ক্রীড়াঙ্গনে ক্ষমতার হিসাব আছে টাকার নেই
Advertisement
ছবি-এআই
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
বাংলাদেশের ক্রীড়াঙ্গনে কমিটির অভাব নেই। ফেডারেশন আছে, অ্যাসোসিয়েশন আছে, নির্বাচিত কমিটি আছে, অ্যাডহক কমিটিও আছে। সভাপতি আছেন, সাধারণ সম্পাদক আছেন, কোষাধ্যক্ষ আছেন। সভা হয়, সিদ্ধান্ত হয়, বিজ্ঞপ্তি বেরোয়। কিন্তু একটা প্রশ্ন উঠলেই হঠাৎ নেমে আসে নীরবতা। টাকা কোথায় গেল?
সরকারি অনুদান কত? ফেডারেশন পেল কত? খরচ হলো কত? কোন খাতে কত টাকা ব্যয় হলো? খেলোয়াড়ের পেছনে গেল কত, প্রশিক্ষণে কত, বিদেশ সফরে কত, অফিস পরিচালনায় কত? বছরের শেষে অডিট হলো কি না? বার্ষিক হিসাব কোথায়? সদস্যরা জানেন কি? ক্রীড়াবিদরা জানেন কি? সবচেয়ে বড় কথা সাধারণ মানুষ, যে মানুষের করের টাকায় রাষ্ট্র ক্রীড়াঙ্গনে অর্থ দেয়, তিনি কি জানেন তার টাকা কীভাবে খরচ হচ্ছে? প্রশ্নগুলো খুব সাধারণ। কিন্তু উত্তরগুলো যেন অস্বাভাবিক কঠিন।
সাম্প্রতিক সময়ে দেশের বিভিন্ন ফেডারেশনে অ্যাডহক কমিটি গঠনের হিড়িক পড়েছে। কোথাও পুরোনো কমিটি ভেঙে নতুন কমিটি, কোথাও নির্বাচন সামনে রেখে নতুন মুখ, কোথাও বছরের পর বছর নির্বাচন নেই। অথচ কমিটি বদলালেই কি বদলে যায় হিসাবের খাতা? নতুন সভাপতি এলেই কি পুরোনো হিসাবের দায় শেষ? অ্যাডহক কমিটি দায়িত্ব নিলেই কি আগের কমিটির আয়-ব্যয়ের হিসাব তলিয়ে দেখার প্রয়োজন থাকে না? জাতীয় ক্রীড়া পরিষদের নির্বাহী পরিচালক দৌলতুজ্জামান খান বলেন, ‘যে সব ফেডারেশন অডিট রিপোর্ট জমা দেবে না, তাদের সরকারি অনুদান দেওয়া স্থগিত থাকবে।’ একটি ফেডারেশনের কাছে সরকারি টাকা মানে শুধু টাকা নয়। তা একজন ক্রীড়াবিদের স্বপ্নের অর্থ। কোনো মা-বাবার সন্তানের অনুশীলনের আশা। কোনো তরুণের জাতীয় দলের জার্সি পরার স্বপ্ন। সেই টাকা যদি প্রশিক্ষণে যায়, খেলোয়াড়ের খাবারে যায়, আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণে যায়-তার প্রতিটি টাকার পেছনে আছে একটি মুখ, একটি পরিবার, একটি স্বপ্ন। কিন্তু সেই টাকা কোথায় খরচ হলো, যদি তার পরিষ্কার হিসাবই না থাকে, তাহলে প্রশ্ন উঠবেই। সরকারি অনুদান পাওয়া ফেডারেশনগুলোর জন্য নিয়মিত অডিট কি বাধ্যতামূলক নয়? হলে সেই অডিট রিপোর্ট কোথায়? বার্ষিক সাধারণ সভায় আয়-ব্যয়ের হিসাব উপস্থাপন করা হয় কি? হলে সেটি প্রকাশ্যে আসে না কেন? সদস্যদের জানানো হয় কি? কোনো ফেডারেশন বছরের পর বছর অনুদান নেওয়ার পরও যদি পূর্ণাঙ্গ হিসাব প্রকাশ না করে, তাহলে তাকে আবার অর্থ দেওয়ার আগে প্রশ্ন করা হয় কি?
ক্রীড়াঙ্গনের সবচেয়ে বড় সংকট সম্ভবত এখানেই। দায়িত্ব নেওয়ার প্রতিযোগিতা আছে, কিন্তু দায়িত্বের হিসাব দেওয়ার সংস্কৃতি নেই। সভাপতি হওয়ার আগ্রহ আছে। সাধারণ সম্পাদক হওয়ার আগ্রহ আছে। কমিটিতে থাকার আগ্রহ আছে। কিন্তু দায়িত্ব শেষ হওয়ার পর নিজের মেয়াদের হিসাব দেওয়ার আগ্রহ কতজনের? অথচ একটি ফেডারেশনের আয়-ব্যয়ের হিসাব গোপন কোনো রাষ্ট্রীয় নথি হওয়ার কথা নয়। কোন প্রতিযোগিতায় কত খরচ হলো, খেলোয়াড়দের পেছনে কত টাকা গেল, বিদেশ সফরে কত ব্যয় হলো, কোচের সম্মানী কত, অফিস ভাড়া কত, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পেছনে কত? এসব তথ্য জানার অধিকার ক্রীড়াঙ্গনের অংশীজনদের আছে।
অ্যাডহক কমিটি আসবে, কাজ করবে, নির্বাচন দেবে এটাই স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। কিন্তু অ্যাডহক কমিটি যদি শুধু ক্ষমতার চাবি বদলায়, হিসাবের খাতা না খোলে, তাহলে সংস্কার কোথায়? ক্রীড়াঙ্গনে এখন এমন একটি সংস্কৃতি দরকার, যেখানে কমিটি গঠন হবে স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায়, নির্বাচন হবে নিয়মিত, সরকারি অনুদানের হিসাব থাকবে প্রকাশ্য, অডিট হবে সময়মতো, আর বছর শেষে প্রতিটি ফেডারেশন জানাবে কত টাকা পেয়েছি, কোথায় খরচ করেছি, কত টাকা অবশিষ্ট আছে। প্রয়োজনে জাতীয় ক্রীড়া পরিষদের ওয়েবসাইটে প্রতিটি ফেডারেশনের জন্য আলাদা হিসাবের পাতা করা যেতে পারে। সেখানে থাকবে সরকারি অনুদান, নিজস্ব আয়, স্পন্সর, বিদেশি অনুদান, ব্যয়, অডিট রিপোর্ট ও বার্ষিক প্রতিবেদন। যে ফেডারেশন হিসাব দেবে না, পরবর্তী অনুদান আটকে রাখার বিধানও থাকতে পারে।
ক্রীড়াঙ্গনে জবাবদিহি মানে কাউকে অপমান করা নয়। বাংলাদেশের কোনো এক প্রান্তে হয়তো একজন তরুণ খেলোয়াড় নিজের পকেটের টাকা খরচ করে অনুশীলনে যাচ্ছে। কোনো নারী খেলোয়াড় হয়তো আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় যাওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় সুযোগের অপেক্ষায়। কোনো কোচ হয়তো মাসের পর মাস সম্মানীর আশায় আছেন। আর একই সময়ে কোনো ফেডারেশনের হিসাবের খাতা যদি অন্ধকারে পড়ে থাকে, তাহলে প্রশ্ন উঠবেই টাকা কি সত্যিই খেলাধুলার কাছে পৌঁছেছে? ক্রীড়াঙ্গনে কমিটি থাকবে। নির্বাচনও থাকবে। সভাপতি-সাধারণ সম্পাদকও থাকবেন। কিন্তু তার সঙ্গে থাকতে হবে আরেকটি জিনিস, হিসাব। কারণ মাঠে খেলোয়াড়ের স্কোরবোর্ড যেমন বলে কে জিতেছে, তেমনি ফেডারেশনের হিসাবের খাতাও বলে দেওয়ার কথা জনগণের টাকা কোথায় গেছে। এখন সময় সেই খাতা খোলার।

