Logo
Logo
×
   

Advertisement

উপসম্পাদকীয়

রাজনীতিতে ইতিবাচক পরিবর্তন অনিবার্য

Advertisement

Icon

শামসুর রহমান শিমুল বিশ্বাস

প্রকাশ: ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৫, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

রাজনীতিতে ইতিবাচক পরিবর্তন অনিবার্য

Advertisement

জুলাই গণ-অভ্যুত্থান-পরবর্তী বাংলাদেশের রাজনীতি এক জটিল বাঁকে এসে পড়েছে। এ সংকট সৃষ্টির জন্য সাধারণ মানুষ কম-বেশি প্রায় সব রাজনৈতিক দলকে দায়ী করছে। বড় হওয়ার কারণে অন্য রাজনৈতিক দলের অহেতুক সৃষ্টি জটিলতার দায় কম-বেশি বিএনপিকেও বহন করতে হচ্ছে। বাংলাদেশের সর্ববৃহৎ রাজনৈতিক দল হিসাবে এ সংকট সমাধানের জন্য বিএনপির অগ্রণী ভূমিকা দেখতে চায়। নানা ঘাত- প্রতিঘাতে অভিজ্ঞ রাজনৈতিক দল হিসাবে বিএনপি মধ্যপন্থার নীতি অনুসরণ করায় এই দলের পতাকাতলে ধর্ম, বর্ণ, গোত্র, সমতল, পাহাড়ি, গারো, চাকমা, হাজং, মারমা, ক্ষুদ্র-নৃগোষ্ঠীসহ ইসলাম ধর্মাবলম্বী সব পক্ষের ধর্মপ্রাণ মানুষ ব্যাপকভাবে সমবেত হয়েছে।

বিগত কয়েকটি নির্বাচনি ফলাফল বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, নিরপেক্ষ নির্বাচন হলে বিএনপি জয়লাভ করে। দেশে এখন নির্বাচনি হাওয়া বইতে শুরু করেছে। নির্বাচনি মৌসুম শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে নানা রঙবেরঙ বিশ্লেষণ, পীর, ফকির, ঠাকুররা, এমনকি তাবিজ-কবজ পাটির আবির্ভাব দেখা যাচ্ছে। বিশেষজ্ঞ-গবেষণা অফিস পর্যন্ত খুলে বসেছে অনেকে। আবার কেউ কেউ মাঠ জরিপের নামে তথাকথিত পর্যবেক্ষণ নিয়ে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের দপ্তরে নিয়মিত আনাগোনা করছে। এসব অতি তৎপরতার সঙ্গে ১/১১-এর রাজনৈতিক বিপর্যয় সৃষ্টিকারী কুশীলবদের কোনো যোগসূত্র আছে কিনা, তা রাজনীতিবিদরা অনুসন্ধান করে দেখতে পারেন। দুর্জনের ছলের কোনো অভাব হয় না, তারা নানা কৌশলে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের অন্দর মহলে যাতায়াত শুরু করেছে। সব রাজনৈতিক দলকে অনুপ্রবেশকারীদের বিষয়ে কঠোর সতর্কতা অবলম্বন করা উচিত।

জুলাই অভ্যুত্থানে নেতৃত্বদানকারী রাজনৈতিক দলসহ সব গণতান্ত্রিক দলের মধ্যে নিয়মিত যোগাযোগ ও প্রয়োজনীয় সমঝোতা থাকা জরুরি। রাজনৈতিক দলে বিভাজনের সুযোগ নিয়ে কুশীলবদের অনুচরেরা নির্বাচনের মাঠে অর্থকড়ি বিতরণ ও মিথ্যা প্রতিশ্রুতির বন্যা বইয়ে দিচ্ছে। ওইসব মৌসুমি নেতার কাল্পনিক কথাবার্তায় সাধারণ মানুষ বিরক্ত ও ক্ষেত্রবিশেষে বিভ্রান্ত হচ্ছে। মাঠ অনুসন্ধানে দেখা যায়, দলীয় হাইকমান্ডের দৃষ্টি আকর্ষণের জন্য মহলবিশেষের নিয়োজিত মৌসুমি ও সুবিধাবাদী প্রার্থীরা ভোটের মাঠে বিভ্রান্তিমূলক প্রচারণা ও গ্রুপিং সৃষ্টি করছে। ফলে সম্ভাব্য জনপ্রিয় প্রার্থীরা অনেকাংশে অসম দলীয় গ্রুপিংয়ের মধ্য জড়িয়ে যাচ্ছেন। অবশ্য, বিশেষ মহলের সুবিধাপ্রাপ্ত মৌসুমি পাখিরা এলাকার বেকার যুবক, এ কিছু ভবঘুরে মার্কা লোকদের বিভ্রান্ত করতে পারলেও রাজনৈতিক দলের কর্মী ও সমর্থকদের এদিক ওদিক নিতে পারছে না। আশা করা যায়, গত ১৭ বছরের দমনের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ দলীয় মনোনয়নপ্রাপ্ত প্রার্থীকে বিজয়ী করার জন্য দলীয় কর্মী-সমর্থকরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

২.

মিষ্টি ফল পাকার গন্ধে যেমন দুধপোকা আসে, রাজনৈতিক দলের জনপ্রিয়তা দেখে তেমন প্রকৃতির সুবিধাবাদীদের দলে ভিড়ে যাওয়ার চেষ্টা বেড়েছে। পাশাপাশি বিজয়ের সম্ভাবনাময় রাজনৈতিক দলের মধ্যে পরিকল্পিতভাবে মাদক কারবারি, চাঁদাবাজ, হাটবাজারের ইজারাদার, বালুমহাল দখলদার, দলীয় ছত্রছায়া পেতে ও যে কোনো উপায়ে অনুপ্রবেশ করতে মরিয়া হয়ে উঠছে কেউ কেউ। আওয়ামী লীগ ও ফ্যাসিবাদের দোসরদের অনেকে ভোল পালটে এনসিপি, বিএনপি, জামায়াতসহ আন্দোলকারী রাজনৈতিক দলের ছত্রছায়ায় ভিড়তে মরিয়া। বাংলাদেশে প্রায় ৭০ লাখ নেশাগ্রস্ত কর্মহীন ও ভবঘুরে বেকার যুবক রয়েছে, যাদের কোনো রাজনৈতিক ও দলীয় আনুগত্য নেই। হতাশাগ্রস্ত এ তরুণ যুবগোষ্ঠী চায় সুযোগ-সুবিধা হাতিয়ে মধু খেয়ে পরিবেশকে কলুষিত করতে। কর্মহীন, নেশাগ্রস্ত, ভবঘুরে এ বেকার যুবকরা সন্ত্রাসী-চাঁদাবাজ গ্রুপ নেতাদের ছত্রছায়ায় সন্ত্রাস ও গ্রুপবাজিতে লিপ্ত হয়। হাটবাজার, ফুটপাত, পোশাক কারখানা, ঝুট, বালুর মহাল, ভূমি রেজিস্ট্রেশন অফিসের দখল নিতে চাঁদাবাজ নেতার অনুসারী হয়। এ বিরাট ভবঘুরে গ্রুপিংবাজদের দলীয় কোনো আনুগত্য নেই। মাঝে-মধ্যে রাজনৈতিক কর্মসূচিতে অংশগ্রহণ করে দলীয় অন্তঃকোন্দল ও গ্রুপিং করাই তাদের অন্যতম কাজ।

৩.

দুর্নীতিগ্রস্ত গ্রুপবাজ নেতারা তাদের অনুগত কর্মীদের আয়োজিত সভায় ও মাঠঘাটের বক্তৃতায় কথার ফুলঝুরি ছুটায়। তারা নিজেদের জাহির করে, তারা জিয়া পরিবার, তারেক রহমানের আশীর্বাদপুষ্ট ও বিশ্বস্ত হাতিয়ার; যা ইচ্ছা মনগড়া ভাষণ দিয়ে দলকে অনেকাংশে বিতর্কিত করে। এ সুবিধাবাদীরা দলের নীতি-আদর্শ ও শৃঙ্খলা কোনোটাই মানতে নারাজ। তবে ভোটের বাজারে সাধারণ মানুষের কাছে এদের কোনো দাম নেই। সাধারণ মানুষ মাদক ব্যবসায়ী, চাঁদাবাজ, সন্ত্রাসী ও গ্রুপবাজদের ঘৃণা করে। দলের আদর্শে অনুপ্রাণিত মফস্বলের প্রকৃত দলীয় তৃণমূল নেতাকর্মীদের সাধারণ মানুষ এখনো সমীহ করে। মফস্বল, থানা ও জেলা পর্যায়ে রাজনৈতিক চর্চা বজায় রাখা সম্ভব হলে, মফস্বল, থানা ও জেলা পর্যায়ে থেকে ভবিষ্যতে গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক নেতৃত্ব গড়ে উঠবে।

আশার কথা, এ দেশে অতীতে ভয়াবহ রাজনৈতিক মহাদুর্যোগ ও সংকটকালে সম্ভাবনাময় জাতীয় নেতৃত্ব গড়ে ওঠার ইতিহাস আছে। মওলানা ভাসানী, শেরে বাংলা, খাজা নাজিমুদ্দিন, সোহরাওয়ার্দী, মুজিব-তাজউদ্দীন, শহীদ জিয়াউর রহমান, বেগম খালেদা জিয়ার মতো নেতৃত্ব মহাতুফান মোকাবিলা করেই গড়ে উঠে। রাজনৈতিক মহাসংকট ও দুর্যোগজনক পরিস্থিতিতে দেশের সাধারণ মানুষ তাদের নেতৃত্বের আসনে বরণ করেন। অবশ্য, কেউ কেউ ক্ষমতার যাওয়ার পর নিজের কর্মে বিতর্কিত হয়েছেন। বর্তমান দেশের চতুর্মুখী রাজনৈতিক সংকটকালে তারেক রহমান চতুর্মুখী সংকটজনক পরিস্থিতি মোকাবিলা করে দলে ও দলের বাইরে গ্রহণযোগ্যভাবে পরিস্থিতি মোকাবিলা করছেন। দক্ষতা ও বিচক্ষণতার সঙ্গে জটিল রাজনৈতিক সংকট মোকাবিলা ও সমাধানে নেতৃত্ব দিচ্ছেন। নির্বাসনে থেকেও তারেক রহমান গোটা জাতি তথা বাংলাদেশকে নেতৃত্ব দিতে সফলকাম হচ্ছেন।

রাষ্ট্রক্ষমতায় অনেকে যাবে-আসবে। কিন্তু দেশের জন্য এখন প্রয়োজন একজন রাষ্ট্রনায়কের। দেশের সাধারণ মানুষ আশা করে, শহীদ জিয়া, খালেদা জিয়ার মতো তারেক রহমান এ জাতিকে নেতৃত্ব দেবেন। পিতা শহীদ জিয়া, মাতা বেগম খালেদা জিয়ার মতো গৌরবোজ্জ্বল অতীত তারেক রহমানকে বরণ করবে। বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে তারেক রহমানকে বাংলাদেশের গ্রহণযোগ্য নেতা হিসাবে বরণ করবে। তারেক রহমান শুধু বিএনপির নয়, বাংলাদেশের আশা ও সম্ভাবনার সারথি।

৪.

বাংলাদেশের আনাচে-কানাচে এখনো অনেক ভালো মানুষ আছে। শত প্রতিবন্ধকতার মধ্যেও তারা দেশ ও মানুষের কল্যাণের জন্য কাজ করে। যদিও দেশের বিভিন্ন জেলা ও উপজেলার তৃণমূল পর্যায়ের বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের কমিটি গঠিত হয়েছে অনেক ক্ষেত্রেই বিতর্কিত লোকদের দিয়ে। গ্রুপরাজনীতি ও প্রশাসনের চামচামি আর সুবিধাবাদীদের আধিপত্যের কারণে আদর্শবাদী রাজনৈতিক নেতাকর্মীরা পদে পদে লাঞ্ছিত হচ্ছে। তারপরও মফস্বলের কর্মী-সমর্থক ও তৃণমূল মাঠের প্রকৃত নেতাকর্মীরাই দলের প্রাণশক্তি। তাদের শ্রম-ঘামে দল আজও উজ্জীবিত। সংগঠনে সাংগঠনিক শৃঙ্খলা ও দলীয় আদর্শ চর্চার উন্মুক্ত পরিবেশ গড়ে তুলতে হবে। ধীরে ধীরে গ্রুপবাজ চিহ্নিত নেতৃত্ব সরিয়ে গণমানুষের নেতাদের নেতৃত্ব ফিরে আসবে বলে আশা করা যায়।

৫.

আগামী দিনে একটি নতুন বাংলাদেশ গড়তে হলে রাজনৈতিক দলগুলোকেই সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখতে হবে। অন্য দল যাই করুক, মানুষ বিএনপির দিকে তাকিয়ে আছে। দেশের মানুষ চায় সর্ববৃহৎ রাজনৈতিক দল হিসাবে বিএনপি সাধারণ মানুষের আকাঙ্ক্ষার বাইরে কোনো অন্যায়কে যেন প্রশ্রয় না দেয়।

আগামী দিনের রাজনীতিতে প্রতিটি দলকেই মনে রাখতে হবে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষা কী ছিল। শহীদের আত্মত্যাগ এবং আহতদের শারীরিক এবং মানসিক যন্ত্রণার মূল্য পরিশোধ করার পথ শুধু একটাই খোলা আছে, আর তা হচ্ছে দেশে পরিচ্ছন্ন একটা রাজনৈতিক ব্যবস্থা গড়ে তোলা। একা কোনো দল বা ব্যক্তি কারও পক্ষেই তা সম্ভব নয়। তবে নেতৃত্বের অগ্রগামী দায়িত্বটা বিএনপিকেই নিতে হবে। সব দলের, সব পর্যায়ের নেতাকর্মীর গণতন্ত্র, আইনের শাসন এবং ন্যায়বিচারের প্রতি দৃঢ় অঙ্গীকারই পারে বাংলাদেশের রাজনীতির সংস্কৃতি পালটে দিতে। অনেক রক্ত আর জীবনের বিনিময়ে বাংলাদেশকে নতুন করে সাজানোর যে সুযোগ আমরা পেয়েছি, তাকে কাজে লাগানো প্রতিটি নাগরিকের দায়িত্ব। আসুন, নতুন বাংলাদেশ গড়ার লড়াইয়ে নিঃস্বার্থভাবে সবাই একসঙ্গে কাজ করি। এমন সুযোগ এবং সম্ভাবনা জাতীয় জীবনে আর না-ও আসতে পারে। কোনোভাবেই আমরা যেন এ সুযোগ হাতছাড়া না করি।

অ্যাডভোকেট শামসুর রহমান শিমুল বিশ্বাস : বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার বিশেষ সহকারী

Advertisement

রাজনীতি

Advertisement

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম