Logo
Logo
×

সুরঞ্জনা

নারীর প্রতি সহিংসতা কতটুকু কমেছে

Icon

উপমা ইসলাম রূপা

প্রকাশ: ১৮ নভেম্বর ২০২৪, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

নারীর প্রতি সহিংস আচরণ বা সহিংসতা নতুন কিছু নয়; পৃথিবীর ইতিহাসের শুরু থেকেই নারী নানাভাবে সহিংসতার মুখোমুখি হয়েছেন। নারীর ভ্রূণ হত্যা থেকে শুরু করে এ সহিংসতার রয়েছে লম্বা ইতিহাস। বিশ্বে নারীর প্রতি সহিংসতার সমস্যাটি গভীরভাবে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও এ সমস্যাটির প্রকট চিত্র দেখা যায়। পরিবার থেকে সমাজ এবং সমাজ থেকে রাষ্ট্রের সর্বত্র। নারী নির্যাতনের বিষয়টি সমাধানের চেষ্টা করা হলেও ফলপ্রসূ সমাধান মিলছে কমই। কালের বিবর্তন এবং ঘটনার পরিক্রমায় বরং নির্যাতনের মাত্রা ও ধরন ভিন্নরূপ লাভ করেছে।

নারীর প্রতি সহিংসতা ব্যক্তি এবং রাষ্ট্র, উভয় দ্বারাই সংঘটিত হয়ে থাকে। ধর্ষণ, পারিবারিক নির্যাতন, যৌন হয়রানি, প্রজননগত জোরজবরদস্তি, কন্যাশিশু হত্যা, লিঙ্গভিত্তিক গর্ভপাত, প্রসবকালীন সহিংসতা, উচ্ছৃঙ্খল জনতার দ্বারা সহিংসতা বা দাঙ্গা, রীতি বা আচরণগত চর্চা; যেমন-যৌতুক বা পণ, অপহরণপূর্বক বা জোরপূর্বক বিবাহ এ ধরনের সহিংসতাগুলো সাধারণত ব্যক্তি দ্বারা সংঘটিত হয়। রাষ্ট্র কর্তৃক সহিংসতার মধ্যে রয়েছে যুদ্ধকালীন যৌন সহিংসতা, সংঘর্ষের সময় যৌন দাসত্ব, জোরপূর্বক গর্ভপাত, পুলিশ বা কর্তৃত্বকারী কর্মকর্তা-কর্মচারী দ্বারা সংঘটিত সহিংসতা ইত্যাদি। অপরাধচক্রের দ্বারা সংঘটিত সহিংসতার মধ্যে রয়েছে নারী পাচার, জোরপূর্বক পতিতাবৃত্তি, সাইবার ক্রাইম, সাইবার বুলিং ইত্যাদি।

বাংলাদেশে সাধারণত ধর্ষণ, যৌন নির্যাতন, শারীরিক নির্যাতন, পাচার, পতিতাবৃত্তি, যৌতুক, অ্যাসিড নিক্ষেপ, মারাত্মক জখমসহ খুনের মতো জঘন্য অপরাধ নারীর বিরুদ্ধে ঘটে থাকে, যা আমাদের জন্য সত্যিই লজ্জাস্করও বটে। বাংলাদেশে পুরুষতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থার কারণে নারী সমাজে পুরুষের অধীনে থাকে এবং অনেক ক্ষেত্রে এ বিষয়টি সহিংসতার প্রধান নিয়ামক হিসাবে কাজ করে। নারীরা পরিবারে, যেখানে সবচেয়ে নিরাপদে থাকার কথা, সেখানেও তারা নানা ধরনের মানসিক ও শারীরিক নির্যাতন ও বঞ্চনার শিকার হয়ে থাকেন।

ঢাকার একজন উচ্চশিক্ষিত চাকরিজীবী নারী সুমাইয়া হোসাইন (ছদ্মনাম) জানান, দুবছর আগে নিজের পছন্দে বিয়ে করেছিলেন; কিন্তু বিয়ে করার কিছুদিন পর তার সামনে ভিন্ন এক বাস্তবতা হাজির হয়। নিজে পছন্দ করে বিয়ে করেছেন, এটি যেন সুমাইয়ার অপরাধ; তাই কথায় কথায় শাশুড়ি কটাক্ষ করতেন। অন্যদিকে যৌতুকের জন্য স্বামীর হাতেই তিনি প্রতিনিয়ত নির্যাতিত হতেন। নির্যাতন সহ্য করতে না পেরে একপর্যায়ে বিচ্ছেদের পথ বেছে নেন। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এ নারী বলেন, ‘নানা অজুহাতে আমার কাছে মোটা অঙ্কের টাকা দাবি করত। যেহেতু আমি চাকরি করতাম। মাঝে-মধ্যে নির্যাতনের মাত্রা ছাড়িয়ে যেত।’ সুমাইয়া হোসাইনের মতো সহিংসতার শিকার এ রকম আরও অনেক উদাহরণ রয়েছে বাংলাদেশে।

বাংলাদেশে এখনো অধিকাংশ নারী তাদের ভরণপোষণের জন্য সম্পূর্ণভাবে পুরুষের ওপর নির্ভরশীল হওয়ায় নির্যাতনের মাত্রা এখনো প্রকট। বিশেষ করে গ্রামীণ সমাজব্যবস্থায়; যেখানে নারীদের কর্মসংস্থানের জন্য বিশেষ কোনো সুযোগ নেই। এছাড়া শহরকেন্দ্রিক জীবনযাপনে অভ্যস্ত অনেক নারী নিজে উপার্জন না করার কারণে স্বামীসহ শ্বশুরবাড়ির লোকজন দ্বারা প্রতিনিয়তই কটাক্ষের শিকার হন।

ঢাকায় বসবাসকারী নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক গৃহিণী বললেন, ‘বিয়ের আগে ভালো একটি চাকরি করতাম। স্বামী চাকরি করা পছন্দ করত না বলে ছেড়ে দিয়েছিলাম। কিন্তু যখন পুরোপুরি সংসারে মনোযোগ দিলাম, এখন নিজের ব্যক্তিগত প্রয়োজনে স্বামীর কাছে টাকা চাইলে খুব খারাপ ব্যবহার করে। কারণে-অকারণে মারতে আসে; অথচ তার কথায়ই চাকরি ছেড়েছিলাম। এখন নিজেকে খুব অসহায় লাগে।’

২০২২ সালের ১৮ মে ঢাকার একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের এক নারী শিক্ষার্থী ভোরে নরসিংদী রেলস্টেশনে অপেক্ষার সময় জিন্স ও টপস পরার কারণে তিনি এবং তার দুই বন্ধু গালিগালাজ ও মারধরের শিকার হন। স্টেশনমাস্টারের কক্ষে গিয়ে তারা আশ্রয় নিয়েছিলেন। ভুক্তভোগী তরুণী জাতীয় জরুরি সেবা নম্বর ৯৯৯-এ কল দিলে নরসিংদী মডেল থানার পুলিশ রেলস্টেশনে গিয়ে তাদের উদ্ধার করেন।

চলতি বছর কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতে এক নারীর হেনস্তার চিত্র ভাইরাল হয় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। রাজধানীর কোনো এক সিগন্যালে গাড়ির মধ্যে বসে থাকা অবস্থায় ওড়না না পরার অপরাধে হেনস্তার শিকার হয়েছেন বলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অভিযোগ করেন আরেক নারী। এসব চিত্র অপ্রত্যাশিত হলেও নতুন কিছু নয়। মানবাধিকার কর্মীরা বলছেন, নারী নির্যাতনের বিরুদ্ধে কঠোর আইন থাকলেও নারীর প্রতি সহিংসতা কমছে না, বরং সাম্প্রতিক বছরগুলোতে পরিবারে এবং অনলাইনে নারী নির্যাতন বেড়েছে। বাংলাদেশে পুলিশের পরিসংখ্যানে দেখা যাচ্ছে, গত পাঁচ বছরে নারীর প্রতি সহিংসতার মামলা কমেনি।

