Logo
Logo
×

উপসম্পাদকীয়

ডাকসু ও জাকসু নির্বাচনের প্রেক্ষাপটে দেশের রাজনীতি

Icon

জিয়া আহমদ

প্রকাশ: ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৫, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

ডাকসু ও জাকসু নির্বাচনের প্রেক্ষাপটে দেশের রাজনীতি

ছবি: সংগৃহীত

২০১৯ সালের পর ৯ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত হয়ে গেল ডাকসু নির্বাচন। ছাত্রছাত্রীদের অনেক প্রত্যাশা ও আশার প্রেক্ষাপটে অনুষ্ঠিত এ নির্বাচনে ভূমিধস বিজয় পেয়েছে বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির। নির্বাচনে দেশের প্রতিনিধিত্বকারী সব কয়টি রাজনৈতিক দলের ছাত্রসংগঠন ও বেশকিছু দলনিরপেক্ষ ছাত্রছাত্রী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে। এবারের ডাকসু নির্বাচনে দেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় দল হিসাবে পরিচিত বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের সহযোগী সংগঠন জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল খুব বাজেভাবে পরাজিত হয়েছে। এর পরপরই অনুষ্ঠিত জাকসু নির্বাচনেও একই ধরনের ফলাফল লক্ষ্য করা গেছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা এ পরাজয়ে খুব একটা অবাক না হলেও দেশের জনগণ এ পরাজয়ে অনেকাংশেই বিস্মিত হয়েছে। নির্বাচনে ছাত্রদলের এ পরাজয় কি আসলে বিস্ময়ের, নাকি তা অবধারিত ছিল?

স্বৈরাচারী আওয়ামী লীগের সাড়ে পনেরো বছরের শাসনামলে বাংলাদেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে আক্ষরিক অর্থেই সরকারবিরোধী রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত ছাত্রসংগঠনগুলোর কোনো রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনার সুযোগ ছিল না। একথা প্রযোজ্য বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল ও বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরের জন্যও। এর মধ্যেও কোনো কোনো ছাত্রসংগঠন ক্যাম্পাসগুলোতে তাদের সাংগঠনিক বা রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনার সুযোগ পেয়েছে।

কিন্তু যে বয়সে একজন ছাত্র বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়, সেটা তো মূলত বিদ্রোহ করার বয়স। এ বয়সে ছাত্রদের মধ্যে আদর্শবাদের প্রভাব থাকে প্রবল। ফলে তারা জীবনের এ অধ্যায়ে নানা আদর্শের প্রচার, প্রচারণা ও বাস্তবায়নের পথ খুঁজে। গত পনেরো বছরে নবীন ছাত্রদের সামনে মূলত তিনটা পথ খোলা ছিল : ১. নীতি-আদর্শ ভুলে গিয়ে সরকারি ছাত্রসংগঠনে যোগ দিয়ে আরাম-আয়েশে থেকে পড়াশোনা শেষ করে বিশ্ববিদ্যালয় ত্যাগ করা; ২. আদর্শের জন্য আন্দোলন করা, যার অর্থ বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রবেশসহ ক্লাস ও পরীক্ষা দেওয়ার অধিকার থেকে বঞ্চিত হওয়া; ৩. প্রকাশ্যে ছাত্রলীগ করে গোপনে নিজ রাজনীতি ও আদর্শের চর্চা করা। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়া বেশির ভাগ ছাত্রছাত্রী প্রথম পথটাই বেছে নিয়েছে এতদিন। যতই রাজনীতি বা আদর্শের চর্চা করার ইচ্ছা থাকুক না কেন, তারা নিজেদের ও পড়াশোনার নিরাপত্তার স্বার্থে ছাত্রলীগে যোগ দিয়েছে এবং পড়াশোনা শেষ করে (ছাত্রলীগ করার সুবাদে) চাকরি-বাকরির ক্ষেত্রে সুবিধা পেয়ে জীবনে প্রতিষ্ঠা (?) লাভ করেছে। দ্বিতীয় অপশনটা বেছে নিয়েছে খুব কম ছাত্রছাত্রী। কারণ এতে পড়াশোনা ধ্বংস হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা যেমন ছিল, তেমনি ছিল জীবনহানিরও শঙ্কা। এ ছেলেমেয়েগুলো তাদের আদর্শ ও রাজনীতির জন্য তাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়াশোনার সময় তো বটেই, তারা নিজেদের জীবনের সোনালি সময়গুলোকে বিসর্জন দিয়েছে এ আশায় যে তারা দেশে নতুন সূর্যের উদয় ঘটাবে। আর তৃতীয় বিকল্পটা যারা বেছে নিয়েছে, তারা মূলত সুযোগসন্ধানী মানুষ, যারা গাছেরটাও খেয়েছে, তলারটাও কুড়িয়েছে।

একটা নীতি ও আদর্শের কারণে জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা ফ্যাসিবাদের পুরো সময়টাতেই ক্যাম্পাস ছাড়া থেকেছে। তাদের ক্লাস করার জো ছিল না; তারা পরীক্ষায় বসতে পারেনি-টিউটোরিয়াল আর ক্লাসে উপস্থিতির মার্কসগুলো তো অধরাই ছিল তাদের কাছে। ফলে অনেকের ১০ বা ১২ বছরেও জুটেনি একটা অনার্স বা মাস্টার্স ডিগ্রি। গত বছর স্বৈরাচারের পতনের পর যখন তার বিশ্ববিদ্যালয়ের হলে উঠল, তখন দেখল তাদের ব্যাচমেটের কেউ আর ছাত্র নেই। নিয়মিত ছাত্ররা তাদের ১০-১২ বছরের ছোট, যারা তাদের চেনে না। ফলে এ ছেলেরা নতুন প্রজন্মের সঙ্গে আর সংযোগ স্থাপন করতে পারেনি।

অপরদিকে ইসলামী ছাত্রশিবিরের ছেলেমেয়েরা আওয়ামী শাসনামল থেকেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হলগুলোতে থেকেছে। তারা গোপন রেখেছে তাদের আদর্শ বা রাজনৈতিক অবস্থান। তারা ছাত্রলীগের মধ্যে থেকে ছাত্রলীগের নেতাকর্মী হিসাবে প্রকাশ্যে যেমন ছাত্রলীগের কাজ করেছে, একইসঙ্গে তারা গোপনে শিবিরের জন্যও ছাত্রছাত্রীদের রিক্রুট করেছে। তারা এ কাজটি করে গেছে নিরবচ্ছিন্নভাবে। এক ব্যাচের ছাত্ররা পাশ করে যাওয়ার সময় তাদের পরবর্তী ব্যাচের হাতে দায়িত্ব দিয়ে গেছে। ফলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হলগুলোতে কখনোই ছাত্রশিবিরের নেতৃত্ব ও কর্মীবাহিনীর ধারাবাহিকতা ক্ষুণ্ন হয়নি। ৫ আগস্টের পর শিবিরের ছেলেমেয়েরা প্রথমেই সিদ্ধান্ত নিয়েছিল তাদের জন্য অজেয় ডাকসুকে জয় করার। সে কারণে অন্য সংগঠনের ছাত্রছাত্রীরা যখন বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠানে চাঁদা বা বদলি বাণিজ্যে লিপ্ত হয়েছে, শিবিরের ছেলেরা তখন গণ-অভ্যুত্থানে তাদের অবদানের হিস্যা হিসাবে সরকারি ও বিশ্ববিদ্যালয়ের বড় বড় পদে তাদের মতাদর্শের মানুষদের নিয়োগের চেষ্টা করেছে। এ হিস্যা হিসাবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিবির যেমন তাদের পছন্দমাফিক ব্যক্তিকে ভিসি পদে আনতে পেরেছে, তেমনি ভিসির মাধ্যমে বিভিন্ন পর্যায়ে তাদের মতাদর্শের লোকজনকে নিয়োজিত করতে সক্ষম হয়েছে। এ মানুষগুলো তাদের ছাত্রবান্ধব কাজে সর্বাত্মক সহযোগিতা করে শিবিরকে একটি শক্ত ভিতের ওপর দাঁড়াতে সহায়তা করেছে। একইসঙ্গে ছাত্রশিবির ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হলগুলোতে ‘দ্রুত রেসপন্স টিম’ও গঠন করে, যার সদস্যরা দিনে বা রাতে নেতাদের ডাকে ২ ঘণ্টার নোটিশে সমবেত হতে সক্ষম ছিল। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হলগুলোতে জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল যখন কমিটি ঘোষণা করল, তখন তাদের এ দ্রুত রেসপন্স টিমের সদস্যরা রাতেই ভিসির বাসা ঘেরাও করে ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হলগুলোতে দলীয় রাজনীতি নিষিদ্ধ’ মর্মে ঘোষণা আদায় করতে সক্ষম হয়। ইসলামী ছাত্রশিবির ডাকসুতে তাদের প্যানেল চূড়ান্ত করে ফেলে গত বছরের ৫ আগস্টের পরপরই। ফলে তার দীর্ঘ সময় নিয়ে তাদের প্রার্থীদের ভাবমূর্তি গঠন ও ছাত্রবান্ধব হিসাবে তাদের প্রতিষ্ঠিত করতে সক্ষম হয়েছে। যার ফল আজকের এ ডাকসু-জাকসু নির্বাচনে দৃশ্যমান হয়েছে।

২০০০ সালের পর থেকেই ঢাকাসহ বিভিন্ন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীদের উৎসে একটা পরিবর্তন হতে থাকে। আধা-আরবান এ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ধীরে ধীরে গ্রামীণ জনপদের নিুমধ্যবিত্ত শ্রেণির ছাত্রছাত্রী দিয়ে ভরে যেতে থাকে। এর সঙ্গে যোগ হয় মাদ্রাসা থেকে আসা ছাত্রছাত্রীরা। শিবিরের ছেলেমেয়েরা একই সামাজিক অবস্থান থেকে আসার কারণে এবং তারা পরিবর্তিত (অর্থাৎ আরবানাইজড) না হওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে তারা সহজেই বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীদের ভাষা বুঝতে পেরেছে, যে ক্ষেত্রে অন্যরা তেমন সফল হয়নি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদল বা অন্যান্য ছাত্রসংগঠনের নেতারা এবারের ডাকসুকে তাদের পূর্বসূরিদের চোখেই দেখেছে। ‘স্নিকার্স, নীল জিন্স ট্রাউজার, সাদা টি-শার্ট ও চোখে সানগ্লাসের’ যে স্মার্ট ইমেজ ১৯৯০-২০০০ সালে কাজ করেছে, তা বর্তমান ছাত্রছাত্রীদের আর আকর্ষণ করতে পারছে না। পক্ষান্তরে ছাত্রশিবিরের ছেলেরা সাধারণ ছাত্রদের মতোই একদম সাধারণ পোশাক পরেছে, সঙ্গে তার নতুন নতুন আইডিয়া নিয়ে ছাত্রছাত্রীদের মন জয় করার চেষ্টা করেছে, তারা ছাত্রছাত্রীদের টিউশন ও অন্য অর্থনৈতিক প্রয়োজনে পাশে দাঁড়িয়েছে। সামাজিক ক্ষেত্রে ভাষার ভিন্নতার কারণে ছাত্রদল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গত ১৫ বছরের ধীর পরিবর্তনটা লক্ষ্য করতে ব্যর্থ হয়েছে। তাছাড়া ছাত্রদল এখানে তাদের প্যানেল চূড়ান্ত করেছে নির্বাচনের মাত্র ২০ দিন আগে। ফলে এক্ষেত্রে প্রার্থী মনোনয়ন ভালো হওয়া সত্ত্বেও প্রার্থীরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রায় ৪০ হাজার ছাত্রছাত্রীদের সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করার জন্য পর্যাপ্ত সময় পায়নি।

ডাকসু নির্বাচনের পর অনেকে বলার চেষ্টা করছেন, নির্বাচনে ভোট কারচুপির মাধ্যমে শিবির জয় পেয়েছে। বাংলাদেশের কোনো ভোটই ১০০ শতাংশ শুদ্ধ হয়নি কখনো। তবে জয়ী শিবিরের প্রার্থীরা যে ভোট ব্যবধানে জিতেছে, সে ধরনের ভোট কারচুপি করে জেতার মতো পরিবেশ সেদিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছিল না। তাছাড়া এ নির্বাচনে ছাত্রলীগের ভোট শিবিরের প্যানেলে যাওয়ার বিষয়টিও প্রশ্নসাপেক্ষ। যদি ছাত্রলীগের ভোট শিবির প্যানেলে গিয়ে থাকে, তাহলে এ নিয়ে সামনের দিনগুলোতে ছাত্রদলের আশঙ্কার কারণ নেই।

জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল ডাকসু-জাকসুতে হেরেছে, এটাকে মেনে নিয়েই সামনে এগোতে হবে। ছাত্রছাত্রীদের রায়কে সম্মান জানাতে ব্যর্থ হলে তাদের থেকে আরও বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এ পরাজয়কে খুব বড় করে না দেখে বরং এটাকে একটি ‘ওয়েক আপ কল’ হিসাবে বিবেচনা করে সামনের নির্বাচনগুলোর জন্য পরিকল্পনা গ্রহণ করলে সাফল্য আসতে সময় নেবে না। A battle has been lost, but the war is yet to begin! অনেকে বলছেন যে ডাকসু-জাকসুর এ পরাজয় জাতীয় নির্বাচনে তেমন প্রভাব ফেলবে না। এর স্বপক্ষে তারা সাবেক ডাকসু ভিপি মাহমুদুর রহমান মান্নার উদাহরণ দেন। কিন্তু দুটি ঘটনার প্রেক্ষাপট সম্পূর্ণ আলাদা। সে সময়ের জাসদ বা বাসদের রাজনৈতিক ভিত্তি বর্তমান জামায়াতের গণভিত্তির সঙ্গে তুলনীয় নয়। এ ছাত্র সংসদ নির্বাচনগুলোর কিছু প্রভাব জাতীয় নির্বাচনে অবশ্যই পড়বে, যেমনটি সারা দেশে বিএনপি ও এর সহযোগী-সংগঠনের কয়েকজন নেতার চাঁদাবাজি ডাকসু-জাকসু নির্বাচনে প্রভাব ফেলেছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় যে কোনো বিচ্ছিন্ন দ্বীপ নয়, সেটা মাথায় রাখতে হবে। ডাকসু-জাকসু নির্বাচন দেশের রাজনীতিতে প্রভাব রাখবে ধরে নিয়েই নির্বাচনের জন্য পরিকল্পনা ও প্রস্তুতি নেওয়া সমীচীন হবে। এ আত্মোপলব্ধি নিয়ে এগিয়ে গেলে যেমন নির্বাচনের পরে বিস্মিত হওয়াটাকে পরিহার করা যাবে, তেমনি জয়লাভের পথেও বিএনপি অনেকদূর এগিয়ে যাবে।

জিয়া আহমদ, এনডিসি : সাবেক সরকারি কর্মচারী ও নিরাপত্তা বিশ্লেষক

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম