গর্ভাবস্থায় অপুষ্টির কারণে যে ঝুঁকি হয়
লিনা আকতার
প্রকাশ: ১৬ মে ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
সংগৃহীত ছবি
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
গর্ভাবস্থায় শিশুর সুস্থ বিকাশ এবং মায়ের সুরক্ষার জন্য পুষ্টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শিশুর আগমনে মায়েদের সুষম পুষ্টিকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। মায়ের শরীরে পুষ্টির অবস্থার ওপরই শিশুর ভবিষ্যৎ নির্ভর করে। গর্ভাবস্থায় অপুষ্টি গর্ভস্থ শিশু এবং মা, উভয়ের জন্যই নেতিবাচক পরিণতি ডেকে আনতে পারে। ফলে গর্ভাবস্থায় ও প্রসবের সময় জটিলতা দেখা দেওয়ার ঝুঁকি থাকে এবং এমনকি দীর্ঘমেয়াদি গুরুতর স্বাস্থ্য সমস্যাও হতে পারে। অপুষ্টির কারণে একটি শিশুর যেসব সমস্যা হতে পারে তা হলো-জন্মের সময় কম ওজন, অকাল জন্ম (যার ফলে দৃষ্টি ও শ্রবণশক্তির দুর্বলতা এবং শ্বাসকষ্ট হতে পারে), জন্মগত ত্রুটির ঝুঁকি বৃদ্ধি (যা প্রায়শই গর্ভধারণের আগে এবং গর্ভকালীন মায়ের খাদ্যে ফোলেটের স্বল্পতার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত), বিলম্বিত প্রসব, দুর্বল রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা ও পরবর্তী জীবনে শিশুর বৃদ্ধি, বিকাশ এবং আচরণগত সমস্যা।
গর্ভবতী নারীরা ঝুঁকিতে থাকেন, কারণ তাদের শরীরে এ সময় নানা হরমোনগত ও শারীরিক পরিবর্তন ঘটে। যখন একজন গর্ভবতী নারী পর্যাপ্ত পুষ্টি পান না, তখন তিনি বিভিন্ন স্বাস্থ্য সমস্যার ঝুঁকিতে থাকেন, যার মধ্যে রয়েছে-
* অ্যানিমিয়া : আয়রনের অভাবজনিত অ্যানিমিয়ার কারণে আপনার শিশুর কম ওজন অথবা অপরিণত জন্মের ঝুঁকি থাকে। একইভাবে, আয়রনের অভাবজনিত অ্যানিমিয়ায় আক্রান্ত মহিলাদের প্রসবোত্তর বিষণ্নতায় ভোগার ঝুঁকি বেশি থাকে।
* উচ্চরক্তচাপ : এর কারণে অনেক সমস্যা হতে পারে, যার মধ্যে অন্যতম হলো প্লাসেন্টায় রক্তপ্রবাহ কমে যাওয়া, যা ভ্রূণের বৃদ্ধিকে ধীর করে দেয় এবং ভ্রূণ প্রয়োজনীয় পুষ্টি পায় না। অন্যান্য সমস্যার মধ্যে রয়েছে মায়ের ভবিষ্যতে হৃদরোগের ঝুঁকি বৃদ্ধি। স্বাস্থ্যকর ওজন বজায় রাখা এবং গর্ভাবস্থায় ওজন বৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণ করা এক্ষেত্রে সাহায্য করতে পারে।
* গর্ভকালীন ডায়াবেটিস : গর্ভকালীন ডায়াবেটিসের কারণে শিশুর অকাল জন্ম অথবা উচ্চ জন্ম ওজনের ঝুঁকি থাকে (যা উভয়ই মায়ের জন্য ঝুঁকি তৈরি করে)। এ ছাড়া শিশু এবং মা উভয়েরই পরবর্তী জীবনে টাইপ ২ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বেড়ে যেতে পারে।
* প্রি-এক্লাম্পসিয়া : প্রি-এক্লাম্পসিয়ায় মা ও শিশু উভয়ের জন্যই মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। এর ফলে অঙ্গের ক্ষতি, খিঁচুনি (এক্লাম্পসিয়া), অকাল প্রসব, গর্ভস্থ শিশুর বৃদ্ধি কমে যাওয়া, এমনকি মা ও শিশুর মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারে।