নারীর প্রতি সহিসংতা প্রতিরোধে সমাজ এবং রাষ্ট্রের করণীয় সম্পর্কে মহিলা পরিষদের সভানেত্রী ডা. ফওজিয়া মোসলেম বললেন, ‘নারীর প্রতি সহিংসতার বিষয়টি একই সঙ্গে সমাজ ও রাষ্ট্রের দায়বদ্ধতার বিষয়। কারণ, সহিংসতার মাধ্যমেই নারীর অগ্রগতির পথ রুদ্ধ হচ্ছে। নারী যখন দক্ষতার সঙ্গে সব জায়গায় কাজ করার সুযোগ পাচ্ছে, তখনই দক্ষতা প্রমাণ করে এগিয়ে যাচ্ছে। এ এগিয়ে যাওয়া নারীর একার অগ্রগতি নয়, বরং সমাজ, রাষ্ট্র ও দেশেরও অগ্রগতি। আমাদের পোশাক খাতসহ ফুটবলে মেয়েরা যেভাবে সম্মান বয়ে নিয়ে এসেছে, এ রকম সর্বত্রই নারী যখন সাফল্য নিয়ে আসে, তখন সেই সাফল্যের পালক সমাজ ও রাষ্ট্রের গঠনেও অবদান রাখে। কিন্তু সহিংসতাই যখন নারীর সফলতাকে বাধাগ্রস্ত করে, তখন এ বাধা দূর করতে সমাজ ও রাষ্ট্রের এগিয়ে আসা উচিত।’ তিনি আরও বলেন, ‘নারীর ব্যক্তিগত অধিকার আমাদের দেশের সংবিধান এবং আইনে স্বীকৃত নেই, কাজেই সমাজেও স্বীকৃত হচ্ছে না। নারীর ব্যক্তিগত অধিকার স্বীকৃত হচ্ছে না বলে সরকার ঈঊউঅড সনদ (নারীর প্রতি বৈষম্য বিলোপ সনদ) সংরক্ষণ প্রত্যাহার করছে না। তাই ঈঊউঅড সনদ সংরক্ষণ প্রত্যাহার করে নারীর ব্যক্তিগত অধিকার নিশ্চিত করার জন্য; যেমন-সম্পত্তিতে নারীর উত্তরাধিকার প্রতিষ্ঠা করা, বিয়ে, বিবাহ বিচ্ছেদ, সন্তানের অভিভাবকত্ব ইত্যাদি তাকে বুঝিয়ে দিতে হবে।’

ডা. ফওজিয়া মোসলেম আরও বলেন, ‘এ ছাড়া সম্প্রতি নারীর পোশাক, চালচলন নিয়ে যেসব সহিংসতা হয়েছে ও নারীর প্রতি পশ্চাৎপদ সংস্কৃতির যে পরিচয় আমরা দেখলাম, তাতে আমরা হতবাক হয়েছি। এটাকে অবশ্যই গুরুত্বসহকারে নিতে হবে। নারী বৈষম্যের একটা বড় কারণ হচ্ছে দীর্ঘদিন ধরে নারীবিরোধী আইন এবং বৈষম্যমূলক আইন ছিল। সেই বৈষম্যমূলক আচরণের মধ্য দিয়ে কতগুলো সামাজিক রীতি, সাংস্কৃতিক চেতনা আমরা বহন করে চলেছি, সেখানে আমাদের পরিবর্তন আনা প্রয়োজন। কাজেই নারীর প্রতি সহিংসতা কমাতে যেমন নারী আন্দোলনের দায় আছে, তেমনি দায় আছে সমাজের এবং সবচেয়ে বড় দায় আছে রাষ্ট্রের। এ সহিংসতা বন্ধের জন্য আইনের কঠোর প্রয়োগ যেমন দরকার, তেমনি সামাজিক সচেতনতাও প্রয়োজন।’

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম