নারীর স্বাস্থ্য সুরক্ষায় যা করা উচিত
ডা. নুসরাত জাহান দৃষ্টি
প্রকাশ: ০৬ জুন ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
সংগৃহীত ছবি
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
বর্তমানে চিকিৎসা বিজ্ঞানের অগ্রগতির ফলে নারীর স্বাস্থ্য নিয়ে অনেক ভুল ধারণা ও কুসংস্কার দূর হয়েছে। তবুও আমাদের সমাজে মাসিক, গর্ভধারণ, যৌনস্বাস্থ্য, মানসিক স্বাস্থ্য এবং মেনোপজ নিয়ে নানা ভুল ধারণা এখনো বিদ্যমান। নারীর স্বাস্থ্যকে শুধু রোগের অনুপস্থিতি হিসাবে দেখলে চলবে না। তাদের স্বাস্থ্য সুরক্ষায় যা যা করা উচিত ও অনুচিত নিম্নে তা দেওয়া হলো-
* নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা করা
অনেক রোগ প্রাথমিক অবস্থায় কোনো লক্ষণ প্রকাশ করে না। উচ্চরক্তচাপ, ডায়াবেটিস, থাইরয়েডের সমস্যা, স্তন ও জরায়ুমুখের কিছু রোগ নিয়মিত পরীক্ষা করলে প্রাথমিক পর্যায়েই শনাক্ত করা সম্ভব। তাই নির্দিষ্ট বয়সের পর চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী স্বাস্থ্য পরীক্ষা করা জরুরি।
* মাসিক সম্পর্কে বৈজ্ঞানিক জ্ঞান অর্জন
মাসিক একটি স্বাভাবিক শারীরবৃত্তীয় প্রক্রিয়া। এটি কোনো রোগ বা অশুচিতা নয়। মাসিকের সময় পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা, পরিষ্কার স্যানিটারি প্যাড বা উপযুক্ত স্বাস্থ্যকর সামগ্রী ব্যবহার করা এবং প্রয়োজনে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
* সুষম খাদ্য গ্রহণ
নারীদের মধ্যে রক্তস্বল্পতা, ক্যালসিয়ামের ঘাটতি এবং ভিটামিন ডি-এর অভাব তুলনামূলক বেশি দেখা যায়। তাই খাদ্যতালিকায় শাকসবজি, ফলমূল, ডাল, মাছ, ডিম, দুধ ও প্রোটিনসমৃদ্ধ খাবার রাখা প্রয়োজন।
* নিয়মিত শারীরিক ব্যায়াম
প্রতিদিন অন্তত ৩০ মিনিট হাঁটা বা শরীরচর্চা হৃদরোগ, ডায়াবেটিস, স্থূলতা এবং মানসিক চাপ কমাতে সাহায্য করে। ব্যায়াম নারীদের হাড় ও পেশির স্বাস্থ্য রক্ষায়ও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
* মানসিক স্বাস্থ্যের যত্ন নেওয়া
উদ্বেগ, বিষণ্নতা, পারিবারিক চাপ, কর্মক্ষেত্রের চাপ কিংবা সম্পর্কজনিত সমস্যা নারীর মানসিক স্বাস্থ্যে প্রভাব ফেলতে পারে। মানসিক কষ্টকে দুর্বলতা মনে না করে প্রয়োজনে মনোরোগ বিশেষজ্ঞ বা কাউন্সেলরের সহায়তা নেওয়া উচিত।
* নিরাপদ মাতৃত্ব নিশ্চিত করা
গর্ভধারণের আগে স্বাস্থ্য পরীক্ষা, গর্ভকালীন নিয়মিত চেকআপ, সুষম খাদ্য এবং দক্ষ স্বাস্থ্যকর্মীর তত্ত্বাবধানে প্রসব মা ও শিশুর স্বাস্থ্য সুরক্ষায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
* যৌন ও প্রজনন স্বাস্থ্য সম্পর্কে সচেতন হওয়া
যৌনস্বাস্থ্য মানবস্বাস্থ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। যৌনবাহিত সংক্রমণ, পরিবার পরিকল্পনা, গর্ভনিরোধ এবং দাম্পত্য সম্পর্কের স্বাস্থ্যকর যোগাযোগ সম্পর্কে সঠিক তথ্য জানা জরুরি।
* পর্যাপ্ত ঘুম নিশ্চিত করা
প্রাপ্তবয়স্ক নারীদের প্রতিদিন সাধারণত ৭-৯ ঘণ্টা ঘুম প্রয়োজন। পর্যাপ্ত ঘুম শারীরিক ও মানসিক সুস্থতা বজায় রাখতে সাহায্য করে।
* মেনোপজ সম্পর্কে সচেতন থাকা
মেনোপজ জীবনের একটি স্বাভাবিক ধাপ। এ সময় হরমোনজনিত পরিবর্তনের কারণে বিভিন্ন শারীরিক ও মানসিক উপসর্গ দেখা দিতে পারে। প্রয়োজন হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
* স্বাস্থ্য বিষয়ে পরিবারের সমর্থন নিশ্চিত করা
নারীর স্বাস্থ্য শুধু নারীর একার বিষয় নয়। স্বামী, বাবা-মা, সন্তান এবং পরিবারের অন্যান্য সদস্যদেরও এ বিষয়ে সচেতন ও সহানুভূতিশীল হওয়া প্রয়োজন।
* স্বাস্থ্য সমস্যাকে অবহেলা নয়
অস্বাভাবিক রক্তপাত, স্তনে গিঁট, দীর্ঘদিনের ব্যথা, অতিরিক্ত ক্লান্তি বা ওজনের অস্বাভাবিক পরিবর্তনকে কখনো হালকাভাবে নেওয়া উচিত নয়।
* কুসংস্কার ও ভুল তথ্যের ওপর নির্ভর করা ভালো নয়
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বা লোকমুখে প্রচলিত সব তথ্য সঠিক নয়। চিকিৎসা বিষয়ক সিদ্ধান্ত অবশ্যই বৈজ্ঞানিক তথ্য ও নিবন্ধিত চিকিৎসকের পরামর্শের ভিত্তিতে নেওয়া উচিত।
* নিজে নিজে ওষুধ সেবন করবেন না
বিশেষ করে হরমোনজাতীয় ওষুধ, অ্যান্টিবায়োটিক বা ত্বক ফর্সাকারী ওষুধ চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া ব্যবহার করা ঝুঁকিপূর্ণ।
* মাসিক নিয়ে লজ্জা বা গোপনীয়তার সংস্কৃতি বজায় রাখা উচিত নয়
মাসিক সম্পর্কে খোলামেলা ও বৈজ্ঞানিক আলোচনা কিশোরী ও নারীদের স্বাস্থ্য সুরক্ষায় সহায়ক।
* মানসিক সমস্যাকে উপেক্ষা করবেন না
বিষণ্নতা, উদ্বেগ বা দীর্ঘমেয়াদি মানসিক চাপকে ‘স্বাভাবিক’ ভেবে সহ্য করে যাওয়া উচিত নয়। প্রয়োজন হলে চিকিৎসা নিতে হবে।
* ধূমপান ও তামাকজাত দ্রব্য ব্যবহার করা উচিত নয়
এসব অভ্যাস হৃদরোগ, ক্যানসার, গর্ভকালীন জটিলতা এবং অন্যান্য গুরুতর স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ায়।
* অনিরাপদ ওজন কমানোর পদ্ধতি অনুসরণ করুন
অতিরিক্ত ডায়েট, না খেয়ে থাকা বা বৈজ্ঞানিক ভিত্তিহীন ওজন কমানোর পদ্ধতি শরীরের জন্য ক্ষতিকর।
* যৌনস্বাস্থ্য নিয়ে নীরব থাকবেন না
দাম্পত্য বা যৌনজীবন সম্পর্কিত সমস্যা থাকলে লজ্জা না পেয়ে যথাযথ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
* পুরুষদের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ বার্তা
নারীর স্বাস্থ্য শুধু নারীদের বিষয় নয়; এটি পুরুষদেরও দায়িত্ব ও সচেতনতার অংশ। একজন স্বামী, বাবা, ভাই বা সহকর্মী হিসাবে নারীর স্বাস্থ্যগত চাহিদাকে সম্মান করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই পুরুষদেরও উচিত নারীর স্বাস্থ্য সমস্যাকে গুরুত্ব দেওয়া। এজন্য তাদেরও নারীদের মাসিক, গর্ভাবস্থা ও মেনোপজ সম্পর্কে সঠিক জ্ঞান অর্জন করতে হবে, স্বাস্থ্যসেবা গ্রহণে নারীকে সহযোগিতা করতে হবে, পারিবারিক সিদ্ধান্তে নারীর মতামতকে মূল্য দেওয়া, যৌন ও প্রজনন স্বাস্থ্য বিষয়ে সম্মানজনক ও খোলামেলা যোগাযোগ বজায় রাখা এবং মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যাকে অবজ্ঞা না করা।
লেখক : সেক্সুয়াল হেলথ এডুকেটর, ডিপ্লোমা ইন ডার্মাটোলজি, ফেলোশিপ ইন সাইকোসেক্সুয়াল মেডিসিন, সেক্স এডু উইথ ডক্টর দৃষ্টি।
