Logo
Logo
×
   

উপসম্পাদকীয়

বাইফোকাল লেন্স

জাতীয় স্বার্থেই তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা উচিত

Icon

একেএম শামসুদ্দিন

প্রকাশ: ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৫, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

জাতীয় স্বার্থেই তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা উচিত

গত ১৫ সেপ্টেম্বর জাতীয় প্রায় সব পত্রিকায় তিস্তা মহাপরিকল্পনা নিয়ে খবর বেরিয়েছে; চীনের একটি কারিগরি বিশেষজ্ঞ দল প্রকল্পের সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের জন্য আগামী কিছুদিনের মধ্যে বাংলাদেশে আসবে। আমাদের জন্য নিঃসন্দেহে এটি একটি আশাপ্রদ খবর। এক যুগেরও বেশি সময় ধরে তিস্তা পানি বণ্টন চুক্তি নিয়ে ভারত যেভাবে পানি ঘোলা করেছে, তা বাংলাদেশের নাগরিক হিসাবে আমাদের হতাশই করেছে। ক্রমাগত মিথ্যা প্রতিশ্রুতি দিয়ে ভারত এতগুলো বছর বাংলাদেশকে কেবল ঘুরিয়েছে। ২০১১ সালে খসড়া তৈরি হলেও নানা অজুহাতে ভারত তিস্তা চুক্তি স্বাক্ষর থেকে বিরত থেকেছে। পরিস্থিতি এমন হয়েছিল, শেখ হাসিনার শাসনামলের শেষ দিকে ভারত এ চুক্তি নিয়ে ন্যূনতম আগ্রহও দেখাত না। এ চুক্তি নিয়ে যখন কিছুতেই কিছু হচ্ছিল না, তখন এক মহাপরিকল্পনা নিয়ে চীন বাংলাদেশের সাহায্যে এগিয়ে আসে। এ বিষয়ে বাংলাদেশ কিছুটা অগ্রসর হতে না হতেই ভারত এ মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নে প্রধান বাধা হয়ে দাঁড়ায়। তারা আপত্তি তোলে এ মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নে চীনের সম্পৃক্ততা নিয়ে। সে সময় শেখ হাসিনার এমন কোনো ক্ষমতা ছিল না, ভারতের আপত্তির বিরুদ্ধে দাঁড়ায়। ফলে এ বিষয়টি সেখানেই আটকে যায়।

বর্তমানে বাংলাদেশে আগের সেই পরিস্থিতি নেই। ভারত এখন ক্ষমতার টোপ গেলানোর মতো দ্বিতীয় একজন শেখ হাসিনা খুঁজে পাচ্ছে না। অতএব, এ প্রকল্প নিয়ে তাদের মিডিয়া হাউজগুলো বড়জোর কিছু উচ্চবাচ্য করতে পারে, তবে শেখ হাসিনার শাসনামলের মতো বাংলাদেশের ওপর কিছু চাপিয়ে দেওয়া সম্ভব নয়। অন্তর্বর্তী সরকার, বিশেষ করে প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস চীনের প্রস্তাবিত তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নে বিশেষ আগ্রহ দেখিয়েছেন। গত মার্চে তার চীন সফরের পর তিস্তা প্রকল্প এগিয়ে নিতে অন্তর্বর্তী সরকার ইতোমধ্যেই প্রয়োজনীয় পদক্ষেপও গ্রহণ করেছে। সে মোতাবেক এ প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য এক্সপার্ট কনসালটেশন অ্যাডভাইজার ও এক্সপার্টিজদের মতামত নেওয়া হয়েছে। এ প্রকল্পের জন্য চীনের কাছে প্রয়োজনীয় আর্থিক ঋণও চেয়েছে বাংলাদেশ। ঋণের বিষয়ে ইতিবাচক ইঙ্গিতও মিলেছে। এ প্রকল্পে বেইজিংয়ের আগ্রহ ছিল আগে থেকেই। সেই লক্ষ্যে প্রকল্পের সম্ভাবনা যাচাই শেষে আগামী অক্টোবরের মধ্যে তিস্তা মহাপরিকল্পনার ডিজাইনও চূড়ান্ত হবে বলে আশা করা হচ্ছে। ২০২৬ সালে এ প্রকল্পের কাজ শুরু করে ২০২৯ সালের মধ্যে শেষ করার লক্ষ্যমাত্রাও নির্ধারণ করা হয়েছে।

গত মার্চে বেইজিং সফরে গিয়ে চীনা প্রেসিডেন্ট শি ঝিং পিঙের সঙ্গে বৈঠকে প্রকল্পের রূপরেখা নিয়ে আলোচনা করেছিলেন প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস। এ ছাড়াও সে দেশের পানিসম্পদ মন্ত্রী লি গোয়েইংয়ের সঙ্গে পৃথক সাক্ষাতে বাংলাদেশের নদী ও পানি ব্যবস্থাপনায় ৫০ বছরের একটি নির্দিষ্ট পরিকল্পনা রচনা করে দেওয়ার আবেদনও জানিয়েছিলেন তিনি। প্রকৃতপক্ষে বাংলাদেশের নদী ব্যবস্থাপনায় চীনা সহযোগিতার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল ২০১৬ সালে, চীনা প্রেসিডেন্ট শি ঝিং পিঙের বাংলাদেশ সফরের কিছু আগে। সে সময় জানা গিয়েছিল, চীনের বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভের অধীনে চীন ১১ বিলিয়ন ডলারের ঋণ দিতে প্রস্তুত। তারই ধারাবাহিকতায় ‘পাওয়ার চায়না’ নামক চীনের কোম্পানির সঙ্গে বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের একটি আলোচনা হয়েছিল। আলোচনার ফলস্বরূপ একটি সমঝোতা স্মারকও স্বাক্ষরিত হয়েছিল এ শর্তে যে, পাওয়ার চায়না বাংলাদেশের সব বড় নদ-নদীকে অন্তর্ভুক্ত করে এবং যমুনা নদীকে অগ্রাধিকার দিয়ে একটি ‘স্থায়িত্বশীল নদী ব্যবস্থাপনা’ কর্মসূচি প্রণয়ন করবে। তবে সে সময়ে শেখ হাসিনা সরকার, ভারতের কাছ থেকে তিস্তা নদীর ন্যায্য হিস্যা আদায়ে ব্যর্থ হয়ে বাংলাদেশের জনগণের কাছে তাদের বিশ্বাসযোগ্যতা ধরে রাখার জন্য, বিকল্পব্যবস্থা হিসাবে তিস্তা মহাপরিকল্পনার বিষয়টিকে জনসম্মুখে নিয়ে আসে। সেই লক্ষ্যে সরকারের নির্দেশনায় পানি উন্নয়ন বোর্ড পাওয়ার চায়নাকে যমুনা নদীর পরিবর্তে তিস্তা নদীর প্রতি অগ্রাধিকার দিতে অনুরোধ করে। ফলে পাওয়ার চায়না ‘তিস্তা নদী সামগ্রিক ব্যবস্থাপনা ও পুনরুদ্ধার প্রকল্প’ প্রণয়ন করে। কিন্তু তাতে বাদ সাধে ভারত। ভারত নিজ দেশের নিরাপত্তা বিঘ্নিত হওয়ার ইস্যু উত্থাপন করে নিজেই এ প্রকল্প বাস্তবায়নের ইচ্ছা প্রকাশ করে। এমতাবস্থায় শেখ হাসিনার ভারতের কাছে নতজানু না হয়ে উপায় ছিল না। অতঃপর ২০২৪ সালের জাতীয় নির্বাচনের আগে আগে ২০২৩-এর সেপ্টেম্বরে ভারত সফরে গিয়ে তিস্তা প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য ভারতের সঙ্গে হাসিনা সমঝোতা স্বাক্ষর করে আসেন।

২০০৯ সালে শেখ হাসিনা দেশের শাসনভার গ্রহণ করার পরপরই শোনা গিয়েছিল, ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের অভিন্ন ৫৪টি নদীর পানির ন্যায্য হিস্যা না পাওয়া পর্যন্ত ভারতকে কোনো ট্রানজিট বা ট্রান্সশিপমেন্ট দেওয়া হবে না। সে সময়ে শেখ হাসিনার দোসরদের মুখেই উচ্চস্বরে এসব কথা শোনা যেত। জাতীয় স্বার্থে এসব নদ-নদীর ওপর নিজ অধিকার আদায়ে নেতা-নেত্রীদের সেই গলাবাজিই যথেষ্ট ছিল না। এ ক্ষেত্রে ভারত যেমন তার ভৌগোলিক অবস্থানের সুযোগ নিয়েছে, তেমনি শেখ হাসিনা সরকারের অনুরূপ সুযোগ গ্রহণ করা উচিত ছিল। এরই সূত্র ধরে, ২০১৩ সাল থেকেই ‘বাংলাদেশ পরিবেশ নেটওয়ার্ক’ সরকারের প্রতি ‘নদীর পানির বিনিময়ে ট্রানজিট’ নীতি গ্রহণের আহ্বান জানিয়ে আসছিল। কিন্তু শেখ হাসিনা তা কর্ণপাত করেননি। তিনি বরং কোনো কিছুর বিনিময় ছাড়াই ভারতকে ট্রানজিট, ট্রান্সশিপমেন্ট, সমুদ্র বন্দর, নৌপথ ব্যবহারের সুযোগ করে দিয়েছেন। ফলে ভারতের কাছ থেকে বাংলাদেশের দাবি আদায়ে দরকষাকষির সুযোগগুলো দুর্বল হয়ে পড়ে। ভারতও হাসিনা সরকারের এ দুর্বলতাকে পুরোপুরি কাজে লাগিয়ে তিস্তা পানি বণ্টন চুক্তি থেকে বিরত থাকে। ভারতের নেতিবাচক মনোভাবের জন্য ওই অঞ্চলের ৮ জেলার ৪২ ইউনিয়নে তিস্তার ভাঙন ও বন্যা থেমে নেই। তিস্তা প্রতিবছর ভারত থেকে প্রায় পাঁচ কোটি টন পলি নিয়ে আসে। ফলে পলির কারণে তিস্তার গভীরতা দ্রুত হ্রাস পায়। মারাত্মকভাবে হ্রাসকৃত প্রস্থচ্ছেদ নিয়ে বর্ষাকালে অতিরিক্ত পানির প্রবাহ ধারণ করা তিস্তার পক্ষে আরও কঠিন হয়ে পড়ে। ভারত তিস্তার বাংলাদেশের অংশের এ সমস্যা সম্পর্কে সম্পূর্ণ অবগত। তা সত্ত্বেও বর্ষাকালে তারা যখন গজলডোবা বাঁধের সব স্লুইসগেট খুলে দেয়, তখন নদীর দুই তীরে ভাঙনের তীব্রতা আরও বেড়ে যায়। এ ভাঙনে প্রতি বছর হাজার হাজার মানুষ উদ্বাস্তু হয়। বিলীন হয়ে যায় হেক্টরের পর হেক্টর ফসলি জমি। আবার শুষ্ক মৌসুমে ভারত তিস্তা থেকে যখন গজলডোবা বাঁধের মাধ্যমেই পানি অপসারণ করে, তখন পানির অভাবে এতদঞ্চলে চাষাবাদ করা একেবারে অসম্ভব হয়ে পড়ে। ফলে বিপুল আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হয় আমাদের কৃষিজীবীরা।

বাংলাদেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের কোটি কোটি মানুষের দীর্ঘদিনের অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে বহুল আলোচিত তিস্তা নদী ব্যবস্থাপনার এ প্রকল্পটি বর্তমানে বাস্তবায়নের পথে। জানা গেছে, তিস্তা প্রকল্পের প্রথম পর্যায় বাস্তবায়নে ব্যয় হবে ৭৫ কোটি ডলার। এর মধ্যে চীন থেকে ঋণ চাওয়া হয়েছে ৫৫ কোটি ডলার। বাকি ব্যয়ভার বহন করা হবে সরকারি অর্থায়নে। এতদিন ধরে ভারতের বাধা ও শেখ হাসিনার ভারতমুখী অবস্থানের জন্য এ প্রকল্প এগিয়ে নেওয়া সম্ভব না হলেও এখন আশা করা হচ্ছে, এ বছরের ডিসেম্বরের মধ্যেই বাংলাদেশ-চীন চূড়ান্ত চুক্তি সম্পন্ন করবে। চীনের কারিগরি ও আর্থিক সাহায্যে এই প্রকল্প যদি বাস্তবায়িত হয়; তাহলে তিস্তা পারের উন্নয়নবঞ্চিত তিন কোটি পরিবারের দীর্ঘদিনের আঁধার কেটে যাবে।

