চলে গেলেন শামীমা সাত্তার মিমু
নিভে গেল অ্যাথলেটিক্সের উজ্জ্বল আলো
Advertisement
মোজাম্মেল হক চঞ্চল
প্রকাশ: ১৫ মার্চ ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
বাংলাদেশের অ্যাথলেটিক্স অঙ্গনে এক উজ্জ্বল নাম ছিলেন শামীমা সাত্তার মিমু। ট্র্যাক অ্যান্ড ফিল্ডে নিজের সাফল্য, কোচিং এবং ক্রীড়া প্রশাসনে দীর্ঘ অবদানের মাধ্যমে তিনি দেশের ক্রীড়াঙ্গনে এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিলেন। সেই আলোকিত পথচলার অবসান হলো শুক্রবার রাতে। ঢাকার নিজ বাসভবনে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন রাষ্ট্রীয় ক্রীড়া পুরস্কার প্রাপ্ত এই সাবেক অ্যাথলেট (ইন্নালিল্লাহি ... রাজিউন)। তার ছেলে শাহরিয়ার শরীফ জানান, ‘দীর্ঘদিন ধরে মা ভাটিকা ও হৃদরোগজনিত সমস্যায় ভুগছিলেন।’ মরহুমার শেষ ইচ্ছা অনুযায়ী তার লাশ দিনাজপুরে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। সেখানে বাবার কবরের পাশে তার লাশ দাফন করা হবে।
স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশের অ্যাথলেটিক্স যখন ধীরে ধীরে সংগঠিত হয়ে উঠছিল, সেই সময় ট্র্যাকে আবির্ভাব শামীমা সাত্তার মিমুর। ১৯৭৩ সালে প্রথম জাতীয় অ্যাথলেটিক্স প্রতিযোগিতায় দিনাজপুর জেলার হয়ে অংশ নিয়ে তিনি ক্রীড়াঙ্গনের নজর কাড়েন। ক্যারিয়ারের শুরুতে ১০০ ও ২০০ মিটার স্প্রিন্ট, ৪›১০০ মিটার রিলে এবং লংজাম্পে রুপা ও ব্রোঞ্জ জিতেছিলেন তিনি। দ্রুত নিজের শক্তির জায়গা খুঁজে পান জাম্প ইভেন্টে, বিশেষ করে হাইজাম্প ও লংজাম্পে।
১৯৭৬ সালে যশোরে অনুষ্ঠিত জাতীয় অ্যাথলেটিক্স মিটে লংজাম্পে স্বর্ণ জিতে তিনি নতুন করে আলোচনায় আসেন। এরপর প্রায় দুই দশক ধরে দেশের ট্র্যাক অ্যান্ড ফিল্ডে আধিপত্য ধরে রাখেন। ১৯৭৩ থেকে ১৯৯২ সাল পর্যন্ত দীর্ঘ খেলোয়াড়ি জীবনে তিনি জাতীয় পর্যায়ে জিতেছেন ২৭টি স্বর্ণ, ১৩টি রুপা ও তিনটি ব্রোঞ্জপদক। হাইজাম্প ও লংজাম্পে তিনবার জাতীয় রেকর্ড গড়ে নিজের নাম লিখিয়েছেন দেশের অ্যাথলেটিক্স ইতিহাসে।
বিশেষ করে হাইজাম্পে তার দাপট ছিল কিংবদন্তিতুল্য। ১৯৭৯ সালে টানা চারবারের চ্যাম্পিয়ন মরিনা খানম মেরীকে পেছনে ফেলে নতুনভাবে আলোচনায় আসেন তিনি। এরপর ১৯৭৯ থেকে ১৯৮৪ সাল পর্যন্ত টানা চ্যাম্পিয়ন হয়ে এই ইভেন্টে নিজের শক্ত অবস্থান তৈরি করেন। হাইজাম্পে দীর্ঘ সময় ধরে তিনি ছিলেন দেশের সেরা অ্যাথলেটদের একজন। ১৯৯২ সালের ২২ ডিসেম্বর তিনি চ্যাম্পিয়ন হয়ে বিদায় নেন।
