ভূমিকম্পের ঝুঁকি : আতঙ্ক নয়, চাই প্রস্তুতি ও প্রতিকার
ড. হাসান খালেদ
প্রকাশ: ২৪ নভেম্বর ২০২৫, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
সাম্প্রতিক ৫.৭ মাত্রার ভূমিকম্প বাংলাদেশের মানুষের মধ্যে এক গভীর উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। এ ভূমিকম্প আমাদের নতুন করে মনে করিয়ে দিল যে, বাংলাদেশ ভৌগোলিকভাবে বিশ্বের অন্যতম ভূমিকম্পপ্রবণ অঞ্চলে অবস্থিত। বিশেষ করে ঢাকা, চট্টগ্রাম এবং সিলেটসহ প্রধান শহরগুলো রয়েছে তীব্র ঝুঁকিতে। ঘনবসতিপূর্ণ এ অঞ্চলে এমন মাঝারি মাত্রার একটি কম্পনও যখন ব্যাপক আতঙ্ক সৃষ্টি করে, তখন একটি বড় বা মেগা-ভূমিকম্পের পরিণতি কী হতে পারে, তা ভাবা কঠিন। এ আতঙ্ক অমূলক নয়; এর পেছনে রয়েছে সুনির্দিষ্ট বাস্তবিক কারণ এবং এর থেকে উত্তরণের পথ হলো আতঙ্ককে শক্তিতে পরিণত করে সুদূরপ্রসারী ও গঠনমূলক প্রতিকারমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা।
১. উদ্বেগের বাস্তবিক কারণ : কেন এত আতঙ্ক?
বাংলাদেশের ভূমিকম্প-সংক্রান্ত উদ্বেগের মূল কারণগুলোকে কয়েকটি ভাগে বিভক্ত করা যায় :
ক. দুর্বল ও অপরিকল্পিত নগর কাঠামো : ন্যাশনাল বিল্ডিং কোড (এনবিসি) লঙ্ঘন : বাংলাদেশে, বিশেষত রাজধানী ঢাকাসহ প্রধান শহরগুলোতে, ভবন নির্মাণে জাতীয় বিল্ডিং কোড (এনবিসি)-এর তোয়াক্কা করা হয় না। অধিকাংশ ভবনই তৈরি হয়েছে নিুমানের উপকরণ ব্যবহার করে এবং যথাযথ ভূমিকম্প-প্রতিরোধী নকশা (Seismic Design) অনুসরণ না করে।
মাটির পরীক্ষা ও নকশার অভাব : বহু ডেভেলপার এবং সাধারণ মানুষ ভবন নির্মাণের আগে মাটির সঠিক পরীক্ষা করায় না। মাটির বহন ক্ষমতা (Bearing Capacity) অনুযায়ী নকশা তৈরি না করায় বড় ভূমিকম্পের সময় ভবন ধসে পড়ার ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যায়।
ঘনবসতি ও সংকীর্ণ রাস্তা : ঢাকার মতো শহরে ভবনগুলো অত্যন্ত ঘনসন্নিবিষ্ট। একটি ভবন ধসে পড়লে তা পাশের ভবনকেও ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। এছাড়া সংকীর্ণ রাস্তাগুলোর কারণে উদ্ধারকারী যানবাহনগুলো (যেমন ফায়ার সার্ভিসের ভারী যন্ত্রপাতি) দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছাতে পারে না।
খ. উদ্ধার ও ত্রাণ তৎপরতায় সক্ষমতার অভাব :
ফায়ার সার্ভিসের সীমিত সক্ষমতা : দেশে ভূমিকম্পের পর উদ্ধার অভিযানের প্রধান সংস্থা ফায়ার সার্ভিস অ্যান্ড সিভিল ডিফেন্সের জনবল (মাত্র ১৪ হাজার ৫৬০ জন) এবং আধুনিক যন্ত্রপাতি নিতান্তই অপ্রতুল। ঢাকায় ১৮টি স্টেশন এবং ৬৫০ জনবল দিয়ে একসঙ্গে মাত্র ২০-২৫টি ধসে পড়া ভবনে উদ্ধার কাজ চালানোর সক্ষমতা রয়েছে। একটি মেগা-ভূমিকম্পে এ সক্ষমতা একেবারেই তলানিতে চলে যাবে।
ভারী যন্ত্রপাতির অভাব : ধসে পড়া কংক্রিটের কাঠামো কাটতে ও সরাতে প্রয়োজনীয় ভারী যন্ত্রপাতি, যেমন-হাইড্রোলিক কাটার, স্প্রেডার, চেইনস, সার্চ ভিশন ক্যামেরা বা থার্মাল ইমেজার, অধিকাংশ স্টেশনে পর্যাপ্ত পরিমাণে নেই।
ভলান্টিয়ারের ঘাটতি : ভূমিকম্পের মতো দুর্যোগ কেবল সরকারি সংস্থা দিয়ে মোকাবিলা করা সম্ভব নয়। প্রয়োজন প্রশিক্ষিত স্বেচ্ছাসেবী বা ভলান্টিয়ারের বিশাল বাহিনী। ফায়ার সার্ভিসের পক্ষ থেকে ৬২ হাজার ভলান্টিয়ার তৈরির লক্ষ্যমাত্রা থাকলেও তা আজও পূর্ণ হয়নি।
গ. দুর্বল প্রাতিষ্ঠানিক ও সমন্বয়ের অভাব :
দুর্বল তদারকি : এনবিসি বাস্তবায়নের জন্য সিটি করপোরেশন, রাজউক এবং অন্যান্য স্থানীয় সরকারি সংস্থাগুলোর পক্ষ থেকে যে কঠোর তদারকি ও নিয়মিত অডিট দরকার, তার অভাব রয়েছে। নির্মাণ চলাকালীন নিয়ম লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয় না।
আন্তঃসংস্থা সমন্বয়ের অভাব : দুর্যোগ-পরবর্তী উদ্ধার কাজ, চিকিৎসাসেবা, খাদ্য ও আশ্রয়ের ব্যবস্থা-এসবের জন্য সেনাবাহিনী, পুলিশ, ফায়ার সার্ভিস, স্বাস্থ্য বিভাগ এবং এনজিওগুলোর মধ্যে সমন্বিত মহড়া ও প্রস্তুতি থাকা আবশ্যক। কিন্তু সরকারের এসওডি (Standard Operating Procedure) থাকা সত্ত্বেও বাস্তবের কার্যকর প্রয়োগ ও সমন্বিত মহড়ার ঘাটতি দেখা যায়।
২. গঠনমূলক প্রতিকার ও করণীয় পদক্ষেপ : ভূমিকম্পের ঝুঁকি মোকাবিলার জন্য অবিলম্বে কয়েকটি বহুমাত্রিক ও গঠনমূলক পদক্ষেপ গ্রহণ করা অপরিহার্য।
ক. নগর কাঠামো শক্তিশালীকরণ (Short to Medium Term): কঠোর এনবিসি প্রয়োগ : সরকার, বিশেষত রাজউক ও সিটি করপোরেশনকে কঠোরভাবে এনবিসি প্রয়োগ করতে হবে। নির্মাণের প্রতিটি স্তরে থার্ড-পার্টি অডিটের ব্যবস্থা করে মান নিশ্চিত করতে হবে।
রেট্রোফিটিং কর্মসূচির বাস্তবায়ন : পুরোনো এবং ঝুঁকিপূর্ণ ভবনগুলোকে চিহ্নিত করে সেগুলোকে ভূমিকম্প-সহনশীল করতে রেট্রোফিটিং (Retrofitting) কর্মসূচি দ্রুত শুরু করতে হবে। ভবন মালিকদের জন্য সহজ শর্তে ঋণ বা সরকারি প্রণোদনা দিয়ে এই প্রক্রিয়াকে উৎসাহিত করতে হবে।
ঝুঁকিভিত্তিক ভূমি ব্যবহার পরিকল্পনা : শহরের কোনো এলাকাগুলো উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ, তা চিহ্নিত করে সেখানে নতুন করে ঘনবসতিপূর্ণ বা গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা নির্মাণে কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করতে হবে।
খ. সক্ষমতা বৃদ্ধি ও আধুনিকীকরণ (Immediate to Medium Term):
ফায়ার সার্ভিসের আধুনিকীকরণ : ফায়ার সার্ভিসের জনবল ও যন্ত্রপাতির ঘাটতি পূরণে অবিলম্বে বাজেট বরাদ্দ ও ক্রয় প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে হবে। প্রতিটি জেলায় উদ্ধার অভিযানের জন্য ভারী যন্ত্রপাতি, বিশেষ করে কাটিং ও ড্রিলিং টুলস এবং সার্চ ক্যামেরার পর্যাপ্ত মজুত নিশ্চিত করতে হবে।
স্বেচ্ছাসেবক বাহিনী গঠন : ফায়ার সার্ভিসকে লক্ষ্যমাত্রার (কমপক্ষে ৩ লাখ) চেয়েও বেশি প্রশিক্ষিত ‘আরবান কমিউনিটি ভলান্টিয়ার’ তৈরিতে মনোনিবেশ করতে হবে। স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থী, যুবসমাজ এবং স্থানীয়দের প্রশিক্ষণ দিয়ে প্রতিটি মহল্লায় প্রাথমিক উদ্ধার দল (First Responders) তৈরি করতে হবে। এ ভলান্টিয়ারদের জন্য প্রয়োজনীয় প্রাথমিক যন্ত্রপাতি ও ইউনিফর্মের ব্যবস্থা করতে হবে।
সমন্বিত দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা : সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী, পুলিশ এবং ফায়ার সার্ভিসের মধ্যে নিয়মিত সমন্বিত মহড়া (Joint Simulation Drills) আয়োজন করতে হবে। দুর্যোগের সময় কমান্ড ও যোগাযোগের চেইন যাতে ব্যর্থ না হয়, তার জন্য বিকল্প যোগাযোগ ব্যবস্থা প্রস্তুত রাখতে হবে।
জনসচেতনতা ও প্রতিরোধমূলক সংস্কৃতি (Long Term):
শিক্ষাক্রম ও প্রচার : প্রাথমিক শিক্ষাক্রম থেকে শুরু করে উচ্চশিক্ষা পর্যন্ত ভূমিকম্প নিরাপত্তা, প্রাথমিক চিকিৎসা এবং দুর্যোগ-পরবর্তী করণীয় বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। গণমাধ্যম ব্যবহার করে নিয়মিতভাবে ভূমিকম্পের মহড়া (Shake Drill) এবং ‘ডু’স অ্যান্ড ডোন্ট’স’ প্রচার করতে হবে।
ব্যক্তিগত প্রস্তুতি : নাগরিকদের উৎসাহিত করতে হবে যেন তারা নিজের বাড়িতে ভূমিকম্পের প্রস্তুতি হিসাবে জরুরি কিট (Emergency Kit) তৈরি রাখেন (জল, শুকনো খাবার, টর্চলাইট, ফার্স্ট এইড বক্স), গ্যাস ও বিদ্যুতের মূল সংযোগ বন্ধ করার কৌশল জানেন এবং পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে যোগাযোগের পরিকল্পনা তৈরি রাখেন।
ভূমিকম্প একটি প্রাকৃতিক বাস্তবতা, এটিকে আটকানো সম্ভব নয়; কিন্তু এর ভয়াবহতা বহুলাংশে কমানো সম্ভব সঠিক প্রস্তুতি, কঠোর নীতিমালা প্রয়োগ এবং সম্মিলিত প্রচেষ্টার মাধ্যমে। রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে শুরু করে প্রতিটি নাগরিক পর্যন্ত যদি এ বিপদকে গুরুত্ব সহকারে নিয়ে আতঙ্ক নয়, বরং গঠনমূলক প্রতিরোধমূলক সংস্কৃতি গড়ে তোলে, তবেই হয়তো ভবিষ্যতের মেগা-ভূমিকম্পের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করা সম্ভব হবে। এখন সময় এসেছে, অতীতের ভুলগুলো শুধরে নিয়ে জাতীয় নিরাপত্তা ও জনজীবনের সুরক্ষা নিশ্চিত করার জন্য একটি সুদূরপ্রসারী ও কার্যকর কর্মপরিকল্পনা হাতে নেওয়া।
ড. হাসান খালেদ : বিশেষজ্ঞ ও কলামিস্ট
