’৭১-এর মুক্তিযুদ্ধ ভারতের হাজার বছরের প্রতিশোধ!
Advertisement
মোবায়েদুর রহমান
প্রকাশ: ১৯ ডিসেম্বর ২০২৫, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
ছবি: সংগৃহীত
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
বাংলাদেশের স্বাধীনতার কথা উঠলেই, একশ্রেণির অন্ধ ভারতপ্রেমী ভারতপ্রেমে গদগদ হয়ে যান। মুক্তিযুদ্ধে ভারতের ভূমিকা দেখে ভারতকে মহান দেশ হিসাবে ভক্তিতে উদ্বেলিত হয়ে পড়েন। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে ভারতের অবদান আমরা কোনো দিন অস্বীকার করি না; কিন্তু বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকে ভারত কি স্বীকার করে? জানি, অনেকে আমার এ প্রশ্নে চমকে উঠবেন। চমকে উঠলেও আমি নাছাড়। কারণ, ভারত তার হৃদয়ে বাংলাদেশকেও স্বীকার করে না, আবার মুক্তিযুদ্ধকেও স্বীকার করে না। যারা এতদিন ধরে আমার লেখা যুগান্তরে পড়ছেন, তারা জানেন, যখন আমি কোনো গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু নিয়ে কথা বলি, তখন ডকুমেন্ট ছাড়া কোনো কথা বলি না। আজকেও যা বলছি, সেটাও ওই ডকুমেন্টের ভিত্তিতেই।
১৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশে যথাযোগ্য মর্যাদায় বিজয় দিবস উদযাপিত হলো। ভারতেও একইদিন বিজয় দিবস উদযাপিত হয়েছে; কিন্তু সেটি কাদের বিজয়? ভারত বলছে, সেটি ভারতের বিজয়। তারা মনে করেছে, এটি ছিল পাকিস্তানের বিরুদ্ধে ভারতের বিজয়। তারা এটিকে মুক্তিযুদ্ধের বিজয় বা বাংলাদেশের স্বাধীনতা বলে কোনো উক্তি করেনি। ১৬ ডিসেম্বর বিজয় দিবস উপলক্ষ্যে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি তার এক্স হ্যান্ডেলে (সাবেক টুইটার) ভারতবাসীর উদ্দেশে যে বাণী দিয়েছেন, তার বাংলা অনুবাদ:
‘বিজয় দিবসে আমরা স্মরণ করি সেসব সাহসী সৈন্যদের। যাদের সাহস এবং ত্যাগ ১৯৭১ সালে ভারতের ঐতিহাসিক বিজয়কে নিশ্চিত করেছিল। তাদের দৃঢ় মনোবল এবং নিঃস্বার্থ সার্ভিস আমাদের জাতিকে সুরক্ষা দিয়েছে এবং ইতিহাসে আমাদের গর্বকে খোদাই করেছে। আজকের এ দিন তাদের সাহসিকতার প্রতি আমাদের স্যালুট এবং তাদের তুলনাহীন স্পিরিটের স্মরণ। তাদের বীরত্ব ভারতীয়দের প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে অনুপ্রেরণা দেবে।’
ইংরেজিতে ৬৪ শব্দ এবং বাংলাতে ৫৯ শব্দের এ বাণী আপনি খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে পড়ুন। দেখুন তো এ বাণীর ৬৪ শব্দের মধ্যে একটি শব্দও কি বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ বা বাংলাদেশের স্বাধীনতা সম্পর্কে বলা হয়েছে? বাংলাদেশের স্বাধীনতা নিয়ে যুদ্ধটি কি কেবল পাকিস্তান এবং ভারতের মধ্যে হয়েছে? যদি না হয়ে থাকে, তাহলে মুক্তিযোদ্ধাদের সম্পর্কেও একটি শব্দও নেই কেন? নরেন্দ্র মোদি ভারতের প্রধানমন্ত্রী হিসাবে প্রতি বছরই ১৬ ডিসেম্বরের ওপর বাণী দেন এবং গত বছরও ঠিক একই ধরনের বাণী দিয়েছিলেন। সেখানেও বাংলাদেশ, বাংলাদেশের স্বাধীনতা, বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ বা মুক্তিযোদ্ধা সম্পর্কে একটি শব্দও নেই।
আর থাকবে কোত্থেকে? ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বরের বিজয়কে তো তারা শুধু ভারতের বিজয় বলেই আখ্যায়িত করেনি, বরং হাজার বছরের প্রতিশোধ বলেই অভিহিত করেছে। যুগান্তরের সম্মানিত পাঠক ভাইয়েরা, এটিও আমার নিজস্ব কোনো উক্তি নয়। এটি খোদ ভারতের পরলোকগত প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর বাণী। ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর যৌথ বাহিনীর কাছে ঢাকার তথা পূর্ব পাকিস্তানের পতনের পর ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী ভারতের লোকসভায় সোল্লাসে ঘোষণা করেন,“Today we have avenged a thousand years of history.”
বাংলা অনুবাদ: ‘আজ আমরা ইতিহাসের হাজার বছরের পরাজয়ের প্রতিশোধ নিয়েছি।’ তাহলে ব্যাপারটা কী দাঁড়াল? তারা কি বাংলাদেশের স্বাধীনতার জন্য যুদ্ধ করেছিল? নাকি ভারতবর্ষের বিগত ১ হাজার বছর হিন্দুরা যে মুসলমানদের অধীনে ছিল তার প্রতিশোধ নিয়েছে? প্রিয় পাঠক, আপনারা জানেন, ভারতের ১৭শ বছরের ইতিহাসে মুসলমান শাসকরা ভারত শাসন করেছেন ১ হাজার বছর। তার পর ২শ বছর শাসন করেছে ইংরেজরা। এ ১২শ বছর আগের ৫শ বছর হিন্দুরা শাসন করেছিল। তাদের ৫শ বছরের শাসনের পর মুসলমানরা একনাগাড়ে ১ হাজার বছর ভারত শাসন করেন। ইন্দিরা গান্ধী ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর লোকসভায় যে ১ হাজার বছরের প্রতিশোধের কথা বলেছেন, সেটি ওই ১ হাজার বছরের মুসলমানদের শাসন।
সুতরাং, এই কথা যদি বলি যে, ভারত ১৯৭১ সালের ৩ ডিসেম্বর যখন পাকিস্তানের বিরুদ্ধে সরাসরি যুদ্ধে নামে, তখন আমরা বাংলাদেশিরা যাই ধারণা করি না কেন, ভারতীয়রা কিন্তু ওই হাজার বছরের প্রতিশোধ নেওয়ার জন্যই যুদ্ধ করেছিল।
দুই
এটি শুধু ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর পরলোকগত ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী অথবা এ বছর ২০২৫ সালে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির বক্তব্যই নয়, এটি ১২০ কোটি ভারতবাসীর ধারণা। এখানে উল্লেখ্য, ভারতের বর্তমান জনসংখ্যা ১৪৪ কোটি। এর মধ্যে মুসলমান ২৪ কোটি।
যেটি বলছিলাম, ভারতের সর্বশ্রেণির মানুষের মন ও মানসিকতা ইন্দিরা গান্ধী বা নরেন্দ্র মোদির মানসিকতারই প্রতিচ্ছবি। এ বক্তব্য রাজনৈতিক নেতারা তো বটেই, ভারতের সিনেমাতেও সবসময় বলা হয়। নিচে এ ধরনের কতগুলো সিনেমার উল্লেখ করছি।
১. গুন্ডে-ভারতের ‘গুন্ডে’ ছবিতে দেখানো হয়েছে যে, ১৯৭১ সালের যুদ্ধটি হয়েছে পাক-ভারত যুদ্ধ। সেখানে বাংলাদেশ, মুক্তিযুদ্ধ বা মুক্তিবাহিনী বলে কোনো কথা নেই। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ ছিল বাংলাদেশের জনগণের স্বাধীনতা অর্জনের সংগ্রাম, যেখানে বাঙালি জাতি পাকিস্তানি শাসন ও শোষণের বিরুদ্ধে রক্তক্ষয়ী সংগ্রামে বিজয়ী হয়েছিল। এ যুদ্ধে বাংলাদেশের মুক্তিবাহিনী এবং ভারতীয় মিত্রবাহিনী পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে যৌথভাবে লড়াই করেছিল। দুর্ভাগ্যবশত, কিছু ভারতীয় চলচ্চিত্রে এ ঐতিহাসিক সত্যকে বিকৃত করে মুক্তিযুদ্ধকে শুধু একটি ‘পাক-ভারত যুদ্ধ’ হিসাবে উপস্থাপন করা হয়েছে এবং বাংলাদেশের অবদানকে অস্বীকার করা হয়েছে।
‘গুন্ডে’ ছবি ছাড়াও আরও কিছু ভারতীয় চলচ্চিত্রে একই রকমের বিকৃতি দেখা গেছে। উদাহরণস্বরূপ:
২. হিন্দুস্তান কি কসম-১৯৭৩ সালে নির্মিত এ সিনেমা মূলত Operation Cactus Lily-এর ওপর ভিত্তি করে তৈরি, যা ১৯৭১ সালের পাকিস্তানের সঙ্গে পশ্চিম সীমান্তে সংঘটিত যুদ্ধকে কেন্দ্র করে নির্মিত। এখানে মুক্তিযুদ্ধ বা বাংলাদেশ সম্পর্কে কোনো উল্লেখ নেই।
৩. বর্ডার-J. P. Dutta পরিচালিত এ সিনেমা Battle of Longewala (1971)-এর ঘটনাকে তুলে ধরে, এবং এটিও ‘ইন্দো-পাক যুদ্ধ’ হিসাবে সীমাবদ্ধ। বাংলাদেশ বা সেই সময়কার মুক্তিযুদ্ধের সংজ্ঞায়নের প্রসঙ্গ থেকে দূরে।
৪. ভূজ: দি প্রাইড অফ ইন্ডিয়া (২০২১)-যুদ্ধের সময় ব্যবহৃত এবং গুহে ধ্বংস হওয়া বিমানঘাঁটির পুনর্নির্মাণের কাহিনিতে বলা হয়-এটিও প্রধানত ইন্দো-পাক যুদ্ধের প্রেক্ষাপটেই সীমাবদ্ধ এবং মুক্তিযুদ্ধের ইস্যু উঠে আসে না।
৫. আক্রমণ (১৯৭৫)-যুদ্ধকালে ভারতীয় সেনা ও তাদের পরিবারের জীবন নিয়ে নির্মিত; কিন্তু এটি নির্দিষ্ট কোনো যুদ্ধ বা মুক্তিযুদ্ধের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট তুলে ধরে না, বরং সেনাদের পারিবারিক সমস্যা ও যুদ্ধসংক্রান্ত অভিজ্ঞতাকে কেন্দ্র করে নির্মিত।
৬. পিপ্পা (২০২৩)-ভারতীয় সেনা ক্যাপ্টেন বালরাম সিং মেহতা-এর জীবন ও ১৯৭১-এর গারীবপুর যুদ্ধে তার অবদান নিয়ে নির্মিত। এটির মূল ফোকাস সেই ঘুরেফিরে পাক-ভারত সংঘর্ষ।
তিন
এ ধরনের একাধিক ছায়াছবি ভারতে নির্মিত হয়েছে, যেখানে ১৯৭১ সালের যুদ্ধ ঠিকই দেখানো হয়েছে, তবে সেগুলোতে যুদ্ধের ফোকাসটি ছিল পশ্চিম পাকিস্তান। অথচ, মুক্তিযুদ্ধে রণাঙ্গন ছিল প্রধানত সাবেক পূর্ব পাকিস্তান, যা আজ বাংলাদেশ।
এ ধরনের ছবি নির্মাণ করে বাংলাদেশ এবং মুক্তিযুদ্ধকে সরাসরি অপমান করা হয়েছে। অথচ বাংলাদেশের একশ্রেণির সুশীল, যারা দিন-রাত মুক্তিযুদ্ধের বন্দনা করার পাশাপাশি ভারতীয় বাহিনীর সামরিক হস্তক্ষেপের বন্দনায় দিবারাত্র ভারতের প্রশংসায় পঞ্চমুখ, সেসব সুশীল মুক্তিযুদ্ধের এ বিকৃতি অথবা মুক্তিযুদ্ধের ক্রেডিট ছিনতাই করার জন্য ভারতের বিরুদ্ধে টুঁ শব্দটি করারও সাহস পান না। সেজন্যই তো প্রশ্ন ওঠে, মুক্তিযুদ্ধকালে ওরা ভারতের কাছে এমন কোনো দাসখত লিখে দিয়েছেন, যার জন্য তারা মুক্তিযুদ্ধের এ অগ্রহণযোগ্য অপরাধেও সদাসর্বদা স্পিকটি নট থাকেন।
আমার দুঃখ হয়, যখন দেখি যে, বাংলাদেশ ৫৫ বছরে পদার্পণ করল। তারপরও বাংলাদেশের ইতিহাস সঠিকভাবে লেখা হলো না। বাংলাদেশের স্বাধীনতা বা মুক্তিযুদ্ধের কথা উঠলেই ওইসব সুশীল ভারতবিরোধী এবং ইসলামপন্থিদের স্বাধীনতাবিরোধী ও অন্যান্য গালাগালি অব্যাহতভাবে দিয়ে থাকেন।
স্বাধীনতার ৫৪ বছর পার হওয়ার পর আজ অনেক প্রশ্নই স্বয়ংক্রিয়ভাবেই উঠে আসে। মুক্তিযুদ্ধে কতজন শহীদ হয়েছেন? আমরা এ সম্পর্কে কোনো সংখ্যা বলব না। কারণ, সেই সংখ্যাটি নির্ণয় করব কীভাবে? ৫৪ বছরেও এ সম্পর্কে একটিও জরিপ করা হয়নি। কেন হয়নি? তাহলে আপনি কোন ভিত্তিতে বলবেন, এ সংখ্যাটি ছিল হাজারে, লাখে বা কোটিতে? জরিপের অভাবে এ সংখ্যাটি তো আন্দাজে যা কিছুই হতে পারে। মুক্তিযুদ্ধে আমাদের নারীরা ধর্ষিত হয়েছেন; কিন্তু কতজন? তার ওপর কি একটিও জরিপ হয়েছে? না হলে ওই মুক্তিযুদ্ধে শহীদের মতো এখানেও সংখ্যাটি হাজার বা লাখ বা কোটি হতে পারে।
মুক্তিযোদ্ধারা আমাদের গর্বিত সন্তান। কিন্তু তাদেরই বা সংখ্যা কত? শেখ হাসিনার আমলেই দেখলাম অন্তত চারবার মুক্তিযোদ্ধাদের সংখ্যা পরিবর্তন করা হয়েছে। অথচ, বেগম খালেদা জিয়ার আমলেই মুক্তিযুদ্ধ মন্ত্রণালয় গঠন করা হয়েছে। অনেক কথাই আছে, যা ইচ্ছা করেই লিখছি না; যারা মুক্তিযোদ্ধা ভাতা পাচ্ছেন, তাদের সংখ্যাই কি মুক্তিযোদ্ধার সংখ্যা? ’৭১ সালের ৯ মাসে ভারতীয়রাও তো একটি তালিকা করেছিল। সেই তালিকায় কতজন মুক্তিযোদ্ধার সংখ্যা উল্লেখ করা হয়েছে?
১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ পাক বাহিনীর ক্র্যাকডাউনের পর অনেক মানুষ শরণার্থী হিসাবে ভারতে চলে যান। এদের সংখ্যা কত? এদের সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ কোন ধর্মের, সেটি আমরা বাংলাদেশিরা কখনো চিন্তাও করিনি। কিন্তু ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ঠিকই তাদের পার্সেন্টেজ উল্লেখ করেছে এবং সেটি তাদের দৃষ্টিকোণ থেকেই।
আমাদের দুর্ভাগ্য, যতগুলো বিষয় উল্লেখ করলাম, তার কোনোটির পরিসংখ্যানই চ্যালেঞ্জের ঊর্ধ্বে নয়। কতদিন আর এভাবে চলবে?
মোবায়েদুর রহমান : সিনিয়র সাংবাদিক
