হালফিল বয়ান
কথামালার নির্বাচনি ইশতেহার আর চলবে না
Advertisement
ড. মাহফুজ পারভেজ
প্রকাশ: ১৮ জানুয়ারি ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
বাংলাদেশ কথামালার রাজনীতির এক অনুপম জনপদ। মুখে যা ইচ্ছা বলে দেওয়ার প্রচলন এখানে সর্বজনবিদিত। এদেশে ‘ওয়াদা’ ও ‘বাস্তবায়ন’ অবস্থান করে দুস্তর ব্যবধানে। বেশির ভাগ রাজনীতিবিদ ওয়াদা বা প্রতিশ্রুতি দেওয়ার সময় ভাবনা-চিন্তা করেন না। পারবেন, নাকি পারবেন না, এ বিবেচনাও তাদের থাকে না। মুখে মুখে তারা ক্ষীরের নদী, দুধের সাগর, মধুর নহর বানিয়ে দিতে পারেন। কাজে-কর্মে-বাস্তবে সেসব ওয়াদা কিংবা প্রতিশ্রুতির ধারে-কাছেও যেতে পারেন না। অতীতের সরকারগুলোর আমলনামা সামনে রেখে ওয়াদা ও বাস্তবায়নের তুলনা করা হলে বিষয়টি স্পষ্ট হবে।
বাংলাদেশের জনগণও নেতাদের মুখ থেকে সুন্দর সুন্দর ওয়াদা শুনতে পছন্দ করেন। নির্বাচন এলে নেতাদের প্রতিশ্রুতি বন্যার পানির মতো প্রবাহিত হয়। যদিও সেগুলো বাস্তায়িত হয়েছে কিনা, সে প্রশ্ন জনগণ করেন না। বিগত দিনগুলো এমন ভাবেই কেটেছে। সামনের দিনগুলোতে পরিস্থিতি আগের মতো থাকবে বলে মনে হয় না। জুলাই বিপ্লবের পর তথ্যপ্রযুক্তিতে অগ্রসর জেন-জি প্রজন্ম প্রশ্ন করতে শিখে গিয়েছে। তারা নানা ইস্যুতে তর্ক-বিতর্ক করেন। জিজ্ঞাসা ও জবাবদিহিতায় দল ও নেতাদের জর্জরিত করেন। ফলে পরিবর্তিত রাজনীতি সামনে রেখে কথামালার নির্বাচনি ইশতেহার আর চলবে বলে মনে হয় না।
অতএব, আসন্ন নির্বাচনি ইশতেহারে শুধু সুন্দর সুন্দর প্রতিশ্রুতি, চটকদার ওয়াদা ও সুমধুর কথার সমাহার হলে চলবে না। ইশতেহারকে হতে হবে এমন একটি জীবন্ত দলিল, যে দলিল রাষ্ট্রচিন্তার পরিপক্বতা এবং শাসন দর্শনের গভীরতাকে প্রকাশ করবে। বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক বিন্যাসে ২০২৪ সালের জুলাইয়ের ঐতিহাসিক পটপরিবর্তনের পর নির্বাচনি ইশতেহারের ভূমিকা আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। এটি এখন শুধু ভোটারদের আকর্ষণের কাগুজে হাতিয়ার নয়, বরং একটি রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ গতিপথ নির্ধারণের মানচিত্রও।
পরিস্থিতির কারণে মানুষের প্রত্যাশার পারদ এখন এতটাই তপ্ত, তারা নির্বাচনি ইশতেহারে দুর্নীতিমুক্ত সুশাসন ও গণতান্ত্রিক পরিপক্বতার প্রতিফলন দেখতে চায়। দলগুলোকে এক্ষেত্রে সতর্কতার সঙ্গে জনমত ও জনচাহিদার অনুসারী হতে হবে। কথার কথা বলে সামনের নির্বাচনে রেহাই পাওয়া যাবে বলে মনে করার কারণ নেই। খুব কঠিন রাজনৈতিক পরীক্ষা পাড়ি দিতে হবে দলগুলোকে। ভেবেচিন্তে ও যথেষ্ট তৈরি হয়ে দলগুলোকে নির্বাচনি ইশতেহার তৈরি করতে হবে।
