সার্ক : নতুন সম্ভাবনার আভাস
Advertisement
ড. মাহবুব হাসান
প্রকাশ: ০৯ জানুয়ারি ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
চাঁদের আলো তেমন পরিষ্কার নয়। কিছুটা ধোঁয়াশাপূর্ণ। কোনো কিছুই পরিপূর্ণভাবে দেখা যায় না। চেনাও যায় না। কূটনৈতিক ভাষাও অনেকটাই অ্যালিগারি সমৃদ্ধ। অনেক সময় রূপক সত্যে উদ্ভাসিত হয়ে ওঠে। আবার কোনোখানে তা কুয়াশায় মিলিয়ে যায়। এজন্য কূটনীতিকরা রহস্যময় কথার মারপ্যাঁচে ফেলেন প্রতিপক্ষকে।
ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর আর পাকিস্তানের জাতীয় সংসদের স্পিকার আইয়াজ সাদিকের সঙ্গে ‘করমর্দন’ করার পর তিন দেশের রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা নড়েচড়ে বসেছেন। কারণ, কয়েক মাস আগেই ভারত-পাকিস্তানের মধ্যে সংক্ষিপ্ত আকাশযুদ্ধ হয়ে গেছে। সেই সংঘর্ষের পর দুই দেশের মধ্যে রাজনৈতিক ও সামরিক মনোমালিন্য আরও বেড়েছে। দুটি দেশই পারমাণবিক শক্তির অধিকারী। ফলে কেউ কাউকে ছেড়ে দেয় না।
তিনবারের সফল প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার ফিউরেনাল অনুষ্ঠানে যোগ দেওয়া এবং তার প্রতি সম্মান জানানোর উদ্দেশেই ভারত-পাকিস্তানের উচ্চপর্যায়ের দুই নেতার ঢাকায় আসা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। সেই হিসাব কষেই বিশ্লেষকরা মন্তব্য করেছেন। সেসব মন্তব্য ইতিবাচকই বলব আমি।
‘বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার জানাজার ঠিক আগমুহূর্তে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্করের সঙ্গে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সাক্ষাৎকে কূটনৈতিক শিষ্টাচারের অংশ হিসাবেই দেখছেন বিশেষজ্ঞরা। তবে ভূরাজনৈতিক দিক থেকে এটিকে নতুন ইঙ্গিতও মনে করা হচ্ছে। তারেক রহমানের সঙ্গে পাকিস্তানের স্পিকার আইয়াজ সাদিকের সাক্ষাৎও সেই বিবেচনায় গুরুত্বপূর্ণ। জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে এ দুই প্রতিবেশী রাষ্ট্রের প্রতিনিধিদের এ সাক্ষাৎকে সব বিবেচনায় ইতিবাচক হিসাবেই দেখছে কূটনৈতিক মহল।’ (যুগান্তর ২ জানুয়ারি, ২০২৬)
এ বিশ্লেষণ কূটনৈতিক শিষ্টাচার এবং প্রতিবেশী দেশের সঙ্গে নতুন করে সম্পর্ক গড়ে তোলার জন্য গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত। শেখ হাসিনা-উত্তর বাংলাদেশ এক্কাট্টা ভারতের অদূরদর্শী পররাষ্ট্রনীতির বিরুদ্ধে। কারণ, বাংলাদেশ চায়, সমতার সঙ্গে সম্মানজনক সহাবস্থান। সম্মান ও সমতার সঙ্গে ভারত কোনোদিনই আচরণ করেনি, এটি ঐতিহাসিকভাবে সত্য। সেখানে বেগম খালেদা জিয়ার প্রতি সম্মান জানানোর কোনো রাষ্ট্রীয় প্রটোকল নেই। তিনি বেসরকারি এক প্রজ্ঞামতী রাজনৈতিক চরিত্র, যার শাসনামলেও ভারত ভালো আচরণ করেনি। সেই খালেদা জিয়ার প্রতি নরেন্দ্র মোদি ও ভারত সরকারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্করকে শোক জানাতে পাঠানোর পেছনে মোদি ও বিজেপি সরকারের সম্পর্কোন্নয়নের ইঙ্গিত দিচ্ছে বলেই আমি ধারণা করি।
বাংলাদেশের বহু রাজনৈতিক দল ও সামাজিক মানুষের মধ্যে ভারত প্রশ্নে যে ঐক্য তৈরি হয়েছে, সেই জনজাগরণের হিমালয় কঠিন চেতনাকে ১৬ বছরে শেখ হাসিনার এজেন্টরা, সাংস্কৃতিক বুদ্ধিবৃত্তিক সমাজ ভাঙতে পারেনি। মওলানা ভাসানী তার রাজনৈতিক প্রজ্ঞা দিয়ে যে কথা বলেছেন, ‘ভারত আমাদের বন্ধু দেশ নয়’, সেই সত্যে দাঁড়িয়েছে নতুন তরুণ সমাজ। ওসমান হাদির হত্যার পরও ভারতবিরোধী উত্তাল জনগণের মনোভাব লক্ষ করেছে দিল্লি।
ভারতীয় পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্করের ঢাকা সফর, বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করা, পররাষ্ট্র উপদেষ্টার সঙ্গে সাক্ষাৎ করা, জামায়াতের আমিরের সঙ্গে সাক্ষাৎ করার পেছনেও রয়েছে আগামীতে যে সরকারই আসুক না কেন, তাদের সঙ্গে কাজ করা ও সম্পর্কোন্নয়নের ইঙ্গিত দেয়। একে আমি ইতিবাচক বলে মনে করি।
তবে, একটি শঙ্কাও আছে। তাহলো শেখ হাসিনাকে ভারত আবারও প্রমোট করার চেষ্টা চালাবে। তবে, সেটা সুদূরপরাহত বলেই মনে করি আমি। কারণ হাসিনার অপরাধমূলক শাসনামল আগামী ৫০ বছরেও সাধারণ ও শিক্ষিত মানুষের মন থেকে দূর হবে না।
২.
এর বাইরেও আছে কিছু আওয়ামী শেকড়, যারা ১৬ বছরের সুবিধাভোগী। তাদের জন্য রয়েছে কিছু প্রশাসনিক চাকরিজীবীর উসকানি। আমলাতন্ত্রের সর্পগুলো নাগিনী বশের সুর শুনলে মাথা তুলতে পারে। আছে কিছু পুলিশ, যাদের রক্তপ্রবাহে আছে আওয়ামী ধ্যান ও ধারণা। দুঃশাসন আর উন্নয়ন যে একই ধারায় চলতে পারে না, টাকার এপিঠ ওপিঠ নয়-এ বোধও তাদের নেই। দিল্লি থেকে শেখ হাসিনার উসকানিতে তারা প্রলুব্ধ হতে পারে, যা দেশের সার্বিক গণতান্ত্রিক পরিস্থিতি ঘোলা করে দিতে পারে; যা কারও কাঙ্ক্ষিত নয়।
এ নেগেশনের বিপরীতে একটি কল্যাণকর ও দূরদর্শী বয়ান আমাদের জন্য জরুরি। আর তা হতে পারে সম্পর্কোন্নয়নে অচল হয়ে পড়া সার্কের নবজাগরণ। সার্কের দুরবস্থার জন্য পুরোপুরিই দায়ী ভারত। দাদাগিরি যে সবক্ষেত্রে চলে না, এ বোধ ভারতীয় রাজনীতিতে জাগতে হবে। গরিব মানুষদের নিয়ে ভাবুন। তাদের দিনরাত্রির কর্মযজ্ঞ নিয়ে ভাবুন। তাদের অবদান নিয়ে সত্য উচ্চারণ করুন। আমরা সেটাই ভাবছি, যা জনগণের জন্য কল্যাণ ও ন্যায়ের হবে। দাদাগিরি করার দিন শেষ হয়েছে।
এস জয়শঙ্কর যে করমর্দন করেছেন আইয়াজ সাদিকের সঙ্গে, তাকে রূপকে ঢেকে না দিয়ে আমরা ভাবতে শিখি যে, ভারতের ক্ষমতাসীন রাজনীতিকদের ও সরকারি চেতনায় বিরোধ নিষ্পত্তির একটি শুভ ইঙ্গিত? একে আমরা একটি নয়া সম্পর্কের দিগন্ত উন্মোচনের ইঙ্গিত ধরতে পারি। পারমাণবিক শক্তি নয়, ১৪০ কোটি মানুষের ইতিবাচক আকাঙ্ক্ষার রূপক ভাবতে পারি ওই হ্যান্ডশেকটিকে। যুদ্ধ নয়, শান্তিই মূল তরিকা হতে হবে দক্ষিণ এশিয়ার রাজনৈতিক ও সামরিক দৃষ্টিভঙ্গির ভেতরে।
বিষয়টি হতে পারে এমন মানবিক ও নৈতিক-‘দেবো আর নেবো/মিলিবো মেলাবো;’-এ পারস্পরিক সম্পর্কের সুন্দর কানেকটিভিটির। যোগাযোগের প্রগতি সব ভুল বোঝাবুঝি আর অপতথ্যের ভান্ডারকে নিঃশেষ করে দিতে পারে। এ যোগাযোগ গড়ে তোলা গেলে যেসব ভয় ও দুর্ভাবনা রয়েছে, তা দূর হবে। তবে এ বিষয়টি সার্কের মাধ্যমে গড়ে তোলার অন্য কোনো বিকল্প নেই। সার্কের পুনঃযাত্রার আয়োজন ভারতকেই করতে হবে। এখন তো আর শহীদ জিয়া নেই যে, এ ভিশনারি প্রকল্পের নেতা গড়ে তুলবেন শেকড় থেকে এ ধারা। তবে আছেন তারেক রহমান, বিএনপির নতুন অগ্রদূত-তিনি ইনেশিয়েটিভ নিলে বিষয়টি পিতার হালটি পুত্রের হাতেই কেবল আসবে না, নেতৃত্বেরও ডাইমেনশন সৃষ্টি হবে। সার্ক কেবল দক্ষিণ এশিয়ার দুই কিংবা সোয়া দুইশ বা আড়াইশ কোটি মানুষের ভাগ্যোন্নয়নের পবিত্র কাজটি করতে পারে না-এতদঞ্চলের গরিব মানুষের সার্বিক উন্নতির সংস্থা হয়ে উঠতে পারে। আর চীন ও মিয়ানমারও যদি এ সংস্থায় আসে বা জোড়ে নেওয়া যায়, তাহলে ভূরাজনীতির ভেতরে যে ডিপ স্টেট নিয়ে ভয় ও ভীতি কাজ করে আমাদের মনে, তারও অবসান হবে। এসব ক্ষেত্রে রাজনৈতিক স্থিতি ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ, পারস্পরিক সহাবস্থানের সঙ্গে সম্মান ও ন্যায়-কল্যাণের হিতকরী সহযোগিতার নতুন বাণিজ্য ব্যবস্থা গড়ে আমাদের প্রত্যাশার রূপায়ণ নির্মাণ করা যায়।
৩.
সংঘাত নয়, সহাবস্থানই হতে হবে মৌলিক দৃষ্টিভঙ্গি, সার্ক দেশগুলোর অন্তরে। আমাদের সামনে তো আছে ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের দৃষ্টান্ত। কানেকটিভিটির ভালো উদাহরণ। তাহলে কেন আমরা ব্যয়বহুল মৃত্যু-ধ্বংস আর নির্মম সংঘাতে জড়াব?
ড. মাহবুব হাসান : কবি ও সাংবাদিক
