Logo
Logo
×
   

সুস্থ থাকুন

চিকিৎসাসেবা ও পরামর্শের ক্ষেত্রে যৌন-মনস্তাত্ত্বিক মেডিসিন

মানবস্বাস্থ্যের আলোচনা করতে গেলে সাধারণত শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের কথা বলা হয়। কিন্তু বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) দৃষ্টিকোণ থেকে স্বাস্থ্য বলতে শারীরিক, মানসিক, সামাজিক এবং যৌন সুস্থতার সমন্বিত অবস্থাকে বোঝায়। অর্থাৎ যৌন স্বাস্থ্য কোনো গোপন বা ব্যক্তিগত বিষয় নয়। বরং এটি মানুষের সামগ্রিক সুস্থতা, আত্মসম্মান, পারিবারিক স্থিতিশীলতা এবং জীবনমানের একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। আমাদের দেশে যৌন স্বাস্থ্য একটি উপেক্ষিত, কিন্তু এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ জনস্বাস্থ্য বিষয়।

Icon

ডা. নুসরাত জাহান দৃষ্টি

প্রকাশ: ০১ আগস্ট ২০২৬, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

চিকিৎসাসেবা ও পরামর্শের ক্ষেত্রে যৌন-মনস্তাত্ত্বিক মেডিসিন

এআই ছবি

বাংলাদেশে যৌন স্বাস্থ্য নিয়ে আলোচনা এখনো অনেকাংশে সামাজিক সংকোচ, লজ্জা এবং ভুল ধারণার মধ্যে সীমাবদ্ধ। ফলে অসংখ্য মানুষ যৌন সমস্যায় ভুগলেও চিকিৎসকের কাছে যেতে দ্বিধাবোধ করেন। অনেকেই গোপনে অবৈজ্ঞানিক চিকিৎসা, ভুয়া বিজ্ঞাপন বা অপ্রমাণিত পদ্ধতির আশ্রয় নেন। এর ফলে সমস্যার সমাধান হওয়ার পরিবর্তে শারীরিক, মানসিক এবং অর্থনৈতিক ক্ষতি আরও বৃদ্ধি পায়। এ প্রেক্ষাপটে যৌন-মনস্তাত্ত্বিক বা Psychosexual Medicine একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ চিকিৎসাবিজ্ঞানভিত্তিক শাখা হিসাবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এটি যৌন সমস্যার শুধু শারীরিক নয়, বরং মানসিক, আবেগীয়, সামাজিক এবং সম্পর্কগত কারণগুলোও মূল্যায়ন করে সমন্বিত চিকিৎসা প্রদান করে।

* সাইকোসেক্সুয়াল মেডিসিন

একজন রোগীর যৌন সমস্যা থাকলে শুধু তার শারীরিক পরীক্ষা করলেই যথেষ্ট নয়। তার মানসিক অবস্থা, আত্মবিশ্বাস, দাম্পত্য সম্পর্ক, সামাজিক পরিবেশ, কর্মজীবনের চাপ, পূর্ববর্তী অভিজ্ঞতা এবং ব্যক্তিগত বিশ্বাসও মূল্যায়ন করা প্রয়োজন। সাইকোসেক্সুয়াল মেডিসিন এ সমন্বিত মূল্যায়নের মাধ্যমে রোগীর জন্য ব্যক্তিকেন্দ্রিক চিকিৎসা পরিকল্পনা তৈরি করে।

* বাংলাদেশে সাইকোসেক্সুয়াল বিষয়ের গুরুত্ব বাড়ছে

অসংখ্য রোগী ইরেকটাইল ডিসফাংশন, অকাল বীর্যপাত, যৌন আকাঙ্ক্ষা হ্রাস, দাম্পত্য অসন্তুষ্টি, যৌন উদ্বেগ বা যৌন ব্যথার মতো সমস্যায় ভুগলেও সঠিক চিকিৎসা গ্রহণ করেন না। ফলে সমস্যাগুলো দীর্ঘস্থায়ী হয়ে ব্যক্তিগত ও পারিবারিক জীবনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।

* পুরুষদের যৌন সমস্যায় সাইকোসেক্সুয়াল মেডিসিন

বাংলাদেশে পুরুষদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি দেখা যায় ইরেকটাইল ডিসফাংশন এবং অকাল বীর্যপাত। অনেক রোগী মনে করেন এগুলো শুধু শারীরিক দুর্বলতা বা যৌনশক্তি হ্রাসের ফল। বাস্তবে বিষয়টি এতটা সরল নয়।

অনেক ক্ষেত্রে উদ্বেগ, ব্যর্থতার ভয়, আত্মবিশ্বাসের অভাব, বিষণ্নতা, সম্পর্কগত সমস্যা বা অতিরিক্ত মানসিক চাপ যৌন কর্মক্ষমতাকে প্রভাবিত করে। আবার ডায়াবেটিস, উচ্চরক্তচাপ, হরমোনজনিত সমস্যা বা কিছু ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াও কারণ হতে পারে। সাইকোসেক্সুয়াল মেডিসিন রোগীর সমস্যা গভীরভাবে মূল্যায়ন করে প্রকৃত কারণ নির্ণয় করতে সাহায্য করে। এর ফলে অপ্রয়োজনীয় ওষুধ ব্যবহারের পরিবর্তে রোগী সঠিক ও কার্যকর চিকিৎসা পেতে পারেন।

* নারীদের যৌন স্বাস্থ্য : একটি অবহেলিত অধ্যায়

বাংলাদেশে নারীদের যৌন স্বাস্থ্য নিয়ে সচেতনতা তুলনামূলকভাবে কম। অনেক নারী যৌন ব্যথা, যৌন আগ্রহের অভাব, যৌন উত্তেজনা সমস্যা অথবা অর্গাজমিক সমস্যায় ভুগলেও তা প্রকাশ করতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন না। ফলে সমস্যাগুলো বছরের পর বছর অমীমাংসিত থেকে যায়। এর প্রভাব শুধু ব্যক্তিগত জীবনে নয়, দাম্পত্য সম্পর্কেও পড়ে। সাইকোসেক্সুয়াল মেডিসিন নারীদের জন্য নিরাপদ, গোপনীয় এবং বৈজ্ঞানিক মূল্যায়নের সুযোগ সৃষ্টি করে। এতে শারীরিক কারণের পাশাপাশি মানসিক, সামাজিক এবং সম্পর্কগত বিষয়গুলোও গুরুত্ব পায়।

* মানসিক স্বাস্থ্য ও যৌন স্বাস্থ্যের গভীর সম্পর্ক

মানসিক স্বাস্থ্য এবং যৌন স্বাস্থ্য একে অপরের সঙ্গে নিবিড়ভাবে সম্পর্কিত। উদ্বেগ, বিষণ্নতা, দীর্ঘস্থায়ী মানসিক চাপ, আত্মসম্মানবোধের অভাব এবং দাম্পত্য দ্বন্দ্ব যৌন জীবনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

আবার দীর্ঘদিনের যৌন সমস্যাও মানসিক স্বাস্থ্যকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। অনেক রোগী আত্মবিশ্বাস হারিয়ে ফেলেন, সামাজিকভাবে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন কিংবা দাম্পত্য সম্পর্কে হতাশা অনুভব করেন। সাইকোসেক্সুয়াল কাউন্সেলিং রোগীর অনুভূতি, উদ্বেগ এবং আচরণগত সমস্যাগুলো বুঝতে সাহায্য করে। এর মাধ্যমে রোগী মানসিকভাবে আরও স্থিতিশীল হয়ে ওঠেন এবং চিকিৎসার ফলাফলও উন্নত হয়।

* দাম্পত্য সম্পর্ক উন্নয়নে সাইকোসেক্সুয়াল কাউন্সেলিং

একটি সফল দাম্পত্য জীবনের অন্যতম ভিত্তি হলো কার্যকর যোগাযোগ এবং পারস্পরিক বোঝাপড়া। অনেক সময় যৌন সমস্যার চেয়ে ভুল বোঝাবুঝি, অবাস্তব প্রত্যাশা এবং যোগাযোগের ঘাটতি বেশি ক্ষতিকর হয়ে দাঁড়ায়। সাইকোসেক্সুয়াল কাউন্সেলিং দম্পতিদের নিজেদের অনুভূতি প্রকাশ করতে, পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ গড়ে তুলতে এবং বাস্তবসম্মত প্রত্যাশা তৈরি করতে সাহায্য করে। ফলে সম্পর্কের মান উন্নত হয়, পারিবারিক স্থিতিশীলতা বৃদ্ধি পায় এবং মানসিক চাপ কমে।

* দীর্ঘমেয়াদি রোগ ও যৌন স্বাস্থ্য

ডায়াবেটিস, উচ্চরক্তচাপ, হৃদরোগ, কিডনি রোগ, থাইরয়েড সমস্যা এবং স্থূলতার মতো দীর্ঘমেয়াদি রোগগুলো যৌন স্বাস্থ্যের ওপর উল্লেখযোগ্য প্রভাব ফেলতে পারে। অনেক রোগী মনে করেন যৌন সমস্যা তাদের মূল রোগের সঙ্গে সম্পর্কিত নয়। বাস্তবে এসব রোগ স্নায়ু, রক্তনালি, হরমোন এবং মানসিক অবস্থাকে প্রভাবিত করে যৌন কার্যকারিতায় পরিবর্তন আনতে পারে। সাইকোসেক্সুয়াল মেডিসিন রোগীর সামগ্রিক স্বাস্থ্য বিবেচনা করে সমন্বিত চিকিৎসা প্রদান করে, যা রোগীর জীবনমান উন্নত করতে সাহায্য করে।

* কৈশোর ও তরুণদের জন্য যৌন স্বাস্থ্য শিক্ষা

বর্তমান ডিজিটাল যুগে তরুণরা সহজেই বিভিন্ন উৎস থেকে তথ্য সংগ্রহ করতে পারে। কিন্তু সব তথ্য বৈজ্ঞানিক বা নির্ভরযোগ্য নয়। অনেক তরুণ সামাজিক মাধ্যম, অনলাইন ভিডিও বা অযাচাইকৃত তথ্যের ভিত্তিতে যৌন স্বাস্থ্য সম্পর্কে ভুল ধারণা তৈরি করে। এসব ভুল ধারণা উদ্বেগ, অপরাধবোধ এবং অযৌক্তিক ভয়ের জন্ম দিতে পারে। সঠিক যৌন স্বাস্থ্য শিক্ষা তরুণদের বৈজ্ঞানিক জ্ঞান প্রদান করে, স্বাস্থ্যকর আচরণ গড়ে তুলতে সাহায্য করে এবং ভবিষ্যৎ পারিবারিক জীবনের জন্য প্রস্তুত করে।

* ভ্রান্ত চিকিৎসা ও অপবিজ্ঞানের বিরুদ্ধে বৈজ্ঞানিক অবস্থান

বাংলাদেশে যৌন সমস্যাকে কেন্দ্র করে বিপুল পরিমাণ বিভ্রান্তিকর বিজ্ঞাপন, অপ্রমাণিত চিকিৎসা এবং অলৌকিক সমাধানের প্রচারণা দেখা যায়। অনেক রোগী দ্রুত সমাধানের আশায় এসবের শিকার হন। এতে শুধু অর্থের অপচয়ই নয়, বরং মানসিক হতাশা এবং চিকিৎসা গ্রহণে অনীহাও তৈরি হয়। সাইকোসেক্সুয়াল মেডিসিন বৈজ্ঞানিক গবেষণা, আন্তর্জাতিক গাইডলাইন এবং প্রমাণভিত্তিক চিকিৎসার ওপর ভিত্তি করে কাজ করে। ফলে রোগী নিরাপদ এবং কার্যকর চিকিৎসা পেতে পারেন।

* বাংলাদেশে ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা

বাংলাদেশে যৌন-মনস্তাত্ত্বিক মেডিসিনের চাহিদা দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে। মেডিকেল কলেজ, বিশেষায়িত হাসপাতাল এবং মানসিক স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানে এ বিষয়ের প্রশিক্ষণ ও গবেষণার সুযোগ বৃদ্ধি করা প্রয়োজন। একইসঙ্গে চিকিৎসক, মনোবিজ্ঞানী, কাউন্সেলর এবং জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে বহুমাত্রিক সেবাব্যবস্থা গড়ে তোলা জরুরি। জাতীয় পর্যায়ে জনসচেতনতা বৃদ্ধি, বৈজ্ঞানিক যৌন শিক্ষা এবং প্রমাণভিত্তিক স্বাস্থ্যসেবার প্রসার ঘটাতে পারলে দেশের সামগ্রিক স্বাস্থ্যব্যবস্থা আরও শক্তিশালী হবে।

* উপসংহার

যৌন স্বাস্থ্য মানুষের সামগ্রিক সুস্থতার একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ। এটি শুধু শারীরিক সক্ষমতার বিষয় নয়, বরং মানসিক স্বাস্থ্য, আত্মমর্যাদা, দাম্পত্য সম্পর্ক, পারিবারিক স্থিতিশীলতা এবং সামাজিক কল্যাণের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত। বাংলাদেশে যৌন-মনস্তাত্ত্বিক মেডিসিনের বিকাশ সময়ের দাবি। এ বিষয়ে সচেতনতা বৃদ্ধি, বৈজ্ঞানিক শিক্ষা, প্রশিক্ষিত জনবল এবং প্রমাণভিত্তিক চিকিৎসাসেবার প্রসার ঘটাতে পারলে অসংখ্য মানুষ উপকৃত হবে। একটি সুস্থ, সচেতন, মানসিকভাবে স্থিতিশীল এবং মানবিক সমাজ গঠনে সাইকোসেক্সুয়াল মেডিসিন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে।

লেখক : ডিপ্লোমা ইন ডার্মাটোলজি, সেক্স এডু উইথ ডক্টর দৃষ্টি।

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম

We use cookies to improve your browsing experience. By using the site, you agree to our Privacy Policy .