বাইফোকাল লেন্স
বাংলাদেশ নিয়ে ভারতের দৃষ্টিভঙ্গি বদলাতে হবে
Advertisement
একেএম শামসুদ্দিন
প্রকাশ: ২৯ ডিসেম্বর ২০২৫, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
শরিফ ওসমান হাদির হত্যাকাণ্ডকে কেন্দ্র করে ঘটে যাওয়া কয়েকটি ঘটনায় বহিঃবিশ্বে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি নষ্ট হয়েছে। ঢাকায় সংবাদপত্র অফিস ও ছায়ানটে হামলা এবং ভালুকায় দিপু চন্দ্র দাস নামের এক হিন্দু যুবককে হত্যার ঘটনা ছিল সম্পূর্ণভাবে অনাকাঙ্ক্ষিত। ওসমান হাদির মৃত্যুর সংবাদ প্রচারের পর সে রাতেই স্বার্থান্বেষী মহল বহুল আলোচিত দৈনিক প্রথম আলো ও ডেইলি স্টার পত্রিকা অফিসে ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করে। তার পরপরই সংগীত শিক্ষায়তন ছায়ানটও হামলার শিকার হয়। হামলার এ ঘটনা ছিল খুবই নিন্দনীয়। ভালুকায় দিপু চন্দ্র দাস হত্যার ঘটনা ছিল আরও মর্মান্তিক ও নৃশংস, যা কোনো অবস্থাতেই মেনে নেওয়া যায় না। ব্যক্তিগতভাবে আমি এ ঘটনাগুলো মেনে নিতে পারিনি। কোনো কোনো সংবাদপত্রের ভাষা ও উদ্দেশ্য কারও ভালো না-ও লাগতে পারে। কেউ কেউ হয়তো অন্য কারও এজেন্ডা বাস্তবায়নে সহযোগিতা করতেই পারে। এজন্য দেশে আইন আছে। কারও পছন্দ না হলে আইনের আশ্রয় নিতে পারে। তাই বলে এভাবে হামলা করতে হবে? ছায়ানট কী অপরাধ করেছিল? এমন একটি সাংস্কৃতিক চর্চাকেন্দ্রে হামলা হবে, তা মেনে নিতে পারছি না। ভালুকায় মিথ্যা অপবাদ দিয়ে দিপু চন্দ্র দাসকে যেভাবে হত্যা করা হয়েছে, তা কোনো সভ্য সমাজের প্রতিফলন হতে পারে না। হত্যাকাণ্ডের পর জানা গেছে, যে অভিযোগ দিপুর বিরুদ্ধে তোলা হয়েছিল, তা ছিল সম্পূর্ণ মিথ্যা।
প্রশ্ন হচ্ছে, ওসমান হাদির মৃত্যুর সংবাদ প্রচারের পরপরই সংবাদপত্র অফিস ও ছায়ানটে হামলা শুধুই কি ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ? নাকি এর পেছনে তৃতীয় পক্ষের কোনো ইন্ধন আছে? আমার বিশ্বাস, সরকারের সংশ্লিষ্ট সংস্থা আন্তরিকভাবে যদি চেষ্টা করে, তাহলে এ তৃতীয় পক্ষের চেহারা উন্মোচন করা সম্ভব হবে। এমন মনে করার কারণও আছে। ইতঃপূর্বে আমরা দেখেছি, একটি পরিকল্পিত দুরভিসন্ধিমূলক ঘটনা ঘটানোর আগেই মতলববাজরা মূল পরিকল্পনার পাশাপাশি আরও কিছু পরিকল্পনা করে রাখে; যাতে উলটো ফল হলে তা কাজে লাগাতে পারে। গোয়েন্দার ভাষায়, এ ধরনের পূর্বপরিকল্পনাকে ‘ব্যাকআপ প্ল্যান’ বলে। এ পরিকল্পনাটি এমনভাবে ডিজাইন করা হয়, যাতে একটি অঘটন ঘটানোর পর আরেকটি অঘটন ঘটিয়ে জনগণের দৃষ্টিকে অন্যদিকে নিবদ্ধ করা যায়। এ কৌশলের মূল লক্ষ্য হলো, সম্ভাব্য ঝুঁকিগুলো চিহ্নিত করে সেগুলোর মোকাবিলায় আগে থেকেই প্রস্তুতি নিয়ে রাখা, যাতে সম্ভাব্য ক্ষতি কমিয়ে আনা যায়। অনেক ক্ষেত্রে মতলববাজরা একাধিক ব্যাক-আপ প্ল্যান করে রাখে। ‘ব্যাকআপ প্ল্যান-১ লক্ষ্য অর্জনে ব্যর্থ হলে তেমন, ‘ব্যাকআপ প্ল্যান-২’ কার্যকর করা হয়। ভালুকার দিপু চন্দ্র দাস হত্যাকাণ্ড ‘ব্যাকআপ প্ল্যান-২’-এর অংশ কিনা তদন্তকালে সংশ্লিষ্টরা লক্ষ্য রাখবেন বলে আশা করি। অবশ্য তদন্তকারীরা এ বিষয়টি তাদের তদন্তের অংশ হিসাবে গ্রাহ্য করছেন কিনা, জানা নেই। তবে, যা বলেছি তা সেভাবেই যে ঘটেছে, এটা না-ও হতে পারে। ওসমান হাদির মৃত্যুর পর ঘটে যাওয়া ঘটনা বিচার-বিশ্লেষণ করে এবং এ ধরনের সংস্থায় কাজ করার পূর্ব অভিজ্ঞতার আলোকে এমন যে হতে পারে, সে সম্ভাবনার কথা বলছি। শেখ হাসিনা যখন দেশ শাসন করতেন, তখনো এমন ছলচাতুরীর অনেক ঘটনাই দেখেছি। সে সময় যারা এমন অঘটন ঘটাত, তারা বাংলাদেশে এখনো সক্রিয়। সুতরাং হাসিনার শাসনামলের ঘটনাগুলো এবং গত দেড় বছর ধরে দেশের নানা প্রান্তে ঘটে যাওয়া ঘটনা বিশ্লেষণ করে এমন উপসংহারে আসা যেতেই পারে।
সংবাদপত্র অফিস ও ছায়ানটে হামলার পর ঢাকার তথাকথিত সুশীল সমাজ যেভাবে প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে, ওসমান হাদির মৃত্যুতে তার কানাকড়িও দুঃখ প্রকাশ করেছে কি? শুধু ঢাকা নয়, কলকাতার শিল্পী, সাহিত্যিক, গবেষক এবং সাংবাদিকরা সংবাদপত্র অফিস ও ছায়ানটে হামলার ঘটনায় চিন্তিত হয়ে পড়েছেন। কলকাতা প্রেস ক্লাব এ ঘটনার নিন্দা জানিয়েছে। কলকাতায় শিল্পচর্চা করেন এমন বিজ্ঞজনরাও আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম ডয়েচে ভেলেকে ছায়ানটে হামলার ঘটনায় উদ্বেগ জানিয়ে বলেছেন, ছায়ানটকে ধ্বংস করার মাধ্যমে বাংলাদেশের ‘আইডেন্টিটি’কে ধ্বংস করার চেষ্টা করা হয়েছে, যা উদ্বেগজনক! তাদের উদ্বেগ কোথায় বোঝা গেলেও একটি বিষয় দৃষ্টিকটু লেগেছে, তা হলো এসব অবাঞ্ছিত ঘটনায় কলকাতার গুণিজনরা তীব্র প্রতিক্রিয়া জানালেও যার মৃত্যুকে কেন্দ্র করে এ ঘটনাগুলো ঘটল, সেই ওসমান হাদির মৃত্যু নিয়ে তাদের কোনো প্রতিক্রিয়া নেই। চব্বিশের জুলাই গণ-আন্দোলনে বাংলাদেশের সহস্রাধিক মানুষ হত্যার পরও তাদের কোনো প্রতিক্রিয়া আমরা দেখতে পাইনি। বরং ৫ আগস্ট-পরবর্তী আওয়ামী লীগ নেতাকর্মী-সন্ত্রাসীদের বাড়িতে হামলার পর তাদের তীব্র প্রতিবাদ করতে শোনা গেছে। যদিও এ ধরনের যে কোনো হামলাই নিন্দনীয়। বর্তমানে ভালুকার দিপু চন্দ্র দাস হত্যাকাণ্ডকেও সংখ্যালঘু নিধনের জিগির তুলে ভারতে বাংলাদেশ দূতাবাসের অফিসগুলোকে আক্রমণের টার্গেট বানানো হয়েছে।
দিপু চন্দ্র দাস হত্যাকাণ্ড তৃতীয় পক্ষের ‘ব্যাকআপ প্ল্যান-২’-এর অংশ কিনা জানি না, তবে এ ঘটনা ভারতের হিন্দুত্ববাদী সন্ত্রাসীদের হাতে যে বাংলাদেশবিরোধী অস্ত্র তুলে দিয়েছে, তা নিঃসন্দেহে বলা যায়। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে সে দেশে বাংলাদেশবিরোধী যে কাণ্ড চলছে, তা সাময়িককালের জন্য হলেও আন্তর্জাতিক মহলের দৃষ্টিকে ওসমান হাদির হত্যাকাণ্ডের ঘটনা থেকে দূরে সরিয়ে রাখতে সক্ষম হয়েছে। ভারতে বর্তমানে বাংলাদেশবিরোধী যে হট্টগোল চলছে, তা যে সুপরিকল্পিত, তা পর্যালোচনা করলেই বোঝা যায়। রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থায় এসব ঘটনা যে ঘটছে, তা দিল্লির বাংলাদেশ দূতাবাসের সামনে ঘটে যাওয়া ঘটনার পর অন্তর্বর্তী সরকারের পররাষ্ট্র উপদেষ্টার বক্তব্যের অন্তর্নিহিত অর্থের বিশ্লেষণ করলেই বোঝা যায়। দিল্লিতে বাংলাদেশের হাইকমিশনের প্রধান ফটকের সামনে এসে একদল হিন্দু সন্ত্রাসী বিক্ষোভ করে। এ সময় সন্ত্রাসীরা ভারতে নিযুক্ত বাংলাদেশের হাইকমিশনার রিয়াজ হামিদুল্লাহকে হুমকিও দেয়। এরই প্রতিক্রিয়ায় পররাষ্ট্র উপদেষ্টা বলেন, ‘দিল্লিতে কূটনৈতিক এলাকার ভেতরে বাংলাদেশ মিশনের অবস্থান খুবই নিরাপদ স্থানে, সেখানে হিন্দু চরমপন্থিরা ওই এলাকার মধ্যে আসতে পারবে কেন? তাহলে তাদের আসতে দেওয়া হয়েছে, এমন ঘটনা প্রত্যাশিত নয়।’ এছাড়াও শিলিগুড়ির বাংলাদেশের ভিসা সেন্টারে হামলা চালিয়ে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। কলকাতাসহ আরও কয়েকটি রাজ্যেও ব্যাপক প্রতিক্রিয়া দেখেছে। দিপু চন্দ্র দাসের মৃত্যুর ঘটনাকে হিন্দু নিধন ঘটনা হিসাবে তারা এমনভাবে তুলে ধরার চেষ্টা করছে, যেন এর চেয়েও জঘন্য ঘটনা কখনো ঘটেনি।
অথচ গত ২৪ ডিসেম্বর কলকাতা থেকে প্রকাশিত বাংলা পত্রিকা ‘গণশক্তি’তে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে জানা যায়, নরেন্দ্র মোদি রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় আসার পর গরু ও গরুর মাংসের নামে গত এক দশকে ভারতের নানা প্রান্তে হিন্দুত্ববাদীরা মুসলিমদের হত্যা করেছে। শুধু মুসলিম নয়, শিখ, বৌদ্ধ, জৈন, খ্রিষ্টান এবং আদিবাসীরাও হত্যার শিকার হয়েছেন। গত ১১ বছরে অন্তত ২০০-এর মতো মুসলিমকে শুধু গরুর নামে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে। আক্রান্ত হয়েছেন আরও বেশি। এখন ভারতে বাংলাদেশি সন্দেহে হত্যাকাণ্ডের এক নতুন ধারা চালু হয়েছে। সম্প্রতি ঘটে যাওয়া দুটো ঘটনা খুবই উদ্বেগজনক। এ উদ্বেগ শুধু বাংলাদেশের নয়। পশ্চিমবঙ্গের বাঙালিদের জন্যও। ১৭ ডিসেম্বর ভারতের কেরালায় বাংলাদেশি সন্দেহে ছত্তিশগড়ের বাসিন্দা রামনারায়ণ বাঘেল নামে একজন হিন্দু ধর্মাবলম্বীকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে। রামনারায়ণ ছিলেন দলিত শ্রেণির একজন হিন্দু, যিনি মৃত্যুর ঠিক দুদিন আগে কাজের সন্ধানে ছত্তিশগড় থেকে কেরালায় এসেছিলেন। এতদিন ধারণা করা হতো, এ ধরনের ঘটনা শুধু হিন্দুত্ববাদী আরএসএসের সদস্যরাই ঘটিয়ে থাকে; কিন্তু বর্তমানে বাংলাদেশবিরোধী এমন ঘৃণার রাজনীতি ছড়ানো হয়েছে, কেরালায় বিজেপি, সিপিআইএম এবং কংগ্রেসের সমর্থক সম্মিলিতভাবে বাংলাদেশি সন্দেহে রামনারায়ণ বাঘেলকে পিটিয়ে হত্যা করেছে। অপর দুর্ঘটনাটি ঘটেছে ২৪ ডিসেম্বর রাতে। ভারতের ওড়িশা রাজ্যে ‘বাংলাদেশি’ সন্দেহে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে জুয়েল রানা নামে পশ্চিমবঙ্গের এক মুসলিম নির্মাণ শ্রমিককে। নিহত ১৯ বছর বয়সি জুয়েল রানা পশ্চিমবঙ্গের মুর্শিদাবাদের সুতি অঞ্চলের বাসিন্দা। মাত্র ৫ দিন আগে তিনি কাজ করতে ওড়িশা গিয়েছিলেন। এ ঘটনা পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, এখানে জুয়েল রানার ধর্মীয় পরিচয়ই একমাত্র কারণ ছিল না, খুনিরা জুয়েল রানাকে একজন মুসলিম এবং বাংলাদেশি গণ্য করেই হত্যা করেছে।
প্রশ্ন হচ্ছে, এসব হত্যাকাণ্ডে জড়িত দোষী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইনানুগ কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে? ২০০২ সালে গুজরাট দাঙ্গার সময় এক সন্তানসম্ভবা মুসলিম নারীকে ধর্ষণ এবং তার পরিবারের ১৪ জনকে হত্যার দায়ে তিন ব্যক্তিকে ফাঁসির দণ্ড দিতে ভারতের বম্বে হাইকোর্ট যখন অস্বীকৃতি জানান, ওই ঘটনায় দণ্ডিত অপর ১১ আসামিকে ক্ষমা করে মুক্তি দেওয়া হয়। শুধু তাই নয়, ২০১৫ সালে উত্তর প্রদেশে গরুর গোশত রাখার মিথ্যা অভিযোগে হত্যার শিকার আখলাক হত্যা মামলায় অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে সব অভিযোগ প্রত্যাহারের জন্য রাজ্য সরকার যখন আদালতে আবেদন করে (যদিও সম্প্রতি আদালত সে আবেদন খারিজ করেছেন) এবং এসব ঘটনায় ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার ভিকটিমের পক্ষে কোনো ভূমিকা না রেখে যখন নীরব থাকে, তখন হিন্দুত্ববাদী সন্ত্রাসীরা সরকারের আশকারা পায় বলে ধরে নেওয়াই যেতে পারে। এ যদি পরিস্থিতি হয়, তাহলে এসব হত্যাকাণ্ডকে সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে ভারতের রাষ্ট্রীয় সহিংসতা না বলে উপায় কী? তারপরও যখন দেখি, বাংলাদেশের কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনায় ভারত যখন ব্যাপক প্রতিক্রিয়া দেখায় এবং বাংলাদেশের কী করা উচিত, আর কী করা উচিত নয় বলে উপদেশ দেয়, তখন বাংলাদেশের আপত্তির জায়গা তৈরি হয় বৈকি। সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা বিধানের ব্যাপারে বাংলাদেশকে উপদেশ না দিয়ে ভারতের বরং নিজ দেশের সংখ্যালঘু নির্যাতন বন্ধের দিকে নজর দেওয়া উচিত। ভারতের মনে রাখতে হবে; আগের আর সেই দিন নেই। শেখ হাসিনার পতনের পরপরই বাংলাদেশে তাদের মধুচন্দ্রিমা শেষ হয়েছে। বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে এখন তাদের নাক গলানো বন্ধ করা উচিত। আরও স্পষ্ট করে যদি বলি, তাহলে অন্তর্বর্তী সরকারের পররাষ্ট্র উপদেষ্টার মতো করে বলতে হয়, বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ কোনো ব্যাপারেই ভারতের নসিহত করার প্রয়োজন নেই।
একেএম শামসুদ্দিন : অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তা, কলাম লেখক
