Logo
Logo
×
   

Advertisement

খেলা

সই হয়েছে, এবার মাঠে কী বদলাবে?

Advertisement

মোজাম্মেল হক চঞ্চল

মোজাম্মেল হক চঞ্চল

প্রকাশ: ০৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

সই হয়েছে, এবার মাঠে কী বদলাবে?

Advertisement

মঞ্চে টেবিল। টেবিলের ওপর কাগজ। পাশে কলম। সামনে ক্যামেরা। কয়েকটি স্বাক্ষর, করতালি, বক্তৃতা। তারপর ঘোষণা ‘ঐতিহাসিক মাইলফলক।’ ২ সেপ্টেম্বর ঢাকায় বাংলাদেশ ব্রাইটন প্লাস হেলসিঙ্কি ঘোষণাপত্রে স্বাক্ষর করেছে। ঘোষণার মূল লক্ষ্য ক্রীড়ায় নারীর সমান অধিকার, নিরাপত্তা, অংশগ্রহণ ও সুযোগ নিশ্চিত করা। শুনতে ভালো। আন্তর্জাতিক মানের। সময়োপযোগীও।

স্বাক্ষরের পর প্রশ্ন একটাই, মাঠে কী বদলাবে? নারী ক্রীড়াবিদদের নিরাপত্তা কাগজে কয়েকটি প্রতিশ্রুতি লিখে নিশ্চিত হয় না। তার পরীক্ষা হয় মাঠে, অনুশীলনে, প্রশিক্ষণ শিবিরে, হোটেলে, যাতায়াতের পথে, ড্রেসিংরুমে, ফেডারেশনের সভাকক্ষে। এমনকি একজন নারী খেলোয়াড় কোনো অভিযোগ নিয়ে কর্মকর্তার দরজায় দাঁড়ালে তার সঙ্গে কেমন আচরণ করা হয়, সেখানেও। ব্রাইটন প্লাস হেলসিঙ্কি ঘোষণাপত্র কোনো নতুন স্লোগান নয়। ১৯৯৪ সালে ব্রাইটন ঘোষণাপত্র হিসাবে যার যাত্রা শুরু, ২০১৪ সালে হেলসিঙ্কিতে তা আরও শক্তিশালী হয়। ঘোষণার ১০টি নীতিতে মেয়েদের ক্রীড়ায় সমান সুযোগ, নেতৃত্ব, সম্পদ, শিক্ষা, গবেষণা ও প্রতিনিধিত্বের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশও এবার সেই তালিকায়। এখন শুরু আসল পরীক্ষা। বাংলাদেশের নারী ফুটবলের সাম্প্র্রতিক সাফল্য আশাব্যঞ্জক। মেয়েরা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সাফল্য এনে দিয়েছে, তৈরি করেছে দর্শক আগ্রহ, নতুন প্রজন্মকে মাঠে নামার সাহস দিয়েছে। তবে কয়েকটি সাফল্যের ছবি দিয়ে গোটা নারী ক্রীড়ার বাস্তবতা মাপা যায় না। জাতীয় দলের তারকা যে সুযোগ-সুবিধা পান, জেলা পর্যায়ের একজন কিশোরী কি তা পান? জাতীয় দলের প্রশিক্ষণ শিবিরে থাকা খেলোয়াড়ের নিরাপত্তা আর প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে উঠে আসা একজন কিশোরীর নিরাপত্তা কি একই?

আরও বড় প্রশ্ন, কেউ হয়রানির শিকার হলে যাবেন কোথায়? অভিযোগ করলে তার ক্যারিয়ার ক্ষতিগ্রস্ত হবে না এমন নিশ্চয়তা কোথায়? তদন্ত করবে কে? তদন্ত কতটা স্বাধীন? অভিযোগকারী ও অভিযুক্ত দুপক্ষের অধিকার রক্ষার নির্দিষ্ট ব্যবস্থা কি আছে? এসব প্রশ্নের উত্তর ছাড়া শুধু ‘নারীর ক্ষমতায়ন’ বললে ছবিটা অসম্পূর্ণ থেকে যায়। তারপর আসে অবকাঠামো। নারী ও পুরুষ খেলোয়াড়দের জন্য মাঠের সুযোগ কি সমান? অনুশীলনের সময়? চিকিৎসা সহায়তা? পুষ্টি? আবাসন? যাতায়াত? বৈষম্য সব সময় চোখে পড়ে না। পুরুষ দলের জন্য বড় আয়োজন হতে পারে, নারী দল পেতে পারে সীমিত সুযোগ। পুরুষ দলের ম্যাচের প্রচার হতে পারে, নারী দলের ম্যাচ হারিয়ে যেতে পারে প্রচারের আড়ালে। নারী ক্রীড়ার জন্য রাষ্ট্র কত টাকা খরচ করছে? ফেডারেশনগুলো তাদের বরাদ্দের কত অংশ নারীদের খেলায় ব্যয় করছে? নারী জাতীয় দলের প্রশিক্ষণ শিবির ও আন্তর্জাতিক সফরের বাজেট কত? একই সময়ে পুরুষ দলের পেছনে কত খরচ হচ্ছে? এই হিসাব প্রকাশ না হলে ‘সমান সুযোগ’ কথাটি শেষ পর্যন্ত নীতিবাক্যই থেকে যাবে। ঘোষণাপত্রের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ জায়গা নেতৃত্ব। মাঠে নারীর সংখ্যা বাড়ছে। সিদ্ধান্তের টেবিলে তাদের সংখ্যা কত?

ফেডারেশনের সভাপতি, সাধারণ সম্পাদক, নির্বাহী কমিটি, কারিগরি কমিটিতে কতজন নারী? মেয়েদের ভবিষ্যৎ নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় নারী ক্রীড়াবিদ ও সংগঠকদের কণ্ঠ কতটা শোনা হয়? মাঠে মেয়েদের সংখ্যা বাড়ালেই সমতা আসে না। সিদ্ধান্তের ঘরেও তাদের জায়গা দিতে হয়। এখন দরকার সঠিক কর্মপরিকল্পনা। প্রতিটি ফেডারেশনে নারী ক্রীড়াবিদদের নিরাপত্তা ও সুরক্ষা নীতি থাকতে হবে। থাকতে হবে নিরাপদ অভিযোগ জানানোর ব্যবস্থা। প্রশিক্ষণ শিবির ও সফরে নির্দিষ্ট নিরাপত্তা বিধি থাকতে হবে। নারী ও পুরুষ দলের বাজেট ও সুযোগ-সুবিধার তুলনামূলক হিসাব প্রকাশ করতে হবে। সিদ্ধান্ত গ্রহণে নারীর প্রতিনিধিত্ব বাড়ানোর লক্ষ্যও নির্ধারণ করতে হবে। সবচেয়ে জরুরি এসব কতটা কার্যকর হচ্ছে, তারও পরিমাপ চাই। নইলে কয়েক বছর পর আবার কোনো হলঘরে মঞ্চ সাজবে। আবার কাগজে স্বাক্ষর হবে। আবার বক্তৃতা হবে। আবার বলা হবে ‘ঐতিহাসিক পদক্ষেপ’। মাঠের মেয়েটির জীবন হয়তো একই থাকবে। মঞ্চের আলো নিভবে। ক্যামেরা সরে যাবে। কাগজটি ফাইলবন্দি হবে। তারপর? স্বাক্ষরের মূল্য তখনই, যখন তার ছাপ পড়বে মাঠে। নিরাপত্তায়, সুযোগে, বাজেটে, নেতৃত্বে। কাগজে সই হয়ে গেছে। এবার মাঠের ঘাসই বলুক সেই স্বাক্ষর কতটা সত্যি।

Advertisement

Advertisement

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম