Logo
Logo
×

Advertisement

উপসম্পাদকীয়

সুশাসন প্রতিষ্ঠায় অডিটর বিচারের গুরুত্ব

Advertisement

Icon

মো. আবদুল বাতেন ফকির

প্রকাশ: ২৯ ডিসেম্বর ২০২৫, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

সুশাসন প্রতিষ্ঠায় অডিটর বিচারের গুরুত্ব

ফাইল ছবি

Advertisement

অডিটর বিচার বা জাজমেন্ট হলো অডিট কার্যক্রমে অডিটরের বিভিন্ন তথ্যসংগ্রহ, পরিমাণগত ও গুণগত অডিট প্রমাণক সংগ্রহ, বিশ্লেষণ, অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা পর্যালোচনা, ঝুঁকি মূল্যায়ন এবং উপসংহার ও মতামত প্রদানের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য আইন বা মানদণ্ড বিবেচনায় নিয়ে অডিটরের পেশাগত সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া। সহজভাবে বলতে গেলে, পাবলিক সেক্টরের অডিট বিচার হলো অডিট প্রক্রিয়ার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও জটিল অংশ, যা একজন অডিটরের বিষয়ভিত্তিক ও পেশাগত জ্ঞান, অভিজ্ঞতা এবং নৈতিক মানদণ্ডের ভিত্তিতে সংগৃহীত তথ্য ও প্রমাণাদি বিচার বিশ্লেষণ করে পেশাগত সিদ্ধান্ত গ্রহণের ধারাবাহিক কার্যক্রম।

প্রকৃতিগতভাবে প্রতিটি মানুষই ভিন্ন। কাজেই একেকজন অডিটরের পেশাগত জ্ঞান, দৃষ্টিভঙ্গি, বিচার-বিশ্লেষণ ক্ষমতায় ভিন্নতা থাকাই স্বাভাবিক। তাই কোনো অডিটরের বিচার শতভাগ নিশ্চিত তা বলা কঠিন। ইন্টুসাই-এর ইসাই মানদণ্ডে অডিটর বিচারের দুটি দিক উল্লেখ করা হয়েছে। প্রথমত : পেশাদার বিচার ও দ্বিতীয়ত : পেশাগত সন্দেহপ্রবণ মনোভাব। বিস্তারিত পর্যালোচনায় দেখা যায় যে, অডিটের পেশাদার জ্ঞান হলো একজন অডিটরের সেই বিশেষ জ্ঞান, দক্ষতা এবং নীতিগত কাঠামো যা তাকে স্বাধীন এবং বস্তুনিষ্ঠভাবে যে কোনো অডিটি প্রতিষ্ঠানের প্রশাসনিক, আর্থিক ও গুণগত দিকগুলো পরীক্ষা ও মূল্যায়ন করতে সাহায্য করে। এ জ্ঞানের আলোকে অডিটর অডিটেড বিষয়ে একটি পেশাদার উপসংহার, মতামত দেওয়ার মাধ্যমে যুক্তিসংগত নিশ্চয়তা প্রদান করে। অডিটরের পেশাদার জ্ঞানের উপাদানগুলোর মধ্যে প্রযুক্তিগত দক্ষতা, নৈতিকতা ও পেশাদারি, স্বাধীনতা ও বস্তুনিষ্ঠতাসম্পন্ন মনোভাব, সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও সমস্যা সমাধান এবং যোগাযোগ দক্ষতা অন্যতম।

অপরদিকে, পেশাগত সন্দেহপ্রবণ মনোভাব এমন এক ধরনের মানসিকতা যেখানে অডিটর তথ্যের সত্যতা যাচাই না করে সহজে গ্রহণ করে না, বরং প্রশ্নবিদ্ধ ও সমালোচনামূলক দৃষ্টিভঙ্গি রাখে এবং নির্ভরযোগ্য প্রমাণ না পাওয়া পর্যন্ত কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছায় না। এর মূল বৈশিষ্ট্য হলো একটি প্রশ্নবিদ্ধ মন, সন্দেহপ্রবণ মনোভাব, প্রমাণককে বিশ্লেষণ করা, প্রমাণ না পাওয়া পর্যন্ত বিচার স্থগিত রাখা, ত্রুটি বা জালিয়াতির সম্ভাবনার প্রতি সজাগ থাকা এবং অডিটের প্রমাণকগুলোর গঠনমূলক মূল্যায়ন করা। ফলে অডিটে অডিটরের প্রশ্নবিদ্ধ মন, সন্দেহপ্রবণ মনোভাবের কারণে জালিয়াতি, অনিয়ম উদ্ঘাটন বৃদ্ধি পায় এবং অডিটরের এ ধরনের সৃজনশীলতা বৃদ্ধির কারণে অডিটের গুণগতমানও উন্নত হয়।

অডিটর বিচারের বিভিন্ন দিকগুলো তাত্ত্বিক ভিত্তির আলোকে পর্যালোচনা করা সম্ভব। এক্ষেত্রে কয়েকটি তত্ত্ব যেমন-প্রফেশনাল জাজমেন্ট থিওরি, বিহেভিয়ারাল ডিসিশন থিওরি, এজেন্সি থিওরি, ইনস্টিটিউশনাল থিওরির আলোকে একজন অডিটর তার বিচার তৈরি করেন। এদের মধ্যে প্রফেশনাল জাজমেন্ট থিওরি উল্লেখেযোগ্য। ওই তত্ত্বের সহায়তায় অডিটর অডিট সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে তার অভিজ্ঞতা, অর্জিত জ্ঞান, নৈতিকতা এবং পেশাগত সন্দেহপ্রবণ মনোভাব ব্যবহার করে থাকেন।

সার্বিকভাবে দেখা যায়, অডিটরদের সিদ্ধান্তকে সময়ের স্বল্পতা (পর্যাপ্ত সময় না দেওয়া), রাজনৈতিক পরিবেশে সম্ভাব্য চাপ, অভ্যন্তরীণ প্রশাসনিক সংস্কৃতি ও অডিট প্রমাণের অপ্রাপ্যতা অডিটরের বিচারকে অনেক ক্ষেত্রে প্রভাবিত করে থাকে। ইনস্টিটিউশনাল থিওরি অনুযায়ী পাবলিক সেক্টরে একজন অডিটর তিন ধরনের চাপকে বিবেচনায় নিয়ে কাজ করতে হয়। এগুলোর মধ্যে প্রথমত আইনগত ও বাধ্যতামূলক চাপ যার মধ্যে সংবিধান (১২৭-১৩২ অনুচ্ছেদ), আইন (বাজেট ব্যবস্থাপনা আইন, পাবলিক মানি ও বাজেট ব্যবস্থাপনা আইন-২০০৯, সরকারি ক্রয় আইন (পিপিএ-২০০৬) ও বিধিমালা (পিপিআর-২০২৫), অডিট ম্যানুয়াল, গভর্নমেন্ট অডিটিং স্ট্যান্ডার্ড এবং সরকারি আর্থিকবিধি বাধ্যবাধকতার মধ্য দিয়ে সিদ্ধান্ত নিতে হয়। এছাড়া আন্তর্জাতিক দাতা সংস্থার নিয়ম (যেমন-চুক্তির শর্ত, ইন্টারন্যাশনাল ফেডারেশন অব কনসাল্টিং ইঞ্জিনিয়ার্স (ফিডিক) গাইডলাইন, বিভিন্ন উন্নয়ন সহযোগী যেমন-বিশ্বব্যাংক, এডিবির প্রকল্প বাস্তবায়নে অডিট বাধ্যতামূলক) উল্লেখযোগ্য। দ্বিতীয়ত মিমেটিক চাপ যা উন্নত দেশের অডিট ব্যবস্থার মতো অনুকরণ। গত কয়েক বছর ধরে বাংলাদেশের পাবলিক সেক্টরের অডিটের গুণগত মান উন্নয়নে জবাবদিহিতার চাপ এবং আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতা অর্জনের লক্ষ্যে অনেকাংশে ইসাই গাইডলাইন অনুসরণ এবং ব্রিটিশ-ওয়েস্টমিনস্টার মডেল অনুসরণ করে পার্লামেন্টারি পাবলিক অ্যাকাউন্টস কমিটির (পিএসি) মাধ্যমে অডিট রিপোর্ট বিশ্লেষণের ব্যবস্থা করা হচ্ছে। তৃতীয়ত, নরমেটিভ চাপ অর্থাৎ পাবলিক সেক্টর অডিটররা পেশাগত মান বজায় রেখে কাজ করতে বাধ্য-এটাই নরমেটিভ চাপ। এ ধরনের চাপ সাধারণত পেশাজীবী, বিশেষজ্ঞ, প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান এবং আন্তর্জাতিক প্রফেশনাল বডিগুলোর মাধ্যমে আসে। যেমন-অডিটরদের পেশাগত যোগ্যতা, প্রশিক্ষণ এবং পেশাগত স্ট্যান্ডার্ড অনুসরণের জন্য উন্নয়ন সহযোগীসহ বিভিন্ন প্রফেশনাল বডি পেশাজীবী প্রতিষ্ঠান ও মিডিয়া ইত্যাদি। এছাড়া অডিটরদের পেশাগত নৈতিকতা, স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহিতা বজায় রাখার ক্ষেত্রেও বিভিন্ন চাপ এসে থাকে। উল্লিখিত তিনটি চাপ সমন্বিতভাবে প্রয়োগে যথাযথ অডিট বিচার সরকারি অডিটকে আরও শক্তিশালী, আধুনিক এবং বিশ্বমানের করার প্রক্রিয়াকে এগিয়ে নিয়ে যায়।

মনে রাখতে হবে, অডিট বিচার অডিটের প্রাণকেন্দ্র। তবে এটি একজন অডিটরের স্বাধীনতা, নৈতিকতা, বস্তুনিষ্ঠতা ও পেশাদারত্বের ওপর ভিত্তি করে গঠিত হলেও বাস্তব ক্ষেত্রে এটি অনেক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়। যার মধ্যে অডিট ইস্যু, সময় সীমাবদ্ধতার চাপ, অডিট অডিটি সম্পর্ক এবং তথ্যের সীমাবদ্ধতা বিচারের গুণমানকে প্রভাবিত করার অন্যতম কারণ। অডিট বিচারের গুণমান উন্নত ও শক্তিশালী করার জন্য প্রশিক্ষণ এবং পেশাগত বিকাশ যেমন-প্রযুক্তিগত উৎকর্ষ সাধনের লক্ষ্যে অডিট অধিদপ্তরগুলোকে আধুনিক প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ করতে হবে, যা অডিটরদের আরও কার্যকরভাবে তথ্য বিশ্লেষণ এবং বিচার করতে সহায়তা করবে। এছাড়া, ট্রেনিং একাডেমি ফিমা, আইডিআইসহ বিবিধ প্রতিষ্ঠান অডিটরদের নিয়মিত প্রশিক্ষণ প্রদান করে অডিটরের পেশাদারত্ব ও জাজমেন্ট উন্নত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখলেও সুশাসন প্রতিষ্ঠায় আধুনিক সময়ের চাহিদা ও প্রযুক্তির সঙ্গে তাল মিলিয়ে প্রশিক্ষণে ডেটা অ্যানালাইসিসে দক্ষ টুলস ব্যবহার করে পর্যাপ্ত আন্তর্জাতিক প্রফেশনাল তৈরির সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে। জটিল এবং টেকনিক্যাল অডিট পরিস্থিতিতে সিদ্ধান্ত গ্রহণ শেখানোর নিমিত্ত কেস স্টাডি ও সিম্যুলেশন বেজড প্রশিক্ষণ; বাস্তব অডিট চ্যালেঞ্জ নিয়ে নিয়মিত জ্ঞান বিনিময়ভিত্তিক আয়োজন; আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বৃদ্ধি করে উত্তম অনুশীলন শেয়ার করে অডিটর বিচারকে আরও আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন করা; সর্বোপরি প্রতিটি অডিট অধিদপ্তরে শেখার সংস্কৃতি তৈরি করে অডিটরদের নিজের ভুল বা নতুন শেখা বিষয় শেয়ার করার লার্নিং ফোরাম চালু করা। বর্ণিত উদ্যোগগুলো সুপ্রিম অডিট ইনস্টিটিউশন বাংলাদেশ বাস্তবায়নে কার্যকর পদক্ষেপ নিলে অডিটর বিচার ও অডিটের গুণগত মান বাড়াবে এবং দেশে সুশাসন নিশ্চিত করতে আরও জোরালো ভূমিকা রাখবে।

মো. আবদুল বাতেন ফকির : সার্টিফাইড ফ্যাসিলিটেটর (কমপ্ল্যায়েন্স অডিট), যুগ্ম সচিব ও ডেপুটি প্রজেক্ট ডাইরেক্টর (অর্থ ও হিসাব), এমআরটি লাইন-৬, (ডিএমটিসিএল)

Advertisement

Advertisement

আরও পড়ুন

রাজনীতির ভাষা

রাজনীতির ভাষা

দিল্লিতে কী হচ্ছে

দিল্লিতে কী হচ্ছে

অর্থনীতির রক্তক্ষরণে ফুটো বন্ধ করবে কে?

অর্থনীতির রক্তক্ষরণে ফুটো বন্ধ করবে কে?

হালফিল বয়ান ধর্ষণ বৃদ্ধি কীসের আলামত

ধর্ষণ বৃদ্ধি কীসের আলামত

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম