলেন, ‘চাঁদাবাজির বিষয়টি দুদকের তফশিলভুক্ত নয়। তবে যদি কেউ জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জন করে থাকে সেই বিষয়টি আমাদের এখতিয়ারভুক্ত। এই বিষয়ে যদি কোনো সুনির্দিষ্ট অভিযোগ থাকে, তা অনুসন্ধান করতে আমাদের কোনো বাধা নেই।’ তবে ইতোমধ্যেই রিয়াদের অবৈধ সম্পদের তথ্য গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। অনেক কষ্টে দিন চালানো রিয়াদের গ্রামের বাড়িতে পাকা ভবন তৈরির কাজ চলছে।

Advertisement

Advertisement

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম