জিয়া পরিবার : সংগ্রাম ও রাজনীতি
Advertisement
হাসান আহমেদ চৌধুরী কিরণ
প্রকাশ: ২৮ ডিসেম্বর ২০২৫, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
ইতিহাস রচনা করে দেশে ফিরলেন তারেক রহমান। এ প্রত্যাবর্তন হয়ে উঠল নায়কোচিত ও রাজসিক। সুদীর্ঘ ১৭ বছর পর ঢাকার বিমানবন্দর থেকে বেরিয়ে জুতা-মোজা খুলে সবুজ ঘাসের ওপর পা রেখে হাতে নিলেন মাটির স্পর্শ। পূর্বাচলের জনসমুদ্রে দাঁড়িয়ে বক্তৃতা শুরু করেছেন, ‘প্রিয় বাংলাদেশ সম্বোধনে’। এ যেন এক অন্য তারেক রহমান। ধীর, স্থির ও আত্মবিশ্বাসী কণ্ঠে তিনি পাহাড় থেকে সমতল-সব ধর্ম, বর্ণ, গোষ্ঠী, শ্রেণিপেশার মানুষের জন্য নিরাপদ বাংলাদেশের কথা বলেছেন। তারেক রহমান ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ ও জুলাই অভ্যুত্থানের কথা স্মরণ করেন। তিনি ওসমান হাদিকে শহীদ হিসাবে উল্লেখ করে বলেন, বিগত স্বৈরাচারের সময় যারা গুম-খুনের শিকার হয়েছেন, তাদের রক্তের ঋণ শোধ করতে হবে, তবে আসুন আমরা আমাদের সেই প্রত্যাশিত বাংলাদেশ গড়ে তুলি।’ তারেক রহমানের বক্তৃতার বিশেষ দিক হলো, তিনি কারও প্রতি বিষোদ্গার করেননি। তিনি প্রতিশোধ বা প্রতিহিংসার কথা উচ্চারণ করেননি। তিনি ঐক্যের কথা বলেছেন, অন্তর্ভুক্তির কথা বলেছেন।
তারেক রহমানের পেছনে রয়েছে মা খালেদা জিয়া এবং নিজের সংগ্রামমুখর রাজনৈতিক জীবনের ইতিহাস। স্বাধীনতাযুদ্ধে বাবা শহীদ রাষ্ট্রপ্রতি জিয়াউর রহমানের গৌরবোজ্জ্বল ভূমিকার জন্য এ পরিবার ইতিহাসের অংশ হয়ে আছে। তবে বারবার এ পরিবারের এবং দলের ওপর আঘাত নেমে এসেছে। পরিবার ও দলের বিরুদ্ধে হয়েছে ষড়যন্ত্র ও চক্রান্ত। কিন্তু খালেদা জিয়া এবং তারেক রহমান স্বৈরশাসক এরশাদ এবং কর্তৃত্ববাদী শেখ হাসিনার সঙ্গে কোনো আপস করেননি। খালেদা জিয়া যেমন এরশাদের দীর্ঘ সমরিক শাসনের বিরুদ্ধে আপসহীনভাবে আন্দোলন করে এরশাদের পতন ঘটিয়েছেন, তেমনই তার পুত্র তারেক রহমান শেখ হাসিনার পতনের আন্দোলনে-সংগ্রামে বড় ধরনের ভূমিকা রেখেছেন। তবে মা ও ছেলের জন্য কোনোটাই সহজ ছিল না। তারেক রহমানের ফিরে আসা যেমন জাতীয় রাজনীতির জন্য বড় ঘটনা, তেমনই সেনাসমর্থিত ১/১১-র সরকারের সময়ে তাকে জোর করে দেশ ছাড়তে বাধ্য করা ছিল আরেক কালো অধ্যায়।
তবে কোনো কিছুতেই তারেক রহমানকে দমাতে পারেনি। ২০০৮ সালের ১১ সেপ্টেম্বর তিনি যখন পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে লন্ডনে যান, তিনি তখন ছিলেন বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব। একপর্যায়ে তারেক রহমান লন্ডন থেকেই দল পরিচালনা করতে থাকেন।
তারেক রহমানের দীর্ঘ নির্বাসিত জীবন চলাকালে মা দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে উদ্দেশ্যমূলক একাধিক মামলায় সাজা দিয়ে কারাগারে পাঠানো হয়। তাকে নাজিমউদ্দিন রোডের পুরোনো নির্জন কারাগারে একমাত্র বন্দি হিসাবে রাখা হয়। যা ছিল এক দুঃসহ নিপীড়ন। এ সময় একটি মৃত্যু জিয়া পরিবারের ওপর গভীর শোকের ছায়া ফেলে। খালেদা জিয়া অন্তরীণ, তারেক রহমান লন্ডনে নির্বাসিত-এ অবস্থায় মালয়েশিয়ায় একটি হাসপাতালে মারা যান জিয়া পরিবারের সদস্য আরাফাত রহমান কোকো। ২০১৫ সালের ২৪ জানুয়ারি যখন কোকো মারা যান, তখন তার বয়স হয়েছিল মাত্র ৪৫ বছর। দেশে এনে কবর দেওয়ার আগে শেষবারের মতো লাশ দেখাতে খালেদা জিয়ার কাছে নিয়ে যাওয়া হয়, তিনি কোকোর মুখ দেখে বাঁধভাঙা কান্নায় ভেঙে পড়েন। তার জানাজায় লাখ-লাখ লোকের সমাগম ঘটে।
