Logo
Logo
×
   

Advertisement

উপসম্পাদকীয়

আর্থিক খাতে সুশাসন বেশি জরুরি

Advertisement

Icon

আবুল কাসেম হায়দার

প্রকাশ: ০৯ নভেম্বর ২০২৫, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

আর্থিক খাতে সুশাসন বেশি জরুরি

Advertisement

বাংলাদেশে সরকারি-বেসরকারি মিলে ব্যাংকের সংখ্যা রয়েছে ৬৭টি। তফসিলি ব্যাংক রয়েছে ৬১টি এবং রাষ্ট্র মালিকানাধীন বাণিজ্যিক ব্যাংক রয়েছে ৬টি। বিগত স্বৈরশাসকের আমলে দেশে ব্যাংক অনুমোদনের হিড়িক চলছিল। রাজনৈতিক বিবেচনায় ব্যাংক অনুমোদন যেন শখের বিষয় ছিল। যাকে ইচ্ছা তাকে ব্যাংকের অনুমোদন দেওয়া হয়। আর অনুমোদনপ্রাপ্তরা ব্যাংক করার আগেই বাণিজ্য শুরু করেন। কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে ব্যাংক অন্যদের দিয়ে দেন। অনেকে আবার বিনা পুঁজিতে ব্যাংকের মালিক বনে যান। আর ব্যাংক স্থাপনের পর শুরু করেন নামে-বেনামে ব্যাংক থেকে অর্থ লোপাট। এতে বিগত ১৬ বছর ব্যাংকিং খাত সবচেয়ে দুর্বল খাতে পরিণত হয়েছে।

এর মধ্যেই দেশে এখন সরকারি কর্মচারীদের জন্য আলাদা ব্যাংক গঠনের আলোচনা শুরু হয়েছে। প্রাথমিকভাবে প্রস্তাবিত ব্যাংকটির একটি নামও ঠিক করা হয়েছে। সেটি হলো, ‘সরকারি কর্মচারী ব্যাংক।’ জাতীয় বেতন কমিশন সরকারি চাকরিজীবীদের দেশের ‘বেতনভোগী একটি টেকসই শ্রেণি’ আখ্যা দিয়ে তাদের জন্য এ ব্যাংক প্রতিষ্ঠার আলোচনা শুরু করেছে বলে জানা গেছে। পল্লী কর্মসহায়ক ফাউন্ডেশনের (পিকেএসএফ) চেয়ারম্যান ও সাবেক অর্থসচিব জাকির আহমেদ খানকে সভাপতি করে গত ২৭ জুলাই জাতীয় বেতন কমিশন গঠন করে সরকার। কমিশনকে ছয় মাসের মধ্যে প্রতিবেদন দাখিল করতে বলা হয়েছে।

যতটুকু জানা যায়, দুনিয়ার কোথাও এ রকম ব্যাংক নেই। দেশে যত ব্যাংক আছে, সেগুলোই বেশি। নতুন কোনো ব্যাংক করার চিন্তা থেকে সরে এসে সরকারের উচিত হবে বিদ্যমান ব্যাংকগুলোর কার্যক্রম কীভাবে আরও ভালো করা যায়, সেই উদ্যোগ নেওয়া।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর মোহাম্মদ ফরাসউদ্দিনের নেতৃত্বাধীন জাতীয় বেতন কমিশন এর আগে ২০১৪ সালের ডিসেম্বরে একই ধরনের সুপারিশ করেছিল। বিষয়টি পরে অবশ্য আর এগোয়নি। সুপারিশটি ছিল, রাজধানীর দৈনিক বাংলা মোড়ের কাছাকাছি থাকা সরকারি জমি থেকে ২০-২৫ কাঠা জমি বিক্রি করে একটি ব্যাংক গঠন করা হবে। তখন ‘সমৃদ্ধির সোপান ব্যাংক’ শীর্ষক একটি নামও দেওয়া হয়েছিল। সুপারিশে বলা হয়েছিল, প্রস্তাবিত ব্যাংকটির পরিশোধিত মূলধন হবে ৪০০ কোটি টাকা।

জাকির আহমেদ খানের নেতৃত্বাধীন নতুন জাতীয় বেতন কমিশনের কার্যপরিধিতে সরকারি, আধা সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান, রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান, সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় এবং রাষ্ট্রায়ত্ত শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিদ্যমান বেতন-ভাতা ও অন্যান্য সুবিধা পর্যালোচনাসংবলিত সুপারিশ করার কথা বলা হয়েছে। ব্যাংক প্রতিষ্ঠার কোনো কথা নেই কার্যপরিধিতে। তারপরও প্রতিবেদনে সরকারি কর্মচারীদের জন্য ব্যাংক প্রতিষ্ঠা করার সুপারিশ করার বিষয়ে আলোচনা চলছে।

বাংলাদেশ ব্যাংক ও অর্থ মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, বিশ্বের কোথাও সরকারি কর্মচারীদের জন্য আলাদা ব্যাংক প্রতিষ্ঠার কোনো নজির নেই। যোগাযোগ করা হলে অর্থ উপদেষ্টা সালেহউদ্দিন আহমেদ গত মঙ্গলবার যুক্তরাষ্ট্র থেকে মুঠোফোনে জানান, বিষয়টি নিয়ে তিনি আপাতত কোনো মন্তব্য করতে চান না। সরকারি কর্মচারীদের জন্য ব্যাংক প্রতিষ্ঠা করতে কিছু যুক্তি তৈরি করেছেন বেতন কমিশনের প্রভাবশালী সদস্যরা। তারা মনে করেন, পুলিশ, সেনাবাহিনী, বিজিবি এবং আনসার-ভিডিপির জন্য আলাদা ব্যাংক রয়েছে। ফলে ২০ লাখ সরকারি কর্মচারীর জন্যও একটি ব্যাংক গঠন করা যেতেই পারে। তাদের বেতন-ভাতা বাবদ বছরে বরাদ্দ থাকে এক লাখ কোটি টাকার কাছাকাছি।

আরও যুক্তি হচ্ছে সরকারি কর্মচারীরা বেতন-ভাতা পান ইলেকট্রনিক ফান্ড ট্রান্সফারের (ইএফটি) মাধ্যমে। এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় বদলি হলে তাদের ব্যাংক হিসাব পালটাতে হয়, বেতন-ভাতা পেতে দেরি হয়। শুধু সরকারি কর্মচারীদের ব্যাংক থাকলে এ সমস্যার সৃষ্টি হতো না। ছেলেমেয়ের পড়াশোনা, মেয়ের বিয়ে ইত্যাদি বিষয়ে স্বল্প সুদে ঋণের ব্যবস্থাও থাকবে প্রস্তাবিত সরকারি কর্মচারী ব্যাংকে। এখন যেমন সরকারি কর্মচারীদের বিভিন্ন ব্যাংক থেকে গৃহনির্মাণ ঋণ নিতে হয়, আলাদা ব্যাংক হলে আর এ পেরেশান পোহাতে হবে না। এমনকি সুদের হারও কম রাখা সম্ভব হবে। বেতন কমিশনের সদস্যদের কেউ কেউ অবশ্য বিদ্যমান কোনো দুর্বল ব্যাংককে সরকারি কর্মচারী ব্যাংকে রূপান্তরের পরামর্শ দেন বলে জানা গেছে। আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিব নাজমা মোবারেকের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।

এদিকে রাজনৈতিক বিবেচনায় অনুমোদন পাওয়া ব্যাংকগুলোতে ব্যাপক লুটপাট হয়েছে। এর নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে পুরো ব্যাংক খাতে। সেজন্য ইসলামি ধারার পাঁচটি ব্যাংক নিয়ে একটি নতুন ব্যাংক গঠনের কাজ শুরু করেছে অন্তর্বর্তী সরকার।

সরকারি কর্মচারীদের জন্য ব্যাংক গঠন করা ঠিক হবে কিনা, জানতে চাইলে অগ্রণী ব্যাংকের চেয়ারম্যান সৈয়দ আবু নাসের বখতিয়ার আহমেদ বলেন, ‘চিন্তাটির কথা শুনে আমি একটু অবাক হয়েছি। দুনিয়ার কোথাও এ রকম ব্যাংক নেই। দেশে যত ব্যাংক আছে, সেগুলোই বেশি। নতুন কোনো ব্যাংক করার চিন্তা থেকে সরে এসে সরকারের উচিত হবে বিদ্যমান ব্যাংকগুলোর কার্যক্রম কীভাবে আরও ভালো করা যায়, সেই উদ্যোগ নেওয়া।’

এ চিন্তা থেকে সরে আসতে হবে : সরকারি বেতন কমিশনের কোনো দায়িত্ব নেই, নতুন করে সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য ব্যাংক কমিশনের সুপারিশ করা। তাদের যে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে, তা তারা পালন করুক। অতিরিক্ত দায়িত্ব নিয়ে দেশের জনগণের বোঝাকে ভারী করার কোনো প্রয়োজন নেই। দ্বিতীয়ত, দেশে এমনিতে প্রয়োজনের বেশি ব্যাংক রয়েছে। অতিরিক্ত ব্যাংক স্থাপন করে আর্থিক খাতকে দুর্বল থেকে আরও দুর্বল করার এখতিয়ার কারও নেই। তৃতীয়ত, বর্তমান সরকার ইতোমধ্যে দুর্বল ব্যাংকগুলোকে একত্র করে একটি ব্যাংক করার উদ্যোগ নিয়েছেন। ইতোমধ্যে ৫টি দুর্বল ইসলামী ব্যাংক একত্র করে একটি সরকারি বড় ব্যাংক হচ্ছে। চতুর্থত, বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের মেয়াদ শেষ, ফেব্রুয়ারি-২৬ জাতীয় নির্বাচন। এ অল্প সময়ের মধ্যে এত বড় সিদ্ধান্ত নেওয়া কোনোক্রমেই উচিত নয়। পঞ্চম, দেশের বর্তমান দুর্বল ব্যাংকিং ও আর্থিক খাতের উন্নয়ন সংস্কার, পরিবর্ধন করার প্রতি সরকারের সঠিক মনোযোগী হওয়া উচিত। কীভাবে দেশের ব্যাংক ও আর্থিক খাতে উন্নয়ন করা যাবে-সেই দিকে বেশি পরিশ্রম করা প্রয়োজন।

দেশে ৩২টি অ-আর্থিক প্রতিষ্ঠান রয়েছে। এরই মধ্যে প্রায় ১০টি অ-আর্থিক প্রতিষ্ঠান খুবই দুর্বল। এগুলোর উন্নতির জন্য সরকারকে অর্থ বরাদ্দ দিয়ে শক্তিশালী করার চেষ্টা করা প্রয়োজন। বিশেষ করে এ ৩২টি অ-আর্থিক প্রতিষ্ঠানকে শক্তিশালী করার জন্য মাত্র ১০ হাজার কোটি টাকা বিশেষ বরাদ্দ দিলে এবং প্রতিষ্ঠানে সুশাসন ফিরিয়ে আনলে দেশের কল্যাণ অনেক বেশি হবে। ব্যাংকিং খাতের দুর্নীতি, অনিয়ম দূর করে একটি শক্ত আইনের ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠান করার জন্য বর্তমান সরকারের বিশেষ উদ্যোগ খুবই জরুরি।

আবুল কাসেম হায়দার : সাবেক সহ-সভাপতি, এফবিসিসিআই

[email protected]

Advertisement

Advertisement

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম