ক্রীড়াবিদদের ভবিষ্যৎ সুরক্ষায় ‘অ্যাথলেট ওয়েলফেয়ার ফান্ড’
‘বাংলাদেশের ক্রীড়াঙ্গনে নতুন মানবিক সংস্কৃতির সূচনা করতে পারে এই তহবিল’
Advertisement
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
স্বর্ণপদক জেতার সময় একজন ক্রীড়াবিদ দেশের সম্পদ। কিন্তু খেলা থামলে? বয়স বাড়লে? চোটে শরীর ভেঙে গেলে? তখন সেই ক্রীড়াবিদের পাশে কে? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে ‘অ্যাথলেট
ওয়েলফেয়ার ফান্ড’ গঠনের তোড়জোড় চলছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী, ক্রীড়া ফেডারেশনগুলোর তত্ত্বাবধানে পরিচালিত হবে এই তহবিল। দেশের সব ক্রীড়া ফেডারেশন, জেলা ও বিভাগীয় ক্রীড়া সংস্থা, ক্লাব এবং জাতীয় পর্যায়ের ক্রীড়াবিদদের এর আওতায় আনার ভাবনা রয়েছে। উদ্দেশ্য, খেলা ছাড়ার পর ক্রীড়াবিদকে যেন শেষ হয়ে যেতে না হয়।
অ্যাথলেট ওয়েলফেয়ার ফান্ড গঠনের অন্যতম উদ্যোক্তা বাংলাদেশ সাঁতার ফেডারেশনের সাবেক সাধারণ সম্পাদক মাহবুবুর রহমান শাহীন বলেন, ‘এই ফান্ড সময়ের দাবি। খেলা শেষে কিংবা খেলা চলাকালীন অ্যাথলেটরা ইনজুরিতে পড়েন। শেষ জীবনে চলার মতো টাকা থাকে না। সেই সময় কিছুটা সহযোগিতার জন্য এই ফান্ড দরকার। আমিও সাধ্যমতো সহযোগিতা করব। অন্যরা এগিয়ে এলে ক্রীড়াঙ্গনে এটা হবে যুগান্তকারী অধ্যায়।’
বাংলাদেশের ক্রীড়াঙ্গনে এমন একটি ব্যবস্থার প্রয়োজন কতটা, তার জীবন্ত উদাহরণ সৈয়দা সাদিয়া সুলতানা। ২০১০ এসএ গেমস শুটিংয়ে স্বর্ণজয়ী। কমনওয়েলথ শুটিংয়েও পদক। ২০১৭ সালে আগুনে পুড়ে গুরুতর অসুস্থ হন।
২০২৪ সালের ২ ডিসেম্বর মাত্র ৩১ বছর বয়সে মারা যান এই সাবেক তারকা শুটার। সাদিয়ার অবুঝ দুই সন্তান অকালে মাতৃহারা হয়। তাদের পাশে দাঁড়ানোর কেউ নেই। দেশের হয়ে স্বর্ণ জেতার পর একজন ক্রীড়াবিদের জীবনের দায়িত্ব কার? এই প্রশ্ন আমেরিকা প্রবাসী সাবেক সাফ স্বর্ণজয়ী শুটার আঁখি চৌধুরীর।
সাবেক তারকা খেলোয়াড় ও ভলিবল ফেডারেশনের সহসভাপতি নাছিমা চৌধুরী শিরিনও এমন উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছেন। তার মতে, ‘একজন ক্রীড়াবিদ দেশের জন্য দীর্ঘদিন যে শ্রম দেন, ত্যাগ স্বীকার করেন, খেলা শেষে তার প্রতি ক্রীড়াঙ্গনের দায়িত্ব শেষ হয়ে যেতে পারে না। বিশেষ করে ইনজুরি, অসুস্থতা কিংবা বার্ধক্যে সাবেক খেলোয়াড়দের পাশে দাঁড়ানোর জন্য স্থায়ী তহবিল থাকা জরুরি।’ তার বিশ্বাস, সব ফেডারেশন, ক্রীড়া সংগঠন, সাবেক খেলোয়াড় ও সামর্থ্যবান মানুষ এগিয়ে এলে ‘অ্যাথলেট ওয়েলফেয়ার ফান্ড’ বাংলাদেশের ক্রীড়াঙ্গনে নতুন মানবিক সংস্কৃতির সূচনা করতে পারে।’
জাতীয় ফুটবল দলের সাবেক তারকা গোলকিপার মোহাম্মদ মহসিনের ঘটনা আরও নির্মম। জীবনের শেষভাগে অসুস্থতা ও আর্থিক সমস্যায় পড়েন তিনি। তার দুরবস্থার খবর প্রকাশের পর বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি) চিকিৎসার দায়িত্ব নেওয়ার পাশাপাশি প্রয়োজনীয় সহায়তা দেয়। প্রায় দুই বছর হলো, মহসিনের কোনো খোঁজ নেই।
অ্যাথলেট ওয়েলফেয়ার ফান্ডের পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে সরকারি সহায়তার পাশাপাশি ফেডারেশনগুলোও থাকবে তহবিলের ব্যবস্থাপনায়। প্রয়োজন হবে স্পষ্ট নীতিমালার। কে সহায়তা পাবেন, কোন পরিস্থিতিতে পাবেন, কতটা পাবেন এবং অর্থ ব্যয়ের হিসাব কীভাবে প্রকাশ হবে। স্বচ্ছতা ছাড়া কল্যাণ তহবিলও একদিন আরেকটি আমলাতান্ত্রিক ফাইলে পরিণত হতে পারে। তহবিলের আওতায় থাকতে পারে চিকিৎসা, ইনজুরি পরবর্তী পুনর্বাসন, স্বাস্থ্যবিমা, জরুরি আর্থিক সহায়তা, অবসরকালীন ভাতা এবং দ্বিতীয় ক্যারিয়ার গঠনের সুযোগ। পাশাপাশি তৈরি হতে পারে কেন্দ্রীয় ‘অ্যাথলেট ওয়েলফেয়ার ডেটাবেস’। জাতীয় পর্যায়ে দেশের হয়ে খেলা প্রত্যেক ক্রীড়াবিদের তথ্য থাকবে সেখানে।
এ প্রসঙ্গে সাবেক তারকা ফুটবলার আব্দুল গাফফার বলেন, ‘যে ফুটবলার আর খেলতে পারবেন না, তিনি কোচ হতে পারেন। যে সাঁতারু অবসর নিয়েছেন, হতে পারেন প্রশিক্ষক। যে অ্যাথলেট আর দৌড়াতে পারবেন না, তাকে যুক্ত করা যেতে পারে ক্রীড়া প্রশাসনে।’ জাতীয় ক্রীড়া পুরস্কার পাওয়া সাঁতারু নিবেদিতা দাসের অভিমত, ‘সরকার, ফেডারেশন, জেলা ও বিভাগীয় ক্রীড়া সংস্থা, ক্লাব, করপোরেট প্রতিষ্ঠান, সাবেক ক্রীড়াবিদ ও ক্রীড়াপ্রেমীরা এগিয়ে এলে এই তহবিল হয়ে উঠতে পারে ক্রীড়াঙ্গনের সবচেয়ে মানবিক নিরাপত্তাবলয়।’

