Logo
Logo
×
   

উপসম্পাদকীয়

দৃষ্টিপাত

অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের বিকল্প নেই

অধ্যাপক ড. আনোয়ারউল্লাহ্ চৌধুরী

অধ্যাপক ড. আনোয়ারউল্লাহ্ চৌধুরী

প্রকাশ: ২০ জানুয়ারি ২০২৬, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের বিকল্প নেই

ফাইল ছবি।

একজন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি সম্প্রতি বরিশালে অনুষ্ঠিত এক রাজনৈতিক সংলাপে প্রধান অতিথির বক্তব্যে বলেছেন, নির্বাচনি ট্রেন ট্র্যাকে উঠে গেছে। এটাকে ট্র্যাকচ্যুত করতে পারে রাজনীতিবিদ ও তাদের মনোনীত প্রার্থীরা। তারা যদি আইন মেনে চলেন এবং সদাচরণ করেন, তাহলে নির্বাচন নিয়ে কোনো ঝুঁকি থাকবে না। তিনি আরও বলেন, রাজনীতিবিদরা উত্তেজনা সৃষ্টি না করলে, সহিংসতায় লিপ্ত না হলে এবং এমপি হওয়ার জন্য অপকৌশল বন্ধ করলে সুষ্ঠু, সুন্দর ও নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠান করা সম্ভব। তিনি আরও বলেছেন, সুশাসন নিশ্চিত করা না গেলে জনগণকে সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য প্রতিবারই আন্দোলনে নামতে হবে।

আলোচনা সভায় তার এ বক্তব্য নানা কারণেই বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। আসন্ন ত্রয়োদশ নির্বাচন সুষ্ঠু, সুন্দর এবং জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে গ্রহণযোগ্য করে তোলার জন্য যেসব আবশ্যিক শর্ত রয়েছে তা কি পূরণ হয়েছে? আর এসব শর্ত সম্পন্ন করার দায়িত্ব কার? আমাদের দেশের রাজনীতিবিদ ও নির্বাচন পরিচালনায় নিয়োজিত ব্যক্তিরা যদি গণতান্ত্রিক মনোভাবের পরিচয় দিতে পারতেন এবং জনমতকে শ্রদ্ধা করতেন, তাহলে কি বারবার গ্রহণযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠানের দাবিতে সাধারণ মানুষকে আন্দোলন করতে হতো?

বহু রক্তের বিনিময়ে চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানের মাধ্যমে আমরা দীর্ঘদিন জাতির ঘাড়ে চেপে থাকা স্বৈরাচারের পতন ঘটিয়েছি। জনগণ গণতন্ত্রে উত্তরণের আশায় মগ্ন রয়েছে। ২০০৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত ১৬ বছর এ দেশের মানুষ তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারেনি। ২০০৯ সালে যে মানুষটির বয়স ছিল ১৮ বছর, তিনি অন্তত তিনটি জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারেননি। ২০১৪ সালে যে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়, তাতে ১৫৩ জন সংসদ-সদস্য বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হন। অবশিষ্ট ১৪৭টি আসনে নির্বাচনের নামে প্রহসন হয়েছে। ২০১৮ সালের নির্বাচনে দিনের ভোট রাতে দেওয়া হয়। রাত ১০টা থেকে শুরু করে তিনটার মধ্যে ৮০ শতাংশ ব্যালট পেপারে সিল দিয়ে বাক্সে ভরা হয়। ২০২৪ সালে নির্বাচন ছিল ডামি নির্বাচন। দলীয় সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচন শুধু বাংলাদেশ নয়, পৃথিবীর নির্বাচনি ইতিহাসে সবচেয়ে জঘন্য নির্বাচন হিসাবে চিহ্নিত হয়ে আছে। বিগত স্বৈরাচারী সরকার যদি ভোট কারচুপির মাধ্যমে জনগণের মতপ্রকাশ ও রাষ্ট্র পরিচালনায় অংশগ্রহণের সুযোগ থেকে বঞ্চিত না করত, তাহলে তাদের এমন করুণ পরিণতি ভোগ করতে হতো না। একটি স্বাধীন রাষ্ট্র চারটি আবশ্যিক উপকরণের সমন্বয়ে গঠিত হয়। এর মধ্যে রয়েছে (ক) স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব, (খ) নির্দিষ্ট ভূখণ্ড, (৩) জনসংখ্যা এবং (৪) সরকার। রাষ্ট্রের সবচেয়ে দুর্বল এবং একমাত্র পরিবর্তনশীল উপকরণ হচ্ছে সরকার। জনগণ হচ্ছেন রাষ্ট্রের প্রকৃত মালিক। আর সরকার হচ্ছে জনগণের পক্ষ থেকে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বপ্রাপ্ত আমানতদার মাত্র। কিন্তু সরকার যদি নিজেকে রাষ্ট্রের মালিক ভেবে বসে, তাহলেই সমস্যার সৃষ্টি হয়, যা আমরা বিগত সরকার আমলে প্রত্যক্ষ করেছি। তারা দেশটাকে নিজস্ব সম্পত্তি বলেই মনে করত। তারা ছাড়া কেউ যেন এ রাষ্ট্রের পরিচালকের আসনে বসতে পারবে না। তারা নির্বাচনকে কলঙ্কিত করে চিরদিন রাষ্ট্রক্ষমতায় আসীন থাকার স্বপ্ন দেখত। কিন্তু রাষ্ট্রের মূল মালিক যে জনগণ, তারা যদি কোনো কারণে সরকারের ওপর বিরক্ত হয়, তাহলে তার পরিণতি কী হতে পারে, বিগত সরকার তা ভালোভাবেই টের পেয়েছে। আগামী দিনে যারা রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব লাভ করবে, তারাও যদি পূর্ববর্তী সরকারের মতো দেশটাকে তাদের নিজস্ব সম্পত্তি বিবেচনা করে এবং চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানের চেতনা বাস্তবায়নে সামান্যতম দ্বিধা বা গাফিলতি করে, তাহলে তাদের পরিণতি পূর্ববর্তী সরকারের চেয়েও করুণ হতে পারে। তাই দেশের বৃহত্তর স্বার্থেই অন্তর্বর্তী সরকারের দায়িত্ব হবে জাতিকে একটি সুষ্ঠু, অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন উপহার দেওয়া; যা জাতীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে গ্রহণযোগ্যতা পাবে।

অন্তর্বর্তী সরকার জনগণের নির্বাচিত সরকার নয়, তারা জাতির সংকট মুহূর্তে বিশেষ দায়িত্ব পালনের জন্য ক্ষমতাসীন হয়েছে। তাদের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ হচ্ছে জাতিকে সর্বোতভাবে গ্রহণযোগ্য একটি নির্বাচন উপহার দিয়ে দেশে রাজনৈতিক সরকার প্রতিষ্ঠা করা। যদি তারা এ দায়িত্ব পালনে ন্যূনতম ব্যর্থতার পরিচয় দেয়, তাহলে তারা ইতিহাসের আস্তাকুঁড়ে নিক্ষিপ্ত হবে। আর যদি তারা সঠিকভাবে তাদের ওপর অর্পিত দায়িত্ব পালন করে জাতিকে একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন উপহার দিতে পারে, তাহলে ইতিহাসে তাদের নাম স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে। অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর প্রায় দেড় বছর অতিক্রান্ত হয়েছে। দেড় বছর একটি অনির্বাচিত সরকারের জন্য খুব একটা কম সময় নয়। এখন মূল্যায়ন করার সময়ে এসেছে এ দীর্ঘ সময়ে প্রশ্নাতীত সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনে অনুষ্ঠানের জন্য কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের ক্ষেত্রে তারা কতটা সক্ষম হয়েছে। নির্বাচনে যেসব রাজনৈতিক দল অংশগ্রহণ করবে, তাদের জন্য কি লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড তৈরি করা সম্ভব হয়েছে? কোনো কোনো রাজনৈতিক দল অভিযোগ করছে, অন্তর্বর্তী সরকার লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড তৈরির পরিবর্তে বিশেষ রাজনৈতিক দলের প্রতি পক্ষপাত প্রদর্শন করছে। অনেক সময় রাজনৈতিক দলগুলো সরকার এবং নির্বাচন কমিশনের ওপর চাপ সৃষ্টির জন্যও এ ধরনের অভিযোগ করে থাকে। তবে এ ব্যাপারে অন্তর্বর্তী সরকারকে সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে। আমাদের দেশে অতীতে দেখা গেছে, নির্বাচনে কোনো দলের জয়লাভ করার সম্ভাবনা থাকলে নির্বাচনে অনুষ্ঠানে নিয়োজিত কর্মকর্তারা সেই দলের প্রতি এক ধরনের আনুগত্য প্রদর্শন করে থাকেন। আগামী নির্বাচনে যেন এমন কোনো নজির সৃষ্টি না হয়, সে ব্যাপারে কঠোর দৃষ্টি রাখতে হবে। বিগত সরকার আমলে অনুষ্ঠিত ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এমন সরকারি কর্মকর্তাদের প্রিসাইডিং অফিসার এবং পোলিং অফিসার হিসাবে দায়িত্ব দেওয়া হতো, যারা প্রশ্নাতীতভাবে সরকারদলীয় সমর্থক হিসাবে পরিচিত। নির্বাচন সুষ্ঠুভাবে অনুষ্ঠানের ক্ষেত্রে প্রিসাইডিং অফিসার ও পোলিং অফিসারদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তারা ইচ্ছা করলে নির্বাচনকে বিতর্কিত করে ফেলতে পারেন। আবার সঠিকভাবে দায়িত্ব পালন করলে কারও পক্ষে নির্বাচনে কারচুপি করা সম্ভব হয় না। নির্বাচনের সময় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী পুরোপুরি প্রিসাইডিং অফিসারের নিয়ন্ত্রণে থেকে তাদের দায়িত্ব পালন করে।

নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতাকে দুভাবে মূল্যায়ন করা যেতে পারে। প্রথমত, অনুষ্ঠিত নির্বাচন গণমানুষের কাছে কতটা গ্রহণযোগ্য। সাধারণ মানুষ নির্বাচনে নির্বিঘ্নে তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারছে কি না। সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন আয়োজন করতে হলে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা এবং ভোট প্রদানের ক্ষেত্রে সম-অধিকার থাকতে হবে। অর্থাৎ এমন ব্যবস্থার অধীনে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে হবে, যেখানে একজন মানুষ চাইলেই নির্বাচনে দাঁড়াতে পারবে। আর ভোটাররা তাদের ইচ্ছামতো পছন্দের প্রার্থীকে ভোট দিতে পারবে। নির্বাচনে সম-অধিকারের বিষয়টি অনেকভাবেই ব্যাখ্যা করা যায়। নির্বাচনকে যদি অন্তত ৫টি শত্রুর হাত থেকে মুক্ত করা না যায়, তাহলে নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতা পাবে না। এর মধ্যে প্রথমেই উল্লেখ করতে হয় টাকার খেলার কথা। আমাদের দেশে নির্বাচন মানেই টাকার খেলা। নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে হলে বিপুল অঙ্কের টাকা থাকতে হয়। ভোটারদের সন্তুষ্ট করার জন্য টাকা ব্যয় করতে হয়। এ অবস্থায় যারা গরিব বা স্বল্প সম্পদের মালিক, তাদের পক্ষে নির্বাচনে অংশগ্রহণ এবং জয়লাভ করা সম্ভব হয় না। সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠানের ক্ষেত্রে দ্বিতীয় প্রতিবন্ধকতা হচ্ছে পেশিশক্তির ব্যবহার। নির্বাচনের সময় রাজনৈতিক দলগুলো তাদের পেশিশক্তি প্রদর্শন করার মাধ্যমে ভোটারদের মাঝে ভীতি সৃষ্টি করে থাকে। তৃতীয় নম্বর প্রতিবন্ধকতা হচ্ছে, সাম্প্রদায়িকতা এবং আঞ্চলিকতার প্রচার-প্রচারণা। চতুর্থ হচ্ছে, প্রশাসনিক দুর্নীতি এবং কারসাজি বন্ধ করা। আমাদের দেশ দীর্ঘদিন ধরে এসব সমস্যার কারণে নির্বাচনি ব্যবস্থাটাই ধ্বংস হয়ে গেছে। যতক্ষণ নির্বাচনব্যবস্থার আমূল সংস্কার করা না যাবে এবং বিদ্যমান সমাজ ব্যবস্থার কিছুটা পরিবর্তন করা না যাবে, ততক্ষণ আমরা নির্বাচনি ব্যবস্থাকে পুরোপুরি সুষ্ঠু এবং গ্রহণযোগ্য করতে পারব না। পঞ্চমত, ঋণখেলাপিদের নানা কৌশলে নির্বাচনের আগে ঋণখেলাপি মুক্ত হিসাবে দেখানো। কিছুদিন আগে বাংলাদেশে ব্যাংক ২ শতাংশ নগদ ডাউন পেমেন্ট প্রদানের মাধ্যমে ২ বছরের গ্রেস পিরিয়ডসহ ১০ বছরের জন্য খেলাপি ঋণ পুনঃতফসিলিকরণের সুযোগ দিয়েছে। এ সুযোগ না দিলে অনেক রাজনৈতিক নেতা, যারা বিভিন্ন ব্যাংকে ঋণখেলাপি, তাদের পক্ষে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করা সম্ভব হতো না।

গণ-অভ্যুত্থানের পরও আমরা দেশের সামাজিক কাঠামো এবং নির্বাচনি ব্যবস্থা নিয়ে আমূল সংস্কার করতে পারিনি। সামাজিক কাঠামো আগের মতোই রয়ে গেছে। এ মুহূর্তে ভয়মুক্ত পরিবেশে ভোট প্রদান এবং ভোটগণনার ক্ষেত্রে কোনো ধরনের কারচুপি বা কারসাজি না হয়, সেটা নিশ্চিত করতে হবে।

দেশের বিদ্যমান আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি এখনো স্বাভাবিক হয়নি। এটা সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য বাধা হতে পারে। নির্বাচনের সুষ্ঠু পরিবেশ সৃষ্টির জন্য পেশিশক্তির ব্যবহার বন্ধ করার জন্য বেআইনি অস্ত্র উদ্ধার করা খুবই জরুরি। কিন্তু এখনো পর্যন্ত বেআইনি অস্ত্র উদ্ধারে তেমন কোনো সাফল্য অর্জিত হয়নি। এমনকি দেশে কয়েকটি বেআইনি অস্ত্রের কারখানা আবিষ্কৃত হয়েছে বলে পুলিশ প্রশাসন জানিয়েছে। গণ-অভ্যুত্থানের সময় কারাগার থেকে অনেক আসামি পালিয়ে গেছে। তারা অস্ত্র নিয়ে গেছে। সেই অস্ত্র এখনো উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। কাজেই আগামী নির্বাচনে কোনো কোনো শক্তি জয়লাভের জন্য এসব অস্ত্র ব্যবহার করতে পারে। অর্থাৎ আগামী নির্বাচনের জন্য পেশিশক্তির ব্যবহারের আশঙ্কা রয়েই গেছে। অবস্থা এমন থাকলে পুরোপুরি ভালো এবং গ্রহণযোগ্য নির্বাচন প্রত্যাশা করা যায় না।

তবে এ মুহূর্তে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান দায়িত্ব হবে কারও প্রতি অনুরাগ-বিরাগের বশবর্তী না হয়ে সুষ্ঠু, সুন্দর ও সর্বজন গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের ব্যবস্থা করা। সংশ্লিষ্ট সব পক্ষ সুষ্ঠু নির্বাচন আয়োজনে সহযোগিতা করবেন, এটাই সবার কাম্য।

ড. আনোয়ারউল্লাহ চৌধুরী : সাবেক উপাচার্য, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়; বাহরাইনে নিযুক্ত বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রদূত

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম