নারীর ভার্জিনিটি পরীক্ষা
হাইমেন কি সত্যিই সতীত্বের প্রমাণ
Advertisement
ডা. নুসরাত জাহান দৃষ্টি
প্রকাশ: ১৭ অক্টোবর ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
সংগৃহীত
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
বিয়ের রাত। রক্তের দাগ আছে কি না, এ একটি প্রশ্নকে ঘিরেই আজও অনেক নারীর জীবনে তৈরি হয় ভয়, অপমান, সন্দেহ এবং কখনো কখনো সম্পর্ক ভেঙে যাওয়ার মতো পরিস্থিতি। অথচ যে বিষয়টিকে ঘিরে এত সামাজিক চাপ, তারই বৈজ্ঞানিক ভিত্তি অত্যন্ত দুর্বল। একজন নারী ‘ভার্জিন’ কি না, এটি কি চিকিৎসক পরীক্ষা করে বলতে পারেন? হাইমেন দেখে কি বোঝা যায়, কোনো নারী আগে যৌনসম্পর্ক করেছেন কি না? প্রথম যৌনসম্পর্কে রক্তপাত না হলে কি ধরে নিতে হবে যে তিনি আগে যৌনসম্পর্ক করেছেন? চিকিৎসাবিজ্ঞান বলছে, রক্তপাত নয়, হাইমেন নয়, ‘ভার্জিনিটি’ কোনো মেডিকেল পরীক্ষা দিয়ে নির্ধারণ করা যায় না। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা স্পষ্টভাবে জানিয়েছে, ‘ভার্জিনিটি পরীক্ষা’র কোনো বৈজ্ঞানিক বা চিকিৎসাগত ভিত্তি নেই। হাইমেন পরীক্ষা করে একজন নারীর যৌন ইতিহাস নির্ভরযোগ্যভাবে নির্ধারণ করা যায় না। একই কারণে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, ইউএন হিউম্যান রাইটস এবং ইউএন ওম্যান ২০১৮ সালে ভার্জিনিটি পরীক্ষা বন্ধ করার আহ্বান জানিয়েছে। বিস্তারিত লিখেছেন ডা. নুসরাত জাহান দৃষ্টি
* ‘ভার্জিনিটি’ কি আদৌ চিকিৎসাবিজ্ঞানের বিষয়
ভার্জিনিটি বা কুমারিত্ব মূলত একটি সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় ধারণা। এটি কোনো রোগ নয়, কোনো শারীরিক রোগ নির্ণয়ও নয়। চিকিৎসাবিজ্ঞানে এমন কোনো রক্ত পরীক্ষা, আলট্রাসনোগ্রাম, শারীরিক পরীক্ষা বা অন্য কোনো নির্ভরযোগ্য পদ্ধতি নেই, যার মাধ্যমে নিশ্চিতভাবে বলা যায়, একজন নারী কখনো যৌনসম্পর্ক করেছেন কি না। অর্থাৎ ‘ভার্জিনিটি টেস্ট’ নামে প্রচলিত পরীক্ষা আসলে বৈজ্ঞানিকভাবে স্বীকৃত কোনো পরীক্ষা নয়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ভাষায়, হাইমেনের চেহারা বা অবস্থার মাধ্যমে vaginal intercourse-এর ইতিহাস নির্ভরযোগ্যভাবে নির্ধারণ করা যায় না।
* হাইমেন নিয়ে এত ভুল ধারণা কেন
নারীর যৌনতা নিয়ে সামাজিক নিয়ন্ত্রণের সঙ্গে হাইমেনের ধারণাটি দীর্ঘদিন ধরে যুক্ত। অনেক সমাজে মনে করা হয়, হাইমেন হলো নারীর ‘সতীত্বের সিল’। কিন্তু শারীরবিদ্যা এ ধারণাকে সমর্থন করে না। হাইমেন হলো যোনিপথের প্রবেশমুখের চারপাশে থাকা একটি পাতলা ও নমনীয় টিস্যু। এর আকৃতি, পুরুত্ব, স্থিতিস্থাপকতা ও গঠন নারীভেদে স্বাভাবিকভাবেই আলাদা হতে পারে। সব নারীর হাইমেন একই রকম নয়। তাই একজন নারীর হাইমেন দেখে তার যৌন ইতিহাস নির্ধারণ করা চিকিৎসাবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে নির্ভরযোগ্য নয়। হাইমেন কোনো তালা নয়, আর ভার্জিনিটি কোনো শারীরিক সিল নয়।
* প্রথম যৌনসম্পর্কে রক্তপাত হবেই, এ ধারণা কি সত্য
এটি আমাদের সমাজের অন্যতম প্রচলিত মিথ।
অনেক পরিবারে এখনো ধারণা আছে, বিয়ের প্রথম রাতে রক্তপাত না হলে মেয়েটি ‘ভার্জিন’ ছিলেন না। এ ধারণার কারণে অনেক নারী অযথা ভয় ও মানসিক চাপে থাকেন। কিন্তু চিকিৎসাবিজ্ঞান বলছে, প্রথম যৌনসম্পর্কে রক্তপাত হতেই হবে, এমন কোনো নিয়ম নেই। একজন নারীর প্রথম যৌনসম্পর্কে রক্তপাত হতে পারে, আবার নাও হতে পারে। হাইমেনের স্বাভাবিক গঠন ও নমনীয়তা ব্যক্তি অনুযায়ী ভিন্ন হওয়ায় সবার অভিজ্ঞতাও এক নয়। গবেষণাতেও দেখা গেছে, প্রথম যৌনসম্পর্কের পর সব নারীর রক্তপাত হয় না। সুতরাং-রক্তপাত হয়েছে বলে নারী ভার্জিন ছিলেন এবং রক্তপাত হয়নি বলে নারী ভার্জিন ছিলেন না, দুটিই বৈজ্ঞানিকভাবে ভুল সিদ্ধান্ত।
* হাইমেন অক্ষত থাকলে কি যৌনসম্পর্ক হয়নি
এটিও নিশ্চিতভাবে বলা যায় না। একইভাবে হাইমেনে কোনো পরিবর্তন দেখা গেলে সেটিও আগের যৌনসম্পর্কের নিশ্চিত প্রমাণ নয়। অর্থাৎ চিকিৎসক হাইমেন দেখে কারও যৌন ইতিহাস সম্পর্কে নিশ্চিত সিদ্ধান্ত দিতে পারেন না।
* ‘দুই আঙুল পরীক্ষা’, বিজ্ঞান কী বলে
‘Two-finger test’ বা দুই আঙুল দিয়ে যোনিপথ পরীক্ষা করে কোনো নারী যৌনসম্পর্ক করেছেন কি না নির্ধারণ করার ধারণাটিও বৈজ্ঞানিকভাবে গ্রহণযোগ্য নয়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এ ধরনের ভার্জিনিটি পরীক্ষার বিরোধিতা করেছে। কারণ যোনিপথের আকার, নমনীয়তা বা হাইমেনের অবস্থা কোনো ব্যক্তির যৌন ইতিহাসের নির্ভরযোগ্য প্রমাণ নয়। আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এ ধরনের অপ্রয়োজনীয় পরীক্ষা একজন নারীর জন্য শারীরিক অস্বস্তি, মানসিক আঘাত, লজ্জা ও অপমানের অভিজ্ঞতা তৈরি করতে পারে।
* বিশ্ব স্থাস্থ্য সংস্থা জানিয়েছে
▶ ভার্জিনিটি পরীক্ষার কোনো বৈজ্ঞানিক বা চিকিৎসাগত ভিত্তি নেই।
▶ হাইমেন পরীক্ষা করে যৌনসম্পর্কের ইতিহাস নিশ্চিত করা যায় না।
▶ কোনো শারীরিক পরীক্ষা দিয়ে নিশ্চিতভাবে ভার্জিনিটি প্রমাণ করা সম্ভব নয়।
▶ ভার্জিনিটি পরীক্ষা শারীরিক ও মানসিক ক্ষতির কারণ হতে পারে।
▶ এ ধরনের পরীক্ষা নারীর মর্যাদা, অধিকার ও শারীরিক স্বায়ত্তশাসনের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
* বাংলাদেশে বিষয়টি কতটা প্রাসঙ্গিক
বাংলাদেশের সমাজে বিয়ে, নারীর ‘চরিত্র’ এবং ভার্জিনিটি নিয়ে সামাজিক প্রত্যাশা এখনো শক্তিশালী। ফলে বিষয়টি শুধু চিকিৎসাবিজ্ঞানের নয়, এটি নারী অধিকার, মানসিক স্বাস্থ্য, পারিবারিক সম্পর্ক এবং সামাজিক সংস্কৃতির সঙ্গেও জড়িত। ধর্ষণের অভিযোগের ক্ষেত্রে নারীর হাইমেন, যোনিপথের ‘laxity’ বা তথাকথিত ভার্জিনিটি দিয়ে যৌন সহিংসতার সত্যতা নির্ধারণ করা যায় না। যৌন সহিংসতার মেডিকেল পরীক্ষা এবং ভার্জিনিটি পরীক্ষা এক বিষয় নয়। যৌন সহিংসতার ঘটনায় চিকিৎসকের প্রয়োজন হতে পারে আঘাত পরীক্ষা করা, প্রয়োজনীয় চিকিৎসা দেওয়া, সংক্রমণ ও গর্ভধারণের ঝুঁকি মূল্যায়ন করা, ফরেনসিক প্রমাণ সংগ্রহ করা এবং মানসিক সহায়তা দেওয়া। এসবের উদ্দেশ্য হলো রোগীর স্বাস্থ্য ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা, ‘চরিত্র’ যাচাই করা নয়।
লেখক : সেক্সুয়াল হেলথ এডুকেটর, সেক্স এডু উইথ ডক্টর দৃষ্টি।