ট্র্যাকে তার সাফল্য ছিল চোখে পড়ার মতো। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তখনো বাংলাদেশের অ্যাথলেটদের সুযোগ-সুবিধা ছিল সীমিত। ১৯৮২ দিল্লি এশিয়ান গেমসে লংজাম্পে অংশ নিয়ে সেরা আটের মধ্যে সপ্তম হন তিনি, যা সেসময়ের উল্লেখযোগ্য অর্জন। পরে নিজের অভিজ্ঞতার কথা বলতে গিয়ে তিনি প্রায়ই উল্লেখ করতেন, ‘বাংলাদেশে একসময় অ্যাথলেটদের বালুর ওপর লাফিয়ে প্রতিযোগিতা করতে হতো, অনেক পরে জাতীয় পর্যায়ে ফোম ম্যাটের ব্যবহার শুরু হয়।’ এই সীমাবদ্ধতাই আন্তর্জাতিক পর্যায়ে পিছিয়ে থাকার অন্যতম কারণ বলে মনে করতেন তিনি।
খেলোয়াড়ি জীবন শেষ হলেও খেলাধুলা থেকে দূরে সরে যাননি শামীমা। কোচ হিসাবে শুরু করেন নতুন অধ্যায়। ১৯৮৩-৮৪তে ভারতের পাতিয়ালা থেকে প্রশিক্ষক হিসাবে ডিপ্লোমা অর্জনের পর জার্মানি ও ইন্দোনেশিয়ায় উচ্চতর প্রশিক্ষণ নেন তিনি। তার প্রশিক্ষণে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে অনেক অ্যাথলেট সাফল্য অর্জন করেছেন। পাকিস্তানে নারী ইসলামিক সলিডারিটি গেমসে তার শিষ্য রহিমা খানম জুঁই দেশকে প্রথম পদক এনে দেন। ১৯৯৬ ও ১৯৯৭ ইসলামিক গেমসেও তার প্রশিক্ষণে বাংলাদেশের অ্যাথলেটরা স্বর্ণপদক জয়ের সাফল্য পায়।
তিনি ছিলেন বাংলাদেশ ক্রীড়া শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের (বিকেএসপি) উপপরিচালক (প্রশিক্ষণ)। দিনাজপুর ও সাভারে তরুণ অ্যাথলেটদের গড়ে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন তিনি। পাশাপাশি সক্রিয় ছিলেন বাংলাদেশ অ্যাথলেটিক্স ফেডারেশনের কার্যনির্বাহী কমিটির সদস্য হিসাবে। জাতীয় ও আন্তর্জাতিক অ্যাথলেটিক্স প্রতিযোগিতায় বিচারক ও টেকনিক্যাল কর্মকর্তা হিসাবেও দায়িত্ব পালন করেছেন। ক্রীড়াঙ্গনে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতি হিসাবে ২০০০ সালে তিনি পান জাতীয় ক্রীড়া পুরস্কার। খেলোয়াড়, কোচ ও প্রশাসক-এই তিন পরিচয়ে তিনি হয়ে উঠেছিলেন বাংলাদেশের অ্যাথলেটিক্সের এক অনন্য ব্যক্তিত্ব। তার মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করেছেন যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী আমিনুল হক। এছাড়া বাংলাদেশ অলিম্পিক অ্যাসোসিয়েশন (বিওএ), অ্যাথলেটিক্স, আরচারি ও হ্যান্ডবল ফেডারেশন এবং বাংলাদেশ ক্রীড়ালেখক সমিতি (বিএসপিএ) ও বাংলাদেশ স্পোর্টস জার্নালিস্টস অ্যাসোসিয়েশন (বিএসজেএ) পৃথক শোকবাণী দিয়েছে।
