শিশুর ডেঙ্গু জ্বর
Advertisement
ডা. আসসাদে তারান্নুম
প্রকাশ: ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
ফাইল ছবি
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
ডেঙ্গু বর্তমানে বাংলাদেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ও দ্রুত বিস্তার লাভকারী মশাবাহিত ভাইরাসজনিত রোগ। ২০২৬ সালে প্রতি সপ্তাহে গড়ে প্রায় এক হাজার ৫৫০ জন মানুষ ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হচ্ছেন এবং প্রতি সপ্তাহে প্রায় ৬ জনের মৃত্যু ঘটছে। আক্রান্তদের মধ্যে প্রায় ১৯ শতাংশ শিশু। বাংলাদেশে ডেঙ্গুর প্রথম উল্লেখযোগ্য প্রাদুর্ভাব ১৯৬০-এর দশকে দেখা যায় এবং তখন এটি ‘ঢাকা ফিভার’ নামে পরিচিত ছিল।
ডেঙ্গু যে কোনো বয়সের মানুষকে আক্রান্ত করতে পারে, কোনো বয়সই ডেঙ্গু থেকে সম্পূর্ণ নিরাপদ নয়। সঠিক সময়ে সঠিকভাবে চিকিৎসা না হলে ডেঙ্গু বিশেষ করে শিশুদের ক্ষেত্রে জীবনহানির কারণ হতে পারে। ডেঙ্গুতে রক্তক্ষরণ, রক্তচাপ কমে শক, গুরুতর অঙ্গের জটিলতা, গুরুতর ক্ষেত্রে মৃত্যু হতে পারে।
* শিশুদের ক্ষেত্রে ডেঙ্গু কেন গুরুত্বপূর্ণ
শিশুদের শরীর থেকে পানি ক্ষয় বেশি হয়, শিশুদের শরীরে শক্তি উৎপাদনের প্রক্রিয়া বা বিপাকক্রিয়া তুলনামূলকভাবে বেশি সক্রিয় তাই পানিশূন্যতা দ্রুত হতে পারে।
শরীরের ভেতরের বা concealed bleeding সবসময় বাইরে থেকে বোঝা যায় না।
শক দ্রুত এবং আকস্মিকভাবে দেখা দিতে পারে।
গুরুতর ডেঙ্গুতে মৃত্যুঝুঁকি বেশি।
তাই শিশুর ডেঙ্গু হলে শুধু জ্বর কমেছে কি না দেখলেই হবে না-সঙ্গে সঙ্গে শিশুর সামগ্রিক অবস্থা, পানি গ্রহণ, প্রস্রাব, শ্বাস-প্রশ্বাস বিপজ্জনক উপসর্গ লক্ষণগুলো নজরে রাখতে হবে।
* ডেঙ্গুর সাধারণ লক্ষণ
সাধারণত ২ থেকে ৭ দিন ধরে জ্বর থাকতে পারে। এর সঙ্গে দেখা দিতে পারে-
▶ তীব্র মাথাব্যথা
▶ চোখের পেছনে ব্যথা
▶ শরীর ও পেশিতে ব্যথা
▶ অস্থিসন্ধিতে ব্যথা
▶ ত্বকে র্যাশ
▶ বমি বমি ভাব ও বমি
▶ ডায়রিয়া বা অন্যান্য পেটের সমস্যা।
* বিপদচিহ্ন
যে লক্ষণগুলো দেখা দিলে দেরি না করে হাসপাতালে/চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে-
তীব্র ও একটানা পেটব্যথা, বারবার বমি, শরীরে পানি জমার লক্ষণ- পেট ফুলে যাওয়া, শ্বাসকষ্ট হওয়া, নাক, মাড়ি বা অন্য কোথাও রক্তপাত, অস্বাভাবিক ঘুমঘুম ভাব, অস্থিরতা বা চেতনার পরিবর্তন।
* ডেঙ্গু হলে বাড়িতে কী করবেন
▶ পর্যাপ্ত তরল দিন : শিশুকে বারবার অল্প অল্প করে তরল খাওয়ান। পানি, খাবার সেলাইন, ডাবের পানি, স্যুপ, দুধ/উপযুক্ত তরল, শিশুর বয়স অনুযায়ী অন্যান্য নিরাপদ তরল দিন। রক্তপাত হয়েছে কি না বোঝার সুবিধার জন্য লাল/বাদামি/কালো রঙের খাবার ও পানীয় (আনার বা ড্রাগন ফল বা ফলের জুস) দেওয়া যাবে না।
▶ জ্বর নিয়ন্ত্রণ করুন : হালকা কাপড় পরান, ঘর ঠান্ডা ও আরামদায়ক রাখুন, প্রয়োজন হলে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী প্যারাসিটামল ব্যবহার করা যায় (প্যারাসিটামল ব্যতীত অন্য কোনো ওষুধ চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া দেওয়া যাবে না), অতিরিক্ত ঠান্ডা পানি/বরফ দিয়ে শরীর ঘষবেন না।
▶ খাবার চালিয়ে যান : শিশু খেতে পারলে স্বাভাবিক খাবার চালিয়ে যান। অল্প অল্প করে বারবার খাওয়ানো ভালো।
* বাড়িতে কী কী পর্যবেক্ষণ করবেন
প্রতিদিন লক্ষ্য করুন শিশু পর্যাপ্ত তরল খাচ্ছে কি না, প্রস্রাব পরিমাণ কমেছে কি না, বারবার বমি হওয়া, পেটে ব্যথা হওয়া, নাক মাড়ি বমি ও মলের সঙ্গে রক্ত যাওয়া, শিশুর অস্বাভাবিক আচরণ যেমন, অতিরিক্ত ঘুমঘুম/অস্থির, শ্বাসকষ্ট, হাত-পা ঠান্ডা হওয়া, জ্বর কমার পর শিশুর অবস্থা কেমন হচ্ছে।
জ্বর কমেছে মানেই বিপদ কেটে গেছে এমন ভাবা উচিত নয়। বিশেষ করে জ্বর কমার সময় শিশুর প্রতি আরও সতর্ক থাকুন। ডেঙ্গু ভয় পাওয়ার রোগ নয় কিন্তু অবহেলা না করে সময়মতো শনাক্তকরণ, পর্যবেক্ষণ ও সঠিক চিকিৎসাই শিশুর জীবন রক্ষা করতে পারে।
লেখক : শিশুরোগ বিশেষজ্ঞ, ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল।