বিভিন্ন দল ও মতের রাজনীতিবিদ নিয়ে দেশে ঐক্যের রাজনীতি গড়ে তোলার লক্ষ্যে জিয়াউর রহমান প্রতিষ্ঠা করেন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদ দল (বিএনপি)। ১৯৮১ সালের ৩০ মে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউজে সেনাবাহিনীর কতিপয় সদস্যের হাতে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান মর্মান্তিকভাবে নিহত হওয়ার পর বিএনপির রাজনীতির প্রথম অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটে। বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) দ্বিতীয় অধ্যায় শুরু হয় খালেদা জিয়ার হাত ধরে। বিএনপির দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে খালেদা জিয়া এরশাদের সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে আন্দোলন শুরু করেন। খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে গঠন করা হয় সাতদলীয় জোট। অন্যদিকে পনেরোদলীয় জোটের নেত্রী হন আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা। তবে এরশাদ হটানোর আন্দোলনে খালেদা জিয়া শুরু থেকেই সোচ্চার ছিলেন। নিজ দল এবং জোটের প্রতিটি কর্মসূচিতে সক্রিয়ভাবে অংশ নিতেন। নেতাকর্মীদের সামনে থেকে আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েছেন। গুলিস্তান চত্বর, পুরান ঢাকার নওয়াব ইউসুফ মার্কেট প্রাঙ্গণ, দৈনিক বাংলা মোড়, নয়াপল্টন থেকে শুরু করে ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় তার পদচারণায় মানুষ আন্দোলনে উজ্জীবিত হয়েছে। ৮২ সালের ২৮ নভেম্বর সচিবালয় ঘেরাও কর্মসূচিতে নেতৃত্ব দিতে গিয়ে তিনি পুলিশের টিয়ার গ্যাসের শেলের আঘাতে আহত হন। তবে তিনি কখনো রাজপথ ছেড়ে যাননি। ১৯৮৭ সালের ১০ নভেম্বর ঢাকা আবোরোধ কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়। হাজার হাজার মানুষ রাজপথে। পুলিশ জনতাকে ঠেকাতে গুলি ছুড়ছে, টিয়ার গ্যাসের শেল মারছে। পুলিশের গুলিতে এদিন ঢাকায় নূর হোসেনসহ চারজন নিহত হন। এ হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে ১১ ও ১২ নভেম্বর হরতাল ঘোষণা করা হয়। খালেদা জিয়া রাজপথের কর্মসূচিতে জনতার সঙ্গে অংশ নেওয়া ও নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য রাতে হোটেল পূর্বাণীতে অবস্থান করেন। তবে ১১ নভেম্বর শত শত পুলিশ আকস্মিকভাবে সকাল সাড়ে দশটায় পূর্বাণীর হোটেলটি ঘেরাও করে ফেলে। পুলিশ খালেদা জিয়ার রুমের দরজা খোলার চেষ্টা করে। ভেতর থেকে দরজা বন্ধ থাকায় দাঙ্গা পুলিশ এসে দরজা ভেঙে ফেলে। খালেদা জিয়া এ সময় সোফায় বসে পত্রিকা পড়ছিলেন। তার সঙ্গে ছিলেন অধ্যাপিকা জাহানারা বেগম। পুলিশ কমিশনার নসরুল্লাহ খান রুমে ঢুকে খালেদা জিয়াকে বাইরে আসতে বললে তিনি কারণ জানতে চান। পুলিশ কমিশনার বলেন, ‘ইউ আর আন্ডার অ্যারেস্ট’। খালেদা জিয়া গ্রেফতারি পরোয়ানা দেখতে চাইলে পুলিশ কমিশনারের সঙ্গে তার উত্তপ্ত বাক্যবিনিময় হয়। মহিলা পুলিশ তাকে জোরপূর্বক রুম থেকে বের করে নিয়ে এলে হোটেলের লবিতে অপেক্ষমাণ সাংবাদিকদের তিনি বলেন, বেআইনিভাবে তাকে গ্রেফতার করা হয়েছে। জিপে তোলার আগে তিনি সাংবাদিকদের বলেন, ‘এরশাদের পতন না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চলবে’।
এরশাদবিরোধী আন্দোলন যখন তুঙ্গে, তখন ১৯৮৪ সালে সংসদ নির্বাচনের ঘোষণা দেওয়া হয়। শেখ হাসিনা চট্টগ্রামের লালদীঘি ময়দানের জনসভায় ৮৬-এর ১৭ মার্চ বলেন ‘৫ দফা পাশ কাটিয়ে যারা নির্বাচনে যাবে তারা জাতীয় বেইমান’। অথচ ঢাকায় এসে তিনি ওই সংসদ নির্বাচনে যাওয়ার ঘোষণা দেন। একতরফা নির্বাচনের জন্য খালেদা জিয়াকে গৃহবন্দি করে ৭ মে নির্বাচন করা হলো। ছাড়া পাওয়ার পর খালেদা জিয়া আঁতাতের সংসদ বাতিল ও এরশাদের পদত্যাগের দাবিতে আবার আন্দোলন শুরু করেন। খালেদা জিয়ার একটাই ঘোষণা, এরশাদের অধীনে কোনো নির্বাচন হবে না। এ দাবিতে তিনি ছিলেন অনড় ও দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। যার জন্য খালেদা জিয়াকে আন্দোলনের আপসহীন নেত্রী হিসাবে অভিহিত করা হয়। এরশাদ হটাও আন্দোলন ধীরে ধীরে বেগবান হয়ে ওঠে। ১৯৯০ সালের নভেম্বরে আন্দোলন তুঙ্গে ওঠে। হরতাল-অবরোধ, পুলিশের নির্বিচারে গুলি, অসংখ্য মানুষের রক্তের পথ বেয়ে গণ-আন্দোলনের মুখে অবশেষে ৪ ডিসেম্বর রাতে এরশাদের পতন ঘটে।
বিচারপতি সাহাবুদ্দীনের নেতৃত্বে গঠিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে বিএনপি জয়লাভ করে সব মহলকে তাক লাগিয়ে দেয়। বাংলাদেশের ইতিহাসে খালেদা জিয়া প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসাবে শপথ গ্রহণ করেন। বিপুলভাবে জনপ্রিয় খালেদা জিয়া তিনবার প্রধানমন্ত্রী ও দুবার বিরোধীদলীয় নেত্রী ছিলেন। তবে শেখ হাসিনার কতৃত্ববাদী শাসনামলে তাকে উদ্দেশ্যমূলক মামলায় সাজা দিয়ে কারাগারে পাঠানো হয়। একাধিক রোগে গুরুতর অসুস্থ হলেও বারবার আবেদন জানানো সত্ত্বেও চিকিৎসার জন্য খালেদা জিয়াকে দেশের বাইরে যেতে দেওয়া হয়নি। তিনি গত ২৩ নভেম্বর থেকে সংকটাপন্ন অবস্থায় এভারকেয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন।
ষড়যন্ত্র-চক্রান্ত করে জিয়া পরিবারের রাজনীতি ও সংগ্রাম বন্ধ করা যায়নি। মামলা-হামলা, গ্রেফতার-কোনোকিছুই জিয়া পরিবার ও বিএনপিকে দমিয়ে রাখতে পারেনি। আপসহীন নেত্রী মা খালেদা জিয়া ও বাবা মরহুম রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের আদর্শকে ধারণ করে তারেক রহমান দেশে ফিরে জাতীয় রাজনীতিতে নবজাগরণের সূচনা করেছেন। দেশের মানুষের ভালোবাসায় সিক্ত হয়ে সব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার অঙ্গীকার করেছেন। দীর্ঘদিন পর ১২ ফেব্রুয়ারি সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের মাধ্যমে জনগণের সরকার প্রতিষ্ঠা করতে দেশের মানুষ এখন অপেক্ষায় আছে। তারেক রহমানের সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো নেতাকর্মীদের সংহত করে দলকে নির্বাচনে জয়ী করা। নির্বাচনে বিজয়ী হলে তার নেতৃত্বে সরকার গঠনের মাধ্যমে নিরাপদ ও শান্তিপূর্ণ বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠিত হবে-এটাই জনগণের প্রত্যাশা।
হাসান আহমেদ চৌধুরী কিরণ : চেয়ারম্যান, ডিবেট ফর ডেমোক্রেসি
