শতফুল ফুটতে দাও
হাদির প্রাণনাশের চেষ্টা : ভয়াবহ ষড়যন্ত্রের ইঙ্গিত
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
জুলাই অভ্যুত্থানের অগ্নিসন্তান ও ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শরিফ ওসমান হাদিকে গত শুক্রবার ১২ ডিসেম্বর পৃথিবী থেকে চিরতরে সরিয়ে দেওয়ার জন্য প্রকাশ্যে গুলি চালিয়েছে এক আততায়ী। হাদির অবস্থা সংকটাপন্ন। ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পরদিনই তার ওপর ভয়াবহ এ হামলা হয়।
শরিফ ওসমান হাদি হয়ে উঠেছিলেন একজন অনলবর্ষী বক্তা। জুলাই অভ্যুত্থানের আদর্শগত স্বরূপ রচনায় তার মতো সপ্রতিভ মানুষ খুব কমই আছে। হাদির খুব একটা বয়স হয়নি। বিয়ে করার পর তার এক সন্তানের জন্ম হয়েছে। এ সন্তানটিকে তিনি প্রাণের চেয়েও বেশি ভালোবাসেন। হাদি সম্প্রতি অজানা ব্যক্তিদের কাছ থেকে মোবাইল ফোনে হত্যার হুমকি পাচ্ছিলেন। তার মন শঙ্কায় ভরে উঠেছিল। শুধু হাদি নন, জুলাই যোদ্ধাদের অনেকেই আশঙ্কা করেন তাদের প্রাণে মেরে ফেলা হতে পারে। এটা বোঝার জন্য রকেট সায়েনটিস্ট হওয়ার প্রয়োজন নেই। রাজনৈতিক দলগুলো যখন ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনার ক্ষমতার আসনকে টলাতে পারছিল না, তখন জুলাইযোদ্ধারা অত্যন্ত সৃজনশীল কৌশলে শিকড় গজানো সাড়ে পনেরো বছরের দুঃশাসনকে উচ্ছেদ করে ছাড়ল। স্বর্গরাজ্য থেকে শেখ হাসিনা এবং তার আশ্রিত ও প্রশ্রয়প্রাপ্ত অলিগার্কদের পতন হলো। বেরিয়ে এলো অত্যাচার, উৎপীড়ন, গুম, খুন, আয়নাঘরে আটক এবং দেশ থেকে লাখো কোটি টাকা পাচারের চাঞ্চল্যকর কাহিনি।
আওয়ামী লীগ, শেখ হাসিনা ও তার পতিত দোসররা কী করে এ পরাজয় সহ্য করতে পারে! তারা তাদের কৃতকর্মের জন্য মোটেও অনুতপ্ত নয়, দেশবাসীর কাছে ক্ষমা চাওয়া তো দূরের কথা। তারা হারানো স্বর্গ ফিরে পেতে মরিয়া হয়ে উঠেছে। প্রতিদিনই তারা দেশবাসীকে নানারকম হুমকি দিচ্ছে। দেশ থেকে পালিয়ে যাওয়া শেখ হাসিনা নাকি দেশে ফিরে আসবেন। আবারও প্রধানমন্ত্রিত্বের কুরসিতে বসবেন। যে গণভবনকে জুলাই জাদুঘরে পরিণত করা হয়েছে, সেই জাদুঘর উচ্ছেদ করে সেখানে আবার প্রধানমন্ত্রীর বাসভবন চালু করবেন।
বিদেশে পলাতক আওয়ামী লীগারদের অন্যতম মুখপাত্র নিঝুম মজুমদার বিদেশ থেকে ডাক দিয়েছেন বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার ও জুলাই যোদ্ধাদের বিরুদ্ধে গেরিলা যুদ্ধ শুরু করার। এ নিঝুম মজুমদারই তত্ত্ব সাজিয়েছেন কীভাবে মেটিকুলাস প্ল্যান করে শেখ হাসিনার রিজিমকে উচ্ছেদ করা হয়েছে। এমনই পরিস্থিতিতে শরিফ ওসমান হাদির প্রাণনাশের প্রচেষ্টাকে হালকাভাবে নেওয়া যায় না।
শেখ হাসিনা ও আওয়ামী ফ্যাসিস্টরা আগামী ২০২৬-এর ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠেয় জাতীয় সংসদ নির্বাচন বানচাল করতে বদ্ধপরিকর। এ উদ্দেশ্যে নির্বাচনে প্রার্থী ও বিশিষ্ট ব্যক্তিদের হত্যা করার ষড়যন্ত্র করা হয়েছে বলে গোয়েন্দা সূত্রে জানা গেছে। আরও জানা গেছে, ভারত থেকে ৮০ জন খুনিকে বাংলাদেশে প্রবেশ করানো হয়েছে। এদের কাজ হবে একের পর এক গুপ্তহত্যা করে সন্ত্রাস সৃষ্টি করা এবং নির্বাচন ভণ্ডুল করা। নির্বাচনটি যথাসময়ে সুষ্ঠুভাবে অনুষ্ঠিত হলে বাংলাদেশ অনেকটাই স্থিতিশীলতার পথে অগ্রসর হবে। আর তা যদি সম্ভব হয়, তাহলে আওয়ামী ফ্যাসিস্টদের ষড়যন্ত্র ও অপপ্রয়াস ভেস্তে যাবে।
পত্র-পত্রিকায় হাদির নাম এবং বক্তব্য বেশ কিছুদিন ধরেই দেখেছি। কিন্তু হাদির সঙ্গে আমার ব্যক্তিগত কোনো পরিচয় হয়নি। হাদিকে প্রথমবারের মতো মুখোমুখি দেখতে পেয়েছি দৈনিক যুগান্তরের এক গোলটেবিল বৈঠকে। সেদিন হাদি খুব স্পিরিটেড বক্তব্য দিয়েছিল। অবশ্য যখনই সে বক্তব্য দেয়, তা হৃদয়-মনকে নাড়া দিয়ে যায়। গোলটেবিল বৈঠকের দিনে অনুষ্ঠানটির পর হাদির সঙ্গে আমার সরাসরি পরিচয় ও কথা হয় যুগান্তরের সম্পাদক আবদুল হাই শিকদারের অফিসে। হাদি আমাকে জানাল যে, সে আমাকে অনেক দিন ধরেই জানে। বঙ্গভঙ্গের ওপর আমার লেখাটি তার খুব পছন্দের বলে সে জানাল। তার সংগঠনের নাম ‘ইনকিলাব মঞ্চ’।
আমি জানতে চাইলাম ইনকিলাব মঞ্চের সঙ্গে দৈনিক ইনকিলাবের কোনোরকমের সম্পর্ক আছে কিনা? হাদি জানাল, দৈনিক ইনকিলাবের সঙ্গে ইনকিলাব মঞ্চের কোনো যোগাযোগ নেই। আসলে জুলাই অভ্যুত্থানকে কেন্দ্র করে ‘ইনকিলাব জিন্দাবাদ’ স্লোগানটি ব্যাপকতা লাভ করেছে। ‘ইনকিলাব জিন্দাবাদ’ স্লোগানটি প্রথম উচ্চারণ করেছিল ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি। ১৯৪৮-এ এই পার্টি একটি বিপ্লব সংগঠিত করতে চেয়েছিল। তখন তাদের স্লোগান ছিল, ‘ইয়ে আজাদি ঝুটা হ্যায়, লাখো ইনসান ভুখা হ্যায়।’ এর পাশাপাশি এ পার্টি স্লোগান তুলেছিল ‘ইনকিলাব জিন্দাবাদ’। অর্থাৎ বিপ্লব জিন্দাবাদ। বাংলাদেশে একশ্রেণির বুদ্ধিজীবী এ স্লোগানটিকে প্রতিক্রিয়াশীল স্লোগান মনে করে। কারণ এটি বাংলা ভাষায় নয়। কিন্তু এ স্লোগানের মধ্যে যে অপরিসীম শক্তি রয়েছে, তা কি অস্বীকার করা যাবে?
শরিফ ওসমান হাদি তার বিভিন্ন বক্তব্যে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়া ও খালেদা জিয়ার প্রশংসা করেছেন। তার দৃষ্টিতে এ দুজন নেতাই বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে আপসহীন। সে কারণেই তারা প্রাতঃস্মরণীয়। হাদি আরও বলেছেন, সমালোচনা করতে গিয়ে বিএনপিকে কোণঠাসা করা যাবে না। বিএনপিকে কোণঠাসা করলে জাতীয়তাবাদী শক্তি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। হাদির এ প্র্যাগমেটিক অবস্থান প্রশংসনীয়। হাদি আরও মনে করেন বাংলাদেশের বিদ্যমান সংবিধান ছুড়ে ফেলতে হবে অথবা আগাগোড়া এর সংস্কার সাধন করতে হবে। তার নিজের যুক্তিকে শক্তিশালী করার জন্য তিনি ৭২-এর সংবিধান নিয়ে খালেদা জিয়ার একটি উদ্ধৃতি প্রদান করেন। এ উদ্ধৃতিতে খালেদা জিয়া বলেছেন, এ সংবিধান ছুড়ে ফেলে দিতে হবে। তাহলে হাদির দোষটা কী?
গত শুক্রবার দুপুরে জুমার নামাজের পর রাজধানীর পল্টন বিজয়নগর এলাকায় নির্বাচনি প্রচারে থাকা অবস্থায় অতর্কিত এ হামলায় তিনি গুরুতর আহত হন। গুলি তার বাম চোয়াল ভেদ করে মস্তিষ্কের সংবেদনশীল অংশে প্রবেশ করায় প্রথমে তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে লাইভ সাপোর্ট দিয়ে জরুরি ভিত্তিতে জটিল অস্ত্রোপচার করা হয়। পরে পরিবারের সিদ্ধান্তে গত শুক্রবার রাত পৌনে ৭টার দিকে তাকে এভারকেয়ার হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়েছে।
হাদির বিরুদ্ধে হামলায় ক্ষোভে উত্তাল হয়ে ওঠে দেশ। প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস এ ঘটনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে দ্রুত ও ব্যাপক তদন্ত এবং দোষীদের কঠোর শাস্তির নির্দেশ দেন। বিএনপি, জামায়াতসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও ছাত্র সংগঠন এ হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়েছে এবং অবিলম্বে নির্বাচনি পরিবেশ নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছে।
আশ্চর্যের বিষয় হলো, ওসমান হাদির ওপর গুলি ছোড়া দুই ব্যক্তি শুক্রবার দুপুরে মতিঝিলের ওয়াপদা মাদ্রাসা এলাকায় তার সঙ্গেই মাস্ক পরে জনসংযোগে অংশ নিয়েছিল। হামলাকারী দুই বাইক আরোহীর পোশাকের সঙ্গে জনসংযোগে অংশ নেওয়া ওই দুই ব্যক্তির পোশাকের মিল রয়েছে।
তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, কয়েক মাস ধরে পরিকল্পনা করে হামলাটি চালানো হয় এবং উদ্দেশ্য ছিল দেশে বড় ধরনের অস্থিতিশীলতা তৈরি করা; হামলার পরপরই পালানোর ছকও কার্যকর করা হয়। পুলিশ সূত্র জানিয়েছে, ঘটনায় জড়িত হিসাবে রোববার পর্যন্ত তিনজনকে শনাক্ত করা গেছে। তাদের মধ্যে মোটরসাইকেলের পেছনে বসে গুলি চালান ছাত্রলীগের নেতা ফয়সাল করিম মাসুদ ওরফে রাহুল, চালক ছিলেন আলমগীর শেখ। ঘটনার আগে হাদিকে রেকি করার সময় এ দুজনের সঙ্গে আরও একজন ছিলেন। তার নাম রুবেল। তিনি আদাবর থানার স্বেচ্ছাসেবক লীগের কর্মী বলে জানা গেছে। হাদির বিভিন্ন গণসংযোগে এ তিনজনের একসঙ্গে থাকার ছবিও পেয়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। ওই ছবি ইতোমধ্যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়েছে। এ তিনজনই আওয়ামী লীগসংশ্লিষ্ট রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত বলে পুলিশ জানিয়েছে।