একটি পরিণত গণতন্ত্রে নির্বাচনি ইশতেহার মূলত তিনটি স্তরে কাজ করে : প্রথমত, এটি রাজনৈতিক দলের বিশ্বদৃষ্টি এবং রাষ্ট্রচিন্তার প্রকাশ। দ্বিতীয়ত, এটি জনগণের সঙ্গে একটি লিখিত চুক্তির মতো, যেখানে উভয়পক্ষের দায়বদ্ধতা স্পষ্ট থাকে। এবং তৃতীয়ত, এটি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি নথি, যার মাধ্যমে রাজনৈতিক দলের বিবর্তন ও চিন্তার ধারাবাহিকতা বোঝা সম্ভব। এমন সুদূরপ্রসারী ও তাত্ত্বিকভাবে বিশুদ্ধ ইশতেহার বাংলাদেশে কোনো দল কখনো উপস্থাপন করেছে বলে জানা নেই। বরং বাংলাদেশে এখন পর্যন্ত ইশতেহারকে প্রধানত প্রথম স্তরেই সীমিত রাখা হয়েছে। কিন্তু জুলাই-পরবর্তী রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে এটিকে দ্বিতীয় ও তৃতীয় স্তরে উন্নীত করে একটি সামগ্রিক কাঠামোতে উপস্থাপনের প্রয়োজনীয়তা দেখা দিয়েছে। দলগুলোকে তাদের দলীয় বা জোটগত নির্বাচনি ইশতেহার ভোটারদের সামনে পেশ করে জনসমর্থন চাইতে হবে।
নির্বাচনের এক মাসের কম সময় রয়েছে, অথচ আনুষ্ঠানিকভাবে এখনো দলগুলো নির্বাচনি ইশতেহার প্রকাশ করেনি। ইশতেহার প্রসঙ্গে গণমাধ্যমে প্রাপ্ত দলীয় অবস্থানের গুণগত বিশ্লেষণে দেখা যায়, বিএনপি তাদের প্রস্তাবিত ইশতেহারে যে আধুনিক রাষ্ট্রের ধারণা উপস্থাপন করেছে, তা নিঃসন্দেহে তরুণ প্রজন্মের আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে সংগতিপূর্ণ। কিন্তু এখানে একটি মৌলিক প্রশ্ন হলো-উচ্চাকাঙ্ক্ষী লক্ষ্য এবং বাস্তবায়নের সক্ষমতার মধ্যে সমন্বয় কীভাবে হবে? এক কোটি কর্মসংস্থানের মতো প্রতিশ্রুতি শুধু তত্ত্বে সীমাবদ্ধ না রেখে এর অর্থনৈতিক মডেল, বিনিয়োগের উৎস এবং প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো সুস্পষ্টভাবে ব্যাখ্যা করা প্রয়োজন। দলের রাষ্ট্রদর্শনের ও শাসন-পরিকল্পনার স্বচ্ছ ও পরিপূর্ণ বিবরণ জনসমক্ষে উপস্থাপনের স্বার্থে বিভিন্ন বিষয়ে স্পষ্ট বক্তব্য তুলে ধরা জরুরি।
জামায়াতে ইসলামীর নির্বাচনি ইশতেহারে প্রাধান্য পাচ্ছে দুর্নীতিমুক্ত সুশাসনের প্রসঙ্গ। দুর্নীতির মূলোৎপাটন করতে গেলে শুধু নৈতিকতার দোহাই দিলে চলবে না, প্রয়োজন স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা এবং প্রাতিষ্ঠানিক পুনর্গঠনের যথাযথ পরিকল্পনা। তাদের ইশতেহারে অর্থনৈতিক নীতির বিস্তারিত বিবরণ দিয়ে আধুনিক বহুত্ববাদী সমাজের চাহিদার সঙ্গে ধর্মীয় মূল্যবোধের সমন্বয়ের দলীয় কৌশল উপস্থাপন করতে হবে। দলটি যে সরকার পরিচালনার জন্য যোগ্য, সে সম্পর্কে অস্পষ্টতা তাদেরই দূর করতে হবে। দলটির রাজনৈতিক পরিপক্বতা নিয়ে যাতে সমালোচকরা প্রশ্নের অবকাশ না পায়, সেটাও নির্বাচনি ইশতেহারের মাধ্যমে সুরাহা করতে হবে দলটিকে।
জুলাই বিপ্লবের পর নবগঠিত এনসিপির ক্ষেত্রে মূল চ্যালেঞ্জ হলো আদর্শিক প্রতিশ্রুতি থেকে বাস্তব নীতিতে রূপান্তরের সক্ষমতা প্রমাণ করা। জুলাই-পরবর্তী প্রজন্মের প্রতিনিধি হিসাবে তাদের দায়িত্ব অনেক বেশি। কারণ তারা শুধু নতুন প্রতিশ্রুতি নয়, একটি নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতিরও প্রতীক। কিন্তু রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক অভিজ্ঞতার সীমাবদ্ধতা এবং জাতীয় নিরাপত্তা ও পররাষ্ট্রনীতির মতো জটিল বিষয়ে দক্ষতার প্রশ্ন তাদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। এসব বিষয়ে সুচিন্তিত বক্তব্য তাদের দল বা জোটগতভাবে সবার সামনে উপস্থাপন করতে হবে।
অতীতে জাতীয় নিরাপত্তার প্রসঙ্গ ছিল নির্বাচনি ইশতেহারের উপেক্ষিত অধ্যায়। কিন্তু জাতীয় নিরাপত্তার ধারণা আজ শুধু সামরিক শক্তির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। আধুনিক রাষ্ট্রবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে এটি এখন একটি সমন্বিত ধারণা, যার মধ্যে মানব নিরাপত্তা, অর্থনৈতিক নিরাপত্তা, সামাজিক নিরাপত্তা এবং ডিজিটাল নিরাপত্তা অন্তর্ভুক্ত। বাংলাদেশের মতো দেশের জন্য খাদ্য নিরাপত্তা, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলা, সাইবার নিরাপত্তা এবং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা জাতীয় নিরাপত্তারই অংশ। কিন্তু বিগত সব ইশতেহারে এ সমন্বি^ত দৃষ্টিভঙ্গির অভাব ছিল লক্ষণীয়।
আসন্ন নির্বাচনকে কেন্দ্র করে প্রণীতব্য ইশতেহারে জুলাই-পরবর্তী পটভূমিতে ফ্যাসিবাদবিরোধী দলগুলোর পক্ষ থেকে নতুন দর্শন উপস্থাপিত হওয়া প্রয়োজন। এজন্য নির্বাচনি ইশতেহার প্রণয়ন প্রক্রিয়ায় আমূল পরিবর্তন আনা দরকার। এটি শুধু দলীয় নেতৃত্ব বা একটি ছোট কমিটির কাজ হওয়া উচিত নয়। বরং এটি হওয়া উচিত একটি জাতীয় আলোচনার ফল, যেখানে বিশেষজ্ঞ, শিক্ষাবিদ, ব্যবসায়ী, কৃষক, শ্রমিক, নারী এবং যুব প্রতিনিধিরা অংশ নেবেন। যাতে প্রতিটি নীতি প্রস্তাবের পেছনে থাকবে গভীর গবেষণা, তথ্য-উপাত্ত এবং বাস্তবসম্মত বিশ্লেষণ। আরও থাকতে হবে ইশতেহারে প্রতিটি প্রতিশ্রুতির জন্য স্পষ্ট বাস্তবায়ন কৌশল, সময়সীমা, বাজেট বরাদ্দ এবং সাফল্য পরিমাপের সূচক।
নির্বাচনে শুধু ভোট দেওয়া নয়, জনগণের পক্ষে দায়িত্ব নিয়ে দলগুলোর ওয়াদাগুলোর সচেতন মূল্যায়ন করা দরকার। জনগণের দায়িত্ব শুধু ভোট দেওয়া ও ইশতেহার পড়া নয়, বরং সেটির গভীরে গিয়ে বোঝার চেষ্টা করা। প্রতিটি প্রতিশ্রুতির পেছনের যুক্তি, সম্ভাব্য বাস্তবায়ন চ্যালেঞ্জ এবং দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব বিচার করা প্রয়োজন। শুধু আকর্ষণীয় বাক্য বা বৃহৎ সংখ্যায় আকৃষ্ট না হয়ে বরং সেই প্রতিশ্রুতিগুলো বাস্তবায়নের প্রাতিষ্ঠানিক ও অর্থনৈতিক সক্ষমতা যাচাই করা উচিত। এরই ভিত্তিতে দল বা প্রার্থীর প্রতি সমর্থন জানানো বা সক্রিয় অবস্থান নেওয়া জনগণের দায়িত্বের অংশ। জনগণের সক্রিয়তার সামনে বায়বীয় আবেগ বা কাগুজে আশ্বাস দিয়ে দলগুলোর পক্ষে অতীতের মতো ধাপ্পা দেওয়া সম্ভব হবে না।
সামনের মাসে বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক রূপান্তরের পথপরিক্রমায় একটি সন্ধিক্ষণতুল্য পরিস্থিতিতে যে নির্বাচন হচ্ছে, বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এ নির্বাচনের ইশতেহারকেও তাই হতে হবে রাষ্ট্রচিন্তার পরিপক্বতার দলিল। তবে, নির্বাচনি ইশতেহার কখনোই শেষ কথা নয়, বরং এটি একটি শুরু। এটি সেই ভিত্তি, যার ওপর ভবিষ্যৎ শাসনব্যবস্থা দাঁড়ায়। বাংলাদেশ আজ একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে দাঁড়িয়ে, যেখানে আমাদের প্রয়োজন পরিণত রাষ্ট্রচিন্তা এবং গভীর শাসন দর্শন। আসন্ন নির্বাচনি ইশতেহারগুলো যেন সেই পরিপক্বতারই পরীক্ষা ক্ষেত্র হয়। দলগুলোর উচিত হবে অতীতের মতো ইশতেহারকে শুধু ভোটারদের প্রলোভনের হাতিয়ার না বানিয়ে, বরং একটি গভীর রাষ্ট্রদর্শনের প্রকাশ হিসাবে উপস্থাপন করা। আর নাগরিকদের দায়িত্ব হবে সেই ইশতেহারকে গভীরভাবে পড়া, বোঝা এবং বিচার করা-কারণ, আমাদের আজকের পছন্দই নির্ধারণ করবে আগামী দিনের বাংলাদেশের চেহারা।
একটি সুস্থ গণতন্ত্রে নির্বাচনি ইশতেহার শুধু নির্বাচনের সময় পড়ার জন্য নয়, বরং তা পুরো মেয়াদজুড়ে সরকারের কাজকর্ম মূল্যায়নের মাপকাঠি। সেই দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার করলে, বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলোর জন্য এখনই সময় তাদের ইশতেহারকে গভীর তথ্যপূর্ণ এবং জবাবদিহিতামূলক করে উপস্থাপনের চেষ্টা করা। কারণ, একটি ভালো ইশতেহার শুধু ভোট পায় না, এটি মানুষের আস্থাও অর্জন করে-আর সেই আস্থাই হলো টেকসই গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার ভিত্তি। বিগত শাসনামলের নানা অসংগতি ও দুর্বলতার মতো কথামালার নির্বাচনি ইশতেহার দিয়ে টেকসই গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার ভিত্তি মজবুত করা মোটেও সম্ভব হবে না।
প্রফেসর ড. মাহফুজ পারভেজ : চেয়ারম্যান, রাজনীতি বিজ্ঞান বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়; নির্বাহী পরিচালক, চট্টগ্রাম সেন্টার ফর রিজিওন্যাল স্টাডিজ, বাংলাদেশ (সিসিআরএসবিডি)
