Logo
Logo
×
   

Advertisement

দশ দিগন্ত

যুক্তরাজ্যের রাজনীতিতে অনিশ্চয়তা

স্টারমারের জনপ্রিয়তায় ধস কেন

Advertisement

Icon

যুগান্তর ডেস্ক

প্রকাশ: ২৩ জুন ২০২৬, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

স্টারমারের জনপ্রিয়তায় ধস কেন

Advertisement

মাত্র দুবছর আগে ব্রিটেনের রাজনৈতিক অঙ্গনে পরিবর্তনের বার্তাবাহক হিসাবে আবির্ভূত হয়েছিলেন কিয়ার স্টারমার। ২০২৪ সালের নির্বাচনে বিপুল জয়ের মাধ্যমে ১৪ বছরের কনজারভেটিভ শাসনের অবসান ঘটিয়ে ক্ষমতায় আসে তার নেতৃত্বাধীন লেবার পার্টি। কিন্তু খুব দ্রুতই ক্ষয়ে যেতে শুরু করে সেই জনসমর্থন। প্রতিরক্ষা ব্যয় বৃদ্ধি, জনকল্যাণ খাতে কাটছাঁট, অভিবাসন নিয়ে বিতর্ক, ফিলিস্তিন ইস্যুতে সমালোচনা, ইউক্রেনকে দৃঢ় সমর্থন এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক বিতর্কের কারণে স্টারমারের জনপ্রিয়তায় ধস নামে। এ অবস্থায় সোমবার তিনি নেতৃত্ব ছাড়ার ঘোষণা দেন। স্টারমারসহ মাত্র ১০ বছরে ৬ প্রধানমন্ত্রীর রদবদল ঘটেছে দেশটিতে। রুশ গণমাধ্যম আরটি প্রতিবেদনে তার রাজনৈতিক পতনের কারণ তুলে ধরার চেষ্টা করা হয়েছে।

স্টারমার কতটা অজনপ্রিয় ছিলেন?

স্টারমারের জনপ্রিয়তা খুব বেশিদিন স্থায়ী ছিল না। নির্বাচনের এক মাসের মধ্যেই তার মোট জনসমর্থন ৭ শতাংশ থেকে শূন্যে নেমে আসে। ৫২ শতাংশ ব্রিটিশ নাগরিক ইপসোসকে জানান, তাদের মতে দেশটি ‘ভুল পথে’ এগোচ্ছে। জরিপ সংস্থা ইউগভ জানায়, তাদের জরিপ স্কেলে স্টারমারের জনসমর্থন ছিল ৪৮, যা যুক্তরাজ্যের সাম্প্রতিক ইতিহাসে তাকে অজনপ্রিয় প্রধানমন্ত্রীদের একজন হিসাবে চিহ্নিত করে।

কর বৃদ্ধি ও ব্যয় সংকোচন নীতি ব্যর্থ

২০২৪ সালে ক্ষমতায় আসার পর জাতির উদ্দেশে দেওয়া প্রথম ভাষণে কর কমানোর প্রতিশ্রুতি দিলেও তা পূরণে ব্যর্থ হন স্টারমার। দেশটিতে একের পর এক কর বৃদ্ধি করে তার সরকার। ব্রিটিশ করদাতা সংগঠন ট্যাক্সপেয়ার্স অ্যালায়েন্সের তথ্যানুযায়ী, ২০২৪ সালের জুলাই থেকে ২০২৫ সালের নভেম্বর পর্যন্ত প্রতি ১০ দিনে একটি নতুন কর আরোপ বা পুরোনো কর বাড়িয়েছে স্টারমারের সরকার। স্টারমারের আগে রক্ষণশীল সরকারগুলোর আমলেই ব্রিটেনে জীবনযাত্রার মানের অবনতি, জ্বালানি ব্যয় বৃদ্ধি এবং উচ্চ মূল্যস্ফীতির সমস্যা দেখা দিয়েছিল। অনেক

ভোটার আশা করেছিলেন, নতুন সরকার তাদের ওপর থাকা অর্থনৈতিক চাপ কমাবে। কিন্তু তার পরিবর্তে স্টারমার সরকার জনকল্যাণ খাতে ব্যাপক ব্যয় সংকোচনের ঘোষণা দেয়।

বাগ্স্বাধীনতা ও অভিবাসন ইস্যুতে বিতর্ক

২০২৪ সালের শেষদিকে অভিবাসনবিরোধী সহিংস বিক্ষোভ মোকাবিলায় স্টারমার সরকারের পদক্ষেপ ব্যাপক বিতর্কের জন্ম দেয়। সে সময় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অভিবাসনবিরোধী পোস্ট দেওয়ার অভিযোগে শতশত মানুষকে গ্রেফতার করা হয়। কারাগারে জায়গা খালি করতে কিছু সহিংস অপরাধীকে আগাম মুক্তি দেওয়া হয়, যাতে বিক্ষোভে জড়িত ব্যক্তি ও তাদের অনলাইন সমর্থকদের কারাবন্দি করা যায়। এছাড়া স্টারমারের সমর্থিত অনলাইন সেফটি বিলও (অনলাইনে ক্ষতিকর ও অবৈধ কনটেন্ট নিয়ন্ত্রণ বিল) ব্যাপক বিতর্কের জন্ম দেয়। সমালোচকদের দাবি, এ আইন ব্রিটেনে বাগ্স্বাধীনতা আরও সীমিত করবে। সমালোচকদের মতে, এসব বিতর্কের পাশাপাশি অবৈধ অভিবাসন কমাতে ব্যর্থ হওয়াও স্টারমার সরকারের জন্য বড় রাজনৈতিক ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

ফিলিস্তিন ইস্যু

২০২০ সালে লেবার পার্টির নেতৃত্ব গ্রহণের পর দলের সাবেক নেতা জেরেমি করবিনের ফিলিস্তিনপন্থি নীতিগুলো বর্জন করেন স্টারমার। এছাড়া ২০২৩ সালের শেষদিকে গাজায় যুদ্ধ চলাকালে দলীয় অনেক সদস্য যুদ্ধবিরতির আহ্বান জানালেও স্টারমার তা সমর্থন করেননি। বরং তিনি প্রকাশ্যে ইসরাইলের নিরাপত্তা পদক্ষেপের প্রতি সমর্থন জানান, যা দলটির বামপন্থি ও মুসলিম সমর্থকদের একাংশের মধ্যে অসন্তোষ সৃষ্টি করে। পরে অবশ্য তিনি অবস্থান পরিবর্তন করে গাজায় যুদ্ধবিরতি এবং ইসরাইল-ফিলিস্তিন সংঘাতের দ্বিরাষ্ট্রভিত্তিক সমাধানের পক্ষে সমর্থন জানান। তবে সমালোচকদের মতে, ততদিনে অনেক মুসলিম ও বামপন্থি ভোটার তার দল থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিলেন।

এপস্টেইন ফাইল নিয়ে বিতর্ক

স্টারমারের ভাবমূর্তি সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত করেছে বিতর্কিত এপস্টেইন ফাইল। পিটার ম্যান্ডেলসন ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত স্টারমারের মার্কিন রাষ্ট্রদূত হিসাবে দায়িত্ব পালন করেন। কুখ্যাত যৌন অপরাধী জেফরি এপস্টেইনের সঙ্গে তার দীর্ঘদিনের সম্পর্ক প্রকাশ্যে আসার পর ম্যান্ডেলসনকে পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়। বিভিন্ন প্রতিবেদন অনুযায়ী, রাষ্ট্রদূত হিসাবে নিয়োগ দেওয়ার সময় স্টারমার ম্যান্ডেলসনের এপস্টেইন-সংযোগ সম্পর্কে অবগত ছিলেন।

গত ১০ বছরে ৬ প্রধানমন্ত্রী ব্রিটেনে

গত এক দশকে যুক্তরাজ্যের রাজনৈতিক নেতৃত্বে একের পর এক পরিবর্তন ঘটেছে। মাত্র ১০ বছরে ৬ প্রধানমন্ত্রীর রদবদল ঘটেছে। নেতৃত্বের এই ঘনঘন পরিবর্তন কেবল ক্ষমতার রদবদল

নয় বরং রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা, অর্থনৈতিক চাপ এবং দলীয় বিভাজনেরও প্রতিফলন। ২০১৬ সালে ইউরোপীয় ইউনিয়নে থাকার পক্ষে প্রচারণা চালিয়ে ব্রেক্সিট গণভোটে হেরে

যাওয়ার পর পদত্যাগ করেন ডেভিড ক্যামেরন। এরপর থেরেসা মে দায়িত্ব নেন এবং ব্রেক্সিট বাস্তবায়নের চেষ্টা করেন। কিন্তু তার সমঝোতা চুক্তি বারবার সংসদে ব্যর্থ হওয়ায় ২০১৯ সালে পদত্যাগ করতে বাধ্য হন তিনি। বরিস জনসন ২০১৯ সালে প্রধানমন্ত্রী হয়ে ব্রেক্সিট সম্পন্ন করেন। তবে ধারাবাহিক কেলেঙ্কারি এবং মন্ত্রীদের পদত্যাগের ঢেউ তার সরকার দুর্বল করে তোলে। ফলে ২০২২ সালে পদত্যাগ করেন বরিস জনসন। একই বছরে লিজ ট্রাস দায়িত্ব নিয়ে কর কমানোর পরিকল্পনা ঘোষণার পর বাজারে তীব্র অস্থিরতা দেখা দেয় এবং মাত্র ৪৯ দিনের মাথায় তিনি পদত্যাগ করেন। পরবর্তীতে ২০২৪ সালের সাধারণ নির্বাচনে কনজারভেটিভরা বড় ব্যবধানে পরাজিত হওয়ার পর ঋষি সুনাক ক্ষমতা ছাড়েন।

Advertisement

Advertisement

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম