Logo
Logo
×
   

Advertisement

উপসম্পাদকীয়

অ্যালগরিদমের ‘ফাঁদ’

Advertisement

Icon

ড. শাহ জে মিয়া

প্রকাশ: ১৬ জানুয়ারি ২০২৬, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

অ্যালগরিদমের ‘ফাঁদ’

অ্যালগরিদমের ‘ফাঁদ’। ছবি: যুগান্তর

Advertisement

আমাদের বর্তমান আধুনিক যুগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমগুলো তাদের অ্যাপ্লিকেশনের পেছনে বিভিন্ন ধরনের অ্যালগরিদম ব্যবহার করে থাকে। এ অ্যালগরিদমগুলো অত্যন্ত চতুরতার সঙ্গে যে কোনো ব্যবহারকারীর আচরণ, পছন্দ, আগ্রহ এবং নানাবিধ অনুভূতি বা চিন্তার বিশ্লেষণ করে। যা হোক, এসব ইন্টেলিজেন্ট অ্যালগরিদমকে ইদানীং আমাদের সমাজের সব অবক্ষয়, সহিংসতা আর বিভাজনের মূল হোতা হিসাবে দাঁড় করানো হচ্ছে। ১৩ জানুয়ারি বাংলাদেশের একটি পত্রিকায় (যুগান্তর) প্রকাশিত ‘অপরাধ-মানসিকতা তৈরির ভয়ংকর ফাঁদ ‘অ্যালগরিদম’ প্রবন্ধে বলা হচ্ছে, এ ‘অদৃশ্য প্রযুক্তি’ আমাদের চিন্তাকে নিয়ন্ত্রণ করছে, ফলে আমাদের সমাজে অনলাইনে অপরাধপ্রবণতা বেড়ে চলছে। প্রবন্ধটি একটি কোয়ালিটেটিভ গবেষণার ফলাফল হিসাবে প্রতীয়মান হলেও এ অভিযোগের আঙুল তোলার আগে আমাদের একবার এর ভেতরের অন্তর্নিহিত ব্যাপারগুলো নিয়ে ভাবা উচিত। অ্যালগরিদম কি সত্যিই আমাদের নিয়ন্ত্রণ করছে, নাকি আমরা যেসব কনটেন্ট গোগ্রাসে গ্রহণ করছি, সেগুলোকেই আমাদের সামনে বারবার পরিবেশন করছে?

মূলত, সোশ্যাল মিডিয়ায় অ্যালগরিদমগুলো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই দিয়ে তৈরি। এটি একটি শক্তিশালী কনটেন্ট ‘বিবর্ধক’ (Amplifier) মাত্র। আমরা প্রায়ই ভুলে যাই, ফেসবুক, ইউটিউব বা টিকটকের ‘নিউজ ফিড’ বা ‘ফর ইউ’ পেজ সবার জন্য এক নয়। আমার মোবাইলের স্ক্রিনে যা ভেসে উঠছে, তা আপনার স্ক্রিন থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। এ পার্থক্যটা তৈরি হয় আমাদেরই আচরণের ওপর ভিত্তি করে। অ্যালগরিদম এবং এআই আমাদের প্রতিটি ক্লিক, স্ক্রল, ওয়াচ-টাইম এবং শেয়ার করার প্রবণতা প্রতিনিয়ত বিশ্লেষণ করে থাকে।

যুক্তিটি খুবই সরল, আমি যদি সহিংসতা, মারামারি বা বিদ্বেষপূর্ণ কনটেন্টে বেশি সময় ব্যয় করি, তবে অ্যালগরিদম ধরে নেবে, এটাই আমার আগ্রহের জায়গা। তখন সে আমাকে আরও বেশি সহিংস কনটেন্ট দেখাবে। কারণ, তার মূল উদ্দেশ্য আমাকে অ্যাপটিতে বেশিক্ষণ ধরে রাখা। পক্ষান্তরে, আমি যদি সমাজসেবা, ধর্মীয় আলোচনা কিংবা শিক্ষামূলক কনটেন্টে সময় দেই, তাহলে অ্যালগরিদম আমাকে সেই জগতের সঙ্গেই যুক্ত রাখবে। অ্যালগরিদমকে একটি ‘মনস্তাত্ত্বিক আয়না’ বলা যেতে পারে। আয়নার সামনে দাঁড়ালে যেমন নিজের প্রতিবিম্ব দেখা যায়, সোশ্যাল মিডিয়াও আমাদের সামষ্টিক ও ব্যক্তিগত চরিত্রের প্রতিবিম্ব দেখায়। যদি এমন হতো, একজন ব্যবহারকারী নিয়মিত জনহিতকর কাজ, পজিটিভ কনটেন্ট বা ধর্মীয় ও আধ্যাত্মিক বিষয়াদি খুঁজছেন, কিন্তু সোশ্যাল মিডিয়া জোর করে তাকে রক্তপাত বা উসকানিমূলক ভিডিও দেখাচ্ছে, একমাত্র তখনই আমরা অ্যালগরিদমকে ‘অপরাধী’ বা ‘ফাঁদ’ বলতে পারতাম। কিন্তু বাস্তবতা হলো, অ্যালগরিদম আমাদের জোর করে কিছু পরিবেশন করে না; বরং আমরা যা দেখতে চাই, সেটার জোগান বাড়ায় মাত্র।

একজন মানুষ যখন ঘণ্টার পর ঘণ্টা ট্রল, গুজব বা বিদ্বেষপূর্ণ ভিডিওতে ‘হা-হা’ রিয়েক্ট দেন কিংবা কমেন্টে তর্কে লিপ্ত হন, তখন তিনি অজান্তেই অ্যালগরিদমকে সিগন্যাল দেন, ‘আমি এটাই চাই’। ফলস্বরূপ, অ্যালগরিদমের প্রযুক্তিগুলো তার সামনে তথাকথিত ‘ইকো-চেম্বার’ তৈরি করে।

বলা হয়ে থাকে, যদি আমরা অনলাইনে সহিংসতার খবর দেখে উত্তেজিত হই, মব জাস্টিসে অংশ নেই বা গুজবে কান দেই, তবে সেই ব্যর্থতা আমাদের বিচারবোধের, শিক্ষার এবং মূল্যবোধের। এখানে আমি জোরালোভাবে বলতে চাই, অ্যালগরিদমগুলো হচ্ছে কেবল একটি বা সমষ্টিগত প্রযুক্তির মাধ্যম। বন্দুক যেমন নিজে মানুষকে মেরে ফেলতে পারে না, ট্রিগার চাপতে হয় মানুষকেই; তেমনি অ্যালগরিদম নিজে সহিংসতা ছড়ায় না, আমরাই একে ভাইরাল করি সহিংসতা ছড়ানোর উত্তেজনা তৈরি করার জন্য।

প্রযুক্তির এ যুগে অ্যালগরিদমকে কেবল ভয়ের চোখে না দেখে এর অপরিহার্য প্রয়োজনীয়তা এবং ইতিবাচক দিকগুলো অনুধাবন করা সময়ের দাবি। কেন অ্যালগরিদম আমাদের জন্য আশীর্বাদ, তা বুঝতে হলে বর্তমান বিশ্বের তথ্যের প্রবাহ বা ‘বিগ ডেটা’র দিকে তাকাতে হবে। পৃথিবী এখন এমন এক অবস্থায় পৌঁছেছে, যেখানে বিগ ডেটার চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করা মানুষের একার পক্ষে অসম্ভব হয়ে পড়েছে।

এখন ডাটা ব্যাংকগুলো এমন ‘ইন্টেলিজেন্ট টেকনোলজি’র ওপর ভিত্তি করে তৈরি হচ্ছে, যেখানে আলাদা করে প্রথাগত ডাটা স্টোরেজের প্রয়োজন হয় না। বরং অনলাইনের বিভিন্ন ইউআরএল, হ্যাশট্যাগ বা সোর্স থেকে ডাটা পড়ে ডাইনামিক ওয়েতে বা গতিশীলভাবে আপনার প্রয়োজনীয় তথ্যটি আপনার সামনে হাজির করা হয়। ইন্টারনেটের সোশ্যাল মিডিয়াগুলোতে প্রতিনিয়ত মিলিয়ন-বিলিয়ন ব্যবহারকারী অগণিত ডেটা তৈরি করছেন, যা সামলানোর জন্য এআই অ্যালগরিদম অপরিহার্য।

অনেকে অভিযোগ করেন, অ্যালগরিদম মানুষের অনলাইন অ্যাকটিভিটি মনিটর করে এবং তাদের পছন্দ বা ‘প্রেফারেন্স’ আগে থেকেই জেনে যায়। কিন্তু গভীরভাবে ভাবলে দেখা যায়, এটি কোনো দোষ নয়, বরং এটি একটি সঠিক সেবাদানের পূর্বশর্ত। ফেসবুক বা ইউটিউবের মতো প্ল্যাটফর্মগুলো মিলিয়ন-বিলিয়ন কনটেন্ট থেকে শর্টিং বা বাছাই করে ব্যবহারকারীর সামনে সেই কনটেন্টটিই নিয়ে আসে, যা তার প্রয়োজন বা পছন্দের সঙ্গে সব সময়ই সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়ে থাকে। এটি মানুষের সময় বাঁচায় এবং সার্চিংয়ের অভিজ্ঞতাকে আনন্দদায়ক করে তোলে। অ্যালগরিদমগুলো মূলত আপনার নিজস্ব অনুভূতি, আচরণ এবং চিন্তা-চেতনার সঙ্গে ম্যাচিং করে প্রতিনিয়ত কনটেন্ট প্রপোজ করে, একে নেতিবাচকভাবে দেখার সুযোগ নেই, বরং এটি একটি সোশ্যাল মিডিয়ায় সুপারিশ ব্যবস্থার অংশ।

এআই অ্যালগরিদম নিয়ে সমালোচনা করার আগে এর বিভিন্ন স্তর বা প্রকারভেদ সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা থাকা জরুরি। প্রযুক্তি বিশ্বে এআই-কে প্রধানত কয়েকটি ভাগে ভাগ করা হয়, যা আমাদের জানা প্রয়োজন :

প্রথমেই রয়েছে উইক এআই (Weak AI/Narrow AI)। এটি নির্দিষ্ট কোনো একটি কাজ করতে পারে; যেমন-স্মার্ট স্পিকার বা দাবা খেলার সফটওয়্যার। বর্তমানে আমরা যা ব্যবহার করছি, তার বেশিরভাগই এ ক্যাটাগরির। দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে জেনারেল এআই (General AI), যেটাকে ‘পারপাসফুল এআই’ বলা হয়, যা মানুষের মতো বুদ্ধিমত্তা দিয়ে বিভিন্ন ধরনের সমস্যা সমাধান করতে এবং সুপারিশ করতে পারে। বর্তমান ব্যবসাগুলো সাধারণত এ জেনারেল এআই বা এর কাছাকাছি প্রযুক্তি ব্যবহারের দিকেই ঝুঁকছে। সর্বোপরি রয়েছে স্ট্রং এআই (Strong AI)। এটি মানুষের চেয়েও বেশি বুদ্ধিমান ও স্বয়ংক্রিয় ক্ষমতার অধিকারী, যা এখনো তাত্ত্বিক পর্যায়ে রয়েছে, বিজ্ঞানীরা এ ধরনের এআই নিয়ে কাজ করে চলেছেন। ব্যবহারের উদ্দেশ্যের দিক থেকে বর্তমানে আমরা নতুন এক ধরনের এআই খুব ব্যবহার করছি, তার নাম জেনারেটিভ এআই (Gen AI)। এটি নতুন কনটেন্ট (টেক্সট, ছবি, অডিও) তৈরি করতে সক্ষম। বর্তমানে এটি খুবই জনপ্রিয়।

এআই বা অ্যালগরিদম নিয়ে আমাদের সমাজে একটি বড় ভয় হলো, এটি মানুষের চাকরি কেড়ে নেবে। কিন্তু মুদ্রার উলটো পিঠটি হলো, এআই মানুষের সময় বাঁচিয়ে দিচ্ছে, এবং নতুন জ্ঞানভিত্তিক চাকরির জন্ম দিচ্ছে। এটি মানুষের একঘেয়ে ও পুনরাবৃত্তিমূলক (Repetitive) কাজগুলো নিজের কাঁধে তুলে নিচ্ছে। ফলে মানুষ এখন নিজস্ব চিন্তাভাবনা বা ‘ক্রিটিক্যাল থিংকিং’ করার জন্য অনেক বেশি সময় পাচ্ছে। এ বাড়তি সময়টুকু কাজে লাগিয়ে মানুষ তাদের সৃজনশীল কাজ এবং সমাজের অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ টাস্কগুলো আরও ভালোভাবে সম্পন্ন করতে পারছে। এর ফলে নতুন নতুন আবিষ্কার সম্ভব হচ্ছে এবং চাকরির বাজার আরও উন্নত ও ইনোভেশনের মাধ্যমে প্রসারিত হচ্ছে।

এআই অ্যালগরিদমগুলো কখনোই মানুষের শিক্ষার সুযোগ বা লার্নিংয়ের জায়গা সংকুচিত করে না, বরং তা আরও উন্মুক্ত করে। এটি যেহেতু একটি নতুন প্রযুক্তি এবং এটি এখনো ‘টেস্টিং’ বা পরীক্ষামূলক পর্যায়ে আছে, তাই কিছু সীমাবদ্ধতা থাকতে পারে। কিন্তু আশার কথা হলো, বিশ্বজুড়ে এখন ‘এথিক্যাল এআই’ নিয়ে ব্যাপক গবেষণা চলছে। বিশ্বের বড় বড় গবেষক গ্রুপ এখন কাজ করছে কীভাবে এআই-কে নিরাপদ করা যায়। শিশু (১৮ বছরের নিচে) থেকে শুরু করে প্রাপ্তবয়স্ক, সবার বয়স, সক্ষমতা এবং সামাজিক মূল্যবোধ মেনে যেন অ্যালগরিদম কাজ করে, সেই প্রটোকল তৈরি হচ্ছে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং অন্যান্য আন্তর্জাতিক সংস্থা শিশুদের সুরক্ষা এবং এআই লিটারেসির ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে। অদূর ভবিষ্যতে আমরা এমন একটি ‘ট্রান্সপারেন্ট’ বা স্বচ্ছ এআই ব্যবস্থা পাব, যা আমাদের সবার জন্য নিরাপদ হবে।

প্রযুক্তিকে দোষ দিয়ে নিজেদের দায় এড়ানোর সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। সমাজকে অপরাধমুক্ত রাখতে হলে অ্যালগরিদম বদলানোর চেয়ে জরুরি হলো আমাদের নিজেদের ‘ডিজিটাল আচরণ’ এবং মনোজগৎকে বদলানো। কারণ, দিনশেষে প্রযুক্তি মানুষেরই সৃষ্টি, মানুষ প্রযুক্তির সৃষ্টি নয়। এর নেতিবাচকতার চেয়ে ইতিবাচক দিক অনেক বেশি। আমরা যদি প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করতে পারি এবং ‘নেগেটিভিটি’কে ‘পজিটিভিটি’তে রূপান্তর করতে পারি, তবে এআই অ্যালগরিদমগুলো হবে মানব জাতির ইতিহাসের অন্যতম সেরা সহযোগী। ভবিষ্যৎ বাংলাদেশ সরকারের উচিত হবে উপযুক্ত এক্সপার্টিজ প্রয়োগের মাধ্যমে বিশ্বাসযোগ্য এবং সামাজিক এআই অ্যালগরিদম তৈরি এবং সবার জন্য ব্যবহারযোগ্য করা।

ড. শাহ জে মিয়া : প্রফেসর অব বিজনেস অ্যানালিটিক্স অ্যান্ড অ্যাপ্লায়েড এআই, নিউক্যাসল ইউনিভার্সিটি, নিউ সাউথ ওয়েলস, অস্ট্রেলিয়া; উপদেষ্টা, বিএনপি অস্ট্রেলিয়া এবং বিএনপি চেয়ারম্যানের বহিঃবিশ্বে শহীদ জিয়ার আদর্শে বিশ্বাসী পেশাজীবী এক্সপার্টিজ গ্রুপের সদস্য

Advertisement

Advertisement

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম