Logo
Logo
×
   

Advertisement

উপসম্পাদকীয়

জুলাই সনদ : জামায়াত ও বিএনপির ব্যবধান আকাশ-পাতাল

Advertisement

Icon

মোবায়েদুর রহমান

প্রকাশ: ০৩ অক্টোবর ২০২৫, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

জুলাই সনদ : জামায়াত ও বিএনপির ব্যবধান আকাশ-পাতাল

Advertisement

অভিন্ন কর্মসূচিতে আবার মাঠে নামছে জামায়াতসহ ৬ দল। ৫ দফা দাবি নিয়ে তারা মাঠে নামছে। যেসব দল মাঠে নামছে তারা হলো-বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিশ, খেলাফত মজলিশ, নেজামে ইসলাম, জাতীয় গণতান্ত্রিক দল (জাগপা), চরমনাই পীরের ইসলামী আন্দোলন এবং খেলাফত আন্দোলন। যেসব দাবি নিয়ে তারা মাঠে নামছে সেগুলো হলো, আসন্ন নির্বাচনের আগেই জুলাই সনদকে আইনি ভিত্তি দেওয়া বা সাংবিধানিক স্বীকৃতি দেওয়া, জুলাই সনদের ভিত্তিতে নির্বাচন (পিআর সিস্টেম) অনুষ্ঠান, সংখ্যানুপাতিক প্রতিনিধিত্বের ভিত্তিতে নির্বাচন, আওয়ামী লীগের দোসর জাতীয় পার্টিসহ অন্যদের নিষিদ্ধ করা, সব দলের জন্য লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড রচনা করা (সবার জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করা) এবং ফ্যাসিস্ট স্বৈরাচার হাসিনা সরকারের সব জুলুম, নির্যাতন, গণহত্যা ও বিচার দৃশ্যমান করা। বিগত ১ অক্টোবর থেকে তাদের এ দ্বিতীয় দফা কর্মসূচি শুরু হয়েছে। ১ অক্টোবর থেকে ৯ অক্টোবর পর্যন্ত সারা দেশে চলবে গণসংযোগ। গণসংযোগ উপলক্ষে মতবিনিময় সভা, গোলটেবিল বৈঠক, সেমিনার সিম্পোজিয়াম ইত্যাদি আয়োজন করা হবে। ১০ অক্টোবর রাজধানীসহ সব বিভাগীয় শহরে ৬টি দল আলাদা আলাদাভাবে গণমিছিল করবে। ১২ অক্টোবর সারা দেশে জেলা প্রশাসকের কাছে স্মারকলিপি দেওয়া হবে।             

উল্লেখ্য, এর আগে তাদের দাবি-দাওয়াগুলো গ্রহণ করার জন্য গত ১৮, ১৯, ২৬ সেপ্টেম্বর কর্মসূচি পালন করা হয়। ১২ অক্টোবরের মধ্যে তাদের দাবি-দাওয়া মেনে নেওয়া না হলে আরও কঠোর কর্মসূচি দেওয়া হবে বলে তারা হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছে।

জুলাই বিপ্লবের পর ড. মুহাম্মদ ইউনূস ক্ষমতায় আসেন। তার সরকারের তথা জুলাই বিপ্লবের সবচেয়ে বড় লক্ষ্য ছিল দেশের জনগণ, সংবাদপত্রসহ সবার মতপ্রকাশের পূর্ণ স্বাধীনতা প্রদান। শেখ হাসিনার ১৫ বছর ধরে এ স্বাধীনতার কণ্ঠরোধ করা হয়েছিল। ড. ইউনূস সরকারের ইতোমধ্যে ১৩ মাস ২৩ দিন অতিক্রান্ত হয়েছে। প্রায় ১৪ মাস হয়ে গেল স্বৈরাচার ও তাদের দোসর ছাড়া দেশের ১৮ কোটি মানুষের একজনকেও অকারণে গ্রেফতার করা হয়নি। প্রায় দেড় হাজার দাবি-দাওয়া নিয়ে সভা, মিছিল ও যমুনা অভিমুখী তথাকথিত ঘেরাও কর্মসূচিও পালিত হয়েছে। কিন্তু এসব কর্মসূচির জন্য বিগত ১৪ মাসে একটি গুলিও ছোঁড়া হয়নি। বিপ্লবের ফসল অন্তর্বর্তী সরকার যেহেতু মতপ্রকাশের অবাধ স্বাধীনতায় বিশ্বাস করে, তাই জামায়াতসহ ৬ দল তাদের কর্মসূচি পালন করতেই পারে। তারা হুঁশিয়ারি দিয়েছে, এসব দাবি না মানলে আগামীতে আরও কঠোর কর্মসূচি দেওয়া হবে। কঠোর কর্মসূচি তারা দিতেই পারে। নির্ভেজাল গণতন্ত্রে এগুলো হলো মৌলিক অধিকার। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এসব কর্মসূচি পালন করতে হচ্ছে কেন? ৫ দফা দাবির কথা বলা হলেও মূল বিরোধটি কোথায়? কার সঙ্গে এ বিরোধ? ড. ইউনূসের সরকার সম্পূর্ণ দলনিরপেক্ষ সরকার। যারা তার উপদেষ্টা পরিষদে আছেন তাদের কেউই কোনো দল করেন না। এখনো যে দুজন ছাত্রনেতা উপদেষ্টা পরিষদে আছেন; তারা যদি নির্বাচন করতে চান, তাহলে তফসিল ঘোষণা করার আগেই তাদের পদত্যাগ করতে হবে। সুতরাং প্রশ্নটি হলো, কার সঙ্গে তাদের বিরোধ? কোন পয়েন্টে তাদের মতদ্বৈধতা? বলার অপেক্ষা রাখে না যে মতভিন্নতা সৃষ্টি হয়েছে বিএনপির সঙ্গে। প্রশ্ন হলো বিএনপি, জামায়াত, এনসিপি, ইসলামী আন্দোলন-এসব দলই স্বৈরাচার পতনের আন্দোলনের সহযোদ্ধা। তাদের মধ্যে মতবিরোধ সৃষ্টি হচ্ছে কোন পয়েন্টে? এটি যদি বুঝতে পারা যায়, তাহলে সমস্যার জট দ্রুত খুলেও যেতে পারে।

২.

এতদিন ধরে বলা হচ্ছে, পিআর পদ্ধতি নিয়েই বিএনপির সঙ্গে বিরোধটি সৃষ্টি হয়েছে। ঠিকই বলা হয়েছে। কিন্তু তাদের দাবিগুলো গভীর অনুসন্ধানী চোখ দিয়ে দেখলে দেখা যাবে যে, মূল দাবি হলো, নির্বাচনের আগে জুলাই সনদের বাস্তবায়ন। এ বিষয়টির গভীর তাৎপর্য আমার মনে হয় অনেকে ধরতে পারেননি। বিষয়টি অন্যভাবে বলেছে নির্বাচন কমিশন। তারা বলেছে যে, দেশে সংবিধান বহাল আছে। সেই সংবিধানের ভিত্তিতেই নির্বাচন হবে। আরও বলা হয়েছে, দেশের বর্তমান সংবিধানে আপার হাউজ বা উচ্চকক্ষের কোনো বিধান নেই। একইভাবে পিআর সিস্টেমেরও কোনো সুযোগ নেই।

আসল সমস্যা বুঝতে হলে ৩টি বিষয় জানতে হবে। একটি হলো, বর্তমান সংবিধান, জুলাই সনদ এবং আরেকটি হলো, জুলাই সনদের ভিত্তিতে নির্বাচন? নাকি বর্তমান সংবিধান অনুযায়ী নির্বাচন? আরও সুনির্দিষ্ট করে বলতে গেলে বিএনপি এবং জামায়াতের মধ্যে যে বুদ্ধিবৃত্তিক লড়াইটা চলছে, সেটি হলো, বর্তমান সংবিধান বনাম জুলাই সনদের লড়াই। এটিই হলো সমস্যার কেন্দ্রবিন্দু।

গত ফেব্রুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর-মোট ৮ মাস ঐকমত্য কমিশন ৩২টি রাজনৈতিক দলের সঙ্গে ধারাবাহিক বৈঠক করে যাচ্ছে। মোট ১১টি কমিশন তাদের রিপোর্ট দাখিল করলেও নির্বাচনকে ঘিরে ৬টি কমিশনের রিপোর্ট নিয়ে আলোচনা হয়েছে। এ আলোচনার মাধ্যমে ১৬৬টি প্রস্তাব উঠে আসে। এ ১৬৬টি প্রস্তাবের মধ্য থেকে ৮৪টি প্রস্তাবের ওপর সুনির্দিষ্ট মতামত আসে। এ ৮৪টি প্রস্তাবের মধ্যে আবার ২১টি প্রস্তাবের কোনো কোনোটিতে বিএনপি নোট অব ডিসেন্ট (অসম্মতি) দেয়, আবার কোনো কোনোটিতে জামায়াত নোট অব ডিসেন্ট দেয়। তারপরও এ ৮৪টি প্রস্তাবকেই জুলাই সনদ হিসাবে সংবিধানে অন্তুর্ভুক্ত করার জন্য সাধারণ ঐকমত্য প্রতিষ্ঠিত হয়।

সাধারণ মানুষ এমনকি বুদ্ধিজীবীরাও ৬টি কমিশনের মধ্যে ৫টির সংস্কারের ব্যাপারে তত আগ্রহী নন। মানুষের যত আগ্রহ, সেটি হলো সংবিধানের সংস্কার নিয়ে। এ ব্যাপারে বিএনপির অবস্থান হলো, সংবিধানের ব্যাপারে কোনো হাত দেওয়া চলবে না। এ সংবিধানের সংস্কার বা যা কিছুই হোক না কেন, সেটি করবে আসন্ন নির্বাচনের মাধ্যমে গঠিত পার্লামেন্ট। ঠিক এখানেই যত সমস্যা এসে কেন্দ্রীভূত হয়েছে। সমস্যাটি যুগান্তরের সম্মানিত পাঠকদের জন্য আমি আরও খোলাসা করছি।

৩.

জুলাই সনদের ওপর ২৯টি দল তাদের লিখিত বক্তব্য দিয়েছে। বিএনপি তাদের লিখিত বক্তব্যে বলেছে, ‘প্রস্তাবিত জুলাই জাতীয় সনদের পরিচ্ছেদ ২ (সংস্কার কমিশন গঠন)-এ সুস্পষ্টভাবে বর্ণিত হয়েছে যে, বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার বিদ্যমান সংবিধানের অধীনে গঠিত হয়েছে। এমতাবস্থায়, ঐতিহাসিক জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা ক্ষুণ্ন হয়নি। সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা চলমান থাকা অবস্থায় প্রস্তাবিত জুলাই জাতীয় সনদকে Constitutional Instrument হিসাবে মর্যাদা দানের চেষ্টা আইনি ও সাংবিধানিক দৃষ্টিকোণ থেকে অসম্ভব, অসংগত ও অগ্রহণযোগ্য। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য যে, সংবিধানের অধীনে গঠিত কোনো সরকার রাষ্ট্রীয় শক্তি ব্যবহার করে বিদ্যমান সংবিধানের স্থলে নতুন কোনো সংবিধান ব্যবস্থা প্রবর্তন করলে, সেটি বিপ্লব নয়, বরং ক্যু হিসাবে গণ্য হবে।’

সুতরাং দেখা যাচ্ছে বিএনপির মতে, ইউনূস সরকার একটি সাংবিধানিক সরকার। এ সরকার গঠিত হয়েছে ১৯৭২ সালের সংবিধান মোতাবেক। পক্ষান্তরে জামায়াতে ইসলামীর লিখিত বক্তব্যে বলা হয়েছে এর সম্পূর্ণ বিপরীত কথা। সংস্কার কমিশনের কাছে লিখিত বক্তব্যে জামায়াত বলেছে, Whereas, the Constitution of 1972 has failed to protect the life and liberty of the people of Bangladesh leading to numerous cases of crimes against humanity and enforced disappearances by the state and government authorities. বাংলা অনুবাদ : যেহেতু ১৯৭২ সালের সংবিধান বাংলাদেশের জনগণের জীবন ও স্বাধীনতা রক্ষায় সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছে, যার ফলে মানবতার বিরুদ্ধে অসংখ্য অপরাধ সংঘটিত হয়েছে এবং রাষ্ট্র ও সরকার কর্তৃক বলপূর্বক অপহরণের অসংখ্য ঘটনা ঘটেছে।

Whereas a number of major Constitutional changes in the Executive and in the Judiciary have already been implemented in Bangladesh since the events of the 5 August 2024, through widespread consensus and in exercise of the constituent power of people. বাংলা অনুবাদ : এবং যেহেতু বাংলাদেশের জনগণের সার্বভৌম ক্ষমতার প্রয়োগের ফলে ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের বেশ কয়েকটি ঘটনাবলির মাধ্যমে অনেকগুলো বড় সাংবিধানিক, নির্বাহী এবং বিচার বিভাগে পরিবর্তন সাধিত হয়েছে।

Therefore, pursuant to the authority granted to the interim Government by the citizens of Bangladesh and pursuant to the constituent power exercised by them, the interim Government hereby proclaims and enacts the following Order. বাংলা অনুবাদ : সুতরাং, অন্তর্বর্তী সরকারকে বাংলাদেশের জনগণ কর্তৃক প্রদত্ত কর্তৃত্ব এবং সেই জনগণ কর্তৃক প্রদত্ত সার্বভৌম ক্ষমতা প্রয়োগ করে সরকার এতদ্বারা নিম্নোক্ত ফরমান জারি এবং কার্যকর করছে।

সুতরাং দেখা যাচ্ছে, বিএনপি ও জামায়াতের মধ্যে যে বিরোধ সেটি একেবারে মৌলিক। বিএনপি বলছে, এ সরকার সাংবিধানিক সরকার। পক্ষান্তরে জামায়াত বলছে, এ সংবিধান ব্যর্থ হওয়ায় জনগণ তাদের সার্বভৌম ক্ষমতা প্রয়োগ করে অন্তর্বর্তী সরকার গঠন করেছে। রাষ্ট্রবিজ্ঞান সম্পর্কে যাদের ন্যূনতম ধারণা রয়েছে তারা বিলক্ষণ বুঝবেন যে এ বিরোধটি এতই মৌলিক যেখানে আপসের কোনো স্থান নেই। এ ব্যাপারে এ মুহূর্তের জন্য দৈনিক যুগান্তর একটি নিরপেক্ষ অবস্থান গ্রহণ করে জুলাই বিপ্লবে অংশগ্রহণকারী দুটি প্রধান দলের মৌলিক অবস্থান তুলে ধরছে মাত্র। বিষয়টি অত্যন্ত মৌলিক ও জটিল হওয়ার ফলে ড. আলী রীয়াজের মতো রাষ্ট্রবিজ্ঞানের পণ্ডিত ব্যক্তিকেও বাংলাদেশের ৪ জন সংবিধান বিশেষজ্ঞের কাছে বিশেষজ্ঞ মতামত আনতে হয়েছে।

আমরা এখানে এ মুহূর্তে কোনো মন্তব্য না করে একটি সতর্কবাণী উচ্চারণ করতে চাই। আজ বিস্তারিত আলোচনায় যাচ্ছি না। সংক্ষেপে বলতে চাই, সবার কাছে একটি গ্রহণযোগ্য শাসনতন্ত্র প্রণয়নে ব্যর্থতার জন্য পাকিস্তান দ্বিখণ্ডিত হয়েছে। বাংলাদেশ ভৌগোলিকভাবে অখণ্ড একটি দেশ। এখানে বিচ্ছিন্নতার অবকাশ নেই। তবে আজ ৫৪ বছর হয়ে গেল, সর্বসম্মত কোনো সংবিধান গৃহীত হলো না। এ সমস্যার যদি সর্বসম্মত এবং সবার কাছে থেকে গ্রহণযোগ্য কোনো সমাধান না আসে, তাহলে বিষয়টি এখানেই থেমে থাকবে না, অনেক দূর গড়াবে। আমরা নিশ্চিত, ড. ইউনূসের সরকার, বিএনপি ও জামায়াত এ সমস্যাটি যে অগ্নিগর্ভ, সে বিষয়ে সচেতন।

মোবায়েদুর রহমান : সিনিয়র সাংবাদিক

[email protected]

Advertisement

বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী বিএনপি

Advertisement

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম