Logo
Logo
×
   

Advertisement

উপসম্পাদকীয়

শতফুল ফুটতে দাও

বৈশ্বিক অস্থিরতার নাভিকেন্দ্র হয়ে উঠেছে ভেনিজুয়েলা

Advertisement

ড. মাহবুব উল্লাহ্

ড. মাহবুব উল্লাহ্

প্রকাশ: ০৮ জানুয়ারি ২০২৬, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

বৈশ্বিক অস্থিরতার নাভিকেন্দ্র হয়ে উঠেছে ভেনিজুয়েলা

Advertisement

প্রিয় পাঠক, আজ আমি ভেনিজুয়েলায় মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের দস্যুসুলভ হামলার বিষয়ে লিখব। তার আগে আপনাদের ভাইকিং জলদস্যুদের কাহিনি বলতে চাই। অষ্টম থেকে একাদশ শতাব্দীর শেষ পাদ পর্যন্ত ভাইকিং জলদস্যুরা ছিল সাগর দাপিয়ে বেড়ানো স্ক্যান্ডিনেভিয়ো নর্স জনগোষ্ঠী। তারা একাধারে দস্যুর মতো আক্রমণ চালাত, বাণিজ্য করত এবং অভিযান চালাত।

তাদের ভয়ে ভীতসন্ত্রস্ত থাকত ইউরোপের সমুদ্রতট এলাকার ধনাঢ্য এলাকাবাসী এবং খ্রিষ্টান গির্জাগুলো। তারা ছিল বহুরূপী। তারা ব্যবসা করত, নতুন বসতি গড়ত এবং সাম্রাজ্য গড়ে তুলত। সমুদ্র অঞ্চলে ক্ষমতার প্রাধান্য প্রতিষ্ঠা, বলপ্রয়োগ এবং সাংস্কৃতিক বিনিময়ের মাধ্যমে তারা ইউরোপের ইতিহাসকে বিশেষ ধারায় গড়ে তুলেছে। ভাইকিং শব্দটির অর্থ জলদস্যু। এরা তাদের জাহাজগুলো আক্রমণ করে লুণ্ঠনের জন্য এবং বাণিজ্যের জন্যও ব্যবহার করত।

তারা হামলা চালিয়েছে, ব্যবসা করেছে, নতুন দেশ আবিষ্কার করেছে, নতুন দেশে বসতি গড়েছে এবং তাদের মধ্যে কেউ কেউ রাজা ও পরোপকারী হয়েছে আয়ারল্যান্ড ও ইংল্যান্ডের মতো দেশে। তারা অন্যদের বাণিজ্যিক জাহাজে এবং সমুদ্র তীরবর্তী ভূমিতে আক্রমণ চালাত। বলপ্রয়োগ করে ধন-সম্পদ ও ক্ষমতা অর্জনই ছিল তাদের লক্ষ্য। সমসাময়িককালের ইউরোপীয় মটাধ্যক্ষরা তাদের ভয়ে তটস্থ থাকত। পঞ্চদশ শতকে পুঁজিবাদের উদ্ভবে ভাইকিং জলদস্যুদের লুণ্ঠিত অর্থ একটি ভূমিকা রেখেছে।

পুঁজিবাদ এমন একটি হিংস্র ব্যবস্থা, যা একবিংশ শতাব্দীতে এসেও ভাইকিং জলদস্যুদের মতো চরিত্র বদলাতে পারেনি। দক্ষিণ আমেরিকার দেশ ভেনিজুয়েলায় ‘বৃহৎ পরিসরে’ হামলা চালিয়ে দেশটির প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে তুলে নিয়ে গেছে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী। মাদুরোর সঙ্গে তার স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরেসকেও নিয়ে যাওয়া হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের হামলায় স্থানীয় সময় শুক্রবার গভীর রাতে কেঁপে ওঠে ভেনিজুয়েলার রাজধানী কারাকাস। দেশটির সবচেয়ে বড় সামরিক ঘাঁটি ফোর্ট তিউনা ও বিমান ঘাঁটি লা কারলোভা আক্রান্ত হয়। ভেনিজুয়েলা এ হামলা প্রতিরোধের ঘোষণা দিয়েছে। তাৎক্ষণিকভাবে হতাহতের কথা জানা যায়নি। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প গত শনিবার স্থানীয় সময় বেলা ১১টায় যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডার মার-আলাগোতে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, ‘যতক্ষণ না আমরা নিরাপদে, সঠিক ও ন্যায়সংগতভাবে ক্ষমতা হস্তান্তর করতে পারি, ততক্ষণ আমরা দেশটি (ভেনিজুয়েলা) পরিচালনা করব।’ তিনি আরও বলেন, তারা তাদের বড় তেল কোম্পানিগুলোকে ভেনিজুয়েলায় পাঠাতে যাচ্ছেন।

ডোনাল্ড ট্রাম্পের দম্ভোক্তি থেকে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে ভেনিজুয়েলায় তাদের হামলার আসল উদ্দেশ্য কী। ভেনিজুয়েলায় রয়েছে বিশ্বের বৃহত্তম পেট্রোলিয়ামের মজুত। ভেনিজুয়েলায় একটি সমাজতান্ত্রিক সরকার ক্ষমতায় আসার পর এবং সেই সরকার ভেনিজুয়েলার তেল সম্পদ জাতীয়করণ করার পর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে। সেই থেকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ভেনিজুয়েলাকে শায়েস্তা করার জন্য হেন অস্ত্র নেই, যা তারা প্রয়োগ করেনি। ভেনিজুয়েলার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র দেশটির অর্থনীতিকে পঙ্গু করে দেয়। মূল্যস্ফীতি চরমে ওঠে। সাধারণ মানুষের জীবনে নাভিশ্বাসের সৃষ্টি হয়। মার্কিন নিষেধাজ্ঞার লক্ষ্য ছিল ভেনিজুয়েলার অর্থনীতির পঙ্গুদশা ঘটিয়ে দেশটির সমাজতান্ত্রিক সরকারের বিরুদ্ধে সেদেশের জনগণকে খেপিয়ে তোলা। এ লক্ষ্য অর্জনে তারা কিছুটা সফলও হয়।

বামপন্থি প্রেসিডেন্ট হুগো শ্যাভেজ ১৯৯৯ সালে ক্ষমতায় আসার পর দেশটির তেল খনিজগুলো সরকারিকরণের সিদ্ধান্ত নেন। এর জেরে মার্কিন তেল কোম্পানিগুলোর বড় বিনিয়োগ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। শুরু হয় যুক্তরাষ্ট্র ও ভেনিজুয়েলার সম্পর্কে টানাপোড়েন। শ্যাভেজের মৃত্যুর পর ২০১৩ সালে ক্ষমতায় আসেন তার উত্তরসূরি মাদুরো। তিনি শ্যাভেজের পথে হাঁটায় যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্কের উন্নতি হয়নি। মাদকবিরোধী অভিযানের নামে কয়েক মাস ধরে ভেনিজুয়েলার সমুদ্রসীমায় একাধিক হামলাও চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। এতে নিহত হয়েছিন শতাধিক মানুষ।

‘দ্য নিউইয়র্ক টাইমস’কে টেলিফোনে দেওয়া এক সংক্ষিপ্ত সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প ভেনিজুয়েলায় চালানো অভিযানকে ‘ব্রিলিয়ান্ট’ বলে অভিহিত করেন। পত্রিকাটি তার উদ্ধৃতি দিয়ে জানায়, ‘অনেক ভালো পরিকল্পনা ছিল। এতে যুক্ত ছিলেন অসাধারণ সব সেনাসদস্য ও দক্ষ মানুষ।’ ভেনিজুয়েলায় হামলায় নিয়োগ করা হয়েছিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে ভয়ংকর বাহিনী ডেল্টা ফোর্সকে। ইরাকের কাহিনি ও ভেনিজুয়েলার কাহিনিতে রয়েছে অদ্ভুত মিল। ইরাকের হাতে গণবিধ্বংসী অস্ত্র রয়েছে বলে অভিযোগ তুলে একটি সুন্দর সাজানো-গোছানো দেশকে ধ্বংস করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। পরে প্রমাণিত হয়েছে ইরাকে কোনো গণবিধ্বংসী অস্ত্র ছিল না। বুশের কোলের কুকুর নামে পরিচিত ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী টনি ব্লেয়ার এ অভিযোগের ব্যাপারে মার্কিনিদের প্রতি খুবই নোংরাভাবে সুর মেলায়।

এখন পর্যন্ত পাওয়া তথ্যে বোঝা যাচ্ছে, ভেনিজুয়েলা ‘কোকেন’ নামক মাদক উৎপাদনও করে না এবং মার্কিন দেশে রপ্তানিও করে না। ভুয়া অভিযোগ তুলে একটি স্বাধীন সার্বভৌম দেশের প্রেসিডেন্ট ও তার স্ত্রীকে হামলা চালিয়ে তুলে নিয়ে গিয়ে যে দৃষ্টান্ত স্থাপন করা হলো তা খুবই জঘন্য এবং নিন্দনীয়। এর আগে প্রায় একই ধরনের অভিযোগ তোলা হয়েছিল পানামার প্রেসিডেন্ট নোরিয়েগার বিরুদ্ধে। নোরিয়েগাকেও তুলে নেওয়া হয় এবং মার্কিন বিচারালয়ে বিচার করে ১৮ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়। কারাদণ্ডের মেয়াদ শেষে নোরিয়েগা পানামায় ফিরে আসেন এবং ২০১৭ সালের ২৯ মে পানামায় মৃত্যুবরণ করেন। নোরিয়েগার প্রায় অনুরূপ ঘটনা ঘটানো হলো মাদুরোর ক্ষেত্রেও।

মাদুরোকে তুলে নেওয়া সম্পর্কে প্রবীণ মার্কিন সিনেটর বার্নি স্যান্ডার্স বলেছেন, ‘আন্তর্জাতিক আইনের এ নির্লজ্জ লঙ্ঘন পৃথিবীর যে কোনো দেশকে অন্য কোনো দেশে হামলা চালাতে, তাদের সম্পদ দখল করতে কিংবা সরকার পরিবর্তনের চেষ্টা করতে সবুজসংকেত দিচ্ছে।

তিনি আরও বলেন, কংগ্রেসের অনুমোদন ছাড়া সামরিক অভিযান চালানো যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধানের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। একই সঙ্গে জাতিসংঘের সনদ অনুযায়ী কোনো সার্বভৌম রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে একতরফা সামরিক আগ্রাসন আন্তর্জাতিক আইনেরও পরিপন্থি’, বার্নি স্যান্ডার্স তার বক্তব্যে যুক্তরাষ্ট্রের লাতিন আমেরিকায় হস্তক্ষেপের দীর্ঘ ইতিহাসের কথাও স্মরণ করিয়ে দেন। তিনি বলেন , ‘এ বিষয়ে কোনো ভুল ধারণার সুযোগ নেই-এটাই নগ্ন সাম্রাজ্যবাদ। এটি লাতিন আমেরিকায় যুক্তরাষ্ট্রের হস্তক্ষেপের ইতিহাসের সবচেয়ে অন্ধকার অধ্যায়গুলোর কথা মনে করিয়ে দেয়, যার ভয়াবহ উত্তরাধিকার আজও রয়ে গেছে।’

বার্নি স্যান্ডার্সের মন্তব্যের আলোকে একথা বলা যায়, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট জ্যামস মনরো ১৮২৩ সালে ঘোষণা করেন, লাতিন আমেরিকায় ইউরোপীয় হস্তক্ষেপ চলবে না, বিনিময়ে যুক্তরাষ্ট্র ইউরোপীয় বিষয়াদিতে হস্তক্ষেপ করবে না। এ ঘোষণা অনুযায়ী পশ্চিম গোলার্ধভুক্ত দেশগুলোতে মার্কিন কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করা হয়। লাতিন আমেরিকা পরিণত হয় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের একক আঙিনায়। এ ঘোষণা অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র কর্তৃক সম্প্রসারণবাদী নীতি ও হস্তক্ষেপকে ন্যায্যতা প্রদান করা হয়, কিন্তু একইসঙ্গে লাতিন আমেরিকার দেশগুলোর সঙ্গে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিরোধ তীব্র আকার ধারণ করে। ভেনিজুয়েলার জঘন্যতম এ হামলা করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র আন্তর্জাতিক আইনে প্রতিষ্ঠিত নিয়মাবলি ও আচার আচরণকে চরমভাবে লঙ্ঘন করেছে। এর ফলে যে খারাপ নজির স্থাপিত হলো, তা একবিংশ শতাব্দীর পৃথিবীকে অস্থির করে তুলবে। অন্য শক্তিধর রাষ্ট্রগুলো যদি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পদাঙ্ক অনুসরণ করে, তাহলে আমাদের এ পৃথিবী নরককুণ্ডে পরিণত হবে।

আমার আশঙ্কা নিজ দেশ বাংলাদেশকে নিয়ে। বাংলাদেশের কোনো সরকার যদি দিল্লির চাহিদা পূরণ করতে না পারে, তাহলে দিল্লিও ট্রাম্পের দৃষ্টান্ত অনুসরণ করে ডেল্টা ফোর্সের মতো ফোর্স দিয়ে হামলা করে বাংলাদেশের সরকারপ্রধানকে তুলে নিয়ে যেতে পারে। এ ধরনের বিপদ তখনই আসবে, যখন বাংলাদেশে শত্রুর পঞ্চম বাহিনী ক্রিয়াশীল হয়ে উঠবে। তাই সর্বোচ্চ জাতীয় ঐক্য দিয়ে এ বিপদ মোকাবিলার কোনো বিকল্প নেই। বাংলাদেশে প্রায় অনুরূপ পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছিল বিডিআর হত্যাকাণ্ডের পর। এ ঘটনার পর সামরিক বাহিনীর তরুণ অফিসাররা বিক্ষুব্ধ হয়ে উঠেছিল। ভারতের পক্ষ থেকে শেখ হাসিনাকে অভয় দেওয়া হয়েছিল, তারা শেখ হাসিনাকে উদ্ধার করার জন্য তাদের সামরিক বাহিনীকে সতর্ক অবস্থায় রেখেছে।

জাতিসংঘ ব্যবস্থা ও আন্তর্জাতিক আইনের প্রতি শ্রদ্ধা দেখানোর ফলেই এখন পর্যন্ত বিশ্বশান্তি বড় ধরনের ব্যত্যয় দেখা যায়নি। যদিও আফগানিস্তান, ইরান, ইরাক, ইয়েমেন, লিবিয়া, লেবানন ও এক সময় বসনিয়া অশান্ত হয়ে উঠেছে অথবা অশান্ত রয়ে গেছে।

আন্তর্জাতিক আইন ও জাতিসংঘব্যবস্থা যদি ভেঙে পড়ে, তাহলে ক্ষুদ্র ও দুর্বল রাষ্ট্রগুলো তাদের সার্বভৌমত্ব বজায় রাখতে পারবে না এবং দুনিয়াজুড়ে নৈরাজ্য ও রক্তপাতের ঘটনাও ঘটতে থাকবে। ভেনিজুয়েলায় সশস্ত্র প্রতিরোধ সংগ্রামের সূচনা হতে পারে। তবে ভেনিজুয়েলায় দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্ট যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কাজ করার ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ভারসাম্যমূলক সম্পর্ক তৈরি করার কথা বলেছেন। তার এ বক্তব্যকে অনেকে আপসের প্রস্তাব হিসাবে দেখছে। ভেনিজুয়েলার জনগণ এ ধরনের প্রস্তাব মেনে নেবে কিনা, তা দেখার বিষয়।

রাশিয়া ও চীনসহ বেশ কিছু দেশ ভেনিজুয়েলায় মার্কিন হস্তক্ষেপের নিন্দা জানিয়েছে। বাংলাদেশে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে পাঠানো এক বিবৃতিতে জানানো হয়, ভেনিজুয়েলার সাম্প্রতিক পরিস্থিতি উদ্বেগের সঙ্গে পর্যবেক্ষণ করছে বাংলাদেশ। বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, বাংলাদেশ বিশ্বাস করে, দেশগুলোর মধ্যে সব বিরোধের ক্ষেত্রে কূটনীতি ও সংলাপই সমাধানের পথ।

ড. মাহবুব উল্লাহ : শিক্ষাবিদ ও অর্থনীতিবিদ

Advertisement

Advertisement

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম