Logo
Logo
×

Advertisement

সুরঞ্জনা

বাল্যবিয়ে রোধ এবং কন্যাশিশুর অধিকার রক্ষায় বিনিয়োগ

Advertisement

Icon

রুকাইয়া সাওম লীনা

প্রকাশ: ০৫ অক্টোবর ২০২৬, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

Advertisement

আগামী ১১ অক্টোবর বিশ্বজুড়ে পালিত হবে ‘আন্তর্জাতিক কন্যাশিশু দিবস’। এবারের প্রতিপাদ্য হলো ‘বাল্যবিয়ে রোধ করুন এবং কন্যাশিশুদের অধিকার রক্ষায় বিনিয়োগ করুন।’ বিশ্বজুড়ে প্রতি পাঁচজন কন্যাশিশুর মধ্যে একজনের ১৮ বছর পূর্ণ হওয়ার আগেই বিয়ে হয়ে যায়; সব মিলিয়ে এর সংখ্যা প্রায় ৬৫০ মিলিয়ন (৬৫ কোটি)। জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ কর্তৃক ২০১১ সালের ডিসেম্বরে গৃহীত ৬৬/১৭০ নম্বর প্রস্তাবের মাধ্যমে ২০১২ সালে প্রথমবার পালিত হয় ‘আন্তর্জাতিক কন্যাশিশু দিবস’।

মেয়েশিশু বলে সে কী করতে পারবে, কোথায় যেতে পারবে বা ভবিষ্যতে কী হয়ে উঠবে-সমাজ বা পরিবার বা অন্য কেউ এসব ঠিক করে দিতে পারে না। অথচ বিশ্বের কোটি কোটি কন্যাশিশুর ক্ষেত্রে বাস্তবতা এখনো এমনই। কয়েক দশক ধরে অনেক অগ্রগতি হওয়ার পরও অসংখ্য কন্যাশিশু বৈষম্য, সহিংসতা, দারিদ্র্য ও সংঘাতের শিকার হচ্ছে; এসব একজন শিশু বা মানুষ হিসাবে তার অধিকার থেকে বঞ্চিত করে, তাদের পছন্দ বা সিদ্ধান্ত গ্রহণের স্বাধীনতাকে সংকুচিত করে এবং সুযোগ-সুবিধাকে সীমিত করে দেয়। কন্যাশিশুদের জন্য বিনিয়োগ করা বলতে বোঝায় কন্যাশিশুকে গুরুত্ব দেয় এমন পরিবার, সম্প্রদায় এবং আরও স্থিতিস্থাপক সমাজ গড়ে তোলার অন্যতম কার্যকর উপায়। তা না হলে আরও অনেক মেয়ে পিছিয়ে পড়বে। প্রতিটি কন্যাশিশুর একটি সুন্দর শৈশব পাওয়ার অধিকার রয়েছে। রয়েছে শিক্ষা ও বিকাশের সুযোগ পাওয়ার অধিকার, নিজের সিদ্ধান্ত নিজে নেওয়া এবং নিজের ভবিষ্যৎ নিজেই গড়ে তোলার স্বাধীনতা। এসবই প্রতিটি কন্যাশিশুর প্রাপ্য। অথচ আজও লাখ লাখ মেয়ে সেই অধিকার থেকে বঞ্চিত।

ইউনিসেফের ২০২৬ সালের সমীক্ষা অনুযায়ী, বিশ্বজুড়ে প্রতি পাঁচজন কন্যাশিশুর মধ্যে একজনের বিয়ে ১৮ বছর পূর্ণ হওয়ার আগেই হয়ে যায়। এর অর্থ হলো, বর্তমানে জীবিত প্রায় ৬৫০ মিলিয়ন নারী ও কিশোরীর বিয়ে হয়েছিল শৈশবে। ১৫-১৯ বছর বয়সি যেসব মেয়ে বিবাহিত বা কোনো সঙ্গীর সঙ্গে সম্পর্কে জড়িয়েছে, তাদের মধ্যে প্রায় প্রতি চারজনের একজন জীবনে কোনো না কোনো সময় অন্তরঙ্গ সঙ্গীর দ্বারা সহিংসতার শিকার হয়েছে। সংকট, সংঘাত এবং গৃহহীনতার মতো পরিস্থিতি মেয়েদের ক্ষেত্রে বাল্যবিয়ে, যৌন সহিংসতা এবং মাতৃমৃত্যুর ঝুঁকি বাড়িয়ে চলেছে। ১৫-১৯ বছর বয়সি ছেলেদের তুলনায় সম বয়সি মেয়েদের শিক্ষা, কর্মসংস্থান বা প্রশিক্ষণের বাইরে থাকার সম্ভাবনা দ্বিগুণ। অস্থিতিশীল, সংঘাতপূর্ণ ও সহিংসতাকবলিত এলাকায় বসবাসকারী মেয়েদের মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের বাইরে থাকার আশঙ্কা স্থিতিশীল বা স্বাভাবিক এলাকার মেয়েদের তুলনায় প্রায় ৯০ শতাংশ বেশি; যা তাদের বাল্যবিয়ের ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়।

‘আন্তর্জাতিক কন্যাশিশু দিবস’ উপলক্ষ্যে বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের সভাপতি ডা. ফওজিয়া মোসলেম বলেন, ‘কন্যাশিশু দিবস উপলক্ষ্যে সব কন্যা এবং নারীকে শুভেচ্ছা জানাই। তবে শুভেচ্ছা যতই জানাই না কেন, আমরা তো জানি, আজ কন্যাদের অত্যন্ত সংকটের মধ্যদিয়ে দিন পার করতে হচ্ছে। প্রতিদিনের পত্রিকা খুললেই দেখছি কন্যা নির্যাতন, যৌন সহিংসতাসহ নানা সহিংসতার চরম চিত্র। ধর্ষণের মতো জঘন্য সহিংসতার শিকারও আমাদের কন্যাশিশুরা ক্রমাগত হয়ে যাচ্ছে। বর্তমান সময়ে আমাদের কন্যাদের জন্য এ সহিংসতা ও নিরাপত্তার কোনো স্থায়ী সমাধান দেখতে পাচ্ছি না। সহিংসতা, বাল্যবিয়ে এবং স্বাস্থ্য সুরক্ষার অভাব-এ তিনটি বিষয় আজ কন্যাশিশুর জীবনের জন্য অত্যন্ত জরুরি সংকট হয়ে দাঁড়িয়েছে। শুধু সহিংসতাই নয়, ইদানীং কন্যাশিশু হত্যার হারও অনেক বৃদ্ধি পেয়েছে। পারিবারিক শত্রুতার কারণে হোক কিংবা সহিংসতার জের ধরে, কন্যাদের হত্যা করে ফেলা হচ্ছে। যে সন্তানদের জন্য আমরা ভবিষ্যৎ বিনির্মাণ করতে চাই, আজকের এ বাস্তবতায় আমরা তাদের সামনে নিজেরা অপরাধী হয়ে দাঁড়িয়েছি। আজকের দিনে নিরাপত্তা, বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ এবং স্বাস্থ্য সুরক্ষা-কোনোটিই সঠিকভাবে নিশ্চিত করা যাচ্ছে না। তার ওপর এ ব্যাপক হারে ঘটা হত্যা আরেকটি বড় সংকট তৈরি করছে। ঘরে, বাইরে, কর্মস্থলে, রাস্তাঘাটে বা হাটে-বাজারে-কোথাও সাধারণ মানুষের নিরাপত্তাই নেই। আর এ নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে কন্যাশিশুদের জীবন আরও অনেক বেশি ঝুঁকির মুখে পড়েছে। তাই সব মিলিয়ে বলা যায়, গোটা সমাজ, মানবাধিকার কর্মী এবং রাষ্ট্র-আমরা সবাই আমাদের কন্যাশিশুদের কাছে অপরাধী হয়ে দাঁড়িয়েছি।’

এ বিষয়ে কথা হলো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞানের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান ড. ফাতেমা রেজিনা ইকবালের সঙ্গে। তিনি বললেন, আগামী ১১ অক্টোবর বিশ্ব কন্যাশিশু দিবস। এ দিবসটির তাৎপর্য অপরিসীম। পৃথিবীর সৃষ্টির শুরু থেকেই যদি আমরা চিন্তা করি, সমাজবিজ্ঞানীদের গবেষণায় দেখা গেছে, আদিকালে সমাজ ছিল মাতৃতান্ত্রিক; সমাজ পরিচালিত হতো নারীদের দ্বারা। তারা সিদ্ধান্ত নিত এবং সমাজে তাদের সুযোগ-সুবিধাও আলাদা ছিল। পরবর্তী সময়ে কৃষি আবিষ্কারের পর থেকে ধীরে ধীরে নারীদের অবস্থান পরিবর্তিত হতে শুরু করে এবং ছেলে-সন্তানের আকাঙ্ক্ষা বাড়তে থাকে। আজ যদি আমরা বছরে অন্তত একটি দিন বিশ্ব বা আন্তর্জাতিক কন্যাশিশু দিবস হিসাবে বিশেষভাবে পালন করি, তবে যেসব পরিবারে কন্যাসন্তান রয়েছে, তারা অনুধাবন করতে পারবে, এ কন্যাসন্তানরা আমাদের বোঝা নয়-তারা আমাদের ‘সম্পদ’। কন্যাশিশুদের প্রতি সমাজের যে বড় দায়িত্ব রয়েছে, তা অনুধাবন করাই এ দিবসের মূল উদ্দেশ্য হওয়া উচিত। এখনো সমাজে দেখা যায়, পুত্র ও কন্যাসন্তান সমান সুযোগ পেয়েও উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে কন্যাদের অনেক সময় বঞ্চিত হতে হয়; কারণ অনেকেই চিন্তা করেন পুত্রসন্তানই ভবিষ্যতে আয়ের মাধ্যম বা ‘বৃদ্ধ বয়সের লাঠি’ হবে। অথচ বাস্তব অভিজ্ঞতায় দেখা যায়, বয়োজ্যেষ্ঠ পিতা-মাতার খেয়াল রাখা বা সার্বিক যত্ন নেওয়ার ক্ষেত্রে মেয়েরাই সবচেয়ে এগিয়ে থাকে। এ দিবসের সঠিক বার্তা ছড়িয়ে দিতে আমাদের কয়েকটি পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন বলে আমি মনে করি। পরিবার থেকেই কন্যাদের গুরুত্ব দিতে হবে। বাবা-মায়ের উচিত প্রতিবছর এ দিনে কন্যাকে ভালোবাসা ও শুভেচ্ছা জানানো এবং তাকে সম্মানিত বোধ করানো। উপহারস্বরূপ একটি ফুল দিয়ে হলেও তাকে বোঝানো উচিত, আমরা তাকে নিয়ে গর্বিত। স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে রচনা প্রতিযোগিতা, বিতর্ক কিংবা সচেতনতামূলক আলোচনার আয়োজন করা যেতে পারে, যেন শিক্ষার্থীরা কন্যাশিশুর তাৎপর্য ও গুরুত্ব অনুধাবন করতে পারে। রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে সেমিনার, সিম্পোজিয়াম ও বিভিন্ন সফল নারীদের জীবনের উদাহরণ তুলে ধরা প্রয়োজন। পাশাপাশি ছোট ছোট শর্টফিল্ম বা নাটকের মাধ্যমে সমাজে ইতিবাচক মনোভাব তৈরিতে আলোকপাত করা যেতে পারে। আমরা যদি পারিবারিক, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয়ভাবে এ দিবসের গুরুত্ব সঠিকভাবে তুলে ধরতে পারি এবং তা উদ্যাপনে সক্রিয় হই, তবেই সমাজ সত্যিকারের অর্থে এ দিবসের মূল বার্তাটি অনুধাবন করতে সক্ষম হবে।’

কন্যাশিশু দিবস পালনের মূল লক্ষ্যগুলো হলো-

* কন্যাশিশুর জন্য শিক্ষার সমান সুযোগ নিশ্চিত করা;

* লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতা বন্ধ করা;

* বিশেষায়িত স্বাস্থ্যসেবা প্রদান;

* কৈশোর থেকে যৌবনে পদার্পণের সময় কিশোরীদের

সহায়তা করা।

আশা করি, আমাদের পরিবার থেকে সমাজ এবং সমাজ থেকে রাষ্ট্র-এ বিষয়ে আন্তরিক ও আরও বেশি সচেতন হবে। তবেই কন্যাশিশুর জন্য আমরা একটি নিরাপদ দেশ গড়তে সক্ষম হব।

Advertisement

Advertisement

আরও পড়ুন

বাল্যবিয়ে রোধ এবং কন্যাশিশুর অধিকার রক্ষায় বিনিয়োগ

বাল্যবিয়ে রোধ এবং কন্যাশিশুর অধিকার রক্ষায় বিনিয়োগ

অর্জন জাতিসংঘের অভিজ্ঞতায় ঋদ্ধ জাইমা রহমান

জাতিসংঘের অভিজ্ঞতায় ঋদ্ধ জাইমা রহমান

যাই তবু এগিয়ে মরক্কোর প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী ফাতিমা জাহরা

মরক্কোর প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী ফাতিমা জাহরা

নারী সংবাদ নারী উদ্যোক্তার গল্প নিয়ে ‘চলো এগিয়ে যাই’

নারী উদ্যোক্তার গল্প নিয়ে ‘চলো এগিয়ে যাই’

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম