শিশুদের রোদে রাখা কতটা বিজ্ঞানসম্মত
Advertisement
ডা. তুহিন বড়ুয়া তমাল
প্রকাশ: ০৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
শিশুদের রোদে রাখা নিয়ে আমাদের সমাজে নানা ধরনের প্রচলিত ধারণা রয়েছে। নবজাতককে কি প্রতিদিন রোদে দিতে হবে? রোদে না দিলে কি জন্ডিস হয়? জন্ডিস হলে কি রোদে দেওয়া জরুরি? বড় শিশুরা দিনের কোন সময় এবং কতক্ষণ রোদে থাকবে?-এসব প্রশ্নের উত্তর নিয়ে অভিভাবকদের মধ্যে প্রায়ই দ্বিধা দেখা যায়। আমাদের পারিবারিক ও সামাজিক পরিসরে শিশুদের রোদে রাখাকে ঘিরে নানা পরামর্শও দেওয়া হয়। কিন্তু এসব ক্ষেত্রে প্রচলিত ধারণার চেয়ে বৈজ্ঞানিক তথ্য ও চিকিৎসাবিজ্ঞানের নির্দেশনাই হওয়া উচিত আমাদের পথনির্দেশক।
নবজাতককে কি রোদে দেওয়া উচিত
নবজাতকসহ ৬ মাসের কম বয়সি শিশুকে সরাসরি সূর্যের আলোতে রাখা উচিত নয়। নবজাতকের ত্বক অত্যন্ত সংবেদনশীল। প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের তুলনায় তাদের ত্বক অনেক বেশি পাতলা এবং অপরিণত। ফলে ত্বকের সুরক্ষাব্যবস্থাও তুলনামূলকভাবে দুর্বল থাকে।
সূর্যের আলোতে অতিবেগুনি বা আল্ট্রাভায়োলেট রশ্মি থাকে। খালি গায়ে বা সরাসরি সূর্যের আলোতে নবজাতককে রাখলে এ রশ্মির কারণে ত্বক ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। অতিরিক্ত গরমে শিশুর শরীরের তাপমাত্রা বেড়ে যেতে পারে, পানিশূন্যতা দেখা দিতে পারে এবং সানবার্নও হতে পারে।
তাহলে ভিটামিন ডি-এর কি হবে
ভিটামিন ডি তৈরিতে সূর্যের আলো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তবে এ জন্য নবজাতককে সরাসরি রোদে রাখার প্রয়োজন নেই। জীবনের প্রথম বছর শিশুকে নিয়মিত ভিটামিন ডি সাপ্লিমেন্ট দেওয়া যেতে পারে।
বড় শিশুরা কতক্ষণ রোদে থাকবে
বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে শিশুর ত্বকের সহনশীলতাও বাড়ে। ভিটামিন ডি তৈরির জন্য শিশুদের কিছু সময় সূর্যালোকের সংস্পর্শে থাকা প্রয়োজন হতে পারে। বয়স, ত্বকের রং, ভৌগোলিক অবস্থান, ঋতু, দিনের সময় এবং শরীরের কতটুকু অংশ সূর্যের আলো পাচ্ছে-এসব বিষয়ের ওপর প্রয়োজনীয় সময় নির্ভর করে।
সাধারণভাবে বলা হয়, ১ বছরের কম বয়সি শিশুর ক্ষেত্রে সপ্তাহে অন্তত পাঁচ দিন প্রায় ১৭ থেকে ৩০ মিনিট এবং ১ বছরের বেশি বয়সি শিশুর ক্ষেত্রে ৩০ থেকে ৪৫ মিনিট সূর্যালোকের সংস্পর্শ উপকারী হতে পারে।
ভিটামিন ডি তৈরির জন্য দিনের কোন সময় সূর্যালোক বেশি কার্যকর, তা ভৌগোলিক অবস্থান ও ঋতুভেদে পরিবর্তিত হয়। সাধারণভাবে বেলা ১১টা থেকে দুপুর ৩টার মধ্যে রোদে দেওয়াটা বেশি ফলদায়ক।
শিশুকে রোদে নেওয়ার জন্য তাকে সম্পূর্ণ কাপড় খুলে দেওয়ারও কোনো প্রয়োজন নেই। শরীরের কিছু অংশ-যেমন মুখমণ্ডল, হাত বা পায়ের অংশ-সূর্যালোকের সংস্পর্শে এলেই ভিটামিন ডি তৈরিতে ভূমিকা রাখতে পারে।
শরীরের কতটুকু অংশ সূর্যের আলো পাবে? আনুমানিক ১৫-৪০% Body Surface Area (BSA)।
১৫-৪০% BSA কীভাবে বুঝবেন, আনুমানিকভাবে-
- মুখ : ৭-১০%
- হাতের কনুই থেকে কবজি পর্যন্ত : ৮%
- হাতের তালু : ৪%
- পায়ের হাঁটু থেকে গোড়ালি পর্যন্ত : ৮-১২%
- পায়ের গোড়ালি থেকে বাকি অংশ : ৮%
সানস্ক্রিন ব্যবহার করা যাবে কি
শিশুদের ক্ষেত্রে সানস্ক্রিন ব্যবহারের নিয়ম বয়সভেদে ভিন্ন হতে পারে। কিছু গাইডলাইনে ৬ মাসের কম বয়সি শিশুকে সরাসরি রোদ থেকে দূরে রাখার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। আবার বড় শিশুদের ক্ষেত্রে দীর্ঘসময় বাইরে থাকলে প্রয়োজন অনুযায়ী সানস্ক্রিন ব্যবহারের পরামর্শ দেওয়া হয়।
রোদ এবং জন্ডিস : প্রচলিত ধারণা কতটা সঠিক
নবজাতককে রোদে না দিলে জন্ডিস হয়-এটি একটি ভুল ধারণা। একইভাবে, জন্ডিস হলে অবশ্যই রোদে দিতে হবে-এ কথাটিও বৈজ্ঞানিকভাবে সঠিক নয়। নবজাতকের জন্ডিসের কারণ এবং চিকিৎসা আলাদা বিষয়। জন্ডিসের মাত্রা বেশি হলে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী প্রয়োজনীয় পরীক্ষা ও চিকিৎসা নিতে হয়। কোনো কোনো ক্ষেত্রে বিশেষ আলোর সাহায্যে ফটোথেরাপির প্রয়োজন হয়। ফটোথেরাপি আর সূর্যের আলো এক জিনিস নয়। তাই জন্ডিসের চিকিৎসা হিসাবে শিশুকে সরাসরি রোদে রাখা উচিত নয়।
প্রকৃতির সঙ্গেই বেড়ে উঠুক শিশু
শিশুকে জন্মের পর থেকেই খালি গায়ে রোদে রেখে দেওয়া যেমন সমীচীন নয়, তেমনি বড় শিশুকে সারাক্ষণ ঘরের মধ্যে আটকে রাখাও ঠিক নয়। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে শিশুর প্রয়োজন হয় খেলাধুলা, খোলা পরিবেশ এবং প্রকৃতির সংস্পর্শ।
তাই শিশুকে বাইরে যেতে দিন। মাঠে খেলতে দিন। প্রকৃতির সঙ্গে পরিচিত হতে দিন। তবে সবকিছুই হোক বয়স, আবহাওয়া এবং নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে।
রোদ শিশুদের জন্য শত্রু নয়, আবার অন্ধভাবে ব্যবহার করার মতো কোনো ওষুধও নয়। প্রয়োজন সচেতনতা, বিজ্ঞানভিত্তিক সিদ্ধান্ত এবং নিরাপদ অভ্যাস।
লেখক : শিশু বিশেষজ্ঞ ও সহকারী অধ্যাপক, সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ।