তদন্তসংশ্লিষ্ট একটি সূত্র মনে করছে, হাদিকে হত্যার উদ্দেশ্যে কয়েক মাস ধরে ছক কষা হচ্ছিল। অন্তত দুমাস ধরে শনাক্ত হওয়া ব্যক্তিরা তাকে অনুসরণ করেছে। তফসিল ঘোষণার পরদিন তাকে হত্যার মধ্য দিয়ে দেশে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি তৈরি করা ছিল অন্যতম লক্ষ্য। এ ঘটনার দিন রাতে রাজধানীর বাড্ডায় বাসে আগুন ও কয়েকটি স্থানে ককটেল বিস্ফোরণ এবং লক্ষ্মীপুরে নির্বাচন অফিসে আগুন দেয় দুর্বৃত্তরা। এসব ঘটনার মধ্যে যোগসূত্র রয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
হাদির প্রাণনাশের চেষ্টা থেকে কিছু সাবধানবাণী উচ্চারণ করা যায়। নির্বাচনি প্রচারণায় যদি অচেনা কেউ যোগ দেয় এবং তাদের সঙ্গে যদি আওয়ামী লীগের সম্পর্ক রয়েছে বলে সন্দেহ করা হয়, তাহলে এদের ধারেকাছেও ঘেঁষতে দেওয়া উচিত হবে না। অনেক প্রার্থী হয়তো মনে করতে পারেন, আওয়ামী লীগ যেহেতু নির্বাচন করতে পারছে না, সেহেতু তাদের লোকজনদের নির্বাচনি প্রচার মিছিলে অংশ নিতে দিয়ে আওয়ামী লীগ সমর্থক ভোট টানা যেতে পারে। হাদির ঘটনার পর এ কথা নিশ্চিতভাবে বলা যায়, আওয়ামী ফ্যাসিস্টদের নির্বাচনি মিছিলে অথবা জনসংযোগে অংশগ্রহণ করতে দেওয়া হবে ভয়ানক আত্মঘাতী। এরা আসলে ট্রয়ের ঘোড়ার মতো দুর্গে প্রবেশ করে দুর্গ দখলের কৌশল নিয়েছে। এরা যতই মিষ্টিমধুর কথা বলুক না কেন, এদের কোনো মতেই বিশ্বাস করা যাবে না।
ষড়যন্ত্র যেভাবে পাকিয়ে উঠেছে, তাতে ধারণা করা যায়, সামনের দিনগুলোতে আরও গুপ্তহত্যার চেষ্টা করা হবে। সুতরাং একদিকে যেমন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে অত্যন্ত সজাগ ও তৎপর থাকতে হবে, অন্যদিকে সারা দেশে ফ্যাসিবাদবিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর প্রত্যেকটি কর্মী ও সমর্থককে খুবই হুঁশিয়ার থাকতে হবে। সর্বদা চোখ-কান খোলা রাখতে হবে। জনপাহারার চেয়ে উত্তম প্রতিরক্ষা আর কিছু হতে পারে না।
হাদির ওপর প্রাণঘাতী হামলার পর আমরা লক্ষ করেছি, ফ্যাসিবাদবিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো পরস্পর দোষারোপের রাজনীতি শুরু করেছে। এ প্রবণতা হয়তো ভোটের মাঠে অতিরিক্ত সুবিধা পাওয়ার জন্য সৃষ্টি হচ্ছে। এমন প্রবণতা শুধু বিপর্যয় ডেকে আনবে, কোনো লাভ বয়ে আনবে না। এভাবে দোষারোপের রাজনীতির চর্চা করলে লাভবান হবে ভারতীয় আধিপত্যবাদ এবং তার দোসর ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ। শরিফ ওসমান হাদিকে উন্নততর চিকিৎসার জন্য এয়ার অ্যাম্বুলেন্সে সিঙ্গাপুর নেওয়া হয়েছে এবং সেখানে তাকে সিঙ্গাপুর জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। এয়ার অ্যাম্বুলেন্সে হাদির রক্তচাপ কমে গিয়েছিল, কিন্তু পরে ঠিক হয়ে যায়। সরকার হাদির চিকিৎসার সব ব্যয়ভার গ্রহণ করেছে। মহান আল্লাহ সোবহানাহুতায়ালার কাছে আকুল প্রার্থনা, আল্লাহ যেন তাকে আমাদের কাছে সহিসালামতে ফেরত নিয়ে আসেন। আল্লাহর কুদরতের শেষ নেই।
ড. মাহবুব উল্লাহ : শিক্ষাবিদ ও অর্থনীতিবিদ

