ইটিং ডিসঅর্ডার
খাদ্যাভ্যাসের গুরুতর ব্যাধি
ডা. নাজমা আক্তার
প্রকাশ: ২২ আগস্ট ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
ইটিং ডিসঅর্ডার হলো এমন কিছু গুরুতর মানসিক ও শারীরিক অবস্থা, যেখানে খাবার এবং ওজন নিয়ে মানুষের ব্যস্ততা এতটাই বেশি থাকে যে, তারা অন্য কোনো বিষয়ে মনোযোগ দিতে পারেন না। এ সমস্যায় আক্রান্ত ব্যক্তি হয়তো সামান্য কম বা বেশি খাবার দিয়ে শুরু করলেও এক পর্যায়ে তার কম বা বেশি খাওয়ার তাগিদ নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। শরীরের ওজন বা আকৃতি নিয়ে অতিরিক্ত উদ্বেগ এবং ওজন বা খাদ্য গ্রহণ নিয়ন্ত্রণে চরম প্রচেষ্টা এ রোগের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। এগুলো মানুষের মানসিক, শারীরিক এবং সামাজিক জীবনের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।
উভয় লিঙ্গের মানুষই ইটিং ডিসঅর্ডারে আক্রান্ত হতে পারেন, তবে পুরুষ ও ছেলেদের তুলনায় নারী ও মেয়েদের মধ্যে এর হার আড়াই গুণ বেশি। সাধারণত কৈশোর বা তরুণ বয়সেই এ রোগগুলো বেশি দেখা দেয়, তবে শৈশবে বা জীবনের পরবর্তী সময়েও এটি বিকাশ লাভ করতে পারে।
* ইটিং ডিসঅর্ডারের প্রকারভেদ
সাধারণ ইটিং ডিসঅর্ডারগুলো হলো-
▶ অ্যানোরেক্সিয়া নার্ভোসা (Anorexia nervosa): যখন কেউ নিজের ওজন যতটা সম্ভব কম রাখার চেষ্টা করেন, যেমন-না খেয়ে থাকা বা অতিরিক্ত ব্যায়াম করা।
▶ বুলিমিয়া (Bulimia): এ সমস্যায় আক্রান্ত ব্যক্তি অতিরিক্ত খাওয়া (Bingeing) এবং বমি করার বা অতিরিক্ত ব্যায়ামের মাধ্যমে ক্যালরি ঝরিয়ে ফেলার (Purging) চক্রের মধ্যে থাকেন। এতে আক্রান্ত ব্যক্তির ওজন স্বাভাবিক বা সামান্য বেশি হতে পারে।
▶ বিং ইটিং ডিসঅর্ডার (Binge-eating disorder): যখন কেউ অতিরিক্ত খাওয়ার প্রবণতা রোধ করতে পারেন না। এতে নিয়মিত অতিরিক্ত খাবার খাওয়া হলেও বুলিমিয়া বা অ্যানোরেক্সিয়ার মতো ব্যায়াম বা বমি করে তা কমানোর চেষ্টা করা হয় না। অনেক সময় ক্ষুধা না থাকলেও বা পেট অস্বস্তিকরভাবে ভরা থাকার পরও খাওয়া চলতে থাকে। অতিরিক্ত খাওয়ার পর অপরাধবোধ বা লজ্জাবোধ তৈরি হয়, যা আবার নতুন করে অতিরিক্ত খাওয়ার কারণ হতে পারে।
* ইটিং ডিসঅর্ডারের কারণ
ইটিং ডিসঅর্ডারের জন্য প্রায়ই স্লিম বা রোগা হওয়ার সামাজিক চাপকে দায়ী করা হয়। তবে এর কারণগুলো সাধারণত বেশ জটিল। এর পেছনে জৈবিক বা প্রভাবশালী কিছু উপাদানের পাশাপাশি এমন কিছু অভিজ্ঞতা কাজ করে যা এ রোগকে উসকে দেয় এবং বজায় রাখতে সহায়তা করে।
যেসব ঝুঁকি একজন মানুষকে ইটিং ডিসঅর্ডারে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকিতে ফেলে-
▶ পরিবারে ইটিং ডিসঅর্ডার, বিষণ্নতা বা মাদকাসক্তির ইতিহাস থাকা।
▶ খাদ্যাভ্যাস, শারীরিক গঠন বা ওজন নিয়ে সমালোচনার শিকার হওয়া।
▶ রোগা হওয়ার প্রতি অতিরিক্ত মাত্রায় আচ্ছন্ন থাকা, বিশেষ করে যদি সমাজ বা পেশাগত কারণে (যেমন-ব্যালেরি ডান্সার, মডেল বা অ্যাথলেট) চাপ থাকে।
▶ কিছু নির্দিষ্ট ব্যক্তিত্বের বৈশিষ্ট্য, যেমন-উদ্বেগের সমস্যা, আত্মবিশ্বাসের অভাব বা নিখুঁতবাদী (Perfectionist) স্বভাব থাকা।
▶ বিশেষ কোনো অভিজ্ঞতা, যেমন-যৌন বা মানসিক নির্যাতন অথবা বিশেষ কোনো প্রিয়জনের মৃত্যু।
▶ পরিবার বা বন্ধুবান্ধবদের সঙ্গে কঠিন ও জটিল সম্পর্ক।
▶ কর্মক্ষেত্র, স্কুল বা বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনো চাপের পরিস্থিতি।
* লক্ষণ ও উপসর্গ
ইটিং ডিসঅর্ডারের লক্ষণগুলো এর ধরনের ওপর ভিত্তি করে ভিন্ন হয়। অ্যানোরেক্সিয়া নার্ভোসা (Anorexia nervosa)-এর লক্ষণগুলোর মধ্যে রয়েছে-খাবার গ্রহণে অনীহা এবং ক্ষুধা অস্বীকার করা, ওজন বাড়ার তীব্র ভীতি, নিজের শরীর সম্পর্কে নেতিবাচক ধারণা, অতিরিক্ত ব্যায়াম করা, আবেগহীন ভাব, খিটখিটে মেজাজ, জনসমক্ষে খেতে ভয় পাওয়া, খাবার নিয়ে অতিরিক্ত ব্যস্ততা, সামাজিক যোগাযোগ এড়িয়ে চলা, পাতলা বা দুর্বল শারীরিক গঠন, ঘুমের সমস্যা, শরীরে নরম লোম গজানো, মাসিকের অনিয়ম বা বন্ধ হয়ে যাওয়া (Amenorrhea), কোষ্ঠকাঠিন্য, পেটে ব্যথা, শুষ্ক ত্বক, ঘন ঘন ঠান্ডা লাগা, অনিয়মিত হৃদস্পন্দন, কম রক্তচাপ এবং পানিশূন্যতা।
* বুলিমিয়া নার্ভোসা (Bulimia nervosa)
এর লক্ষণগুলোর মধ্যে রয়েছে-অস্বস্তি বা ব্যথা হওয়া পর্যন্ত খাওয়া (বিশেষ করে চর্বিযুক্ত বা মিষ্টি খাবার), নিজে নিজে বমি করার চেষ্টা করা, ল্যাক্সেটিভ বা মলত্যাগের ওষুধ ব্যবহার করা, অতিরিক্ত ব্যায়াম করা, শরীর ও ওজন নিয়ে অস্বাস্থ্যকর আচ্ছন্নতা, অতিরিক্ত নেতিবাচক শারীরিক ভাবমূর্তি, আত্মবিশ্বাসের অভাব, খাওয়ার পরে বা খাওয়ার মাঝে বারবার বাথরুমে যাওয়া, খাওয়ার আচরণ নিয়ন্ত্রণ করতে না পারার অনুভূতি, অন্ত্রের অস্বাভাবিক কার্যকারিতা, দাঁত ও মাড়ির ক্ষত, গলা ও মুখে ঘা, পানিশূন্যতা, অনিয়মিত হৃদস্পন্দন, হাতের কড় বা আঙুলে ক্ষতের দাগ, মাসিকের অনিয়ম বা বন্ধ হয়ে যাওয়া এবং মাদক বা অ্যালকোহল অপব্যবহার।
* বিং-ইটিং ডিসঅর্ডার (Binge-eating disorder)
লক্ষণগুলোর মধ্যে রয়েছে-অস্বস্তি বা ব্যথা না হওয়া পর্যন্ত খাওয়া, স্বাভাবিক খাবারের চেয়ে অনেক বেশি পরিমাণে খাবার খাওয়া, দ্রুত খাবার খাওয়া, খাওয়ার আচরণ নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ার অনুভূতি, প্রায়ই একা একা খাওয়া এবং অতিরিক্ত খাওয়ার কারণে বিষণ্ন, বিরক্ত বা বিপর্যস্ত বোধ করা।
* জটিলতা
ইটিং ডিসঅর্ডারের ফলে বিভিন্ন ধরনের জটিলতা দেখা দিতে পারে, যার মধ্যে কিছু জীবনঘাতীও হতে পারে। যেমন-মৃত্যু, হৃদরোগ, একাধিক অঙ্গের কার্যকারিতা ব্যাহত হওয়া, বিষণ্নতা, আত্মহত্যার চিন্তা বা আচরণ, মাসিক বন্ধ হয়ে যাওয়া, হাড়ের ক্ষয়, শারীরিক বৃদ্ধি আটকে যাওয়া, পরিপাকতন্ত্রের সমস্যা, কিডনির ক্ষতি, দাঁতের মারাত্মক ক্ষয় এবং উচ্চ বা নিম্ন রক্তচাপ।
* কখন চিকিৎসকের কাছে যাবেন
ইটিং ডিসঅর্ডারের তীব্র আকর্ষণের কারণে একা একা এটি মোকাবিলা বা কাটিয়ে ওঠা বেশ কঠিন হতে পারে। এটি আপনার পুরো জীবনকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। আপনার সারাক্ষণ শুধু খাবার নিয়ে চিন্তা হতে পারে, কী খাবেন তা নিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা দুশ্চিন্তা হতে পারে এবং ক্লান্ত না হওয়া পর্যন্ত ব্যায়াম করতে পারেন। রোগীর লজ্জা, বিষণ্নতা, আশাহীনতা, ক্লান্তি, খিটখিটে মেজাজ এবং উদ্বেগ কাজ করতে পারে। এ ধরনের সমস্যা দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের সাহায্য নিন। এর চিকিৎসায় সাধারণত সাইকোথেরাপি, পুষ্টি বিষয়ক কাউন্সেলিং, পারিবারিক কাউন্সেলিং, ওষুধ এবং প্রয়োজনে হাসপাতালে ভর্তির ব্যবস্থা করা হয়। এর মধ্যে রয়েছে কগনিটিভ বিহেভিওরাল থেরাপি (CBT), ইন্টারপারসোনাল থেরাপি, ডায়াটরি কাউন্সেলিং, সাইকোডায়নামিক থেরাপি, ফ্যামিলি থেরাপি এবং বুলিমিয়া বা বিং ইটিং চিকিৎসার জন্য অ্যান্টিডিপ্রেসেন্ট জাতীয় ওষুধ ও ব্যবহার করা হয়।
লেখক : সহযোগী অধ্যাপক, অ্যান্ডোক্রাইনোলজি ও মেটাবলিজম বিভাগ, মার্কস মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল, ঢাকা।