* সংক্রমণের ঝুঁকি বৃদ্ধি : গর্ভবতীদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতায় পরিবর্তন আসে, যার ফলে তাদের শ্বাসতন্ত্রের সংক্রমণ, ভাইরাসজনিত সংক্রমণ, যোনিপ্রদাহ, মূত্রনালির সংক্রমণ এবং প্রসবপরবর্তী সংক্রমণের ঝুঁকি থাকে। সুষম পুষ্টি এবং পর্যাপ্ত তরল পান গর্ভাবস্থায় রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থাকে শক্তিশালী রাখতে এবং সংক্রমণের ঝুঁকি কমাতে সাহায্য করতে পারে।
এটা মনে রাখা গুরুত্বপূর্ণ, বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই সঠিক পুষ্টির যত্ন এবং খাদ্য পরিকল্পনার মাধ্যমে এসব স্বাস্থ্য সমস্যা নিয়ন্ত্রণ করা, এমনকি এড়ানোও সম্ভব। এজন্য স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস গড়ে তোলার প্রসবপূর্ব পুষ্টিবিদের পরামর্শ নেওয়া অত্যন্ত জরুরি। গর্ভাবস্থায় পুষ্টির মান উন্নত করার জন্য এখানে কিছু সাশ্রয়ী উপায় দেওয়া হলো-
* বিভিন্ন ধরনের খাবার খান : প্রয়োজনীয় সব পুষ্টি উপাদান যাতে আপনি পান, তা নিশ্চিত করতে বিভিন্ন ধরনের ফল, শাকসবজি, শস্যদানা, চর্বিহীন প্রোটিন এবং স্বাস্থ্যকর চর্বি খাওয়াতে লক্ষ রাখুন। খাবারগুলো যত বেশি রঙিন হবে, তত ভালো। বেগুনি, কমলা, সবুজ ইত্যাদি রঙে ভরা প্লেট খাবারে আরও বেশি ভারসাম্য আনে।
* পুষ্টিকর খাবার বেছে নিন : এমন খাবার বেছে নিন যেগুলোতে পুষ্টিগুণ বেশি কিন্তু ক্যালোরি কম, যেমন পাতাযুক্ত শাকসবজি, কম ক্যালরিযুক্ত সবজি এবং চর্বিহীন প্রোটিন। ভ্রূণের সুস্থ বিকাশের জন্য আপনার ফোলেট, আয়রন এবং ক্যালসিয়াম গ্রহণ নিশ্চিত করুন।
* প্রক্রিয়াজাত খাবার সীমিত করুন : প্রক্রিয়াজাত খাবারে সাধারণত চিনি, সোডিয়াম এবং অস্বাস্থ্যকর চর্বির পরিমাণ বেশি থাকে। এর পরিবর্তে বাদাম, বীজ ও ফল বেছে নিন।
* প্রসবপূর্ব ভিটামিন গ্রহণ করুন : গর্ভাবস্থায় পরিকল্পনা করার আগে এবং পরে প্রয়োজনীয় পুষ্টি উপাদান ও ভিটামিন গ্রহণ করুন, যেমন ফলিক অ্যাসিড, আয়রন, ক্যালসিয়াম ইত্যাদি।
* শরীর আর্দ্র রাখুন : গর্ভাবস্থায় প্রচুর পরিমাণে পানি ও তরল পান করা উচিত। পানি রক্ত এবং অ্যামনিওটিক ফ্লুইডের পরিমাণ বজায় রাখতে সাহায্য করে এবং কোষ্ঠকাঠিন্য ও মূত্রনালির সংক্রমণ প্রতিরোধ করতে পারে। প্রতিদিন অন্তত আট গ্লাস পানি পান করুন।
গর্ভাবস্থায় মায়েদের পুষ্টির অবস্থা উন্নত করার জন্য পুষ্টিবিদের সঙ্গে পরামর্শ আবশ্যক। সুস্থ সন্তান পেতে এমন খাদ্যাভ্যাস গড়ে তুলতে হবে যার মাধ্যমে শিশুকে একটি সুস্থ জীবন উপহার দেওয়া সম্ভব।
লেখক : পুষ্টিবিদ, রাইয়ান হেলথ কেয়ার হসপিটাল অ্যান্ড রিসার্চ সেন্টার, দিনাজপুর।
