Logo
Logo
×
   

সুস্থ থাকুন

ডেঙ্গুজ্বর কোভিড ও মৌসুমি ইনফ্লুয়েঞ্জা

Icon

ডা. এম সেলিম উজ্জমান

প্রকাশ: ২১ জুন ২০২৫, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

ডেঙ্গুজ্বর কোভিড ও মৌসুমি ইনফ্লুয়েঞ্জা

ডেঙ্গুজ্বর : বাসাবাড়ির আশপাশে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা, এডিস মশার বংশ বিস্তার রোধে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া এবং জ্বর হলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ গ্রহণ করা-এসবই ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

* কীভাবে ছড়ায়

ডেঙ্গু রোগ ছড়ায় স্ত্রী এডিস ইজিপ্টাই মশার কামড়ের মাধ্যমে, যা সাধারণত দিনে কামড় দেয়, বিশেষ করে সকাল ও বিকালের সময়। এ মশা স্বচ্ছ পানি জমে থাকা স্থানে বংশ বিস্তার করে। যেমন-ফুলদানি, ডাবের খোলা, পরিত্যক্ত টায়ার, ছাদে জমে থাকা পানি ইত্যাদি।

* লক্ষণ

▶ হঠাৎ জ্বর।

▶ মাথাব্যথা ও চোখের পেছনে ব্যথা।

▶ শরীর ব্যথা।

▶ পেশি ও হাড়ের ব্যথা।

▶ ত্বকে লালচে ফুসকুড়ি।

▶ বমি বমি ভাব বা বমি, পেটে ব্যথা।

▶ কখনো কখনো মাড়ি বা নাক দিয়ে রক্ত পড়া।

গুরুতর ডেঙ্গু (Dengue Hemorrhagic Fever) মারাত্মক রক্তপাত এবং অঙ্গ অবসাদ-ক্লান্তি অনুভব করা, যা প্রাণঘাতী হতে পারে।

* ডেঙ্গু সচেতনতায় করণীয়

▶ ৩-৫ দিন পরপর ফুলদানি, পরিত্যক্ত টায়ার, ডাবের খোসা, ছাদে জমে থাকা পানি পরিষ্কার করুন।

▶ সপ্তাহে অন্তত একদিন ‘পরিষ্কার দিবস’ পালন করুন।

▶ বাসা ও এর আশপাশে জমে থাকা পানি অপসারণ করুন।

▶ মশারি ব্যবহার করুন।

রাতে ঘুমানোর সময় অবশ্যই মশারি ব্যবহার করুন, প্রয়োজন হলে দিনের বেলায়ও।

▶ মশা নিধনের ওষুধ ব্যবহার করুন।

স্প্রে বা কয়েল ব্যবহার করুন, বিশেষ করে ভোর ও সন্ধ্যায়।

▶ স্থানীয় প্রশাসনকে সহযোগিতা করুন।

▶ পরিচ্ছন্নতা অভিযানে অংশগ্রহণ ও সচেতনতামূলক কর্মসূচিতে যুক্ত থাকুন।

* ডেঙ্গুজ্বর হলে করণীয়

ডেঙ্গু হলে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী চলা জরুরি। স্বাভাবিক ডেঙ্গুতে অনেক সময় শুধু বিশ্রাম, তরল পানীয় এবং প্যারাসিটামলই যথেষ্ট। তবে জ্বরের তীব্রতা বেড়ে গেলে বা রক্তপাত শুরু হলে দ্রুত হাসপাতালে ভর্তি হওয়া উচিত। ব্যথানাশক হিসাবে অ্যাসপিরিন বা আইবুপ্রোফেন খাওয়া যাবে না, কারণ এগুলো রক্তপাতের ঝুঁকি বাড়ায়।

কোভিড-১৯ জ্বর : বিশ্বব্যাপী মারাত্মক আকারে ছড়িয়ে পড়া কোভিড-১৯ মহামারির কয়েক বছর অতিক্রান্ত হলেও এর বহুমাত্রিক প্রভাব এখনো পুরোপুরি নির্মূল হয়নি।

* কীভাবে ছড়ায়

কোভিড-১৯ একটি শ্বাসতন্ত্রজনিত ভাইরাসজনিত রোগ, যা মূলত করোনাভাইরাস SARS-CoV-2 (Severe acute respiratory syndrome -Coronavirus-2) দ্বারা সৃষ্ট। এটি এক ব্যক্তি থেকে অন্য ব্যক্তির দেহে মূলত হাঁচি-কাশির মাধ্যমে নির্গত শ্বাসযন্ত্রের ফোঁটার (শ্বাসযন্ত্রের ড্রপলেট) মাধ্যমে ছড়ায়। এ ছাড়া সংক্রমিত পৃষ্ঠ ছুঁয়ে হাত না ধুয়ে মুখ, নাক বা চোখে স্পর্শ করলেও সংক্রমণ ঘটতে পারে।

* বর্তমানে কোভিড-১৯ এর সাধারণ লক্ষণ

▶ জ্বর ও শরীর ব্যথা (জ্বর হয়তো নাও থাকতে পারে)।

▶ কাঁশি, গলা ব্যথা থাকতে পারে।

▶ শ্বাসকষ্ট।

▶ মাথাব্যথা, দুর্বলতা বা শরীর ব্যথা।

▶ বমি বমি ভাব বা ডায়রিয়া।

* অধিক ঝুঁকিপূর্ণ গোষ্ঠী

বয়স্ক ব্যক্তি, যাদের আগে থেকেই ডায়াবেটিস, উচ্চরক্তচাপ, হৃদরোগ, কিডনি বা ফুসফুসের সমস্যা আছে, তাদের ক্ষেত্রে কোভিড-১৯ গুরুতর রূপ নিতে পারে। ৫-বছরের কম বয়সি শিশু, গর্ভবতী-মা এবং রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম এমন ব্যক্তি সতর্ক থাকা উচিত ।

ষজনসচেতনতায় করণীয়

▶ স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা : জনসমাগমস্থলে মুখে মাস্ক ব্যবহার করুন, নিয়মিত হাত ধুয়ে ফেলুন (কমপক্ষে অন্তত ২০ সেকেন্ড ধরে) বা স্যানিটাইজার ব্যবহার করুন, হাঁচি-কাশি দেওয়ার সময় মুখ, হাত বা টিস্যু পেপার ব্যবহার করে ঢেকে রাখুন।

▶ সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখা : প্রয়োজনে নিরাপদ দূরত্ব (তিন ফুট) বজায় রেখে চলাফেরা করুন, বিশেষ করে বদ্ধ পরিবেশে।

▶ টিকা গ্রহণ : কোভিড ১৯-এর প্রতিরোধে সরকার অনুমোদিত সম্পূর্ণ ডোজ টিকা গ্রহণ এবং প্রয়োজনে বুস্টার ডোজ নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ।

▶ স্বাস্থ্য লক্ষণ দেখা দিলে পরীক্ষা ও আইসোলেশন : জ্বর ও শরীর ব্যথা, কাশি বা শ্বাসকষ্ট দেখা দিলে কোভিড পরীক্ষা করুন এবং সংক্রমণ নিশ্চিত হলে নিজেকে আলাদা রাখুন ও চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।

▶ গুজব ও ভুল তথ্য এড়ানো : শুধু বিশ্বস্ত ও সরকারি উৎস থেকে তথ্য গ্রহণ করুন এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়ানো থেকে বিরত থাকুন।

* সঠিক ব্যবস্থাপনা

সরকারি স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র ও হাসপাতালে এখন কোভিড শনাক্তকরণ ও চিকিৎসার সুবিধা রয়েছে। হালকা উপসর্গ থাকলে বাসায় বিশ্রাম, তরল গ্রহণ এবং চিকিৎসকের পরামর্শ যথেষ্ট (প্রয়োজনে যোগাযোগ করুন, স্বাস্থ্য বাতায়ন নম্বর : ১৬২৬৩)। তবে শ্বাসকষ্ট বা অক্সিজেন কমে গেলে দ্রুত হাসপাতালে যাওয়া এবং চিকিৎসকের পরামর্শ জরুরি। কোভিড-১৯ এখনো শেষ হয়ে যায়নি, বরং এটি নিয়মিত পর্যবেক্ষণ ও সতর্কতার মধ্যে রাখতে হবে।

মৌসুমি ইনফ্লুয়েঞ্জা : মৌসুম পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে বাড়তে থাকে সর্দি-জ্বর, হাঁচি-কাশির প্রকোপ। এসবের পেছনে অন্যতম একটি কারণ হলো মৌসুমি ইনফ্লুয়েঞ্জা (Seasonal Influeza)। এটি একটি ভাইরাসজনিত রোগ এবং বছরে একবার আবহাওয়ার পরিবর্তনের সময় সাধারণত বাংলাদেশে বছরের এ সময়টাতে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে। যদিও অনেকেই এটিকে সাধারণ ঠান্ডা জ্বর মনে করেন, তবে এটি গুরুতর শ্বাসতন্ত্রের সংক্রমণ হিসাবে জটিল আকার ধারণ করতে পারে, বিশেষ করে শিশু, বৃদ্ধ ও অসুস্থদের জন্য। এটি মূলত হাঁচি-কাশির মাধ্যমে ছড়ায় এবং খুব সহজেই এক ব্যক্তি থেকে অন্য ব্যক্তিতে সংক্রমিত হয়।

* লক্ষণ

▶ হঠাৎ জ্বর (৩৮° সেলসিয়াস / ১০০.৪° ফারেনহাইট বা তার বেশি)।

▶ কাশি (শুষ্ক বা কফযুক্ত)।

▶ গলা ব্যথা, সর্দি ও নাক বন্ধ।

▶ মাথাব্যথা ও পেশিতে ব্যথা।

▶ দুর্বলতা বা অবসাদ।

▶ শিশু ও বৃদ্ধদের ক্ষেত্রে শ্বাসকষ্ট ও ফুসফুসে সংক্রমণ।

* অধিক ঝুঁকিপূর্ণ গোষ্ঠী

▶ ৫ বছরের কম বয়সি শিশু।

▶ ৬৫ বছরের বেশি বয়সি ব্যক্তি।

▶ গর্ভবতী নারী।

▶ যাদের দীর্ঘস্থায়ী অসুস্থতা আছে (ডায়াবেটিস, হৃদরোগ, হাঁপানি, কিডনি রোগ প্রভৃতি)।

▶ রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম, এমন ব্যক্তি।

* সচেতনতামূলক ব্যবস্থা

▶ হাঁচি-কাশির শিষ্টাচার মেনে চলুন : হাত বা টিস্যু পেপার ব্যবহার করে মুখ ঢেকে কাশি বা হাঁচি দিন এবং ব্যবহৃত টিস্যু যথাযথভাবে ফেলে দিন।

▶ নিয়মিত হাত ধুয়ে ফেলুন : সাবান ও পানি দিয়ে কমপক্ষে অন্তত ২০ সেকেন্ড ধরে হাত ধোয়া জরুরি, বিশেষ করে নাক-মুখ স্পর্শ করার আগে ও পরে।

▶ জনসমাগম এড়িয়ে চলুন : ইনফ্লুয়েঞ্জা আক্রান্ত ব্যক্তি যেন স্কুল, অফিস বা জনবহুল স্থানে না যায় এবং বাসায় বিশ্রামে থাকে।

▶ মাস্ক ব্যবহার করুন : কাশি-জ্বর বা সর্দি থাকলে মাস্ক ব্যবহার করুন যেন অন্যদের সংক্রমণ না হয়।

▶ পুষ্টিকর খাবার ও পর্যাপ্ত বিশ্রাম নিন : রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে স্বাস্থ্যকর খাদ্য ও ঘুম গুরুত্বপূর্ণ।

* চিকিৎসা ও ব্যবস্থাপনা

▶ ইনফ্লুয়েঞ্জা সাধারণত ৫-৭ দিনের মধ্যে সেরে যায়। এ সময় প্রচুর তরল পান, প্যারাসিটামল সেবন এবং বিশ্রাম নেওয়া উচিত।

▶ তবে দীর্ঘস্থায়ী জ্বর, শ্বাসকষ্ট, বুকে চাপ বা শিশুদের ক্ষেত্রে খাওয়া বন্ধ হয়ে গেলে অবিলম্বে চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে।

▶ উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণদের জন্য প্রতি বছর ইনফ্লুয়েঞ্জা ভ্যাকসিন গ্রহণ একটি কার্যকর প্রতিরোধ ব্যবস্থা।

▶ উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণদের চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে।

ইনফ্লুয়েঞ্জা কোনো সাধারণ ঠান্ডা নয়। এটি সঠিকভাবে প্রতিরোধ না করলে ব্যক্তিগত ও পারিবারিক স্বাস্থ্য ঝুঁকির কারণ হতে পারে। তাই মৌসুমের আগে থেকেই সতর্ক থাকা, ভ্যাকসিন গ্রহণ, স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা এবং সংক্রমণের লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া-এসবই ইনফ্লুয়েঞ্জার বিরুদ্ধে একটি সচেতন ও কার্যকর প্রতিরোধ।

জনসচেতনতা ও করণীয়

বর্ষার আগমনে এডিস মশাবাহিত ডেঙ্গুর সংক্রমণ আশঙ্কাজনকভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে। বিভিন্ন জায়গায় জমে থাকা পানি, অপরিষ্কার পরিবেশ এবং জনসচেতনতার অভাব এর বিস্তারে ভূমিকা রাখছে। প্রতি বছর ডেঙ্গু জ্বর জটিল রূপ নিয়ে বহু মানুষের মৃত্যু ও হাসপাতালে ভর্তি বাড়িয়ে তোলে। যদিও কোভিড-১৯ মহামারির তীব্রতা হ্রাস পেয়েছে, তবে নতুন ভ্যারিয়েন্টের মাধ্যমে মাঝে মাঝে সংক্রমণ বৃদ্ধি লক্ষ করা যাচ্ছে। টিকাদান ও জনসচেতনতা থাকলেও, সর্দি-কাশি ও জ্বর নিয়ে কোভিড পরীক্ষা ও স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার প্রবণতা কমে যাচ্ছে-যা আবার ঝুঁকি বাড়াতে পারে। অন্যদিকে মৌসুমি ইনফ্লুয়েঞ্জা, সাধারণত বাংলাদেশে বছরের এ সময়টাতে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে। এ সময় ইনফ্লুয়েঞ্জার প্রকোপও দেখা দিচ্ছে। শিশু, বৃদ্ধ ও অসুস্থদের মধ্যে শ্বাসতন্ত্রের সংক্রমণ বাড়ছে। উপসর্গগুলো কোভিডের সঙ্গে মিল থাকায় সচেতনতা ও পরীক্ষার প্রয়োজনীয়তা এখনো অপরিহার্য। এ তিনটি সংক্রমণই জনস্বাস্থ্যের জন্য চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে। সচেতনতা, ব্যক্তিগত সুরক্ষা, সঠিক সময়ে চিকিৎসা গ্রহণ এবং জনস্বাস্থ্য নির্দেশিকা মেনে চলা জরুরি।

লেখক : পাবলিক হেল্থ বিশেষজ্ঞ।

ডেঙ্গু

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম