এপ্রিল : মুখগহ্বর ক্যানসার সচেতনতা মাস
সতর্কতায় মেলে মুক্তি
ডা. মো. তৌছিফুর রহমান
প্রকাশ: ২৫ এপ্রিল ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
সংগৃহীত ছবি
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
মুখ ও গলার ক্যানসার (ওরাল ও ওরোফ্যারেনজিয়াল ক্যানসার) বলতে সাধারণত মুখগহ্বর, জিহ্বা, মাড়ি, ঠোঁট এবং গলার পেছনের অংশের ক্যানসারকে বোঝায়। নিচে এর কারণ, লক্ষণ, শনাক্তকরণ এবং চিকিৎসা পদ্ধতি আলোচনা করা হলো-
* কারণ ও ঝুঁকির উপাদান
মুখ ও গলার ক্যানসারের প্রধান কারণগুলো হলো-
▶ তামাক ও জর্দা : বিড়ি-সিগারেট, হুক্কা এবং পান-সুপারির সঙ্গে জর্দা বা তামাক ব্যবহার সবচেয়ে বড় কারণ।
▶ অ্যালকোহল : নিয়মিত মদ্যপান ক্যানসারের ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।
▶ ভাইরাস (HPV) : হিউম্যান প্যাপিলোমা ভাইরাস (HPV), বিশেষ করে টাইপ-১৬, এটি গলার ক্যানসারের জন্য দায়ী হতে পারে।
▶ দীর্ঘস্থায়ী ক্ষত : মুখে ধারালো দাঁতের ঘর্ষণ বা ভাঙা দাঁত থেকে দীর্ঘ সময় ধরে ক্ষত থাকলে তা ক্যানসারে রূপ নিতে পারে।
▶ অপুষ্টি : ভিটামিন ও খনিজ পদার্থের অভাব।
* প্রধান লক্ষণ
যদি নিচের লক্ষণগুলো দুই সপ্তাহের বেশি সময় ধরে থাকে, তবে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত-
▶ মুখে বা জিহ্বায় সাদা দাগ (লিউকোপ্লাকিয়া) অথবা লালচে দাগ (ইরাইথ্রোপ্লাকিয়া)।
▶ দীর্ঘদিন ধরে থাকা ক্ষত বা আলসার যা সহজে সারছে না।
▶ মুখে বা গলায় কোনো প্লি বা ফোলা ভাব।
▶ ঢোক গিলতে সমস্যা বা গলায় কিছু আটকে থাকার অনুভূতি।
▶ অকারণে দাঁত নড়ে যাওয়া বা মাড়ি ফুলে যাওয়া।
▶ কণ্ঠস্বরের পরিবর্তন বা স্বরভঙ্গ।
▶ মুখে বা কানে অনবরত ব্যথা।
* শনাক্তকরণ
ক্যানসার নিশ্চিত করতে চিকিৎসকরা সাধারণত নিম্নলিখিত পরীক্ষাগুলো করান-
▶ শারীরিক পরীক্ষা : ডাক্তার মুখ ও গলার ভেতরটা গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করেন।
▶ বায়োপসি : সন্দেহভাজন স্থান থেকে টিস্যু বা কোষ নিয়ে ল্যাবরেটরিতে পরীক্ষা করা। এটি ক্যানসার শনাক্তকরণের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য পদ্ধতি।
▶ ইমেজিং টেস্ট : ক্যানসারের বিস্তার বোঝার জন্য সিটি স্ক্যান, এমআরআই বা পেট স্ক্যান করা হয়।
▶ অ্যান্ডোস্কোপি : গলার ভেতরের অংশ দেখার জন্য বিশেষ ক্যামেরা ব্যবহার করা হয়।
* চিকিৎসার ধরন
ক্যানসারের পর্যায় (Stage) এবং স্থানের ওপর ভিত্তি করে চিকিৎসা নির্ধারিত হয়-
▶ অস্ত্রোপচার : যদি ক্যানসার নির্দিষ্ট একটি জায়গায় সীমাবদ্ধ থাকে, তবে অপারেশনের মাধ্যমে টিউমারটি অপসারণ করা হয়।
▶ রেডিওথেরাপি : উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন এক্স-রে বা প্রোটন বিম ব্যবহার করে ক্যানসার কোষ ধ্বংস করা হয়। আধুনিক পদ্ধতিতে টমোথেরাপি (Tomotherapy) বা IMRT ব্যবহার করে সুস্থ কোষ বাঁচিয়ে শুধু আক্রান্ত স্থানে রেডিয়েশন দেওয়া সম্ভব।
▶ কেমোথেরাপি : ওষুধের মাধ্যমে ক্যানসার কোষ ধ্বংস করা। অনেক সময় রেডিওথেরাপির সঙ্গে মিলিয়ে এটি দেওয়া হয়।
▶ টার্গেটেড থেরাপি : নির্দিষ্ট প্রোটিন বা জিনকে লক্ষ্য করে ওষুধ দেওয়া হয় যা ক্যানসার কোষের বৃদ্ধিতে বাধা দেয়।
* প্রতিরোধে করণীয়
▶ সব ধরনের তামাক ও নেশাজাতীয় দ্রব্য বর্জন করা।
▶ মুখের পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা।
▶ প্রচুর পরিমাণে ফলমূল ও শাকসবজি খাওয়া।
▶ HPV টিকা গ্রহণ করা (পরামর্শ অনুযায়ী)।
▶ মুখে যে কোনো অস্বাভাবিক পরিবর্তন দেখা দিলে অবহেলা না করে একজন বিশেষজ্ঞ (যেমন ইএনটি সার্জন বা অনকোলজিস্ট) দেখানো জরুরি। প্রাথমিক পর্যায়ে রোগ শনাক্ত হলে এ ক্যানসার সম্পূর্ণ নিরাময়যোগ্য।
লেখক : মেডিকেল ও রেডিয়েশন অনকোলজিস্ট, টিএমএসএস ক্যানসার সেন্টার, বগুড়া।
