নাক-কান-গলার ক্যানসারকে জানুন
ডা. মো. আব্দুল হাফিজ (শাফী)
প্রকাশ: ০১ আগস্ট ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
সংগৃহীত ছবি
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
হেড-নেক ক্যানসার বলতে নাক-কান-গলার ও ঘাড় অঞ্চলের বিভিন্ন অঙ্গের কোষ থেকে উৎপন্ন ক্যানসারকে বোঝায়। হেড-নেক ক্যানসারের মধ্যে সাধারণত অন্তর্ভুক্ত হচ্ছে-মুখগহ্বরের ক্যানসার (ঠোঁট, জিহ্বা, মাড়ি, গালের ভেতরের অংশ, মুখের তালু, টনসিল), স্বরযন্ত্রের ক্যানসার (ল্যারিংস), নাক ও নাকের পাশের সাইনাসের ক্যানসার, নাসোফ্যারিংসের ক্যানসার এবং লালাগ্রন্থির ক্যানসার, ঘাড়ের ক্যানসার জাতীয় টিউমার।
মুখ, গলা, জিহ্বা, স্বরযন্ত্র কিংবা ঘাড়ে দীর্ঘদিনের অস্বাভাবিক কোনো লক্ষণ দেখা দিলে তা অবহেলা না করে দ্রুত বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া, প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা সম্পন্ন করা এবং রোগ ধরা পড়লে সময়মতো চিকিৎসা শুরু করাই হতে পারে জীবন বাঁচানোর সবচেয়ে কার্যকর উপায়।
কিন্তু দুঃখজনকভাবে, আমাদের সমাজে এখনো একটি ভুল ধারণা ব্যাপকভাবে প্রচলিত-‘অপারেশন করলে ক্যানসার ছড়িয়ে পড়ে।’ এই ভ্রান্ত বিশ্বাসের কারণে প্রতি বছর অসংখ্য রোগী অপারেশনের সিদ্ধান্ত থেকে বারবার পিছিয়ে আসেন। অনেক ক্ষেত্রে রোগ এমন পর্যায়ে পৌঁছে যায়, যখন আর অপারেশন করে সম্পূর্ণভাবে ক্যানসার অপসারণের সুযোগ থাকে না।
চিকিৎসাবিজ্ঞানের সত্য সম্পূর্ণ ভিন্ন। বরং প্রাথমিক পর্যায়ে শনাক্ত হওয়া অধিকাংশ হেড-নেক ক্যানসারের ক্ষেত্রে অপারেশনই শরীর থেকে ক্যানসার অপসারণের সবচেয়ে কার্যকর ও প্রধান চিকিৎসা। সময়মতো অপারেশন রোগমুক্তির সম্ভাবনা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়িয়ে দেয় এবং অনেক রোগীর ক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদি সুস্থ জীবনের সুযোগ তৈরি করে।
নাক-কান-গলার অঞ্চলে হেড-নেক ক্যানসারের চিকিৎসায় আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, অনেক রোগী সফল অপারেশনের পরও চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী রেডিওথেরাপি গ্রহণ করতে অনীহা প্রকাশ করেন বা মাঝপথে চিকিৎসা বন্ধ করে দেন। অথচ অনেক হেড-নেক ক্যানসারের ক্ষেত্রে অপারেশনের পর হিস্টোপ্যাথলজি রিপোর্ট অনুযায়ী রেডিওথেরাপি বা কেমোরেডিওথেরাপি চিকিৎসার অপরিহার্য অংশ হতে পারে। এটি অবশিষ্ট অণুবীক্ষণিক ক্যানসার কোষ ধ্বংস করে রোগ পুনরায় ফিরে আসার (recurrence) ঝুঁকি কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তাই অপারেশন সফল হলেও চিকিৎসা সেখানেই শেষ নয়; চিকিৎসক নির্ধারিত সম্পূর্ণ চিকিৎসা পরিকল্পনা অনুসরণ করাই রোগমুক্তির সম্ভাবনা সর্বাধিক বাড়ায়।
হেড-নেক ক্যানসারের সফল চিকিৎসার পূর্বশর্ত হলো নির্ভুল রোগ নির্ণয় ও সঠিক চিকিৎসা পরিকল্পনা। এজন্য রোগের ধরন নিশ্চিত করতে প্রয়োজনে অভিজ্ঞ প্যাথলজিস্ট দ্বারা FNAC বা Biopsy রিপোর্ট নিশ্চিত করা, রোগের বিস্তার ও পর্যায় নির্ণয়ের জন্য দক্ষ রেডিওলজিস্ট-এর মাধ্যমে মানসম্মত সেন্টারে CT Scan বা MRI এবং পরবর্তীতে রোগের পর্যায় ও অবস্থান অনুযায়ী অপারেশন, রেডিওথেরাপি, কেমোথেরাপি বা সমন্বিত চিকিৎসা পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়। অর্থাৎ, FNAC/Biopsy, দক্ষ রেডিওলজিস্টের Imaging (CT Scan/MRI) এবং প্রয়োজন অনুযায়ী অপারেশনসহ সঠিক চিকিৎসা পরিকল্পনাই রোগীর সর্বোত্তম ফল নিশ্চিত করতে সাহায্য করে।
‘One World’ অংশটি আমাদের মনে করিয়ে দেয়, হেড-নেক ক্যানসার কোনো একক দেশের সমস্যা নয়। এটি একটি বৈশ্বিক স্বাস্থ্যচ্যালেঞ্জ, যার মোকাবিলায় চিকিৎসক, রেডিওথেরাপিস্ট, স্বাস্থ্যকর্মী, গবেষক, নীতিনির্ধারক এবং সাধারণ মানুষের সম্মিলিত উদ্যোগ প্রয়োজন।
আর ‘One Voice Against Head & Neck Cancer’ অংশটি প্রতীকীভাবে একটি অভিন্ন বার্তার আহ্বান জানায়-তামাক ও ধূমপান বর্জন, ঝুঁকিপূর্ণ আচরণ পরিহার, সন্দেহজনক লক্ষণকে গুরুত্ব দেওয়া, দ্রুত রোগ নির্ণয় এবং সময়মতো চিকিৎসা গ্রহণ। এই একীভূত বার্তাই বিশ্বব্যাপী হেড-নেক ক্যানসারে আক্রান্ত মানুষের বেঁচে থাকার সম্ভাবনা বাড়াতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
হেড-নেক ক্যানসারের কিছু গুরুত্বপূর্ণ সতর্কসংকেত রয়েছে, যেগুলো অবহেলা করা উচিত নয়। যেমন-ঘাড়ে ফোলা/ গোটা, মুখের ঘা তিন সপ্তাহের বেশি স্থায়ী হওয়া, স্বর ভেঙে যাওয়া/ গলার কণ্ঠস্বর বসে যাওয়া, গিলতে কষ্ট হওয়া কিংবা মুখের ভেতরে সাদা বা লাল দাগ দেখা দেওয়া। এসব লক্ষণ দেখা দিলে দেরি না করে একজন ENT ও Head-Neck Surgeon-এর পরামর্শ নেওয়া উচিত।
লেখক : সহকারী অধ্যাপক, নাক-কান-গলা বিভাগ, সিলেট এম এ জি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল।
