ডায়াবেটিসের সঙ্গে উচ্চরক্তচাপ থাকলে স্ট্রোক-হার্টঅ্যাটাক-কিডনি রোগের ঝুঁকি কতটুকু?
ডা. শাহজাদা সেলিম
প্রকাশ: ২৫ জুলাই ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
ডায়াবেটিস রোগীদের মধ্যে ৬০ থেকে ৭০ শতাংশেরই উচ্চরক্তচাপ বা হাইপারটেনশন থাকে। চিকিৎসাবিজ্ঞানে এ দুটি রোগের একসঙ্গে উপস্থিতিকে বলা হয় ‘কার্ডিওমেটাবলিক ডুয়েল থ্রেট’ বা দ্বৈত বিপদ। কারণ একটি রোগ অপরটিকে আরও শক্তিশালী করে তোলে এবং হৃদরোগ, কিডনি বিকল ও স্ট্রোকের ঝুঁকি আলাদাভাবে থাকার চেয়ে কয়েকগুণ বেড়ে যায়।
* কেন একসঙ্গে হয় এ দুটি রোগ
ডায়াবেটিস হলে রক্তে শর্করার পরিমাণ বেড়ে যায়। এ অতিরিক্ত শর্করা রক্তনালির ভেতরের দেওয়ালকে ধীরে ধীরে শক্ত ও সরু করে দেয়। ফলে হৃৎপিণ্ডকে আরও বেশি চাপে রক্ত পাঠাতে হয় এবং এটাই উচ্চরক্তচাপের জন্ম দেয়। অন্যদিকে ডায়াবেটিসের রোগীদের শরীরে ইনসুলিনের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে ওঠে, যার ফলে কিডনিতে সোডিয়াম ধরে রাখার প্রবণতা বাড়ে-এটিও রক্তচাপ বাড়িয়ে দেয়। এ ছাড়া মেদভুঁড়ি বা কেন্দ্রীয় স্থূলতা, যা বাংলাদেশের মধ্যবয়সি মানুষের মধ্যে ব্যাপকভাবে দেখা যাচ্ছে, একই সময়ে ডায়াবেটিস ও উচ্চরক্তচাপ দুটোরই অন্যতম প্রধান কারণ।
* বিপদ কতটুকু
গবেষণায় দেখা গেছে, ডায়াবেটিসের সঙ্গে উচ্চরক্তচাপ থাকলে হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকি স্বাভাবিকের তুলনায় চারগুণ, স্ট্রোকের ঝুঁকি তিনগুণ এবং কিডনি বিকলের ঝুঁকি পাঁচগুণ পর্যন্ত বেড়ে যেতে পারে। চোখের রেটিনার ক্ষতিও ত্বরান্বিত হয়, যা অন্ধত্বের দিকে নিয়ে যেতে পারে। পায়ের রক্তনালি ক্ষতিগ্রস্ত হয়-যা পরে পায়ে ঘা বা পচন এবং এমনকি অঙ্গচ্ছেদের কারণ হতে পারে। দুটি রোগ একসঙ্গে মানে শুধু দুটি আলাদা সমস্যা নয়-এটি একটি মারাত্মক সংমিশ্রণ যা সারা শরীরের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গকে একযোগে আক্রমণ করে।
* লক্ষণ ও শনাক্তকরণ
উচ্চরক্তচাপের সবচেয়ে ভয়ানক দিক হলো এটি প্রায়ই কোনো উপসর্গ ছাড়াই শরীরে থাকে। তাই একে বলা হয় ‘নীরব ঘাতক’। মাথাব্যথা, ঘাড়ে ব্যথা বা মাঝে মাঝে চোখে ঝাপসা দেখা দিলেও বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই রোগী কিছু টের পান না। ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার পরামর্শ হলো, প্রতিটি ডাক্তারি পরিদর্শনে রক্তচাপ মাপতে হবে এবং লক্ষ্যমাত্রা রাখতে হবে ১৩০/৮০ মিলিমিটার পারদের নিচে।
* করণীয়
▶ জীবনযাত্রার পরিবর্তন অপরিহার্য। লবণ কম খেতে হবে, প্রতিদিন পাঁচ গ্রামের বেশি নয়। তেলে ভাজা, প্রক্রিয়াজাত ও ফাস্টফুড পরিহার করুন। প্রতিদিন কমপক্ষে ৩০ মিনিট হাঁটুন বা হালকা ব্যায়াম করুন। ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখুন-প্রতি কেজি ওজন কমলে রক্তচাপ প্রায় এক মিলিমিটার কমে আসে। ধূমপান ও মদ্যপান সম্পূর্ণ বর্জন করুন।
▶ ওষুধের ক্ষেত্রে ডায়াবেটিক রোগীর উচ্চরক্তচাপে সাধারণত ACE inhibitor বা ARB শ্রেণির ওষুধ প্রথমে দেওয়া হয়, কারণ এগুলো কিডনিকেও সুরক্ষা দেয়। তবে কোনো ওষুধই চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া শুরু বা বন্ধ করবেন না।
▶ নিয়মিত পর্যবেক্ষণ জরুরি। HbA1c (তিন মাসের গড় রক্তশর্করা), রক্তচাপ, কিডনির কার্যকারিতা (ক্রিয়েটিনিন ও মূত্রে অ্যালবুমিন) এবং চোখের ফান্ডাস পরীক্ষা-প্রতিটি পরীক্ষা ডায়াবেটিক রোগীর জন্য বছরে অন্তত একবার অপরিহার্য।
মনে রাখবেন, ডায়াবেটিস ও উচ্চরক্তচাপ-দুটোই নিয়ন্ত্রণযোগ্য। সচেতনতা, সঠিক খাদ্যাভ্যাস, নিয়মিত ওষুধ এবং চিকিৎসকের তত্ত্বাবধানে থাকলে এ দুই রোগকে বশে রেখে সুস্থ ও স্বাভাবিক জীবনযাপন করা সম্পূর্ণ সম্ভব। দেরি না করে আজই আপনার রক্তচাপ মাপুন।
লেখক : সহযোগী অধ্যাপক, অ্যান্ডক্রাইনোলজি বিভাগ, বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়।
