যুক্তরাষ্ট্রের ‘নতুন’ কৌশলে পুরোনো বাধা
যুগান্তর ডেস্ক
প্রকাশ: ২২ আগস্ট ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
ইরানকে একঘরে করতে দশকের পর দশক ধরে কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে আসছে যুক্তরাষ্ট্র। আর এতে কার্যত ব্যর্থ হয়ে গত ২৮ ফেব্রুয়ারি তারা ইসরাইলকে নিয়ে ইরানের ওপর হামলা শুরু করে। এর জেরে যে যুদ্ধ শুরু হয়, সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের আকস্মিক ঘোষণায় তা স্থগিতও হয়ে যায়। এ পর্যায়ে চরম অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার ঘোষণা দেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। নতুন এ ঘোষণা যুক্তরাষ্ট্রের পুরোনো চেষ্টারই পুনরাবৃত্তি দেখা গেছে।
ট্রাম্প এটাকে নতুন নাম দিয়েছেন-‘ইকোনমিক ডি-ডে’ বা নির্ণায়ক অর্থনৈতিক অভিযানের দিন। বিশ্লেষকরা বলছেন, এ প্রচেষ্ঠায় প্রধান বাধা চীন ও রাশিয়া। কারণ, তারা ঘনিষ্ঠ মিত্র ইরানকে এভাবে একঘরে হতে দেবে না; একাও ছাড়বে না। যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইলের সঙ্গে যুদ্ধেও তারা তেহরানের পাশে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে ছিল।
বৃহস্পতিবার আল জাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়, তেহরানের বিরুদ্ধে ‘অর্থনৈতিক ডি-ডে’ ঘোষণার পাশাপাশি ইরানকে অর্থনৈতিক ‘লাইফলাইন’ বা জীবনরক্ষাকারী সহায়তা দেওয়া যে কোনো দেশকে আর্থিকভাবে শাস্তির হুমকি দেন ট্রাম্প।
ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের ব্যয়বহুল সংঘাতের ছয় মাস অতিক্রান্ত হওয়ার পর ট্রাম্পের এ হুমকিটি হলো তার পররাষ্ট্রনীতির লক্ষ্য অর্জনে মার্কিন অর্থনৈতিক শক্তিকে কাজে লাগানোর সর্বশেষ প্রচেষ্টা। এর আগে তার মেয়াদের শুরুর দিকে বেশ কয়েকটি ক্ষতিকর বাণিজ্য যুদ্ধ সংঘটিত হয়।
বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের গুরুত্বপূর্ণ দুই বাণিজ্যিক সহযোগী-চীন ও রাশিয়ার ওপর ট্রাম্পের প্রভাব সীমিত।
রাশিয়া ইতোমধ্যেই যুক্তরাষ্ট্রের কঠোর নিষেধাজ্ঞার আওতায় রয়েছে এবং মূলত যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন অর্থনৈতিক কাঠামোর বাইরেই তাদের কার্যক্রম পরিচালনা করছে। অন্যদিকে চীন বারবার প্রমাণ করেছে-নিজস্ব অর্থনৈতিক স্বার্থ রক্ষায় তারা যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করতে প্রস্তুত।
কাতারের জর্জটাউন ইউনিভার্সিটির রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক পল মাসগ্রেভ আল জাজিরাকে বলেন, ট্রাম্পের পক্ষে তার এ ‘চাপ প্রয়োগের কৌশল’ কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা ‘অত্যন্ত কঠিন’ হবে। তিনি বলেন, ‘ট্রাম্প এমন সব সমন্বিত নিষেধাজ্ঞা এককভাবে চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করছেন, যার জন্য প্রথাগতভাবে বহুপাক্ষিক সমন্বয়ের প্রয়োজন হয়; অর্থাৎ এর জন্য চীন, রাশিয়া এবং জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের পি-৫ বা স্থায়ী সদস্য দেশগুলো সঙ্গে পাওয়া জরুরি।’
মঙ্গলবার ট্রুথ সোশ্যালে এক পোস্টে মার্কিন প্রেসিডেন্ট বলেন, ইরানের বিরুদ্ধে তার এ অভিযান হবে ‘যে কোনো দেশের বিরুদ্ধে এ পর্যন্ত গৃহীত সবচেয়ে কঠোর অর্থনৈতিক পদক্ষেপ।’ একইদিনে সংযুক্ত আরব আমিরাত তেহরানের ওপর অনির্দিষ্টকালের জন্য বাণিজ্য নিষেধাজ্ঞা আরোপের ঘোষণা দেয়। গুরুত্বপূর্ণ আমদানি ও বাণিজ্যিক বাজারে প্রবেশের জন্য ইরান দীর্ঘদিন ধরেই আরব আমিরাতের ওপর নির্ভরশীল।
ব্র্যান্ডেইস ইউনিভার্সিটির মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক অর্থনীতির অধ্যাপক নাদের হাবিবি বলেন, তার ধারণা-এ বাণিজ্য নিষেধাজ্ঞা আরোপের জন্য যুক্তরাষ্ট্র আরব আমিরাতকে ‘জোরালভাবে প্ররোচিত’ করেছে। এছাড়া যুক্তরাষ্ট্র ইরানের অন্য বাণিজ্যিক অংশীদারদের, যার মধ্যে সবচেয়ে বড়টি হলো চীন, তাদের ওপরও চাপ সৃষ্টির চেষ্টা করতে পারে।
চীন ও ইরানের মধ্যকার বাণিজ্য ব্যাহত করার যে কোনো মার্কিন পরিকল্পনা বড় ধরনের বাধার মুখে পড়তে পারে। বিশ্লেষণধর্মী প্রতিষ্ঠান কেপলারের তথ্যানুযায়ী, ২০২৫ সালে ইরান থেকে রপ্তানি করা তেলের ৮০ শতাংশই কিনেছিল চীন। তবে চীনের তেল শোধনাগারগুলোর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া প্রায়শই কঠিন হয়ে পড়ে। কারণ, এগুলোর অধিকাংশই স্বাধীনভাবে পরিচালিত এবং মার্কিন আর্থিক ব্যবস্থার ওপর এদের নির্ভরতা খুবই কম।
ইরানি অর্থ লেনদেনের দায়ে চীনের বড় ব্যাংকগুলোর ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপের যে হুমকি যুক্তরাষ্ট্র দিয়েছেন, তা কার্যকর হলে চীন বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়বে। কিন্তু এর ফলে চীন পালটা পদক্ষেপও নিতে পারে, যা একটি স্পর্শকাতর কূটনৈতিক পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলতে পারে। চ্যাথাম হাউজ থিংক ট্যাংকের ‘চীন ও এশিয়া-প্যাসিফিক কর্মসূচি’র জ্যেষ্ঠ গবেষণা ফেলো ইউ জি বলেন, ইরানের অর্থনৈতিক মিত্রদের লক্ষ্যবস্তু করার যে হুমকি ট্রাম্প দিয়েছেন, তা চীনের সম্পৃক্ততা ও ইরানের সঙ্গে বিদ্যমান বাণিজ্যিক সম্পর্ক পরিবর্তন করবে না।
অপরদিকে ওয়াশিংটনের জন্য রাশিয়া একটি ভিন্ন ধরনের চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। চীনের তুলনায় ইরানের কাছে রাশিয়া ছোট আকারের বাণিজ্যিক অংশীদার। তবু মস্কো ও তেহরান দীর্ঘ সময় ধরে এমন সব গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক ও সামরিক সম্পর্ক গড়ে তুলেছে, যা পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার আওতার বাইরে থাকে।
রাশিয়ার জ্বালানিমন্ত্রী সের্গেই সিভিলেভের তথ্যমতে, কঠোর নিষেধাজ্ঞার কবলে থাকা এ দুদেশ ২০ বছর মেয়াদি একটি অংশীদারত্ব চুক্তি সই করেছে। ফলে ২০২৫ সালের প্রথম ১১ মাসেই তাদের বাণিজ্যের পরিমাণ বেড়ে ৪ দশমিক ৮ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। নিষেধাজ্ঞার আওতাভুক্ত তেল ছাড়াও ক্যাস্পিয়ান সাগরের মাধ্যমে রাশিয়া ও ইরান একে অপরের মধ্যে অস্ত্র ও সামরিক সরঞ্জাম আদান-প্রদান করে।
