সংস্কার কমিশন পিছু হটল কেন
Advertisement
মোবায়েদুর রহমান
প্রকাশ: ১৭ অক্টোবর ২০২৫, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
হঠাৎ করে রাজনীতির নিঃসীম নীলিমায় টুকরো টুকরো কালো মেঘ দেখা যাচ্ছে। এটি দেখা যাচ্ছে বলতে গেলে, অক্টোবরের শুরু থেকেই। বুধবার সন্ধ্যায় এ কলামটি লেখার ঠিক পূর্ব মুহূর্তে একটি বহুল প্রচারিত অনলাইন বাংলা দৈনিকের প্রধান সংবাদের শিরোনাম দেওয়া হয়েছে, ‘জুলাই সনদ নিয়ে নতুন সংকট, অতি জরুরি বৈঠক সন্ধ্যায়’। খবরে বলা হয়েছে, গত মঙ্গলবার রাতে জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সঙ্গে বৈঠক করে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)।
সেখানে দলটির পক্ষ থেকে কঠোর অবস্থান তুলে ধরা হয়। ‘সংবিধান আদেশ’ জারির মাধ্যমে সংস্কার প্রক্রিয়া আগানো না হলে এনসিপি সনদে সই করবে না বলে ওই বৈঠকে জানানো হয়। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, এনসিপি বলছে, তারা মনে করে, এর আগে জুলাই ঘোষণাপত্র প্রণয়নের সময় তারা ছাড় দিয়েছে। এবার আর ছাড় দেওয়ার কোনো সুযোগ নেই। তারা সংস্কার, বিশেষ করে সংবিধান সংস্কার প্রশ্নে নতুন করে পুরো আলোচনা শুরু করার পক্ষে।
অপর একটি বাংলা দৈনিকে বলা হয়েছে, জামায়াতে ইসলামীও জুলাই সনদ স্বাক্ষর করবে কিনা এবং স্বাক্ষর অনুষ্ঠানে হাজির হবে কিনা সে ব্যাপারে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত এখনো (এ ভাষ্য লেখার সময় বুধবার রাত ৯টায়) গ্রহণ করেনি। বলা হয়েছে, বুধবারেই জামায়াতের নীতিনির্ধারণী পরিষদের বৈঠক বসবে এবং সেখানে এ সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হবে।
তবে জামায়াতের একাধিক সূত্র এ ভাষ্যকারকে বলেছেন, ব্যক্তিগতভাবে জুলাই সনদের যে খসড়া রাজনৈতিক দলগুলোর কাছে পাঠানো হয়েছে, সেটা পড়ে তারা সন্তুষ্ট হতে পারেননি। কারণ সেখানে পিআরের কোনো কথা নেই, সনদ বাস্তবায়িত হবে কীভাবে, অর্থাৎ কীভাবে এ মুহূর্তে সেটি সংবিধানের অংশ হবে এবং গণভোট কবে হবে, এ সম্পর্কে সনদের খসড়ায় কোনো কিছুর উল্লেখ নেই। এ অবস্থায় ব্যক্তিগতভাবে তারা মনে করেন, এ ধরনের একটি অসম্পূর্ণ খসড়ায় তারা সই করতে পারেন না। তবে এগুলো তাদের ব্যক্তিগত মতামত। চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত তারা কেন্দ্রীয় নীতিনির্ধারণী পরিষদে গ্রহণ করবেন।
সংক্ষেপে বলা যায়, জুলাই সনদ নিয়ে গভীর সংকটের সৃষ্টি হয়েছে। এর আগে যুগান্তরের এ কলামে আমি যেসব উপসম্পাদকীয় লিখেছিলাম, সেখানে স্পষ্ট বলেছিলাম, জুলাই সনদ নিয়ে বিএনপি এবং জামায়াতের মধ্যে আকাশ-পাতাল তফাত। এখন সেই তফাতটি প্রকট হয়ে দেখা দিয়েছে।
বিএনপি জুলাই সনদের খসড়াকে মুক্তকচ্ছ সমর্থন দিয়েছে। সালাহউদ্দিন আহমদের নেতৃত্বে বিএনপির তিন সদস্যের একটি টিম জুলাই সনদ স্বাক্ষর অনুষ্ঠানে যোগ দেবে বলে ঘোষণা করা হয়েছে। আমি ইতঃপূর্বে যুগান্তরে একাধিকার লিখেছি এবং আজও লিখছি, বিএনপি এবং জামায়াতের মধ্যে তফাতটি মৌলিক। বিএনপি চায় বর্তমান সংবিধানের ভিত্তিতে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হোক। বিএনপির এ ব্যাপারে অবস্থান হলো, যেহেতু সংবিধানের ১০৬ অনুচ্ছেদের অধীনে সুপ্রিমকোর্টের মতামত নিয়ে ইউনূস সরকার গঠিত হয়েছে, তাই ইউনূস সরকার তথা ইন্টারিম সরকার বর্তমান সংবিধানেরই ধারাবাহিকতায় একটি সাংবিধানিক সরকার।
পক্ষান্তরে জামায়াত এবং এনসিপি মনে করে, এ সরকার জুলাই বিপ্লবের মাধ্যমে প্রকাশিত জনগণের অভিপ্রায় মোতাবেক গঠিত সরকার। সুতরাং, এ সরকারের স্থান সংবিধানেরও ঊর্ধ্বে। এনসিপি গত মঙ্গলবার ঐকমত্য কমিশনের সঙ্গে বৈঠকে দাবি করেছে, একটি সাংবিধানিক ফরমান বলে জুলাই সনদ ঘোষিত হোক। এর পর গণভোট হোক। যদি সাংবিধানিক ফরমান মোতাবেক জুলাই সনদ ঘোষিত হয়, তাহলে তারা নির্বাচনের দিন গণভোট হলেও তাদের আপত্তি থাকবে না। পিআরের ব্যাপারে তাদের অবস্থান হলো, নিুকক্ষে বর্তমান ব্যবস্থা, অর্থাৎ আসনভিত্তিক নির্বাচনে তাদের কোনো আপত্তি নেই। কিন্তু উচ্চকক্ষে সংখ্যানুপাতিক প্রতিনিধিত্ব বা পিআরভিত্তিক নির্বাচন হতে হবে।
জামায়াতে ইসলামীর অবস্থান হলো, তারা দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদ চায় এবং সংসদের উভয় কক্ষেই তারা পিআর চায়। তারা নির্বাচনের আগে জুলাই সনদের ওপর গণভোট চায়। এ গণভোট অনুষ্ঠিত হওয়ার পর অনুমোদিত জুলাই সনদের ভিত্তিতে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। চরমোনাইয়ের পীর সাহেবের দল ইসলামী আন্দোলন জামায়াতের অবস্থানের সঙ্গে একমত। কিন্তু বিএনপি বলে, যেহেতু ইন্টারিম সরকার একটি সাংবিধানিক সরকার, তাই সেই সাংবিধানিক সরকারের কোনো Constituent Power বা সাংবিধানিক ক্ষমতা নেই। সে কারণেই কোন সাংবিধানিক ফরমান বলে জুলাই সনদ ঘোষণার ক্ষমতা ইন্টারিম সরকারের নেই।
আমি প্রথম থেকেই আশঙ্কা করছিলাম, এ প্রশ্নে যে জটিলতার সৃষ্টি হয়েছে, সেটিকে ইন্টারিম সরকার এবং ড. আলী রীয়াজের ঐকমত্য কমিশন বাইপাস করে যাচ্ছে। আমি বারবার বলেছি, একটি সর্বজনগ্রহণযোগ্য সংবিধান প্রণয়ন করতে পারেনি বলে পাকিস্তান ভেঙে গেছে। বাংলাদেশের মাটি ভৌগোলিকভাবে একটি এককে সংহত বলে হয়তো বিচ্ছিন্নতা সম্ভব নয়। কিন্তু সর্বজনগ্রহণযোগ্য সংবিধান তৈরি করতে না পারলে, দেশ ঘোরতর নৈরাজ্যে নিক্ষিপ্ত হবে।
২.
এ লেখাটি প্রকাশিত হচ্ছে শুক্রবার, অর্থাৎ আজ। বুধবার ড. ইউনূসের উপস্থিতিতে যে অতি জরুরি বৈঠক হয়ে গেল, সেই বৈঠকে কী সিদ্ধান্ত গৃহীত হলো, সেটি জানা সম্ভব হলো না। তবে আমি এ মর্মে হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করতে চাই, যদি তিনটি প্রধান রাজনৈতিক দলের যে কোনো একটি বা একাধিক রাজনৈতিক দল জুলাই সনদ স্বাক্ষর না করে, তাহলে শুধু জুলাই সনদ নয়, এর ফলে ফেব্রুয়ারির নির্বাচনও বিপন্ন হয়ে পড়বে।
এরই মধ্যে ঐকমত্য কমিশন, তথা সরকার কিছু উলটাপালটা কাজ করছে। ঐকমত্য কমিশনই একতরফাভাবে ঘোষণা করেছিল, তারা সংবিধান থেকে ৪(ক) অনুচ্ছেদটি বিলুপ্ত করবে। এ সিদ্ধান্ত ব্যাপকভাবে অভিনন্দিত হয়েছিল। কিন্তু বুধবার পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত সিদ্ধান্ত মোতাবেক দেখা গেল, শেষ মুহূর্তে ঐকমত্য কমিশন ৪(ক) অনুচ্ছেদ বিলুপ্ত করার সিদ্ধান্ত থেকে সরে এসেছে। বলা হয়েছে, এ সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে পরবর্তী নির্বাচিত সরকার।
৪(ক) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, ‘জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতিকৃতি রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী, স্পিকার ও প্রধান বিচারপতির কার্যালয় এবং সকল সরকারি ও আধা-সরকারি অফিস, স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান, সংবিধিবদ্ধ সরকারি কর্তৃপক্ষের প্রধান ও শাখা কার্যালয়, সরকারি ও বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, বিদেশে অবস্থিত বাংলাদেশের দূতাবাস ও মিশনসমূহে সংরক্ষণ ও প্রদর্শন করিতে হইবে।’
ঐকমত্য কমিশনের এ সিদ্ধান্তটি ইতঃপূর্বে জনগণ কর্তৃক গৃহীত এবং ড. ইউনূস কর্তৃক অনুমোদিত সিদ্ধান্তের বিপরীত। পক্ষান্তরে অনেকে বলে যে, এ সরকারের সংবিধানে হাত দেওয়ার কোনো ক্ষমতা নেই। কারণ, তাদের হাতে কোনো Constituent Power নেই। এ প্রশ্নের বিপরীতে অনেক কথাই উঠে আসে। প্রথমদিকে রাষ্ট্রপতি থেকে শুরু করে প্রধান উপদেষ্টা, উপদেষ্টারা এবং সচিব থেকে শুরু করে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের সরকারি অফিসে প্রধানমন্ত্রীর পাশে শেখ মুজিবুর রহমানের ছবি অপসারণে উপদেষ্টা পরিষদের অনেকে টালবাহানা করছিলেন। তখন ছাত্র প্রতিনিধিরা এবং বিপ্লবের অন্যতম নায়ক ইউনূসের অন্যতম উপদেষ্টা মাহফুজ আলম নিজে বঙ্গভবনে গিয়ে শেখ মুজিবের ছবি অপসারণ করেন। এ ঘটনার পর উপদেষ্টারা এবং অনেক সরকারি অফিস থেকে শেখ মুজিবের ছবি অপসারণ করা হয়েছে।
৩.
আরও অনেক কথা রয়েছে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট বিকালে লাখ লাখ মানুষ র্যাংগস ভবনের বিপরীতে বিজয় সরণিতে মৃত্যুঞ্জয়ী প্রাঙ্গণে স্থাপিত শেখ মুজিবের বিশাল সোনালি মূর্তি ভেঙে রশি দিয়ে সেটি টেনে নামায়। যখন সেই বিশাল মূর্তিটি রশির টানে ধীরে ধীরে পড়ে যাচ্ছিল, তখন জনগণ বিজয়োল্লাসে করতালি দিচ্ছিলেন। এ ব্যাপারে সাংবাদিকরা ড. ইউনূসকে প্রশ্ন করলে তিনি বলেন, কেন মূর্তি ভাঙা হয়েছে, সেটি আপনারা তার কন্যা শেখ হাসিনাকে জিজ্ঞাসা করুন। অন্য কথায় শেখ মুজিবের মূর্তি ভাঙায় দেশের কোটি মানুষের সমর্থন ছিল বলে ড. ইউনূসও সেটি ওই ধরনের উত্তরের মাধ্যমে সমর্থন করেছেন।
চলতি বছরের ৫ ফেব্রুয়ারি শেখ মুজিবের ধানমণ্ডি ৩২ নম্বরের বাড়িটি জনগণ ধ্বংস করে দেন। ৫ ফেব্রুয়ারি সন্ধ্যা থেকে এ বাড়িটি ভাঙা শুরু হয়। ৫ তারিখ রাতে ছাত্রদের সঙ্গে কিছুসংখ্যক মানুষ যুক্ত হন। পরদিন অর্থাৎ ৬ ফেব্রুয়ারি ভোর থেকে হাজার হাজার মানুষ এ বাড়ি ধ্বংসের কাজে যুক্ত হন এবং সন্ধ্যার আগেই বাড়িটি ধূলিসাৎ করা হয়। বেলা ১০টার পর থেকে হাজার হাজার মানুষ এ ধ্বংসযজ্ঞ দেখার জন্য মোটরগাড়ি, সিএনজি অটোরিকশা ও রিকশাযোগে এবং হাজার হাজার মানুষ পদব্রজে ৩২ নম্বরে আসেন।
আরও গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার হলো, বাংলাদেশের কাগজী নোট থেকে শেখ মুজিবের ছবি গত জুন থেকে অপসারণ করা হয়েছে। সিদ্ধান্তটি নেওয়া হয়েছিল গত বছরেই। কিন্তু বিভিন্ন ডিনোমেনোশনের কারেন্সি থাকায় সেগুলোর ডিজাইন এবং নোট ছাপতে সময় লেগেছিল। সংবাদপত্রে প্রকাশিত খবর, উইকিপিডিয়া ও এআই কর্তৃক পরিবেশিত খবর মোতাবেক গত বছর শেখ মুজিবের কম করে হলেও ১ হাজার ৪৯২টি মূর্তি ভাঙা হয়েছে। দিনাজপুরে দুটি বড় মূর্তি ভাঙা হয়েছে এবং পাবনায় ‘শিখর থেকে শিখরে’ নামের ২৬ ফুট উচ্চতার মূর্তি জনগণ ভেঙে ফেলেন। সারা দেশে শেখ মুজিব, বেগম মুজিব এবং শেখ মুজিবের পরিবারের অন্য সদস্যের নামে যেসব সামরিক ও বেসামরিক স্থাপনা, প্রতিষ্ঠান, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল, অফিস, আদালতে ছিল, সেগুলো থেকে তাদের নাম মুছে ফেলে নতুন নাম দেওয়া হয়।
এত কিছুর পরেও কি সংবিধানের ৪(ক) মোতাবেক শেখ মুজিব জাতির পিতা রয়েছেন? এত কিছুর পরেও সংবিধানের ঐ ৪(ক) অনুচ্ছেদ বিলুপ্ত করতে বাধা কোথায় ছিল? ১৫ অক্টোবর রাত সাড়ে ৯টাতেও অতীব জরুরি বৈঠকের ফলাফল জানা গেল না। ২৫ জুন সাবেক ও বর্তমানে সার্ভিং আর্মি অফিসারের বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধ, যথা-আয়নাঘর, গুম, ক্রসফায়ার ইত্যাদি গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। তাদের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানাও জারি হয়েছে। ওইদিকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ক্যান্টনমেন্টের ৫৪ নম্বর ভবনকে সাবজেল ঘোষণা করেছে। এ নিয়ে সরকারের একাধিক গুরুত্বপূর্ণ পাওয়ার সেন্টারে টানাপোড়েন চলছে।
এমন একটি পটভূমিতে বুধবার রাতের অতীব জরুরি বৈঠক যেন সফল হয়, সে সম্পর্কে জাতি একটি সুসংবাদ পাওয়ার জন্য অপেক্ষা করছে। এ জাতি চায় না, আর একটি নতুন সংকট জুলাই বিপ্লবের স্পিরিট নষ্ট করুক।
মোবায়েদুর রহমান : সিনিয়র সাংবাদিক