এ প্রকল্পের আওতায় তিস্তা নদীর দু’পারে ২২০ কিলোমিটার গাইড বাঁধ নির্মাণ করা হবে। নদীর গভীরতা প্রায় ১০ মিটার বৃদ্ধি করা হবে। তাতে বন্যার পানি প্লাবিত হয়ে ভেসে যাবে না গ্রামগঞ্জের জনপদ। সারা বছর নৌ চলাচলের মতো পানি সংরক্ষণের ব্যবস্থা রাখা যাবে। তাছাড়া নদীর প্রশস্ততা কমিয়ে এবং নদী শাসনের মাধ্যমে কয়েক লাখ হেক্টর কৃষিজমি উদ্ধার করা হবে, তাতে এক লাখ ১৩ হাজার কোটি টাকা সম্পদ রক্ষা হবে বলে আশা করা হচ্ছে। শুধু তাই নয়, প্রতি বছর ২০ হাজার কোটি টাকার ফসল উৎপাদন করা সম্ভব হবে। বাঁধের দুপাশে সমুদ্রসৈকতের মেরিন ড্রাইভের মতো রিভার ড্রাইভ, হোটেল, মোটেল, রেস্টুরেন্ট ও পর্যটন নগরী, পরিকল্পিত স্যাটেলাইট টাউন ও বন্দর গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে। এ ছাড়াও ১৫০ মেগাওয়াট সৌর বিদ্যুৎকেন্দ্র, শিল্পকারখানা, ইপিজেড, ইকোনমিক জোন, বনায়নের কথাও রয়েছে। তাতে প্রায় ১০ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান হওয়ার সম্ভাবনাও আছে। মোট কথা প্রকল্পটি বাস্তবায়ন হলে শুষ্ক মৌসুমে পানির জন্য ভারতের দিকে আর তাকিয়ে থাকতে হবে না।

অতীতে বাংলাদেশের উন্নয়নমূলক অনেক কাজেই ভারত বাধা দিয়ে এসেছে। অথচ তার স্বার্থসংশ্লিষ্ট কোনো বিষয়েই বাংলাদেশকে কোনো ছাড় দেয়নি। আমাদের স্মরণে আছে ইতঃপূর্বে ভারতের বিরোধিতার কারণে চীনের অর্থায়নে বাংলাদেশের সোনাদিয়ায় গভীর সমুদ্রবন্দর প্রকল্পটি বাতিল হয়ে গিয়েছে। এমন আরও অনেক বিষয়ে ভারত প্রধান বাধার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রশ্ন হচ্ছে, ভারত বাধা দেওয়ার কে? বাংলাদেশ স্বাধীন ও সার্বভৌম একটি রাষ্ট্র। নিজের স্বার্থে আমরা স্বাধীনভাবে আমাদের সিদ্ধান্ত নেব। কিন্তু বিগত সরকারের আমলে এ বিষয়টি অনেক ক্ষেত্রেই অনুপস্থিত ছিল। শেখ হাসিনার মতো পতিত শাসক নিজের ও দলের স্বার্থে ভারতের কাছে বাংলাদেশের স্বার্থ জলাঞ্জলি দিতে পারে, তবে বাংলাদেশের মানুষ তা কখনোই মেনে নেয়নি। এখন দিন পালটে গেছে। আমাদের স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়ে আর কোনো ছাড় দেওয়া যাবে না। বর্তমানে এদেশের সবারই প্রত্যাশা, অন্যায় কোনো চাপের কাছে নতি স্বীকার না করে জাতীয় স্বার্থেই তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের পথে বাংলাদেশ এগিয়ে যাবে।

একেএম শামসুদ্দিন : অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার জেনারেল, কলাম লেখক

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম

We use cookies to improve your browsing experience. By using the site, you agree to our Privacy Policy .