নিষিদ্ধ হওয়ার শঙ্কায় মাবিয়া
ফাইল ছবি
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
বাংলাদেশের নারী ভারোত্তোলনের ইতিহাসে মাবিয়া আক্তার সীমান্তের নাম এড়িয়ে যাওয়ার উপায় নেই। ঢাকার টংঘরে বাবার সঙ্গে বাজারে সবজি বিক্রি করা সেই মেয়েটিই পরে হয়ে ওঠেন দেশের সবচেয়ে সফল নারী ভারোত্তোলক। দক্ষিণ এশিয়ার মঞ্চে স্বর্ণ জয়, জাতীয় প্রতিযোগিতায় একের পর এক রেকর্ড, দারিদ্র্যের সঙ্গে লড়াই করে উঠে আসা মাবিয়ার গল্প সংগ্রাম ও সাফল্যের এক বিরল উপাখ্যান। সেই গল্পের মাঝখানে অনিশ্চয়তার অন্ধকার।
সৌদি আরবের রিয়াদে ২০২৫ ইসলামিক সলিডারিটি গেমস শেষে মাবিয়ার ডোপিং নমুনায় আপত্তিকর ফল পাওয়ার অভিযোগ ওঠে। গেমসের ডোপিং কার্যক্রম পরিচালনা করা ইন্টারন্যাশনাল টেস্টিং এজেন্সি জানিয়েছে, প্রাথমিক পরীক্ষায় তার শরীরে নিষিদ্ধ উপাদানের উপস্থিতি মিলেছে। তবে অভিযোগ চূড়ান্ত নয়। ডোপিং প্রক্রিয়ায় ‘এ’ নমুনার পর ‘বি’ নমুনা পরীক্ষার সুযোগ থাকে। কিন্তু ‘বি’ নমুনাতেও একই ফল এলে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় নারী ভারোত্তোলককে নিষেধাজ্ঞার মুখে পড়তে হতে পারে। মাবিয়ার জন্য এটি শুধু নিয়মভঙ্গের অভিযোগ নয়, তার ক্যারিয়ার সবচেয়ে বড় আঘাত। কারণ বাংলাদেশের ক্রীড়াঙ্গনে মাবিয়া শুধু একজন অ্যাথলেট নন, সংগ্রামের প্রতীকও। মাদারীপুর থেকে ঢাকায় এসে খিলগাঁওয়ে বড় হওয়া মাবিয়ার শৈশব কেটেছে অভাবের মধ্যে। বাবা ছিলেন মুদি দোকানদার। সংসারের টানাপোড়েনে লেখাপড়া বন্ধ হয়ে যায়। ছোটবেলায় বাবার সঙ্গে বাজারে সবজি বিক্রি করেছেন। টংঘরে থেকেছেন, দিন কেটেছে ঠিকমতো খাবার ছাড়াই। ২০১০ সালে মামার হাত ধরে প্রথম জাতীয় স্টেডিয়ামে যান। সেখানে এসএ গেমসের ক্যাম্পে ভারোত্তোলনের সঙ্গে পরিচয়। অল্প সময়ে শক্তি আর জেদের কারণে জাতীয় পর্যায়ে উঠে আসেন তিনি। ২০১৩ সাল থেকে নারী ভারোত্তোলনে অপ্রতিদ্বন্দ্বী মাবিয়া। গত বছর জাতীয় প্রতিযোগিতায় ৬৯ কেজি বিভাগে স্ন্যাচে ৯২ কেজি ও ক্লিন অ্যান্ড জার্কে ১১৮ কেজি তুলে মোট ২১০ কেজি ভার তোলেন, যা তার ক্যারিয়ারের সেরা।
বাংলাদেশের ক্রীড়াপ্রেমীরা তাকে প্রথম চিনেছিল ২০১৬ দক্ষিণ এশীয় গেমসে। ভারতের গুয়াহাটিতে ৬৩ কেজি বিভাগে স্বর্ণ জিতে বাংলাদেশের জন্য প্রথম স্বর্ণ এনে দেন তিনি। স্ন্যাচে ৬৭ ও ক্লিন অ্যান্ড জার্কে ৮২ কেজি তুলে মোট ১৪৯ কেজি ভার তুলেছিলেন। স্বর্ণ নিশ্চিত হওয়ার পর মঞ্চেই কান্নায় ভেঙে পড়েছিলেন মাবিয়া। সেই কান্না ছিল দারিদ্র্য আর অপমানের বিরুদ্ধে জয়ের কান্না।
তিন বছর পর নেপালের পোখারায় দক্ষিণ এশীয় গেমসে আবারও স্বর্ণ জেতেন। এবার ৭৬ কেজি বিভাগে স্ন্যাচে ৮০ ও ক্লিন অ্যান্ড জার্কে ১০৫ কেজি তুলে মোট ১৮৫ কেজি ভার তোলেন। টানা দ্বিতীয়বার দক্ষিণ এশিয়ার সেরা হওয়ার কীর্তি বাংলাদেশের নারী ভারোত্তোলনে আগে দেখা যায়নি। এসএ গেমসের বাইরেও তার সাফল্য কম নয়। যুব কমনওয়েলথ চ্যাম্পিয়নশিপে স্বর্ণ, কমনওয়েলথে রুপা, এশিয়ান পর্যায়ে পদক রয়েছে তার ঝুলিতে। ২০১৮ কমনওয়েলথ গেমসে ক্যারিয়ারসেরা ১৮০ কেজি ভার তুলে ষষ্ঠ হয়েছিলেন। শুধু অপূর্ণ থেকে গেছে অলিম্পিক-স্বপ্ন।
এত সাফল্যের পরও মাবিয়ার ক্যারিয়ার মসৃণ ছিল না। কখনো বৃত্তি পাওয়া থেকে বাদ পড়েন, কখনো কোচের সঙ্গে দ্বন্দ্বে জড়িয়েছেন। অভিযোগ করেছেন, তাকে ইচ্ছা করেই পিছিয়ে রাখা হয়েছে। সম্প্রতি নিজের সেরা পারফরম্যান্সের পরও তিনি বলেছিলেন, ‘আমি শেষ হয়ে যাইনি।’ সেই সময়ই তার জীবনে নেমে আসে ঝড়।
বাংলাদেশ অলিম্পিক অ্যাসোসিয়েশনের মেডিকেল কমিটির সদস্য সচিব ডা. শফিকুর রহমান জানিয়েছেন, প্রথম নমুনা দক্ষিণ কোরিয়ার পরীক্ষাগারে পাঠানো হয়েছিল। সেখানে মাবিয়ার ফল পজিটিভ আসে। দ্বিতীয় নমুনা ইতালির পরীক্ষাগারে পাঠানো হয়েছে। তার মতে, ‘কখনো চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া ওষুধ বা দূষিত সাপ্লিমেন্ট থেকেও শরীরে নিষিদ্ধ উপাদান চলে আসতে পারে। মাবিয়ার ক্ষেত্রেও সেটি ঘটেছে কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।’
ডোপিং অভিযোগ প্রমাণিত হলে মাবিয়ার বিরুদ্ধে দুই থেকে চার বছরের নিষেধাজ্ঞা আসতে পারে। ২৬ বছর বয়সি ভারোত্তোলকের জন্য নিষেধাজ্ঞা মানে ক্যারিয়ার প্রায় শেষ। তবে ‘বি’ নমুনায় যদি নিষিদ্ধ উপাদান না পাওয়া যায়, তাহলে তিনি মুক্তি পেতে পারেন। কিন্তু আপাতত দেশের সবচেয়ে বড় নারী ভারোত্তোলককে অপেক্ষা করতে হচ্ছে কঠিন রায়ের জন্য।

