দখলদারত্বের অবসান না হলে স্থায়ী শান্তি অধরাই থাকবে
Advertisement
আজ্জাম তামিমি
প্রকাশ: ১১ অক্টোবর ২০২৫, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
বৃহস্পতিবার সকালে মিসর থেকে প্রথমবারের মতো একটি ভালো খবর এলো। জানা গেল, গাজায় ইসরাইল যুদ্ধের নামে যে গণহত্যা চালাচ্ছিল, তা অবসানে একটি চুক্তি হয়েছে। আমার বিশ্বাস, ফিলিস্তিনি জনগণের জন্য কিছু সুস্পষ্ট অর্জন না থাকলে হামাস নেতৃত্ব নিশ্চয়ই এ চুক্তিতে রাজি হতো না। এটি আগের যুদ্ধবিরতি চুক্তিগুলোর মতো নয়, যা ইসরাইলের লঙ্ঘনের কারণে বেশিদিন টেকেনি বা কখনোই পুরোপুরি কার্যকর হয়নি। বলা যেতে পারে, বরং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে এবারের চুক্তিটি হয়েছে অন্তত আটটি আরব ও মুসলিম দেশের অংশগ্রহণে একটি আন্তর্জাতিক প্রচেষ্টার মাধ্যমে। আন্তর্জাতিক জোটের মধ্যস্থতায় হওয়া এ ধরনের চুক্তি স্বাক্ষর নিশ্চয়তা দেয় যে, তা কঠোরভাবেই মেনে চলা হবে। ট্রাম্পের দুজন বিশেষ দূত এবং কাতার ও তুরস্কের দুজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তার উপস্থিতি সে ধারণাই নিশ্চিত করেছে।
সন্দেহ নেই, এ চুক্তি চূড়ান্ত করা সহজ ছিল না। এটি নিয়ে টানা কয়েকটি দিন ও রাত কঠোর আলোচনা চলে, যার কেন্দ্রে ছিল ট্রাম্পের ২০ দফা পরিকল্পনা। ধারণা করা হয়, এটি ছিল নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে আরব ও মুসলিম নেতাদের কাছে তিনি যে মূল পরিকল্পনা পেশ করেছিলেন, তার একটি পরিবর্তিত রূপ। ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু এ চুক্তিকে হামাসের ওপর চাপিয়ে দেওয়া আত্মসমর্পণ হিসাবে দেখাতে চেয়েছিলেন এবং এর জন্য বিভিন্ন পরিবর্তনও এনেছিলেন। তারপরও স্বাধীনতাকামী ফিলিস্তিনি সংগঠন হামাস ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ বলার ক্ষেত্রে অত্যন্ত সতর্ক ছিল। বিবৃতির মাধ্যমে তারা দারুণ কৌশলী জবাব দেয়, যেখানে ইতিবাচক মনোভাব নিয়ে আলোচনা চালিয়ে যাওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করা হয়।
শারম আল-শেখের আলোচনার বিস্তারিত খুব বেশি জানা যায়নি। তবুও, এটা ধরে নেওয়া যেতে পারে যে, আলোচনার সময় হামাসের মনোযোগ ছিল চুক্তিটিতে তাদের মূল দাবিগুলোর ওপর : ইসরাইলি সৈন্য প্রত্যাহার, বন্দিবিনিময়, ত্রাণ প্রবেশের অনুমতি এবং পুনর্গঠনের একটি সময়সূচি নির্ধারণ।
এখানেই সমাপ্তি নয়
যুদ্ধ থামবে এবং ইসরাইলিরা পর্যায়ক্রমে গাজা থেকে সরে যাবে, যা যুদ্ধবন্দিদের বিনিময়ের পথ সুগম করবে। পুনর্গঠন এবং শাসনকার্য যে পরের ধাপে আসবে, তা স্বাভাবিকভাবেই অনুমেয়। তবে এ চুক্তির সবচেয়ে বড় অর্জন হলো নেতানিয়াহুর প্রতিরোধ গুঁড়িয়ে দেওয়া এবং গাজা থেকে জনগোষ্ঠীকে উচ্ছেদ করার পরিকল্পনা ব্যর্থ হওয়া। এ চুক্তি তথাকথিত ‘ধর্মীয় জায়নবাদ’ গোষ্ঠীর জন্যও একটি বড় আঘাত, যারা গাজায় গণহত্যার মূল চালিকাশক্তি ছিল। তাছাড়া দুই বছরের গণহত্যা পুরো বিশ্বের সামনে ইসরাইলকে নগ্ন করে দিয়েছে। অন্য যে কোনো সময়ের চেয়ে জায়নবাদের আসল রূপ বিশ্ব আজ চিনতে পারছে। নেতানিয়াহুসহ ইসরাইলের শীর্ষ নেতারা বিশ্বের সর্বোচ্চ আদালতগুলোতে এখন অভিযুক্ত যুদ্ধাপরাধী। এটি এমন এক কলঙ্ক, যা আগামী প্রজন্ম কখনো ভুলবে না বা উপেক্ষা করতে পারবে না।
যুদ্ধবিরতি চুক্তিতে সম্মত হওয়ার অর্থ কোনোভাবেই এই নয় যে, ইসরাইলের যুদ্ধাপরাধগুলো ভুলে যাওয়া হবে বা ক্ষমা করা হবে। মনে রাখা দরকার, হামাস সবসময়ই যুদ্ধবিরতি চেয়েছে। নেতানিয়াহু এবং তার কট্টরপন্থি সরকারই আগের সব চুক্তির প্রচেষ্টা ভেস্তে দিয়েছে। এমনকি তারা দুই পক্ষের মধ্যে হওয়া চুক্তি থেকেও সরে এসেছে। এবার পরিস্থিতি বদলের একটি কারণ হলো, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প নোবেল শান্তি পুরস্কার পাওয়ার জন্য অতীব আগ্রহী। তবে আমাদের বুঝতে হবে, এটিই সমস্যার শেষ নয়। ফিলিস্তিনিরা এখনো তাদের স্বাধীনতা অর্জন করতে পারেনি, যার জন্য তারা এক শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে সংগ্রাম করছে। তাই স্বাধীনতার জন্য এ সংগ্রাম অনিবার্যভাবে চলতেই থাকবে। শুধু তা-ই নয়। যতক্ষণ ইসরাইলি দখলদারত্ব চলমান থাকবে, এ অঞ্চলে উত্তেজনা বিরাজ করবে এবং ভবিষ্যতে আরও সংঘাত দেখা দেওয়াটাই স্বাভাবিক।
এ কারণেই ট্রাম্প যে দীর্ঘস্থায়ী শান্তির প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, ফিলিস্তিনের জায়নবাদী দখলদারত্বের সম্পূর্ণ অবসান না হলে তা অধরাই থেকে যাবে। গাজার মানুষকে যখন খোলা আকাশের নিচে কারাগারে অবরুদ্ধ রাখা হয় এবং পশ্চিম তীরের অধিকৃত এলাকার মানুষ যখন ইহুদি বসতি স্থাপনকারীদের হামলার শিকার হয়, যারা তাদের জমি ছিনিয়ে নেয়, জলপাই গাছ পুড়িয়ে দেয় এবং দিনরাত তাদের জীবিকা ধ্বংস করে, তখন কীভাবে শান্তি সম্ভব?
শান্তির জন্য হামাসের সূত্র : হুদনা
দীর্ঘস্থায়ী শান্তির জন্য হামাসের পরিকল্পনা শুরু হয় একটি দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধবিরতি বা হুদনা দিয়ে। ইসলামি আইনশাস্ত্রে হুদনা একটি বৈধ ও বাধ্যতামূলক চুক্তি হিসাবে স্বীকৃত, যার লক্ষ্য হলো একটি নির্দিষ্ট সময়ের জন্য শত্রুর সঙ্গে যুদ্ধ বন্ধ করা। পারস্পরিক প্রয়োজন ও স্বার্থের ভিত্তিতে এ সময়কাল সংক্ষিপ্ত বা দীর্ঘ হতে পারে। হুদনার চেয়ে কম কিছু হলে বুঝতে হবে ইসরাইল দীর্ঘস্থায়ী শান্তি নিয়ে মোটেই আন্তরিক নয়।
এখন সময় এসেছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের নেতাদের ফিলিস্তিনি প্রতিরোধ আন্দোলনকে আরও গুরুত্ব সহকারে নেওয়ার এবং তাদের দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব বিবেচনা করার। অসলো শান্তি চুক্তির ব্যর্থতা এবং দ্বি-রাষ্ট্র সমাধানের সব সম্ভাবনা নস্যাৎ হওয়ার পর হুদনাই হয়তো শান্তির একমাত্র কার্যকর পরিকল্পনা হতে পারে। হামাসের প্রসঙ্গে বলতে গেলে, বহু ফিলিস্তিনির কাছে এ সংগঠনটি কেবল একটি সামরিক শক্তি নয়; এটি একটি আদর্শ, একটি সংস্কৃতি এবং একটি চলমান প্রক্রিয়া। সামরিক দিক থেকে দুই বছরের যুদ্ধে আন্দোলনটি নিঃসন্দেহে দুর্বল হয়েছে; কিন্তু এটি শেষ হয়ে যায়নি। তবে একটি আদর্শ হিসাবে ইসরাইলের দখলদারত্ব ও অপরাধের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ আগের মতোই সজীব; এর নাম হামাস হোক বা অন্য কিছু। সেই আদর্শ এখন আগের চেয়েও শক্তিশালী।
সাম্প্রতিক জরিপ অনুযায়ী, গাজার মানুষের অকল্পনীয় কষ্ট ও দুর্ভোগ সত্ত্বেও এ ফিলিস্তিনি আন্দোলনই জনগণের প্রথম পছন্দ হিসাবে রয়ে গেছে। এটি অপ্রত্যাশিত নয়, কারণ গাজার বেশিরভাগ বাসিন্দা হলো সেই ফিলিস্তিনিদের বংশধর, যাদের ১৯৪৮ সালে জায়নবাদী সশস্ত্র দলগুলো গণহত্যা ঘটিয়ে স্থানীয়দের বিতাড়িত করার সময় তাদের জন্মভূমি ও শহর ছেড়ে পালাতে বাধ্য করেছিল।
গাজার জনগণ এবং প্রতিরোধ আন্দোলনগুলো প্রমাণ করেছে, কোনো নৃশংস শক্তি, কোনো গণহত্যা, কোনো মানবতাবিরোধী অপরাধ বা উচ্ছেদের হুমকি-কোনো কিছুই ফিলিস্তিনি জনগণকে দখলদারত্ব প্রতিরোধের এবং তাদের নিজ ভূমিতে ফিরে আসার অধিকার থেকে সরিয়ে দিতে পারবে না; সেই ভূমিতে, যেখান থেকে জায়নবাদীরা সাম্রাজ্যবাদী পশ্চিমা রাষ্ট্রগুলোর সহায়তায় ৭৪ বছরেরও বেশি আগে তাদের পূর্বপরুষদের বিতাড়িত করেছিল।
মিডল ইস্ট আই থেকে ভাষান্তরিত
আজ্জাম তামিমি : ফিলিস্তিনি শিক্ষাবিদ ও রাজনৈতিক কর্মী
