স্থায়ী যুদ্ধের ফাঁদে মধ্যপ্রাচ্য
Advertisement
যুগান্তর ডেস্ক
প্রকাশ: ০৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত থামানোর বদলে দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধের পরিস্থিতি স্বাভাবিক করে তোলার পথে এগোচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র, ইসরাইল ও সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই)। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর মতো ইউএই’র প্রেসিডেন্ট শেখ মোহাম্মদ বিন জায়েদ আল নাহিয়ানও নিজেকে এমন এক নেতায় পরিণত করেছেন, যিনি সবসময় যুদ্ধ ও সংঘাতের মধ্যেই নিজের দেশের প্রভাব বিস্তারের পথ খুঁজছেন। এক বিশ্লেষণে এমনটি বলেছেন ব্রিটিশ সাংবাদিক ও মিডল ইস্ট আইয়ের সম্পাদক ডেভিড হার্স্ট।
চলতি বছর যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইল ও ইরানের যে যুদ্ধ শুরু হয়েছে, তা থামেনি এখনো। যুক্তরাষ্ট্র এখনো মধ্যপ্রাচ্যে বিপুল সামরিক উপস্থিতি ধরে রেখেছে। প্রায় ৫০ হাজার মার্কিন সেনা, একাধিক যুদ্ধ জাহাজ ও বিমানবাহী রণতরির উপস্থিতি দেখাচ্ছে, ওয়াশিংটন এই অঞ্চল থেকে দ্রুত সরে যাওয়ার অবস্থানে নেই। বরং সামরিক চাপ বজায় রেখেই ইরানকে নিয়ন্ত্রণে রাখার কৌশল অনুসরণ করছে যুক্তরাষ্ট্র।
এই সংঘাতের প্রভাব শুধু যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। ইরানের পালটা হামলা মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে মার্কিন ঘাঁটি ও গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলেছে। হরমুজ প্রণালি ঘিরে উত্তেজনাও আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও জ্বালানি সরবরাহের ওপর চাপ তৈরি করেছে। সাম্প্রতিক সময়ে সৌদি আরবেও ইরান-সমর্থিত হুথিদের হামলা পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত করেছে। এই পরিস্থিতিতে ইউএই’র ভূমিকাও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। আবুধাবি একদিকে যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ নিরাপত্তা অংশীদার, অন্যদিকে নিজেদের সামরিক ও অর্থনৈতিক সক্ষমতা ব্যবহার করে মধ্যপ্রাচ্য ও আফ্রিকায় প্রভাব বাড়াচ্ছে। ইরানের সঙ্গে সংঘাতের মধ্যেও ইউএই নিজেদের জ্বালানি রপ্তানি ও বাণিজ্যের বিকল্প পথ তৈরির উদ্যোগ নিয়েছে, যাতে হরমুজ প্রণালির ওপর নির্ভরতা কমানো যায়। ইউএই’র এই নীতির প্রভাব মধ্যপ্রাচ্যের বাইরেও দেখা যাচ্ছে। লিবিয়া, ইয়েমেন ও সুদানের মতো সংঘাতপূর্ণ অঞ্চলে আবুধাবির রাজনৈতিক ও সামরিক ভূমিকা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই নানা অভিযোগ রয়েছে। ফলে দেশটি সরাসরি বড় সামরিক বাহিনী মোতায়েন না করেও মিত্র গোষ্ঠী, অর্থনৈতিক প্রভাব ও আঞ্চলিক অংশীদারদের মাধ্যমে নিজেদের অবস্থান শক্ত করছে বলেই বিশ্লেষণে উঠে এসেছে।
অন্যদিকে ইসরাইলও সামরিক শক্তির পাশাপাশি অধিকৃত পশ্চিম তীরে বসতি সম্প্রসারণ অব্যাহত রেখেছে। সাম্প্রতিক সময়ে নতুন নতুন বসতি স্থাপন ও ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে নিয়ন্ত্রণ বাড়ানোর কর্মকাণ্ড নিয়ে আন্তর্জাতিক সমালোচনা জোরালো হয়েছে। সবমিলিয়ে মধ্যপ্রাচ্যে এখন যুদ্ধের পাশাপাশি তৈরি হচ্ছে দীর্ঘমেয়াদি সামরিক ও রাজনৈতিক জোট। এই পরিস্থিতির সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হলো-একটি সংঘাত শেষ হওয়ার আগেই আরেকটি সংঘাত শুরু হওয়া। ইরান-যুক্তরাষ্ট্র উত্তেজনা, ইসরাইল-ফিলিস্তিন সংকট, ইয়েমেন ও সুদানের যুদ্ধ এবং হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা-সবগুলো সংকট পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়ছে। ফলে মধ্যপ্রাচ্যে স্থায়ী শান্তির বদলে ‘স্থায়ী যুদ্ধের স্বাভাবিকতা’ তৈরি হলে এর প্রভাব শুধু অঞ্চলটিতে নয়, বিশ্ব অর্থনীতি ও আন্তর্জাতিক নিরাপত্তাতেও দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে।
এদিকে সিএনএনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরানের সঙ্গে যুদ্ধের অবসান হলে মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সামরিক ও গোয়েন্দা উপস্থিতি কমানোর বিষয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে।ছয়টি সূত্রের বরাতে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসন ইরান সংঘাতের অবসান ঘটাতে পারলে মধ্যপ্রাচ্যে বর্তমানে থাকা সেনা ও সামরিক স্থাপনার সংখ্যা কমানোর বিষয়টি বিবেচনা করা হচ্ছে। এমন পদক্ষেপ বাস্তবায়িত হলে ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বরের হামলার পর যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যপ্রাচ্যকেন্দ্রিক নিরাপত্তা কৌশলে আরেকটি বড় পরিবর্তন আসবে। ৯/১১ হামলার পর সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধ পরিচালনার জন্য মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ও গোয়েন্দা স্থাপনা দ্রুত বাড়ানো হয়। ইরাক, আফগানিস্তান, সিরিয়া, ইরান, ইয়েমেন ও লিবিয়াসহ বিভিন্ন দেশে যুদ্ধ ও অভিযান পরিচালনায় এসব ঘাঁটি ব্যবহার করা হয়েছে।
